Main Menu

আপনজনের কাছে উপস্থিত হয়ে শেষ বিদায় জানাতে পারছেনা ইতালীতে

ইতালী - পারিবারিক সদস্যরা আপনজনের কাছে উপস্থিত হয়ে শেষ বিদায় জানাতে পারছেনা। প্রস্তুতি নেয়ার সময় পাইনি ইতালী। শত্রু মোকাবেলায় পুরোপুরি অপ্রস্তুত ছিলো। ইতোমধ্যেই করোনাভাইরাস একের পর এক জীবন সংহারে মত্ত হয়েছে। ভাইরাস প্রতিরোধ ততোক্ষণে নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে গেছে। আক্রান্তদের জীবন বাঁচাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করতে হিসেবে ভুল করেছিলো ইতালীর কর্তৃপক্ষ। তারা ভাবতেই পারেনি করোনাভাইরাস আক্রমনে তারা এতোটা কুপোকাত হবে।

পরিনতি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক! এবং ইতালীর জন্য অভূতপূর্ব দৃশ্য! ডজেন ডজেন সেনাবাহিনীর গাড়ী শহরে ঘুরে ঘুরে হাসপাতালগুলো থেকে মৃত মানুষের লাশ সংগ্রহ করে ২০০ শত কিলোমিটার দূরে নিয়ে অন্তেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করছে। প্রত্যেকটি কনভয়ে ১০ ট্রাক করে লাশ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

লাশ সরানো হচ্ছে। বেড ক্লিন করা হচ্ছে। শত শত নতুন আক্রান্ত ভর্তি হচ্ছে। ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটে একটি বেড পাওয়া আর বেহেস্তে প্রবেশ করা এখন ইতালীর আক্রান্ত মানুষদের কাছে সমান। অপেক্ষাকৃত ভালো কিন্তু আক্রান্তদের জায়গা হচ্ছে কোনো চার্চ বা কোনো হলরুমে। কোনো পরিবার নিজেরা মৃতদের অন্তেষ্টি ক্রিয়ার আয়োজন করতে বা অংশগ্রহন করতে পারছেনা। এমনকি হাসপাতালে শেষ বিদায় জানাতেও যেতে পারছেনা প্রিয়জনরা।

মহামারী করোনাভাইরাসের প্রধানকেন্দ্র যেনো ইতালীর লোম্বার্ডি। যদিও এখন কিছুটা নিয়ন্ত্রনে এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে। নতুন মৃতের সংখ্যা এবং আক্রান্তের সংখ্যা একটু কমে আসছে। সেটা সম্ভব হয়েছে দেশব্যাপী কড়াকড়ি লকডাউনের মাধ্যমে। পর পর তিন দিনের হিসেবে মৃতের সংখ্যা ৩০০ জনের মধ্যে স্থির ছিলো। ক্লান্ত স্বাস্থ্যকর্মীগন (ডাক্তার, নার্স) মনে করছিলো শীঘ্রই খারাপ দিনের অবসান ঘটবে হয়তো।

কিন্তু তা’ হবার নয়। বৃহস্পতিবারে আবার মৃতের সংখ্যা দাঁড়ালো ৪৭৮ এ। শুক্রবারে ৬২৫। প্রতিদিন ইতালীর মানুষের বিকেল ৫টায় টিভির সামনে উদ্বিগ্ন হয়ে বিশেষ বুলেটিন দেখে। করোনাভাইরাস এমার্জেন্সী কমিশনার এন্জেলো বোরেলি ভয়াবহ মৃতের সংখ্যা এবং আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা বর্ননা করেন।

শনিবারে মৃতের সংখ্যা এযাবতকালের সবদিনের মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়ে ৭৯৩ এ পৌঁছালো যার মধ্যে লোম্বার্ডিতেই ছিলো ৫৪৬ জন। এখন পর্যন্ত ৫,০০০ ইটালিয়ান মৃত্যুবরন করেছে। এই সংখ্যা হয়তো চীনকেও ছাড়িয়ে গেলো যেখানে এই ভাইরাসের উৎপত্তি। প্রতি দশ লক্ষে ইতালীর মৃতের হার এখন ৫৬.৩৫ যেখানে চীনে এই হার মাত্র ২.২৬ এবং ইউরোপের অন্য একটি দেশ স্পেনে এই হার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৬.৪।

জরুরী অবস্থা যে বিরাজমান তার মাত্রা বিবেচনা করা হচ্ছে কতো দ্রুত সময়ে রোগটি সংক্রমিত হচ্ছে তার ওপর। এক মাস আগেও  ইতালীতে কেউ মারা যায়নি। এমনকি দু’সপ্তাহ পূর্বেও মৃতের সংখ্যা এখনের চেয়ে ১৭ গুন কম ছিলো। কি ভুল হলো? মৃতের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে কেনো? অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের সব সরকারগুলো কোনো ব্যবস্থা গ্রহন না করে শুধু মুখে মুখে গবেষনায় মগ্ন ছিলো। তারা সবাই পানির স্পর্শে প্লাবনের খবর পেলেন।

গবেষকগন এবং স্বাস্হ্য ব্যবস্থাপকগণ এখন মনে করেন ইতালীর উত্তরাংশে বুঝে ওঠার পূর্বে অন্তত ৪ সপ্তাহব্যাপী করোনাভাইরাস ছড়াচ্ছিলো। ব্যাপকভাবে আক্রান্তরা যখন হাসপাতালে আসছিলো তখন তারা যে করোনাক্রান্ত তা’ ডাক্তারগণ নিরূপণ করতেই সক্ষম হননি এবং অনেককে হাসপাতালে ভর্তি হতেই দেয়নি। তারা আবার যখন হাসপাতালে ফিরে আসলেন তখন তাদের বাঁচানো যায়নি।

ততোদিনে অনেক দেরী হয়ে গেছে। কমিউনিটিতে তখন অলরেডি করোনাভাইরাসের বীজ বপিতো হয়ে গেছে। সনাক্তকরন এবং আইসোলেশন তখন আর কাজ করেনি। অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশগুলো যে সময় এবং তথ্য পেয়েছে ইতালী সেই সময় এবং তথ্য পাওয়ার সুযোগ অনেকটা কম পেয়েছে।

ফেব্রুয়ারীর শেষ দিকে ইটালীর সরকার যখন মহামারীর মাত্রা বুঝতে সক্ষম হয় তখনই লোম্বার্ডির অন্তত ১০ টি শহর লকডাউন করে। ইটালীর প্রধানমন্ত্রী প্রথম দিকে মহামারীকে গুরুত্ব দেননি বরং খাটো করে দেখেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন শীঘ্রই স্থিতিশীল হয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা মনে করেন প্রধানমন্ত্রী সময়োপযোগী যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহন না করে বরং করেনাভাইরাস ছড়াতে বাতাস দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী অবশ্য অধিকাংশ শহর লকডাউন করার ঘোষনার একদিন পরেই পুরো দেশ শাটডাউনের ঘোষনা দেন। দেরী হওয়াতে এখনও পর্যন্ত স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।

ভুল পদক্ষেপ এবং সময়োপযোগী ব্যবস্থা গ্রহন না করায় ইতালীর উত্তরাংশে যেমন হেলথ ক্রাইসিস তৈরী হয়েছে তেমনি এখন দক্ষিনান্চলে নতুন করে সংক্রমন বাড়ছে।

লোম্বার্ডির ওয়ার্ল্ড ক্লাস হেলথ সিস্টেম ভেঙ্গে পড়েছে। ওয়েটিং রুমগুলোকে সেখানে ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটের বেড বানানো হয়েছে। বলতে গেলে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা বাড়তি রোগীর কারনে ভেঙ্গে পড়েছে। ২৫,৫১৫ জনকে টেস্ট করে দেখা গেছে অন্তত ৫০% আক্রান্ত। যাদের অনেককে হাসপাতালে ভর্তি রাখা হয়েছে, অনেককে আইসিইউতে পাঠানো হয়েছে, আবার অনেকে ট্রিটমেন্ট দেয়ার পূর্বেই মারা গেছে। এটি লোম্বার্ডির মতো উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার চিত্র। সমগ্র ইটালীতে লোম্বার্ডির মতো চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই। সমগ্র ইটালীর অবস্থা সহজেই অনুমেয়। লোন্বার্ডিতে প্রতি দশ জন আক্রান্তের মধ্যে এক জনের বেশী মৃত্যুবরন করছে। তুলনামূলকভাবে এই হার জার্মানিতে ০.২৪ শতাংশ, ফ্রান্সে ৩.৫৬ শতাংশ এবং স্পেনে ৫.৩ শতাংশ।

ব্রিটিশ সরকার মনে করেন COVID-19 এ মৃতের হার ১ শতাংশ হবে। তবে চুড়ান্তভাবে এই হার নির্ভর করবে অনেকগুলো ফ্যাক্টরের ওপর।

ইটালীতে বয়স্ক মানুষ বেশী বলে মৃতের হার বেশী বলে অনেকে মনে করেন। আবার লোম্বার্ডির এয়ার কোয়ালিটিও মৃতের হার বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে অনেকে মনে করেন। লোম্বার্ডিতে যেহেতু ম্যানুফ্যাক্চারিং ইন্ডাস্ট্রির আধিক্য রয়েছে সেহেতু বাতাস দূষিত এবং এমনিতেই অনেক মানুষের শ্বাসকষ্ট রয়েছে। সে কারনেই এই অন্চলের মানুষ সহজেই করোনাক্রান্ত হচ্ছে।

কনফর্মড কেসেস এবং মৃতের অনুপাত ইটালীতে প্রতিদিন বাড়ছে।অনেক দেশই এই হার কমিয়ে আনছে। ইটালীকে আরও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে।
 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT