Main Menu

আজ তাহলে কিসের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দেখছি?

কামরুল ইসলামঃ ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধাদের বলা হতো Son of the Soil. একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সবচেয়ে বড় পরিচয় সে একজন মুক্তিযোদ্ধা, তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ কিংবা পরিচয় খুজাও চরম মূর্খতা এবং ভণ্ডামি। সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন একজন রনাঙ্গণের মুক্তিযোদ্ধা যিনি ৭১-এ গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সম্মুখে যুদ্ধ করেন। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে দীর্ঘ নয় বছর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। রাজধানী ঢাকার মেয়র নির্বাচিত হ‌ওয়ার পর যে খোকা দল মত নির্বিশেষে ভাষা আন্দোলনকারী ও বীর মুক্তিযোদ্ধার নামে অহরহ সড়ক নামকরণ করেছেন। দেশের প্রতি কতটুকু মায়া, দরদ, মোহ ও ভালোবাসা থাকলে একজন ব্যক্তি নিজের দেশে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার জন্য হাহাকার করেছিলেন, সে দেশে মরার জন্য প্রয়োজনে জেলে যেতেও প্রস্তুত ছিলেন, অথচ তাকেই কিনা প্রবাসে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে বাধ্য করা হলো। 

রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখলের রাজনীতিতে কেবল ১৯৯১ সালে প্রতিপক্ষকে বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করার কারণেও সম্মুখ সমরে অংশ নেয়া এই মুক্তিযোদ্ধা মাতৃভূমি থেকে উৎখাত হয়ে গেলেন ক্ষমতাসীন হিংসের রুদ্ররোষে পড়ে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাদেক হোসেন খোকার প্রবাসে মৃত্যু ইতিহাসের অমোচনীয় দায়, তাকে দেশের মাটিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার অধিকার থেকে বঞ্চিত করলো ক্ষমতাসীন সরকার। একজন মুক্তিযোদ্ধাকে দেশচ্যুত করার এ ট্র্যাজেডি ইতিহাসে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কলংক রেখা হিসেবে বিরাজ করবে আজীবন, এই দায় স্বাধীন দেশের কেউ এড়াতে পারবে না।

ইউনিভার্সিটি অফ মনিতবা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক হেলাল মহিউদ্দিন এই খোকা সম্পর্কে লিখেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসাবে সে নিজে প্রত্যক্ষদর্শী ১৯৯২ সালে ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গাকে কেন্দ্র করে পুরান ঢাকায় যখন দাঙ্গায় অসংখ্য প্রাণহানির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল, সাদেক হোসেন খোকা দলবল নিয়ে অটল প্রাচীরের মত দাঁড়িয়েছিলেন বলে অসংখ্য মানুষ রক্ষা পেয়েছিলেন। কার কী দল, কী মত, কী ধর্ম-অধর্ম বা বিশ্বাস অবিশ্বাস না দেখে একটি সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ান। তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর পাহারা দিয়ে সেই সময়ে সম্প্রীতির অনন্য নজির স্থাপন করে পুরান ঢাকাবাসীর বিরাট আস্থা অর্জন করেন।

২০১৪ সালের ১৪ মে সাদেক হোসেন খোকা দানবীয় ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান। এর পর থেকে সেখানেই চিকিৎসাধীন ছিলেন। খোকাকে ডাক্তাররা যখন আশা ছেড়ে দেন, ইতিমধ্যে তাঁর পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। ২০১৭ সালে খোকা দেশে চলে যাবেন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং ১৭ ই এপ্রিল নিউইয়র্কের বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে পাসপোর্ট পাবার জন্য প্রসেসিং করেন। তবে দূতাবাস থেকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দেওয়া হয় উপরের সিদ্ধান্তে পাসপোর্ট নবায়ণে তাদের কিছু করার নেই । শেষ অব্দি উনাকে এই পৃথিবী থেকে চলে যেতে হলো আর উনার লাশটি দেশে পাঠাতে ট্রাভেল পারমিটের জন্য অপেক্ষা করতে হলো।  

যেকোন মামলায় যেকোন নাগরিকের সাজা হোক, কোন নাগরিককে তার পাসপোর্ট থেকে তাঁকে বঞ্চিত করা যায় না। রাষ্ট্র এটা বলতে পারে না যে, আমি একজন নাগরিকের পাসপোর্ট দেবো না বা আটকে রাখবে!

সম্প্রতি দুইজন মুক্তিযোদ্ধাও মৃত্যুর আগে বলে গিয়োছিলেন, মৃত্যুর পর তাদেরকে যেকোন রাষ্ট্রীয় সন্মাননা যেন না দেয়া হয়! আজ তাহলে কিসের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দেখছি? কারা এইসব ভারপ্রাপ্ত বা সহকারী মুক্তিযুদ্ধা যারা বসে বসে রাষ্ট্রের ট্যাক্স খাচ্ছে? যে দেশে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাই হাজারো অনুনয় ও অনুরোধ করে সে দেশে মরতে পারে না, পাসপোর্ট নবায়ণের আবেদন করা সত্ত্বেও নিজ দেশের পাসপোর্ট নবায়ন হয় না! একজন সাধারণ মানুষের শেষ ইচ্ছা পূরণ করার জন্য‌ তার চির শত্রুরাও পর্যন্ত যেখানে কখনো কার্পন্য করে না, সেখানে একজন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাকে হিংসা বশত তার শেষ ইচ্ছাটুকু রাষ্ট্র বা সরকার পূরণ করলো না। অথচ খোকাদের ত্যাগের বিনিময়ে আজ আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক। 

দেশে ফেরার জন্য তাঁর পরিবার আবেদন করতে হয়েছে পরদেশির মত ‘ট্রাভেল পারমিট’ নিয়ে! যে মাটির জন্য যুদ্ধ করলেন সেই মাটিতেই ফিরছেন এতটা অসম্মান ও করুণা নিয়ে? এ তো বর্বরতা বা নির্মমতাই নয়, এর চাইতে বড় অন্যায় ও অসভ্যতা আর কিছু কি আদৌ হতে পারে? আমাদের জাতীয় লজ্জা ও জাতীয় অন্ধকার আরো গভীরতর হল সাদেক হোসেন খোকার নির্বাসিত মৃত্যুর মাধ্যমে। 


লেখকঃ প্রাক্তন অধ্যাপক
E-mail: mdkamrulislam@yahoo.com


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT