Main Menu

হাজী নাছির উদ্দীন কলেজ অধ্যক্ষের স্বীকারোক্তি 'আমি বাদে সবার নিয়োগ অবৈধ'

গত মঙ্গলবার (১১ ফেব্রুয়ারি) দুপুর বারোটা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক শাখার একজন অতিরিক্ত সচিবের কক্ষে এমপিও পুনর্বিবেচনা কমিটির সভা চলছে। সভার চিঠিতে ১৩টি বিষয় আলোচনার জন্য এজেন্ডাভুক্ত ছিলো। কমিটির দশজনের মতো সভ্য বিভিন্ন এজেন্ডায় মতামত দিচ্ছেন। কোনোটি গ্রহণ হচ্ছে আবার কোনোটি নাকচ হচ্ছে। এমন সময় সভার একজন কর্মকর্তা সভাকে জানান, ‘জাল সনদ ও কাম্য অভিজ্ঞতার ঘাটতিহ কয়েকটি অভিযোগে সাতক্ষীরার কলারোয়ার হাজী নাছির উদ্দীন কলেজের কয়েকজন শিক্ষকের এমপিও কর্তন করা হয়েছে কয়েক বছর আগে । শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পৃথক তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের এমপিও কর্তন করা হয়। কিন্তু  এমপিও হারানো শিক্ষকরা নানা মহল থেকে অবৈধ তদবির করে এমপিও ফেরত চাচ্ছেন। তারা  এখন আমাদের সভাকক্ষের বাইরে অবস্থান করছেন। যদিও হাজী নাছির কলেজের বিষয়টি আজকের এজেন্ডাভুক্ত নয়, তবু তাদের ভারপ্রাপ্ত  অধ্যক্ষকে ডেকে বলে দিই তাদের ঘোরাঘুরি আর তদবির বৃথা।’ কলেজটির বৈধ ও নিয়মিত অধ্যক্ষ শিক্ষাছুটিতে অস্ট্রেলিয়া রয়েছেন। 

ভারপ্রাপ্ত অ্যধক্ষকে বলা হয়, ‘জালসনদ ও ভূয়া অভিজ্ঞতাসহ বিভিন্ন অপরাধে আপনাদের নিয়োগ অবৈধ তাই এমপিও কর্তন করা হয়েছে, একথা জেনেও কেন তদবির করছেন? জবাবে, অধ্যক্ষ বলেন, “স্যার নিয়োগের সময় আমার একটু সমস্যা ছিলো কিন্তু সময়ের ব্যবধানে তা এখন ঠিক হয়ে গেছে, এবং মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গত বছরের তদন্তেও প্রমাণিত হয়েছে, শুধু আমি বাদে বাদবাকী সবার নিয়োগ অবৈধ। তদন্ত প্রতিবেদনের কপি আমার কাছে রয়েছে।’  এসব জেনেও কেন আপনারা এমপিও ফিরে পেতে তদবির করছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে কাঁদো কাঁদো কন্ঠে অ্যধক্ষ বলেন, ‘স্যার কি করবো। সবাই একসাথে চলি। আমরা সব জানি। তাই যুক্তি নয়, মানবিক কারণে এমপিও ফিরিয়ে দেয়ার আবেদন করেছিলাম প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে । আমার সঙ্গের অন্য শিক্ষকরা এখন এই সভাকক্ষের বাইরে বারান্দায় (সচিবালয়ের ৬নং ভবনের ১৯তলায়) অপেক্ষা করছে। আমি এখানে যা বলেছি তা ওরা শুনলে আমার ওপর ক্ষুব্ধ হবে। আপনারা যা ন্যায্য সেটাই সিদ্ধান্ত দেবেন। এতে আমার কোনো কষ্ট থাকবে না। ’ এরপর অধ্যক্ষকে সভাকক্ষ থেকে বের হয়ে যেতে বলা হয়। 

সভাশেষে একাধিক কর্মকর্তা দৈনিক শিক্ষাকে বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষসহ মোট দুইজনের এমপিও ফেরত দেয়া হতে পারে। বাদবাকীরা কোনোভাবেই পাবেন না। তাহলে আবার এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অন্যপক্ষ আদালতে যাবে। তারা হয়তো আদালতে বলবে এই মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা অধিদপ্তরই তদন্ত করে এমপিও স্থগিত করলো কয়েকবছর আগে। আবার এখন ফেরত দিচ্ছে।  এটা কেমন প্রশাসন।’


অভিভাবকরা দৈনিক শিক্ষাকে জানান, জাল সনদসহ বিভিন্ন অভিযোগে প্রথমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত হয় ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দে। জাল সনদ ও কাম্য শিক্ষাগত যোগ্যতাবিহীন সাধারণ ও কারিগরি শাখায় মোট ১৪ জন শিক্ষকদের এমপিও স্থগিত হয় ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে। এরপর থেকেই শিক্ষকরা ব্যস্ত শিক্ষা ভবনের দালাল হবির খান, চিটার রমজান ও মাউশি অধিদপ্তরের কর্মচারী মিজানের সঙ্গে তদবিরে। এদিকে সাতক্ষীরার কলারোয়ায় অবস্থিত কলেজটির পড়াশোনা লাটে উঠেছে।

শিক্ষা অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, কলেজটি অধ্যক্ষসহ তিনজন শিক্ষককে গত কয়েকবছর ধরে দেখা যায় মনিরামপুরের কয়েকজন দালালের সাথে মন্ত্রণালয়, ডিআইএ এবং শিক্ষা ভবনের বারান্দায় ঘুরঘুর করতে।

এমপিও স্থগিত থাকা কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে জামাত ও আহলে হাদিস সংশ্লিষ্টতার তদন্ত চলছে।

এলাকাবাসীর মতে, বাল্যবিবাহপ্রবণ ও শিক্ষা-দীক্ষায় পিছিয়ে পড়া কলোরোয়া এলাকার অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, সমাজসেবক এবং শিক্ষানুরাগী এনাম হক তাঁর বাবার নামে কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠাতা ও দাতা সদস্যরা নিজেদের কোনো আত্মীয়-স্বজনকে এই কলেজে শিক্ষকতা বা অন্য কোনো পদে চাকরি দেননি। 

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয় অভিযুক্ত শিক্ষকরা ভুয়া ও জাল সনদ দেখিয়ে চাকরি লাভ ও এমপিওভু্ক্ত হন। এ ছাড়া মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের দুজন কর্মকর্তার তদন্তেও ধরা পড়েছে কলেজের অর্থ আত্মসাৎসহ নানা অনিয়ম।

এর আগে ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দে শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক অধ্যাপক মো: মেজবাহ উদ্দিন ও পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সৈয়দ জাফর আলী ও মন্ত্রণালয়ের একজন উপ-সচিবের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি ১০ শিক্ষকের শুনানি গ্রহণ করে প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেন। দৈনিকশিক্ষার হাতে থাকা ওই প্রতিবেদনে দেখা যায় প্রায় সব শিক্ষকই তাদের নিয়োগ অবৈধ  এবং নিয়োগকালে যথাযথ যোগ্যতা না থাকার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। 

এমপিও হারানো শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কলেজের যাবতীয় কাগজ মেরে দেয়ারও অভিযোগ রয়েছে। যদিও তারা তদন্ত কমিটিকে বলেছে, নিয়োগের সব কাগজ শিক্ষাছুটিতে বিদেশে থাকা অধ্যক্ষের জিম্মায় রয়েছে। কিন্তু তদন্ত কমিটি তা বিশ্বাস করেনি বলে জানা যায়।  

এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের খুলনা অফিস থেকে হাজী নাছির কলেজের ১০ শিক্ষক নিয়োগসহ যাবতীয় কাগজ চাওয়া হয়েছে। 

অভিভাবকরা দৈনিক শিক্ষাকে বলেন, হাজী নাছির কলেজের কতিপয় শিক্ষক মুক্তিযুদ্ধে চেতনাবিরোধী একটি জাতীয়  পত্রিকায় নিজেদের সাফাই গেয়ে একটি বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেছিলো টাকা বিনিময়ে। কলেজ ফান্ড থেকে টাকা নিয়ে প্রতিবাদ বিজ্ঞাপন ছাপানোর দায়ে নতুন করে অভিযোগ জমা দেয়া হয়েছে ওই বিজ্ঞাপন দাতাদের বিরুদ্ধে। বিধান অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রতিবাদ ওই পত্রিকায় দিতে হয়। কিন্তু তা না করে মন্ত্রণালয়ের একটি চক্রের পরামর্শে টাকার বিনিময়ে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেছে হাজী নাছির কলেজের কতিপয় শিক্ষক। তথ্য সূত্রঃ দৈনিক শিক্ষা


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT