Main Menu

অন্ধকার রাত, মুখোমুখি ২৭ খুনের আসামি ও আমি

প্রথম যে বার দেখা হয় কথা হয় সেটা এক অন্ধকার রাতে, একেবারে ঘুটঘুটে অন্ধকার। একটি ছইওয়ালা নৌকায় কেরোসিনের কুপি জ্বালিয়ে। আমার চোখ ছিলো নোট বইয়ের দিকে, বক্তার চোখের দিকে চেহারার দিকে তাকাতে পারিনি। আবার ভয়েও তাকাইনি, সাহস পাইনি উনি যদি কিছু মনে করেন। রাত ভর কথা হলো কিন্ত চেহারাটা চেনা হলো না। চেহারা চেনার অবশ্য কোনো দরকার ছিলো না আমার। প্রয়োজন ছিলো তার কথা শোনার, সেটা শুনেছিলাম। বছরখানেক পরে আরেকবার দেখা হয়েছিলো ঢাকায় ভর দুপুর বেলায়। ওই চরমপন্থী নেতার নাম রনি বিশ্বাস। কুষ্টিয়ার এক সাংবাদিক বন্ধু ফোনে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। তার পর নানা সূত্র ধরে তার মুখোমুখি হয়েছিলাম কেবলমাত্র কথা শোনার জন্য।

২০০৭ সালের ২১ মার্চ। মোবাইলে ফোনে খবর আসলো। নম্বরটা রনি বিশ্বাসের- কিন্ত কথা বললেন এক মহিলা, জানালেন কথা বলতে চাইলে আজই আসতে হবে আপনাকে। ঝিনাইদহ এসে থাকতে হবে, বাকি কথা তিনিই বলবেন আসতে হবে সন্ধ্যার আগেই। ধন্ধে পড়ে গেলাম। অনেক কিছু ভাবছি, তা হলে রনি বিশ্বাস ধরা পড়ে গেল কি  না? আগে তিন চার বার কথা হয়েছে কোনো মহিলা তো ফোন ধরেনি, বিষয়টা নিয়ে বেশ ভাবছি। যাবো কি যাবো না- সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। এর মধ্যে আবার ফোন এবার চেনা কণ্ঠ রনি বিশ্বাস, যা ভাবছিলাম রনি বিশ্বাস সেটাই বললো। জানিয়ে দিলো এর পর কখনো ফোন করলে ওই মহিলা ধরতে পারে ঘাবড়াবেন না। আপনি চলে আসুন, ঝিনাইদহ এসে পৌঁছাতে হবে বেলা থাকতে আমার লোক আপনাকে নিয়ে আসবে। আপনি ফোনটা খোলা রাখবেন।

সন্ধ্যার আগেই ঝিনাইদহ পৌঁছালাম। একটি আবাসিক হোটেলে উঠলাম। কেউ আর যোগাযোগ করে না। রনি বিশ্বাস অবশ্য আগেই বলে দিয়েছে এ সময়ের মধ্যে আপনি আমাকে আর ফোন করবেন না। আবার চিন্তায় পড়লাম। রাত সাড়ে আটটার মত বাজে, ফোন করে একজন জানতে চাইলো আপনি কি রেডি বললাম, হ্যাঁ রেডি। তা হলে যত দ্রুত সম্ভব পাগলা কানাই মোড়ে চলে আসুন। এখানে এসে দেখবেন তিনটি মোটর সাইকেল দাঁড়ানো আপনি সোজা মাঝখানের টায় উঠে পড়বেন। সে ভাবেই কাজ। মোটর সাইকেল চলতে থাকলো। মনে হয় ঘণ্টা দেড়েক ধরে চললো সাইকেল।

ঘুটঘুটে অন্ধকার। নিজের শরীরটাও দেখা যায় না। মোটর সাইকেল থামলো গিয়ে এক নির্জন জায়গায়তে। সেখানো দাড়াঁনো আরো তিন-চারজন। তাদের সঙ্গে যেতে হলো পায়ে হেটে ক্ষেতের আল দিয়ে। ওদরে সকলের হাতে টর্চ লাইট কিন্ত লাইট জ্বালালো না কেউ। উচু-নীচু পথ, মাটির ডেলার আঘাতে আঙ্গুল দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে, বারবার পড়ে যাচ্ছি সঙ্গের লোকগুলো শুধু বলছে আরেকটু কষ্ট করুন। এই তো এসে গেছি। কিন্ত পথ আর শেষ হয় না। মনে মনে নিজেকে একটা মস্ত বড় আহম্মক ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারছি না। নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছি কিন্ত রাগে দুখে ভেতরে তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে। ঘামে পুরো শরীরটা ভিজে যাচ্ছে। এখন তো আর ফেরার ও পথ নেই। তাও এক ঘণ্টার উপরে হেটেই চলছি। জনমানবের কোনো সাড়া শব্দ নেই। চারদিকে অসম্ভব নীরবতা! কেবল আওয়াজ আছে ঝিঝি পোকার আর মাঝে মধ্যে দূর কোনো গায়ে কুকুরের ঘেউঘেউ শব্দ।

সামান্য দূরে কেরোসিনের কুপি জ্বলছে মনে হলো। কুপিটা হয়তো কোনো নৌকার ভেতরে। ধীরে ধীরে আমার সামনের লোকটা কুপির দিকেই এগুচ্ছে। নৌকাটা একটু দূরে ছিলো সামনের লোকটা লাল বলে একটি শব্দ তিনবার উচ্চারণ করার পর পাড়ের দিকে আসলো নৌকা। নৌকায় উঠতে হবে কাঁদা মাড়িয়ে, স্যান্ডেল খুলে হাতে নিলাম। নৌকায় উঠে পানিতে পা পরিস্কার করতে কেবল পানিতে পা দিয়েছি আর শুরু হলো জ্বালা পোড়া, শক্ত মাটির ডেলায় পায়ের কত জায়গায় ত হয়েছে টের পেলাম তখন।

মাঝারি সাইজের একটা নৌকা। মাঝখানে ছই। ছইয়ের সামনের দিকটায় চটের পর্দা দেয়া। ভেতরে কেরোসিনের কুপি জ্বলছে। এবার সামনে আরেকটি কুপি জ্বালানো হলো কিন্ত বাতাসে বারবার বাইরের কুপিটা নিভে যাচ্ছে। কুপি রেখে হেরিকেন জ্বালানো হলো। নৌকার সামনের পাটাতনের ওপর বড় সাইজের একটি গামলায় মাংশ আরেকটি গামলায় ভাত। দশ পনের জন লোক। ছইয়ের ভেতর থেকে রনি বিশ্বাস নৌকায় উঠতেই সালাম দিয়ে বললো ভাইয়া অনেক কষ্ট হয়েছে পা পরিস্কার করে আসুন আগে খেয়ে নিই আমরা ও বসে আছি, আপনি আসলে এক সঙ্গে খাবো।

খাওয়া শেষ হলে কথা বলা শুরু হলো। এর মাঝে ডজনখানেক ওয়ানটাইম ইউজ গ্লাস এবং কেরু কোম্পানির চারটে বোতল এনে কুপির সামনে রাখলো একজন। রনি বিশ্বাস বললো, ভাইয়া আপনার ঢাকায় থাকেন বিদেশি মাল খান আমরা তো সব সময় ওই সব পাই না আমরা কেরু কোম্পানিরটাই বেশি খাই। আপনার জন্য আজই চুয়াডাঙ্গা থেকে বোতলগুলো আনিয়েছি। বললাম ভাইজান আমি তো ওই সবে অভ্যস্ত নই, কি বলেন বলে অবাক রনি বিশ্বাস বললো একজন সাংবাদিক মত খায় না এটা কি বিশ্বাস করা যায়। আপনার সম্পর্কে তো শুনেছি আপনি চাব্বিশ ঘণ্টাই মদের উপর থাকেন বলে আমাদের নিয়ে এত কিছু লেখার সাহস পান। তা আপনি কি সত্যি কথা বলছেন? বললাম জি, ভাইজান আপনার শোনাটা ভুল আমি মদ, গাঁজার মধ্যে নেই, তা বলে আবার এটাও মনে করি না যারা মদ খায় তারা খরাপ। যা হোক কথা শুরু হলো। রনি বিশ্বাসই আগে আমাকে প্রশ্ন করলেন আচ্ছা ভাইজান আপনি বলুন তো এত কষ্ট করে আমার মত একজন নষ্ট মানুষের সঙ্গে কথা বলার আপনার কি প্রয়োজন? আপনার উদ্দেশ্যটা কি? তা বলালাম আগেও বলেছি এখনো সেই একই কথা। বললাম উদ্দেশ্যর কথা। এবার নিজের পরিচয় দিয়ে রনি বিশ্বাস শুর করলেন।

রনি বিশ্বাস। পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল) যোদ্ধার সম্পাদক। যার নাম শুনলেই গা-শিউরে উঠতো দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের মানুষের। ভয়ঙ্কর মানুষ হিসেবে পরিচিত, এক আতঙ্কের নাম!  রনি বিশ্বাস বলেন, অথ্যাচার, নির্যাতন যতই আসুক ক্যাডার সংখ্যা বাড়বেই এটা স্বাভাবিক, কারণ আদর্শ-টাদর্শ নয় সশস্ত্র রাজনীতি এখন এক সামাজিক ব্যধি, একটি রোগ, এর উৎপাটন করতে হলে সামাজিকভাবেই চিন্তা করতে হবে। হত্যা, নির্যাতন, গ্রেপ্তার কোন সমাধান নয়, সেটাই যদি সমাধান হত তাহলে এতো সুদীর্ঘ সময় ধরে এদেশে অস্ত্রের রাজনীতি টিকে থাকতো না, এ ধারা টিকে আছে, ভালোভাবেই টিকে আছে। প্রতিনিয়ত এদের হাতে মানুষ খুন হচ্ছে, একটি খুন মানেই একটি পরিবার ধ্বংস। যতদিন সশস্ত্র নিষিদ্ধ রাজনীতির এ ধারা থাকবে, ক্যাডারদের হাতে অস্ত্র থাকবে ততদিন খুন বন্ধ হবে না আরো খুন হবে। এগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হলে প্রযোজন সশস্ত্র রাজনৈতিক দলের কর্মীদের সামাজিক পুনর্বাসন, তাদেরকে প্রকাশ্য রাজনীতি করার সুযোগ দেয়া, তাদের সাংগঠনিক শক্তিকে ইতিবাচক দিকে কাজে লাগানো। এই ধরুন আমাকে প্রকাশ্য রাজনীতি করার সুযোগ দিলে অস্ত্র ত্যাগ করে আমি প্রকাশ্য রাজনৈতিক দল গঠন করতাম। সে সুযোগ না পেলে এভাবে নিষিদ্ধ হয়ে থাকলে বাস্তব কারণেই অস্ত্র ত্যাগ করা সম্ভব নয়। কিন্তু বিশ্বাস করুন এ জীবন আমি চাই না, এ জীবনে থাকতেও চাই না।

রনি বলেন, বেশি কিছু চাওয়া ছিল না আমার। এক সময় স্বপ্ন দেখতাম দুই কাঠা জমির ওপরএকখানা কুড়ে ঘরে সুখনিদ্রা আর দিনমজুরির আয়ে পেট পুরে এক মুঠো পানতা ভাত। মাত্র সেটুকু জোটাতে গিয়ে এখন ইম চরমপন্থী, খুনি, ভয়ঙ্কর মানুষ এক সময়ে পেটের আহার যোগাতে দিনমজুরি করে, পেটে-ভাতে দোকানের কর্মচারী খেটেছি। এখন বলতে পারেন আমি বিত্তবান, বায়ান্ন লাখ টাকা দামের গাড়ীতে চড়ি, দেশের যে কোনো প্রান্তে আমার ৬ তলা করে একাধিক বাড়ি। তবুও এ জীবনে শান্তি পাই না, রাতে শুয়ে শুয়ে মনে হয় আমার সেই কুড়ে ঘরের স্বপ্নটা যদি বাস্তব করতে পারতাম।

রনি বিশ্বাসের জন্ম ১৯৮৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর। চুয়াডাংগা জেলার আলমডাংগার মহেশপুর গ্রামে। শিশুকাল কেটেছে নানা হোসেন মণ্ডলের বাড়িতে। নানা ছিলেন দরিদ্র কৃষক, নিরীহ মানুষ, নিজের সম্পর্কে রনি বিশ্বাস বলেন জন্মই আমার আজন্ম পাপ। পিতা-মাতা দুজনই জীবিত থাকতে তাকে বড় হতে হয়েছে মা-বাবার আদর, স্নেহ বঞ্চিত হয়ে, অনাদর, অবহেলায়। জন্মের ৪ মাস আগে তার বাবা একটি মিথ্যা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয় কলেজ থেকে। সে সময় তার বাবার এইচএসসি পরীক্ষা চলছিল। পরীক্ষা দেয়া হয়নি। মামলায় যাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয় তার। হত্যা মামলায় রনির বাবা সাজাপ্রাপ্ত হবার বছর তিনেক পর তার মা চলে যায় একই গ্রামের অন্য এক ছেলের সঙ্গে। তাকে বিয়ে করে। যে বয়সে মায়ের কোলে বসে ঘুমপাড়ানি ছড়াগুলো শুনে শুনে ঘমানোর কথা সে বয়সেই শুরু হয় রনি বিশ্বাসের কর্মের জীবন। মা অন্যের সংসারে, বাবা কারাগারে। নানা বাড়ি থেকে জানিয়ে দেয়া হয়কাজ না করলে খাবার নেই। চার বছর বয়সে বেগুন ক্ষেতে, ধান ক্ষেতে পাখি তাড়াতে হতো তাকে। তারপরও নানা বাড়িতে আহার জুটেনি।

মাত্র পাঁচ বছর বয়সে আলমডাংগার আসমানখালী বাজারে একটি দোকানে কর্মচারীর কাজ নেয় রনি বিশ্বাস। সেখানে তাকে কিছুদিন কাজ করতে হয়। রনির বয়স যখন ১৩ বছর, সে সময় তার বাবা জেল থেকে মুক্তি পেয়ে বাড়িতে আসে। বাবা রনিকে নিয়ে আসে বাড়িতে। স্কুলে ভর্তি করে দেয় তাদের গ্রামের হোগাইলবাগদি স্কুলে। সেখানে ৫ম শ্রেণি থেকে প্রথম হয়ে ভর্তি হয় ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে। এর মধ্যে রনির বাবা বিয়ে করেন। সৎ মায়ের সংসারে রনির শুরু হয় নির্যাতনের জীবন। একদিকে সৎ মায়ের অত্যাচার অন্যদিকে মায়ের চরিত্র নিয়ে বাবা প্রতিদিন বকা-জকা করে রনিকে। গ্রামের অনেকেই রনিকে বলে, কারো কারো দু মা থাকে কিন্তু রনির দুই বাবা। এসব কথাবার্তা শুনে নিজের প্রতি ঘৃণা ধরে যায় রনির। মনের দুঃখে এলাকা ছাড়ে। ভবঘুরে হয়ে যায়। আবার এলাকায় ফিরে আসে ১৯ বছর বয়সে। এলাকায় ফিরে আর বাবার বাড়ি যায় না। গ্রামে পানের বরজে দিনমজুরির কাজ করে। মাঝে মধ্যে গ্রামের বাজারে বসে বাবার বিরুদ্ধে দুচারটে কথা বলে। চেহারায়, আচরণে তখন উগ্রতা, গ্রামের কেউ তার সামনে কথা বলে না।

এর মধ্যে আসে ইউপি নির্বাচন। রনির বাবাও চেয়ারম্যান প্রার্থী হয়। তার বিরুদ্ধে প্রার্থী হন আনোয়ার হোসেন লাড্ডু নামের এক ব্যক্তি। লাড্ডু জানতো বাবার সঙ্গে খুবই খারাপ সম্পর্ক রনির। একদিন লাড্ডু তার বাড়িতে নিয়ে যায় রনিকে, বলে নিবাচনে আমার সঙ্গে কাজ করো, আমি তোমার ভবিষ্যত দেখব যা লাগে দেব। রনি জানায়, আমার কোনো চাহিদা নেই, শুধু চাই দুই কাঠা জমির ওপর একখানা কুড়ে ঘর। নিবাচনে বিভিন্ন সভায় বাবার বিরুদ্ধে বক্তৃতা দেয়ার। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে জয়লাভ করে আনোয়ার হোসেন লাড্ডু।

দশ-পনের দিন পর রনি যায় লাড্ডুর কাছে, প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন চায়। কিন্তু লাড্ডু কোনো কথা বলে না। একদিন বেশ কথা কাটাকাটি হয় রনির সঙ্গে সেদিন চেয়ারম্যান রনিকে বলে টাকা চাইলে টাকার কোনো অভাব নেই। আমি পথের দিশা দিয়ে দিচ্ছি। এই বলে চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন লাড্ডু একটি ফাইভ স্টার পিস্তল দেয়। পিস্তল হাতে পাবার পর শরীরে কেমন যেন একটা গরম ভাব আসে। আমি পিস্তলটা কোমরে নিয়ে এলাকায় ঘুরি। দেখি মানুষজন আমাকে সমীহ করা শুরু করে।

ইকরাম ওরফে শান্ত নামে আমার এক চাচাতো মামা ছিলেন জনযুদ্ধের নেতা। এর মধ্যে তিনি জেলমুক্ত হয়ে এলাকায় আসেন। একদিন মামা আমাকে জনযুদ্ধে যোগ দিতে বলেন। আমি রাজি হয়ে যাই। জনযুদ্ধের ক্যাডার হিসেবে কাজ শুরু করি।

২০০৪ সালের জানুয়ারি মাসে প্রথম একটি অপারেশনের দায়িত্ব দেয়া হয় আমাকে। চুয়াডাংগা জেলার মুন্সীগঞ্জ গরু হাটে, হাটের ভেতর খতম করতে হবে গণশত্রু বাদশা মেম্বারকে। দায়িত্ব নিয়ে একাই যাই। হাতে বোমা কোমরে পিস্তল নিয়ে। দেখি বাজারের পান হাটায় দাঁড়িয়ে আছে টার্গে। সুবিধা মত জায়গা থেকে ঠিক মাথায় বোম মারি। সেখানেই মৃত্যু হয় বাদশা মেম্বারের।

অপারেশন থেকে ফেরার পর আমার সঙ্গে পরিচয় হয় দাদা তপনের সঙ্গে। দাদা তপন আমাকে অনেক আশার কথা শোনায়। আমি আশায় বুক বাধি।

সামনে ঈদ। একদিন দাদা তপনের কাছে কিছু টাকা চাই। সঙ্গের লোকদের দেয়ার জন্য। দাদা বলে, তোমার এখন অনেক নাম, তুমি চাইলে যে কেউ-ই টাকা দিয়ে যাবে। এর দুদিন পর সন্ধ্যা ৭টার দিকে একটা স্টেনগান নিয়ে আমি যাই আলমডাংগার পিটিয়া লিমনি বাজারে। সঙ্গে ৫ জন ক্যাডার। বাজারের বড় দুইজন ব্যবসায়ীর নিকট ৪ লাখ টাকা চাই। পরদিনই তারা চাহিদা মোতাবেক টাকা আমার ডেরায় পৌঁছে দিয়ে যায়।

এর মধ্যে শান্ত মামা গ্রেপ্তার হয়ে যায় ঢাকা থেকে। তাকে ক্রসফায়ার দেয়া হয়। শান্ত মামার ক্রসফায়ারে আমি খুব আঘাত পাই। প্রতিশোধ নেয়ার প্রস্তুতি নেই। ঘটনা আলোচনা করি দাদা তপনের সঙ্গে। দাদা তপন রাজী হয় না। এর মধ্যে ঘটে আরেক ঘটনা, শান্ত মামার অনুপস্থিতিতে দাদা তপন গোপনে চেষ্টা করে খুলনার আবুল খায়ের নামের এক ক্যাডারকে আমাদের এলাকার দায়িত্ব দিতে। আমার সঙ্গীরা এর বিরোধিতা করে। তারা আমাকে দায়িত্ব নিতে বলে। আমি দায়িত্ব নেব বলে দাদা তপনকে জানালে সে গোপনে আমাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। এ সময় আমি আলাদা পার্টি গঠনের সিদ্ধান্ত নেই।

এক রাতের ভেতর চুয়াডাংগা, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ, যশোর, কুষ্টিয়া এলাকার সকল অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেই। পার্টির ২৮ জন গেরিলা সরাসরি যোগ দেয়। ২০০৫ সালের ১৫ মে আলাদা পার্টি গঠন করা হয়। পার্টির নাম পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল) যোদ্ধা।

রনি বিশ্বাস জানান, দিনে দিনে আরো বিস্তৃত হচ্ছে তার পার্টি বর্তমানে চুয়াডাংগা জেলা তার সংগঠন আছে খুলনার ডুমুরিয়া, ফুলতা, সাতক্ষীরা, যশোর, অভয় নগর, শার্মা, বেনাপোল, ঝিনাদিহ, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর এবং পার্টি ওপেনের আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে বরিশাল এবং ফরিদপুরের ভাঙ্গাতে।

রনি বিশ্বাস বলেন, স্বেচ্ছায় কেউ এ লাইনে আসে না। তথাকথিত সমাজপতি, রাজনৈতিক নেতা ইউপি চেয়ারম্যানরা এক সময় এদের ব্যবহার করে ছুড়ে ফেলে দেয়। সে সময় উপায়ন্তর না দেখে চরমপন্থী দলে নাম লেখায়। অন্যদিকে হচ্ছে, ভাই ক্ষুধা একটা ভয়াবহ সন্ত্রাস, বেকার যুবকরা ধাতাড়িত, যুবকরা নগদ টাকার হাত ছানিতে চলে আসে এখানে। এ লাইনে যদি মত্যুও হয় তবুও ক্ষুধার যন্ত্রণার চেয়ে এ মত্যু তারা ভালো মনে করে। তবে কেবল সমাজপতিদের কারণেই নয় প্রশাসনের কারণেও সৃষ্টি হচ্ছে চরমপন্থী এবং চরমপনথী দল, এই ধরুন আমার কাকা আলমডাংগা থানায় তৎকালীন সেকেন্ড অফিসার বর্তমান ওসি আমাকে পার্টি খুলতে সাহায্য করছে, সহযোগিতা করেছে।

ভাই এখন আমার টাকা আছে, প্রাচুর্য আছে। তবু কি যেন নেই, প্রতিয়িত কি যেন খুঁজি। এক সময়ে এক মুঠো ভাতের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি, কেউ জিজ্ঞেস করেনি, এখন তারাই আমাকে সমীহ করে। স্বপ্ন ছিল মাত্র একখানা কুড়ে ঘরের কিন্তু এখন আমার ৬ তলা একাধিক ইমারত। ৫২ লাখ টাকা দামের গাড়িতে চড়ি। কোনদিন ভাবিনি চরমপন্থী হব, তাই হয়ে গেলাম।

তবে শুনন, আমি যা সত্য বলে জানি অকপটে বলে দেই, নিজের সম্পর্কেও কিছু লুকাই না। তবে গুছিয়ে বলতে পারি না, কারণ পেটে বিদ্যে নেই, লেখাপড়া জানি না। একটা কথা বললে, এ লাইনের অন্যরা হয়তো প্তি হবে আমার ওপর, আসলে মাওবাদ, লেলিনবাদ মার্কসবাদ, সমাজতন্ত্র, সাম্যবাদ ওসব ভুয়া কথা। কেউ খাবে আর কেই খাবে না- এ সব কেবল মুখে বুলি কারো অন্তরের বিশ্বাস নয়। এ এক অন্ধকার জগত, ওখানে ওয়ানওয়ে রোড। এখানে প্রবেশ করা যায়- বেরুনোর একমাত্র পথ লাশ। তবে আমার একটা আবেদন আছে, সরকার প্রকাশ্য রাজনীতির সুযোগ দিলে আমি একটি প্রকাশ্য রাজনৈতিক দল করতাম।

রনি বিশ্বাসের অবশ্য সে সুযোগ হয়নি। পত্রিকায় তার সাক্ষাতকারটি প্রকাশিত হয়েছিলো, নানা কারণে বলতে হয়েছিলো তার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে। রনি বিশ্বাস ক্রসফায়ারে নিহত হয়ে এর এক বছর পর। এর মাঝে আরো একবার দেখা হয়েছিলো তার সঙ্গে। সে ভর দুপুর বেলা। ঢাকা শহরের একাট আবাসিক হোটেলে একা একা বসে প্রত্রিকা পড়ছি হঠাৎ দরজায় কড়ানাড়ার শব্দ। দরজা খুলতেই দ্রুত ঘরে প্রবেশ করলো এক যুবক আধো চেনা মনে হচ্ছে পুরোটা চিনতে পারছি না, নীরবতা ভেঙ্গে যুবক বলে উঠলো ভাইজান বুঝেছি চিনতে পারেননি। আমি রনি বিশ্বাস। ছোট একটা ব্যাগ কাধ থেকে নামিয়ে বসে পড়লো খাটের ওপর, নিজেই ঢেলে ঢগ ঢগ করে এক গ্লাস পানি সাবাড় করলো। ওদিকে আমার তো গা শীতল হয়ে আসছে। কি বলবো ভাবতে পারছি না। রনি বিশ্বাস হেসে উঠলো বললো ভাইজান ভয় নাই আমি থাকতে আসিনি, চলো যাবো এক্ষুণি। আমি এসেছি শুধু আপনাকে বোঝানোর জন্য যে আপনার খোঁজ রাখি আমি। ঢাকাতে আমার অনেক ক্যাডার থাকে। আপনার আশ পাশ দিয়েই আছে ওরা। ওরাই জানালো আপনি অল্প সময় আগে রুমে এসেছেন। আমি চিটাগাং যাচ্ছি মনে করলাম একটু দেখা করে যাই, তাই আসলাম। সময় নেই বলে উঠে পড়লো। আর দেখা হয়নি রনি বিশাসের সঙ্গে।

মাঝে মধ্যে ফোনে কথা হতো তার সঙ্গে অনেক দুখের কাহিনী। ফোনে প্রেম করে বিয়ে করেছিলো, বউ ছিলো খুবই সুন্দরী। শেষ পর্যন্ত বউ থাকেনি প্রায় দুই কোটি টাকা রেখেছিলো বউয়ের নামে। সে টাকা নিয়ে অন্য এক ছেলের সঙ্গে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে বউ। আর বিয়ে করেনি রনি বিশ্বাস। রনি বিশ্বাসের সাক্ষাতকার নেয়ার বছর খানেক পর ক্রসফায়ারে নিহত হয় সে। এর মাঝে দু’একবার ফোন করে একটি অনুরোধ করেছিলো, তার অনুরোধটা রাখতে পারিনি। রনি বলেছিলো, ভাইজান আমাকে ধরার জন্য সরকার একটি বিশেষ টিম গঠন করেছে, আমার নামে ২৭টি খুনের মামলা। আমার বাচাঁর কোনো পথ নেই। আপনাকে অনুরোধ চট্টগ্রামে আমার একটি বাড়ি আছে, বাড়িটা আপনাকে লিখে দেই। তার অনুরোধ রাখতে পারিনি। ক্রসফায়ারে তার মৃত্যুর খবরটা শুনে বেশ মর্মাহত হয়েছিলাম।


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT