Main Menu

২০ কলসী পানি ঢেলেও ফিরে পাননি আসল চেহারা

২০ কলসী পানি ঢেলেও- লক্ষ্মীর বয়স তখন সবে পনের। ক্লাস সেভেনের ছাত্রী। পাশাপাশি দিল্লির খান মার্কেটে একটি বইয়ের দোকানে পার্ট টাইম কাজও করতেন ৷ সেসময় নাঈম খান নামের এক লোক তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। সে ছিল লক্ষ্মীর এক বান্ধবীর বড় ভাই। দ্বিগুণ বয়সের সেই ব্যক্তির প্রস্তাবে রাজি হননি লক্ষ্মী। আর এতেই লক্ষ্মী আগারওয়ালের জীবনে নেমে আসে মানবসৃষ্ট এক দুর্যোগ। সময়টা ছিল ২০০৫ সাল।

একদিন কাজে যাওয়ার পথে নাঈম খান প্রতি’শোধ নিতে লক্ষ্মীর গায়ে অ্যা’সিড ছুঁড়ে মা’রে। মূহুর্তের মধ্যে তীব্র যন্ত্র’ণায় চিৎকার করতে থাকে এই কিশোরী। গলা কাটা পশুর মতো দিল্লির রাস্তায় গড়াগড়ি খাচ্ছিলো সে। এক ট্যাক্সি ড্রাইভার নিজের গাড়িতে করে লক্ষ্মীকে হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে যমে মানুষে টানাটানি চলে লক্ষ্মীকে নিয়ে। ২০ কলসি পানি ঢালা হয়েছিল অ্যা’সিডে পু’ড়ে যাওয়া লক্ষ্মীর শ’রীরে। লক্ষ্মীর তখন মনে হয়েছিল কেউ যেন ছুরি দিয়ে কুচি কুচি করে ফেলছে তার শ’রীর।

একজন না’রীর সৌন্দর্য প্রকাশ পায় তার গুণের আগে রূপে। আর তাই কি তার প্রতি সব আ’ক্রোশ মেটাতে তার রূপ ঝ’লসে দিয়েই শান্ত! কিছুদিন আগেও বখাটেদের উৎপাতে না’রীদের জীবন অ’তিষ্ট হয়ে গিয়েছিল। প্রতিদিনই বিশ্বের কোথাও না কোথাও কোনো না’রীর মুখ ঝ’লসে যাচ্ছে অ্যা’সিডে। তেমনই এক না’রী লক্ষ্মী আগারওয়াল।

১৯৯০ সালের ১ জুন দিল্লির এক মধ্যবিত্ত পরিবারে লক্ষ্মী আগারওয়ালের জন্ম। দু’চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে অন্য সব শিশুদের মতোই হেসে খেলে তার জীবন কেটে যাচ্ছিল। তবে হঠাৎই অপ্রত্যাশিত এক ঝড় এসে এলোমেলো করে দিলো সেই সাজানো জীবনকে। ল’ণ্ডভ’ণ্ড হয়ে গেল সব এক নিমিষেই। এক সাক্ষাৎকারে লক্ষ্মী জানান, হাসপাতালে বাবা আসার সঙ্গে সঙ্গে আমি তাঁকে জ’ড়িয়ে ধরি। বাবার শার্টের বেশিরভাগটাই পু’ড়ে যায়। যখন আমি বাড়ি ফিরি, বাড়ির সমস্ত আয়না সরিয়ে দেয়া হয়েছিল।

ডাক্তারদের হার না মানা এক ল’ড়াই আর অসম্ভব মনের জোর লক্ষ্মী ফিরে এসেছিল মৃ’ত্যুর মুখ থেকে। লক্ষ্মীর কেবিন থেকে সব আয়না সরিয়ে নেয়া হয়েছিল। যাতে পু’ড়ে বিকৃত হয়ে যাওয়া চেহারাটা দেখে সে মানসিকভাবে ভেঙ্গে না পড়ে। তবে একদিন মুখ ধুতে গিয়ে গামলা ভর্তি পানির মধ্যে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে আঁ’তকে উঠেছিলেন লক্ষ্মী।

তার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল যে, এটা তারই প্রতিবিম্ব। তখন আ’ত্ম’হ’ত্যার চেষ্টা করেন তিনি। এখানেই হয়তো লক্ষ্মীর গল্পটা শেষ হয়ে যেত পারতো। তবে পরিবারের সমর্থন তাকে সবসময় উজ্জীবিত করেছে। পু’ড়ে যাওয়া চেহারা নিয়ে বিপুল বিক্রমে ফিরে এসেছিলেন তিনি। লক্ষ্মীর বাবার করা মা’মলা যখন কোর্টে তখন বিচারকের সামনে দাঁড়িয়ে অপ’রাধী লক্ষ্মীকে বলেছিল, সে এখনো লক্ষ্মীকে বিয়ে করতে রাজি আছে।

তখন লক্ষ্মী তাকে বলেছিলেন, তুমি আমার চেহারা বদলাতে পেরেছ কিন্তু মন নয়। একাধিকবার বিয়ের প্রস্তাবসহ বিভিন্নভাবে লক্ষ্মীকে উত্ত্য’ক্ত করত নাঈম। এমনকি কয়েকবার লক্ষ্মীর গা’য়েও হাত তোলে সে। তবে লক্ষ্মী এসবের কিছুই বাড়িতে জানাননি। তিনি ভেবেছিলেন বাড়িতে জানালে হয়তো তাকে বাড়ি থেকে বের হতে দেয়া হবে না। তার পড়াশোনাও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

লক্ষ্মী অপ’রাধীকে সর্বোচ্চ শা’স্তি পাইয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। নাঈম খানের ১০ বছর জে’লও হয়েছিল। এরপর লক্ষ্মী আগরওয়াল কাজ শুরু করেছিলেন অ্যা’সিড আ’ক্রান্ত না’রীদের নিয়ে। পরবর্তীকালে নিজেই অ্যা’সিড খোলা বাজারে বিক্রি-বিরো’ধিতার আন্দো’লনের একজন প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন। আদা’লতে রিট করে প্রকাশ্যে অ্যা’সিড কেনা-বেচা বন্ধ করিয়ে ছেড়েছেন তিনি।

এসময় তিনি ২৭ হাজার গণস্বাক্ষর, অনলাইনে পিটিশন খুলেছেন। ভারতে অ্যা’সিডে ঝ’লসে যাওয়া লাখো না’রীর কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন লক্ষ্মী। অ্যা’সিড হাম’লার শিকার না’রীদের জন্য লক্ষ্মী অবিলম্বে ন্যায়বি’চার ও পুনর্বাসনের দাবিতে ধর্মঘট করেন। অনেকেই তাকে চাকরির প্রস্তাব দিয়েছে। তবে আত্নসম্মান বিসর্জন দেয়ার কথা একবারও মাথায় আসেনি তার। নিজের প্রচেষ্টায় একটি টিভি চ্যানেলের উপস্থাপক হয়েছেন তিনি।

জীবনযো’দ্ধা লক্ষ্মী আগারওয়ালের এই সত্যিকারের গল্প নিয়ে সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে মেঘনা গুলজারের পরিচালিত সিনেমা ‘ছপাক’। যেখানে লক্ষ্মী আগারওয়ালের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন দীপিকা পাড়ুকোন। এ গল্পটি লক্ষ্মীর একার নয়, এটি হাজার হাজার অ্যাসিডে ঝলসে যাওয়া না’রীর জীবনের গল্প।

২০ কলসী পানি ঢেলেও ফিরে পাননি আসল চেহারা

২০ কলসী পানি ঢেলেও ফিরে পাননি আসল চেহারা

সিনেমার প্রচারণার সময় লক্ষ্মীর গল্প বলতে গিয়ে বারবার কেঁদেছেন দীপিকা। অভিনয় করতে গিয়ে তিনি বুঝেছেন, কতটা কঠিন ছিল লক্ষ্মীর জীবনের এই পথ চলা। হাজার কাঁটায় ভর্তি ছিল সে পথ। লক্ষ্মী আগারওয়াল এমন একজন মানুষ যিনি ইস্পাত কঠিন মানসিক দৃঢ়তা নিয়ে সব বাঁধা বিপত্তিকে পায়ে মারিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন।

তিনি আজ সারা বিশ্বের বহু মেয়ের কাছে অনুপ্রেরণা ৷ তার জীবনে এগিয়ে যাওয়ার আরেক অনুপ্রেরণা লক্ষ্মীর স্বামী আলোক দিক্সিত। একটি এনজিওতে কাজ করার সময় আলোকের সঙ্গে পরিচয় হয় লক্ষ্মীর। এরপর দু’জনের বন্ধুত্ব এবং পরবর্তিতে বন্ধুত্ব থেকে পরিণয়। বর্তমানে পিহু নামের এক কন্যা সন্তানের জননী লক্ষ্মী।

লক্ষ্মীর জীবনে প্রাপ্তির ঝুলিও কম ভারি নয়। বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে স্বীকৃতিও মিলেছে অনেক। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য ২০১৪ সালে তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্রের ফার্ষ্ট লেডি মিশেল ওবামার কাছ থেকে ‘ইন্টারন্যাশনাল ওম্যান অব কারেজ’ পুরষ্কার লাভ করেন লক্ষ্মী।

২০ কলসী পানি ঢেলেও ফিরে পাননি আসল চেহারা

২০ কলসী পানি ঢেলেও ফিরে পাননি আসল চেহারা

সেবছরই ‘এনডিটিভি ইন্ডিয়ান অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হন লক্ষ্মী আগারওয়াল। এছাড়াও কাজের আরো অনেক স্বীকৃতি পেয়েছেন লক্ষ্মী। যা তাকে তার কাজের দৃঢ়তা বাড়াতে সাহায্য করে। ‘চানভ ফাউন্ডেশন’ নামে অ্যা’সিড আ’ক্রান্ত নারীদের জন্য একটি এনজিও প্রতিষ্ঠা করেছেন লক্ষ্মী।


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT