Main Menu

টাইটেলঃ তুমি কেমন নারী?

কামরুল ইসলামঃ আবুল হাসান লিখেছিলেন, নারী কোন রমণীকে বলে? বর্তমান বাংলাদেশের নারী নেত্রী, নারী সাংবাদিকগণের দিকে তাকালেই সাথে সাথে মনে পরে উনার সেই ছোট প্রশ্নটি। কিছুদিন আগে একবার ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন ৭১ টিভির এক টকশোতে এক নারী সাংবাদিককে চরিত্রহীন বলায় ১০১ জন নারীসহ, নারী সাংবাদিক এবং নারীর অধিকার নিয়ে লড়াই করা নারী নেত্রীগণ প্রতিবাদে কি ভীষণ ফুঁসে উঠেছিলেন! মইনুল হোসেন পরের দিনেই ক্ষমা চেয়ে সংশোধনী চিঠি বিভিন্ন পত্রিকায় দিয়েছিলেন, সেই নারীরা সেইদিন তাকে ক্ষমা করে নি। তখন মনে হয়েছিল দেশে হয়তো নারীদের জন্য অপরিসীম এক শক্তির আধার সংগোপনে বটবৃক্ষের মতো বিস্তার লাভ করেছে, এখন থেকে নির্যাতিত সকল নারীরা আশ্রয় পাবে সেই শক্তিমান বটবৃক্ষের ছায়াতলে। ভূল সবেই ভূল। আসলে ওই শক্তিশালী বটবৃক্ষ কখনও জীর্ণশীর্ণ অপুষ্টি-আক্রান্ত মুখাবয়বের নাজমা বা আবিরনদের জন্য নয়! তারা ছিলোও না!

বেশ কিছুদিন আগের পুরাতন একটা ভিডিওতে দেখছিলাম, আমাকে বাঁচাও, আমাকে ফেরাও মধ্যপ্রাচ্য থেকে নির্যাতিত এক নারীর আকুতি। বাঁচাও আকুতি কেবল তার পরিবারের প্রতি ছিল না, তাঁর সরকারকে ডেকেছিল, দূতাবাসকে ডেকেছিল, তাঁর দেশকে ডেকেছিল অথচ সেই দেশের ভোগবিলাসের ভরসাই এইসব প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। শেষ পর্যন্ত সেই নারী দেশে ফিরেছে তবে কফিনে করে! আরো কত শত বাঁচার আকুতি আমাদের কানো পৌছায় নি। মধ্যপ্রাচ্য থেকে দিনে আসছে গড়ে ১১টি কফিন। আট মাসে এসেছে ২ হাজার ৬১১টি। এর মধ্যে নারীদের সংখ্যাও কম না। সাড়ে তিন বছরে শুধু সৌদি আরবেই গেছেন ২ লাখ ৬০ হাজার নারী। এই সাড়ে তিন বছরে নারী শ্রমিকের লাশ এসেছে প্রায় সাড়ে তিনশ। আত্মহত্যার এই হার তিন বছর আগের চেয়ে ১৭ গুণ বেশি। তার মানে এই সময়ে তাঁদের ওপর আরবদের নির্যাতনও ১৭ গুণ বেড়েছে। এক দিকে বছরে ৮০ লাখ কোটি টাকা বছরে পাচার হচ্ছে আর অন্য দিকে ১৫-২০ হাজার মাসে বেতনে টাকার জন্য এইসব নারীরা খোয়া গর্তের মধ্যে ঢুকে পরছে! কি বৈষম্য!

২০১১ সালে সৌদিআরব প্রথম বাংলাদেশ থেকে গৃহকর্মী নেয়ার প্রস্তাব দেয়। এর ৪ বছর আগে থেকেই বাংলাদেশ থেকে পুরুষ শ্রমিক নেয়া বন্ধ ছিল! ফলে সরকার লাফাতে লাফাতে গিয়ে হাজির হয়, এরপর ২০১৫ সাল থেকে ব্যাপক হারে নারী শ্রমিক পাঠানো শুরু হয়ে যায়। সরকারের উন্নয়নের গল্পে আরেকটি পালক যুক্ত হয় সৌদি শ্রমবাজার আবার উন্মুক্ত! অতি উৎসাহ দেখে সৌদি সরকার বেতন কমিয়ে মাসিক ৮০০ রিয়াল করে (ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিনের বেতন ছিল ১০০০-১২০০ রিয়াল)। আমাদের সরকারের প্রতিনিধিরা তাতেই রাজী! এইরকম হাভাতে-বুভুক্ষু-মেরুদণ্ডহীন জাতি যে নারীশ্রমিকদের পাঠাচ্ছে, তাদেরকে "ইচ্ছেমত ব্যবহার" করার সিগনালও বস্তুত তখনই আরব শেখরা পেয়ে যায়!

ফলে আমাদের নাজমা বেগমরা যখন লাশ হয়ে ফেরে, তার জন্যে বর্বর সৌদি আরবকে গালানোর আগে একশবার নিজেদেরকে গালান! অথচ আমাদের মন্ত্রী-সচিবরা বিভিন্ন সময়ে ফিরে আসা নারীশ্রমিকদের অভিযোগগুলোকে ‘দেশে ফেরার জন্যে বানিয়ে বলছে, বাড়িয়ে বলছে’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে, অগ্রাহ্য করেছে, পাশ কাটিয়ে গিয়েছে! শুধু তাই না রেমিটেন্সের লোভে, রেমিটেন্সের উপরে দাঁড়ানো উন্নয়নের চাকচিক্যে মজে সৌদি ধর্ষক শেখদের কাছে নিজ দেশের নারীকে তুলে দিতে এতটুকু কুন্ঠিত হন নাই বরং তারাই বলেছেন নারী শ্রমিক না পাঠালে পুরুষ শ্রমিককে নিবে না বা নারী শ্রমিক ফেরত নিয়ে আসলে আমাদের পুরুষ শ্রমিকদেরকেও ফেরত পাঠিয়ে দিবে। 

মধ্যপ্রাচ্য মেয়েদের জন্য নিরাপদ জায়গা নয়। আমরা সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে একজন নারীও পাঠাবো না শ্রীলংকা, ফিলিপাইনের মতো করে এমন একটা ঘোষনা দেবার মত বিবেক একজন নীতিনির্ধারকের মনেও জাগ্রত হয় না শুধুমাত্র প্রবাসী রেমিটেন্স আসে বলে! নারী প্রধানমন্ত্রীর আমলে নারীর এমন অবমাননায় স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও বিচলিত নন। 

দেশের ভিতরের গল্পও কি কম ভয়াবহ? ভোলার দুই কন্যার সামনে বাবাকে নগ্ন করে পেটানোর ভিডিওটি দেখতে দেখতেই গত ২৮ অক্টোবরের প্রথম আলোর ধর্ষণের লেখা দেখলাম ভোলারই মনপুরায়। শিশুসন্তানের সামনেই জননীকে পালাক্রমে ধর্ষণ। সেই জননী সন্তানসহ রাস্তায় জামে আটকে পরলে শেষ লঞ্চটি আর ধরতে না পেরে মূলত একটা স্পিডবোট ভাড়া করে বাড়ি ফিরছিলেন। যাওয়ার পথে বোর্ডে উঠেছিল চার পুরুষ সহযাত্রী, যাত্রাপথে বোর্ড থামিয়ে চারজন মিলে জননীকে এক চরে নামিয়ে পালাক্রমে ধর্ষণ করে তারই শিশু সন্তানের চোখের সামনে। চারজনে মিলে পালাক্রমে শিশুসন্তানের সামনে ধর্ষণ করেও টনক নড়ে নি ধর্ষকদের। ধর্ষণের পরে জননীকে ফেলে রেখে স্পিডবোটের চালক তাঁর মালিক সেখানকার ছাত্রলীগের নেতাকে খবর দেওয়ামাত্রই মওকার গন্ধ পেয়ে দৌড়ে ছুটে আসে সেই ছাত্রলীগ নেতা। পুনরায় জঙ্গলে নিয়ে জননীকে ছাত্রলীগ নেতার আবার ধর্ষণ। ধর্ষণের সালিসের নামেও যখন হয় পুনরায় ধর্ষণ, ছাত্রলীগের নেতাটি হয়ত ভাবছিল সে স্বাভাবিক কাজটিই করেছে। 

বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে ধর্ষিতাকেই যখন খারাপ ভাবে সমাজ, তখন ছাত্রলীগের নেতা ভাবতেই পারে তার আগেও চারজন পুরুষ নারীটিকে অপবিত্র ও ভোগযোগ্য করে ফেলেছে, তাহলে সে আর বাদ যাবে কেন? পঞ্চম পুরুষ হিসেবে নেতাটিও তাঁকে ব্যবহার করতেই পারে, করেছেও, এ যেন এক ধর্ষণেরই অভয়ারন্য। 

কি ভয়ংকর! ধর্ষণ এখন তাহলে খুবই স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে! সন্তান বা স্বামীকে বেঁধে রেখে ধর্ষণ! মা-মেয়েকে একসঙ্গে ধর্ষণ। চলন্ত বাসে ধর্ষণ! ২ বছরের সন্তানটি ধর্ষণ! ১০২ বছরের বিধবাকে ধর্ষণ! থানার ভিতর আটকে রেখে থানার পুলিশের ধর্ষণ! 

ভাবা যায়, জননীর সাথে থাকা সন্তানকেও ভয়াবহ বিভীষিকা নিয়ে বাকি জীবন কাটাতে হবে! সেই সন্তানটি না পারবে কাউকে নিজের মায়ের ধর্ষণের বর্ণনা দিতে, না পারবে সইতে। ইয়াসমিন, তনুর বিচার হয়নি, সুবর্ণচরের জননীর বিচার হয়ণি! তানিয়ার বিচার হয়ণি! কালকে আপনার মা-বোনের সাথে এমন হলে নিশ্চিতভাবে কি বলতে পারেন তার বিচার হবে? ধর্ষণের পরে যদি কেরোসিন ঢেলে মেরে ফেল সেই বিচার পেয়েও আপনি কি সেই সন্তানটিকে ফিরে পাবেন? 

রাষ্ট্রে ধর্ষিত হয়েছে কি না তার জন্য আছে এখনো অদ্ভুত সেই টু ফিঙ্গার টেস্ট বা ‘দুই আঙুলের পরীক্ষা’ পদ্ধতি। চিকিৎসক যদি ধর্ষণের কোনো আলামত বুঝতে না পারেন তাহলে ধর্ষিতাকে উল্টো প্রমাণ করতে হয় সে ধর্ষিত! প্রতিবন্ধী মেয়েরাও বাদ যাচ্ছে না, বাংলাদেশ এখন ধর্ষকদের অভায়ারণ্য, সময়টা এখন ধর্ষকদের। অভিজাত হোটল থেকে বস্তি এলাকা পর্যন্ত ধর্ষকদের রাজত্ব যেখানে টার্গেট হচ্ছে পশ্চিমা পোশাকের নারী থেকে হিজাব-পরিহিতারা সবাই। এ কেমন ভয়াবহ শ্বাপদের দেশ আজকের বাংলাদেশ!

গত কিছু দিনে সিডনিতে বাংলাদেশীয় জননীরা বেশ কয়েকটি নতুন নারী সংঘটনের যাত্রা শুরু করেছে, জননীদের প্রতি রইলো শুভ কামনা। বাস্তবতা হচ্ছে অষ্টেলিয়াতে নির্যাতন নারীদের নিয়ে খুব বেশী কিছু তাদের করারও নেই কারণ এখানে পুলিশ খুব কার্যকরী। কোন একটা দুর্ঘটনা ঘটলে পুলিশ সংশ্লিষ্ট বিভাগের সাথে দ্রুত যোগাযোগ করে। তবে বাংলাদেশী জননীদের সবার প্রতি একটি আবেদন থাকবে তারা অষ্টেলিয়াতে নির্যাতিত নারীদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে যেন তাদের শিকড়কে ভূলে না যায়। তারা যেন ভূলে না যায় বাংলাদেশে কন্যা, জননী, বোন, দাদী, নানীদের অনিরাপদের কথা! 


লেখকঃ প্রাক্তন সহকারী অধ্যাপক
Email: mdkamrulislam@yahoo.com


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT