Main Menu

খাদ্য মজুদের জন্য বাংলাদেশি গ্রোসারিতে কেনাকাটার ধুম

করোনা ভাইরাসের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। সরকার, প্রশাসন এবং দেশটির সাধারণ মানুষ বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না। দেশটিতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে ভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা। বাড়ছে মৃতের সংখ্যাও। শুক্রবার পর্যন্ত করোনাভাইরাসে যুক্তরাষ্ট্রে ১ হাজার ২৬৪ জন আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন ৩৬ জন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুক্রবার বিকালে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে জাতীয় জরুরি অবস্থা (ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি) ঘোষণা করেছেন। পরিস্থিতি মোকাবেলায় জনসাধারণকে সতর্ক থাকতে সেন্টার ফর ডিজেজ কন্ট্রোলের (সিডিসি) নির্দেশনা অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছেন।

এর আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক করোনাভাইরাস সংক্রমণকে বৈশ্বিক মহামারী ঘোষণা করে। করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ১১ মার্চ ইউরোপের নাগরিকদের আমেরিকা ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। এরপর ১২ মার্চ সকালে নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। সকালে লেনদেন শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যে সূচক ২ হাজার পয়েন্ট পড়ে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির সর্বত্রই একটা ভীতিকর পরিবেশ লক্ষ্য করা গেছে। ‘নিউইয়র্ক সিটি কখনো ঘুমায় না’ করোনাভাইরাস আতঙ্কে এই প্রবাদটিরও পরিবর্তন হয়ে গেছে। বিশ্বের রাজধানী খ্যাত নিউইয়র্ক সিটি দিনের বেলায় কিছুটা জনসমাগম থাকলেও রাতে জনশূন্য হয়ে পড়ছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত নিউইয়র্ক রাজ্যে ৪২১ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এরমধ্যে নিউইয়র্ক সিটিতে আক্রান্তের সংখ্যা ১৫৪ জন।

নিউইয়র্কে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতেও করোনাভাইরাসের প্রভাব এখনো তীব্রভাবে পড়েনি বলেই মনে হচ্ছে। বাংলাদেশি মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো খোলা রয়েছে নিত্যদিনের মতই। বরং এসব গ্রোসারিতে কেনাকাটার ধূম পড়ে গেছে। আতঙ্কিত ও দিশেহারা হয়ে বাংলাদেশিরা খাদ্য মজুদের জন্য এসব গ্রোসারিতে ভিড় করছেন। এ সুযোগে বাংলাদেশি মালিকানাধীন কিছু গ্রোসারি অযৌক্তিকভাবে পণ্যের দাম বাড়িয়ে অধিক মুনাফা করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে ।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সি, কানেকটিকাট, ম্যাসাচুটেস, পেনসিলভেনিয়া, মেরিল্যান্ড, ভার্জিনিয়া, জর্জিয়া, ফ্লোরিডা, ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশিরা সেখানে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।

এদিকে নিউইয়র্কের বাসিন্দারা পরিস্থিতি মোকাবেলায় তাকিয়ে আছেন সিটি প্রশাসনের দিকে। নিউইয়র্ক স্টেট ও সিটি কর্তৃক জরুরি অবস্থা জারির পর বাংলাদেশিদের বহু অনুষ্ঠান স্থগিত ও বাতিল করা হয়েছে। এখনো পাবলিক স্কুল বন্ধ ঘোষণা না করায় অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে। করোনাভাইরাস সনাক্ত হওয়ায় নিউইয়র্ক সিটির ব্রঙ্কসের দুটি স্কুল পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের অংশ হিসাবে সাময়িক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার সিটি মেয়র বিল ডি ব্লাজিও বলেছেন, স্কুল খোলা থাকবে।

করোনাভাইরাস সচেতনতায় লং আইল্যান্ড মুসলিম সোসাইটির মসজিদে শুক্রবার জুমার নামাজ হয়নি। লং আইল্যান্ড মুসলিম সোসাইটির সভাপতি প্রফেসর হোসেন আহমেদ এ ব্যাপারে মুসল্লিদের সহযোগিতা কামনা করেছেন।

নিউইয়র্কের অন্যান্য মসজিদেও সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। কুইন্সের জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারে (জেএমসি) শুক্রবার নিয়মিতভাবে জুমার নামাজ হয়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে মুসলিম সেন্টার কর্তৃপক্ষ বেশকিছু নির্দেশনাও জারি করেছেন। জেএমসির সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুর আহমদ চৌধুরী মুসল্লিদের জানিয়েছেন, জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারের নামাজ ছাড়া সকল কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। স্টেট ইমাজেন্সি থাকায় যেহেতু ৫‘শ লোকের বেশী জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছে সেজন্য আগামী সপ্তাহ থেকে জুম্মার নামাজের চারটি জামাত হবে। এতে মুসল্লিদের সমাগম নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। এছাড়া প্রতিদিনের ৫ ওয়াক্তের নামাজের শুধু ফরজ আদায়ের ব্যবস্থা থাকবে মসজিদে। সুন্নত ও অন্যান্য নামাজ সবাইকে বাসায় আদায় করার জন্য মুসল্লিদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকি, মেরিল্যান্ড, ওহাইও, মিশিগান ও নিউ মেক্সিকোর সকল স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। করোনাভাইরাসে দেশটিতে সবচেয়ে বেশী আক্রান্ত হয়েছে ওয়াশিংটন রাজ্য। এরপর রয়েছে ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউইয়র্ক রাজ্য। ইতিমধ্যে ৪৪টি রাজ্যে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। তবে করোনাভাইরাস সনাক্তের প্রয়োজনীয় কিট এখনো সহজলভ্য না হওয়ায় উদ্বিগ্ন দেখা দিয়েছে সব মহলে। নিউইয়র্কের মেয়র বিল ডি ব্লাজিও সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলোকেও করোনাভাইরাস পরীক্ষায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।

এর আগে বৃহস্পতিবার বিকালে করোন ভাইরাস মোকাবেলার জন্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন সিটি মেয়র। সিটি হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মেয়র ব্লাজিও বলেন, আমরা দীর্ঘ লড়াইয়ে নেমেছি। খুব শিগগিরই এটি শেষ হবে না। এটি একটি দীর্ঘ যুদ্ধ হতে চলেছে; এটি একটি কঠিন লড়াই হতে চলেছে। তিনি বলেন, এই লড়াইয়ে অবধারিত মানুষ মারা যাবে।

করোনাভাইরাসের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নিউইয়র্কের বাংলাদেশি ট্যাক্সিচালকরা। মোট ট্যাক্সিচালকের ৬০ ভাগই বাংলাদেশি। করোনার ভয়ে এখন তারা রাস্তায় গাড়ি নিয়ে বের হতে পারছেন না। আবার বের না হলে আয়-রোজগার করারও উপায় নেই তাদের। এছাড়া যারা নি¤œ আয়ের চাকরিজীবী তারাও চিহ্নিত হয়ে পড়েছেন। কারণ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পড়লে তারা বেতনসহ ছুটি পাবেন না। ফলে বাসা ভাড়াসহ সংসার চালানো তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।

করোনাভাইরাসে যুক্তরাষ্ট্রে এখনো কোনো বাংলাদেশি আক্রান্ত হবার খবর পাওয়া যায়নি। তবে ছোটখাটো সমস্যা বিশেষ করে সর্দি-কাশি দেখা দেওয়ায় অনেকেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন। করোনাভাইরাসের জীবাণু থেকে রক্ষা পেতে অনেকেই বাজারে গিয়ে হ্যান্ড স্যানিটাইজার খুঁজছেন। কিন্তু কোথাও তা মিলছে না। এমন পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার জ্যাকসন হাইটসে বাংলাদেশিদের মাঝে নিজের তৈরি হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিতরণ করেছেন বাংলাদেশি চিকিৎসক ফেরদৌস খন্দকার। কিভাবে স্যানিটাইজার তৈরি করতে হয় সে ব্যাপারেও সবাইকে পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। নিউইয়র্ক শহরের অদূরে নিউ রচেলে সবচেয়ে বেশী লোক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। সেখানে শতাধিক মানুষ আক্রান্ত হওয়ার পর আর্মির ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন রয়েছে। এখনো সেখানকার পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি।

এদিকে নিউইয়র্কের পাশের রাজ্য নিউজার্সিতে করোনাভাইরাস সনাক্ত হওয়ার পর থেকে আটলান্টিক সিটির প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবনযাত্রায় ছন্দপতন ঘটেছে। ইতোমধ্যে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কারনে নিউজার্সি রাজ্যে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকেই আতংকে ভুগছেন। করোনা আতংকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকেই জনসমাগম এড়িয়ে চলছেন, অনেকেই সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে আতিথ্য গ্রহণ কমিয়ে দিয়েছেন। করোনাভাইরাস-এর প্রভাবে নিত্যপণ্যের বাজারেও আতঙ্কের ছায়া। সেখানকার অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি আপদ-কালীন খাদ্য সামগ্রী মজুত করছেন। তাই বাংলাদেশী মালিকানাধীন গ্রোসারিসহ অন্যান্য গ্রোসারিগুলোতে কর্মীদের দম ফেলার ফুরসত নেই। ক্রেতাদের আবদার ও চাহিদা মেটাতে গিয়ে গ্রোসারি মালিকরা গলদঘর্ম হচ্ছেন। আটলান্টিক সিটির প্রাণ ক্যাসিনোগুলোতে কর্মরত বাংলাদেশিদের অনেকেই আতংকের মধ্যে আছেন।

আটলান্টিক সিটির মসজিদ আল হেরার খতিব ড. রুহুল আমিন জানান, তিনি জুমার নামাজের একাধিক খুতবায় করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতা এবং তা প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে মুসল্লিদের অবহিত করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি ধর্মীয় অনুশাসনগুলো যথাযথভাবে মেনে চলার জন্য সবার প্রতি আহবান জানান।

করোনাভাইরাসের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রী সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। ফলে অনেক এয়ারলাইন্স তাদের ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছে। যাত্রীদের আকৃষ্ট করতে অনেক এয়ারলাইন্স আবার ভাড়ায় ছাড় দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এ কারণে বিমানবন্দরগুলো জনশূন্য হয়ে পড়েছে। আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা বৃদ্ধির এই ধারায় গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, সামনের কয়েক দিনে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় ভাইরাসটি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ১১ মার্চ এক বিবৃতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, করোনাভাইরাস পরীক্ষার গতি এত ধীর কেন? আমেরিকায় এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুতি রয়েছে কিনা এখন সে প্রশ্ন উঠছে। পরদিন গভর্নর ক্যুমো স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক ও সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের আওতাধীন সব কলেজের ক্লাস অনলাইনে নেওয়া নির্দেশ দিয়েছেন। এর আগে অবশ্য সবচেয়ে বেশি উপদ্রুত অঞ্চলগুলোর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা আসে।

এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজের পরিচালক অ্যান্থনি ফসি। তিনি বলেন, ‘সামনের দিনগুলোতে আরও বেশি আক্রান্ত ব্যক্তির দেখা আমরা পাব। এ ক্ষেত্রে চীনের অনুসৃত মডেলটি অনুসরণ করা যেতে পারে।


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT