Main Menu

বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ বিক্ষোভের হেতু কী

ইরানে যখন বিক্ষুব্ধ মানুষ স্লোগান দিচ্ছিল ‘খামিনির মৃত্যু চাই’, তখন সরকার তাদের হত্যা করছে এবং ইন্টারনেট বন্ধ করে দিচ্ছে। গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় জনগণ প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করছে হংকং, পোল্যান্ডের ওয়ারশ, হাঙ্গেরির বুদাপেস্ট, ইস্তান্বুল ও মস্কোতে। লেবানন থেকে বলিভিয়া পর্যন্ত গণমানুষ বিক্ষুব্ধ। ১৯৮৯ সালের পর এটিই বিশ্বব্যাপী বেসামরিক অসন্তোষের সবচেয়ে বড় চিত্র। এটি এমন একটি বিষয়, যা অভিশংসন থেকে ১০ গুণ বড়; যদিও দুটির মধ্যে সম্পর্ক আছে।

বর্তমান অস্থিরতার বীজ বপিত হয়েছে ৩০ বছর আগের অনেক ঘটনায়- সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন, বিশ্বায়নের বিস্তৃতি এবং অন্যান্য। ওই সময় ছিল উদার গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদ, মুক্তবাজার মৌলনীতি এবং ইতিহাসের যবনিকার স্বর্ণযুগ। আমরা এখন এমন অনেক কিছু জানি, যার বেশিরভাগকে আমাদের অনেকে তখন স্বাগত জানায়নি। বিশ্বায়িত গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদ তীব্র নেতিবাচক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। এটি শিক্ষিত শহুরে ও গ্রামীণ গণমানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংঘাত তৈরি করছিল- শিক্ষিত শহুরে শ্রেণি উন্নতি লাভ করছিল, অন্যদিকে গ্রামের জনসাধারণ পেছনে পড়েছিল। যেসব মানুষ অনুভব করেছিল, তাদের সংস্কৃতিকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে, তারা এর প্রবক্তাদের কাছ থেকে সরে যাচ্ছিল।

শ্বেতাঙ্গ জাতিগত জাতীয়তাবাদ : জনতুষ্টিবাদী নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া বিভিন্ন আকারে বিশ্বের বিভিন্ন অংশ থেকে এসেছে। মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে এটি এসেছে জাতীয়তাবাদী শক্তিমান ব্যক্তিদের মাধ্যমে- ভিক্টর অরবান, ভ­াদিমির পুতিন, পোল্যান্ডের দ্য ল’ অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি। ল্যাটিন আমেরিকায় এটি এসেছে পিঙ্ক টাইড আকারে- বামপন্থী অর্থনৈতিক জনতুষ্টিবাদী হিসেবে। যেমন- হুগো শাভেজ ও নিকোলাস মাদুরো। শ্বেতাঙ্গ ইংরেজ ঘরানায় এটি এসেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ব্রেক্সিটের আকারে। মধ্যপ্রাচ্যে এটি ছিল মুসলিম মৌলবাদের আকারে। চীনে এটি হচ্ছে শি জিনপিংয়ের ক্রমবর্ধমান একনায়কতান্ত্রিক শক্তির আকারে। আর ভারতে এ ধারাটি এসেছে নরেন্দ্র মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদের আকারে।

বিভিন্ন স্থানে জনতুষ্টিবাদী ঢেউয়ের উত্থান এখনও হচ্ছে। ফ্রান্সে হলুদ গেঞ্জি আন্দোলন এবং চিলির প্রতিবাদ পরিচালিত হয়েছে ওইসব লোকের নেতৃত্বে, যারা অনুভব করেছে যে, তারা অর্থনৈতিকভাবে পেছনে পড়ে গেছে। কিন্তু এটি স্পষ্ট যে, ক্ষমতায় থাকাকালে জনতুষ্টিবাদীরাও চাহিদামাফিক পণ্য সরবরাহ করতে পারেনি। ফলে বিভিন্ন অঞ্চলে এখন আমরা দেখছি বিদ্রোহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিদ্রোহ করছে খোদ নিজেদের জনতুষ্টিবাদীদের বিরুদ্ধে।

মূল সমস্যা অর্থনৈতিক। বাম ও ডানদের জনতুষ্টিবাদী অর্থনৈতিক নীতি প্রবৃদ্ধিকে ধ্বংস করছে। ভেনিজুয়েলায় অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটেছে। মেক্সিকোতে বামপন্থী আন্দ্রেস ম্যানুয়েল লোপেজ অবরাদরের লোকরঞ্জনবাদী নীতি প্রবৃদ্ধিকে থামিয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ভবিষ্যদ্বাণী করেছে, ল্যাটিন আমেরিকার প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক দুই শতাংশ কমে যেতে পারে।

লেবানন বছরে মাত্র ৩ হাজার চাকরি তৈরি করতে পারছে, যেখানে প্রয়োজন অন্তত ২০ হাজার। ইতিমধ্যে সেখানে ঋণ তীব্র আকার ধারণ করেছে। ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধ আমেরিকার অর্থনীতির গতিশীলতা কমিয়ে দিয়েছে। শি জিনপিং বাজার সংস্কার থেকে পেছনে সরে এসেছেন এবং অর্থনীতির ধীরগতির সূচনা করেছেন। পাকিস্তানে লোকরঞ্জনবাদী নেতা ইমরান খানের শাসনাধীনে করবৃদ্ধিতে গাড়ি বিক্রি ৩৯ শতাংশ কমে গেছে সর্বশেষ চার মাসে।

বিশ্বজুড়ে সব দেশে নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির সদস্যরা নিজেদের অনুভব করছেন পরিত্যক্ত ও ফাঁদে পড়া অবস্থায়। যেমনটি ফরিদ জাকারিয়া সম্প্রতি উল্লেখ করেছেন, আইএমএফ মনে করে বিশ্ব অর্থনীতি একটি ‘সুসমন্বিত ধীরগতি’র মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং প্রবৃদ্ধি বর্তমানে ‘বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের পর থেকে সবনিম্ন গতি’তে রয়েছে। দ্বিতীয় যে বিষয়টা লোকরঞ্জনবাদীরা নিয়ে এসেছেন তা হল দুর্নীতি। ইউক্রেনের সঙ্গে ট্রাম্পের ‘একটির বিনিময়ে অন্যটি প্রত্যর্পণ করার চেষ্টা’ হল বিশ্বজুড়ে লোকরঞ্জনবাদীদের অনিয়ম-দুর্নীতি চর্চা বাড়িয়ে দেয়ার একটি উদাহরণ। তারা শপথ করেছেন নিয়মনীতি ভেঙে ফেলার; কিন্তু এটি বিতাড়িত হয়েছে মূলত নিজেকে ধনী করা ও নিজেকে সুরক্ষা দেয়ার প্রক্রিয়ার কারণে।

নেতাহীন প্রতিবাদ : বলিভিয়ায় একটি নির্বাচনে ভোট জালিয়াতির পক্ষে দাঁড়ানোর অভিযোগ উঠেছে ইভো মোরালেসের বিরুদ্ধে। যুক্তরাষ্ট্রে ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের নিয়মনীতি কাটছাঁটের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে। দুর্নীতির ধারণা সূচকের তথ্য দেখাচ্ছে যে, বিশ্বজুড়ে মানুষ মনে করছে দুর্নীতি বাড়ছে।

লোকরঞ্জনবাদী শাসকরা গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছেন। বর্তমান দিনগুলোতে তীব্র ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ শুরু হতে খুব বেশি সময় লাগে না। লেবাননে হোয়াটসঅ্যাপে কর বসানোর একটি প্রস্তাবে মানুষের ক্ষোভ উগরে উঠেছে। ফ্রান্স, জিম্বাবুয়ে, ইকুয়েডর ও ইরানে মানুষের ক্ষোভে ফেটে পড়ার পেছনে কারণ ছিল জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি। চিলিতে একই ঘটন ঘটেছে পাতাল রেলের ভাড়া ৪ শতাংশ বাড়ানোর একটি প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে।

বিশ্ব এখন টলমল এবং ফেটে পড়তে প্রস্তুত। সর্বোপরি বার্তা হল- উদার বিশ্বায়নের ত্রুটিগুলো বাস্তব; কিন্তু লোকরঞ্জনবাদী বিকল্প কাজ করছে না। যেসব স্থানে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ হচ্ছে, সেগুলো হচ্ছে কোনো ধরনের একক নেতৃত্ব ছাড়া। কাজেই তাদের কোনো নীতি সংক্রান্ত এজেন্ডা আছে মনে করাটা হবে অবাস্তব। কিন্তু বড় প্রশ্ন হচ্ছে, এরপর কী? লোকরঞ্জনবাদ ব্যর্থ হওয়ার পর কী আসতে যাচ্ছে?

ওইসব দেশের নেতার পরবর্তী বড় কাজ হচ্ছে- নতুন একটি সামাজিক চুক্তি লেখা, যেখানে শিক্ষিত শহুরে এলিট শ্রেণি এবং মূল ভূখণ্ডের শ্রমিক শ্রেণি উভয়কে তারা সবচেয়ে বেশি করে যেটি চায়, সেটি দেয়ার ব্যবস্থা থাকবে। লোকরঞ্জনবাদীদের সমর্থন করা শ্রমিক শ্রেণির প্রয়োজন এমন একটি পথ, যার মাধ্যমে তারা আধুনিক অর্থনীতিতে উন্নতি করতে পারবে এবং এমন একটি বোধ, যাতে তাদের জাতীয় প্রকল্পে অবদান রাখবে। শিক্ষিত এলিটদের চাওয়া হল- তাদের গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকবে এবং জাতিগতভাবে বহুজাতিক ও বৈচিত্র্যপূর্ণ একটি সমাজে তারা বসবাস করবে। সামাজিক দরকষাকষির এ চুক্তি যে লিখতে পারবে, ভবিষ্যতে সে-ই জয় লাভ করবে।

নিউইয়র্ক টাইমস থেকে ভাষান্তর :


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT