Main Menu

সেই শান্ত আবরারের ঝড়ে অশান্ত বাংলাদেশ

সময় শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন তিনি। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখেন ভিসিকে। তবে রাত পৌনে ১০টার দিকে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে উপাচার্য সাইফুল ইসলামের কার্যালয়ের তালা খুলে দেয়া হয়। এ সময় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা জানান, রাতের মতো তারা আর অবস্থান বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছেন না। আজ বুধবার সকাল সাড়ে ৯টায় তারা আবার জড়ো হবেন।

শিক্ষার্থীদের এই তালা খোলার মধ্য দিয়ে প্রায় চার ঘণ্টার মাথায় অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত হলেন উপাচার্য। শিক্ষার্থীরা জানান, উপাচার্য তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সঠিক জবাব দেননি। এ জন্য তাদের দাবি-দাওয়ায় কিছুটা পরিবর্তন আসবে যা আজ জানানো হবে। আপাতত তারা উপাচার্যের কার্যালয়ের তালা খুলে দিচ্ছেন। এর আগে সন্ধ্যা ৬টার পরে উপাচার্য আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সামনে হাজির হন। নিজ কার্যালয়ের সামনে তিনি শিক্ষার্থীদের সাথে তাদের দাবির বিষয় নিয়ে কথা বলেন। আবরার হত্যার পর থেকে এই পর্যন্ত প্রকাশ্যে না আসার কারণ ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেন। তখন উপাচার্য বলেছিলেন, ‘শিক্ষার্থীদের দাবির সাথে আমি একমত। সমস্যা সমাধানের উপায় বের করা হচ্ছে। আমি কাজ করে যাচ্ছি।’ তবে শিক্ষার্থীরা তার এই বক্তব্য অস্পষ্ট মন্তব্য করে প্রতিক্রিয়া জানান এবং উপাচার্য তার কার্যালয়ে প্রবেশ করলে সেখানে তালা ঝুলিয়ে দেন। তখন কার্যত তিনি অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন।

এ দিকে আবরার হত্যার ঘটনায় সারা দেশ বিশেষ করে উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিবাদ-আন্দোলনের গণজোয়ার ওঠে। সবার দাবি হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি প্রতিবাদ জানিয়েছেন সচেতন শিক্ষক এবং শিক্ষক সংগঠনগুলোও। তারাও আবরার হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার দাবি করেন। পাশাপাশি ক্যাম্পাসগুলো শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সবমহলের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করেন।
আবরার হত্যার বিচার দাবিতে গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) এবং বুয়েট ক্যাম্পাসে দ্বিতীয় দিনের মতো দিনভর ছাত্র বিক্ষোভে ফেটে পড়েন প্রতিবাদী শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনকারীরা ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধসহ আট দফা দাবি জানান। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সব ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। ঘটনার ৪৮ ঘণ্টা পেরোতে চললেও ভিসি অধ্যাপক সাইফুল ইসলামকে প্রকাশ্যে দেখা না দেয়ায় গতকাল বিকেল ৫টা পর্যন্ত আলটিমেটাম দেন শিক্ষার্থীরা। পরে ৩৬ ঘণ্টা পর ক্যাম্পাসে আসেন ভিসি। এ দিকে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছাত্রলীগের ১০ নেতাকে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় বুয়েট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকে ‘বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা’ ব্যানারে মিছিল শুরু করেন আন্দোলনকারীরা। বিক্ষোভকালে তারা ‘আমার সেই গর্বের ক্যাম্পাস ফিরিয়ে দাও’ লেখা সংবলিত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করা হয়। বিক্ষোভ মিছিলে ‘খুনিদের ঠিকানা, এই বুয়েটে হবে না’, ‘ফাঁসি ফাঁসি, ফাঁসি চাই’, ‘প্রশাসনের দুই গালে, জুতা মারো তালে তালে’ ইত্যাদি স্লোগান দেয়া হয়।
বিক্ষোভকালে তারা আট দফা দাবি জানান। দাবিগুলো হলোÑ ফাহাদের খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত; ৭২ ঘণ্টার মধ্যে নিশ্চিতভাবে শনাক্তকৃত খুনিদের সবাইকে স্থায়ী বহিষ্কার নিশ্চিত; দায়েরকৃত মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের অধীনে স্বল্পতম সময়ে নিষ্পত্তি; বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি কেন ৩০ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পরও ঘটনাস্থলে উপস্থিত হননি তা তাকে সশরীরে ক্যাম্পাসে এসে বিকেল ৫টার মধ্যে জবাবদিহি করাসহ একই সাথে ছাত্রকল্যাণ পরিচালক (ডিএসডব্লিউ) কেন ঘটনাস্থল থেকে পলায়ন করেছেন তা উনাকে বিকেল ৫টার মধ্যে জবাবদিহি করা; আবাসিক হলগুলোতে র্যাগের নামে ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর সব রকমের শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন বন্ধে জড়িত সবার ছাত্রত্ব বাতিল একই সাথে আহসানউল্লাহ হল এবং সোহরাওয়ার্দী হলের আগের ঘটনাগুলোতে জড়িত সবার ছাত্রত্ব বাতিল; রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে আবাসিক হল থেকে ছাত্র উৎখাতের ব্যাপারে অজ্ঞ থাকা এবং ছাত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হওয়ায় শেরেবাংলা হলের প্রাধ্যক্ষকে প্রত্যাহার করা; মামলা চলাকালীন সব খরচ এবং আবরারের পরিবারের সব ক্ষতিপূরণ বুয়েট প্রশাসনকে বহন করা এবং ক্যাম্পাসে সাংগঠনিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের একপর্যায়ে দুপুর ১২টার দিকে শহীদ মিনারে যান ছাত্রকল্যাণ পরিচালক (ডিএসডব্লিউ) অধ্যাপক মিজানুর রহমান। এ সময় আন্দোলনকারীরা তার কাছে বুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানান। তখন তিনি শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়ে বুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির দরকার নেই বলে ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, আমাদের বর্তমান যে পরিস্থিতি তাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্ররাজনীতির প্রয়োজন নেই। এ সময় শিক্ষার্থীরা করতালির মাধ্যমে তাকে অভিনন্দন জানান। আন্দোলনের একপর্যায়ে শহীদ মিনারে আসেন বুয়েট শিক্ষক সমিতি নেতারা। তারা আন্দোলনকারীদের সাথে একাত্ম প্রকাশ করেন। এ সময় তারা বুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানান।


দুপুরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করেন বুয়েট ৮৫ ব্যাচের শিক্ষার্থী ও কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক। এ সময় তিনি পেশিশক্তির রাজনীতি বন্ধের দাবি জানান। তিনি বলেন, এক সময় রাজনীতি করা হতো আদর্শের জন্য। এখন করা হয় চাঁদাবাজি, বড় দলকে পাহারা দেয়ার জন্য। তিনি বলেন, আমরা চাই বুয়েটে বিতর্ক ক্লাস, সংস্কৃতি ক্লাব এ ধরনের সংগঠনগুলো থাকুক। পেশিশক্তির রাজনীতি না থাকুক।
এ দিকে, শিক্ষার্থীদের আট দফা দাবির অন্যতম ভিসিকে গতকাল বিকেল ৫টার মধ্যে ক্যাম্পাসে এসে জবাবদিহি করা। আবরার হত্যাকাণ্ডের পর তাকে ক্যাম্পাসে না আসায় ক্ষুব্ধ হন শিক্ষার্থীরা। তারা অভিযোগ করেন, ৪৮ ঘণ্টা পার হলেও ভিসি এখনো ক্যাম্পাসে আসেনি। আবরারের জানাজার নামাজেও তিনি আসেননি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে শিক্ষার্থীরা এর জবাবদিহির দাবি জানান। অবশেষে বিকেল ৪টার দিকে ক্যাম্পাসে আসেন ভিসি অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম। পরে তিনি নিজ কার্যালয়ে যান। সেখানে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। তারা ভিসির সাথে দেখা করতে চাইলেও গেটে তালাবদ্ধ থাকায় প্রবেশ করতে পারেননি। পরে সভার বাইরে আরেকটি তালা লাগিয়ে কার্যালয় সামনে অবস্থান নেন তারা।

ঢাবিতে গায়েবানা জানাজায় শিক্ষার্থীদের ঢল : ফাহাদের গায়েবানা জানাযায় হাজারো শিক্ষার্থীর পাশাপাশি সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে। নামাজের ইমামতি করেন ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেন। ডাকসু ভিপি নুরুল হক নূর এই জানাজার আহবান জানান।
জানাজার পূর্বে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন শিক্ষার্থীরা। তারা এ ঘটনায় বুয়েট প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করে হত্যাকারীদের শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানান। বিচারকার্যে কোনো অবহেলা লক্ষ করা গেলে কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার ঘোষণা দেয়া হয়। তারা আববারকে শহীদ হিসেবে অভিহিত করেন। তারা বলেন, আবরার দেশের পক্ষে কথা বলে শহীদ হয়েছেন।

জানাজা শেষে আববারের রূহের মাগফিরাত কামনা করে মুনাজাত করা হয়। একই সাথে তার স্বজনদের জন্যও বিশেষ মুনাজাত করা হয়।
এ সময় ডাকসুর ভিপি নুরুল হক বলেন, কোনো ছাত্র যদি অন্যায় অপরাধ করে থাকে, তার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন রয়েছে। তাদের হাতে তুলে দেন। তারা ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু ছাত্রলীগকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের গায়ে হাত তোলার অধিকারটা কে দিলো?
জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি ঢাবি শিক্ষক সমিতির : আবরার ফাহাদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে ক্ষোভ জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। পাশাপাশি এই হত্যাকাণ্ডকে নির্মম ও পৈশাচিক উল্লেখ করে হত্যাকারীদের দ্রুততম সময়ে বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে শিক্ষক সমিতি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক তাজিন আজিজ চৌধুরী স্বাক্ষরিত গতকাল বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আবরার ফাহাদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে আমরা ক্ষুব্ধ, ব্যথিত ও মর্মাহত। তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আমরা গভীর সমবেদনা জানাই।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আবরারের এই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছুসংখ্যক শিক্ষার্থীর চরম অসহিষ্ণুতার বহিঃপ্রকাশ; যা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য ও চিন্তাচেতনার পরিপন্থী। বিজ্ঞপ্তিতে সব ভেদাভেদ ভুলে শিক্ষাঙ্গনকে প্রকৃত মানুষ গড়ার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা এবং সবাই মিলে শিক্ষাঙ্গনে সহিষ্ণু পরিবেশ সৃষ্টির কার্যকর উদ্যোগ নিতে সবার প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় গ্রেফতারকৃত বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের ১০ নেতাকর্মীকে পাঁচ দিন রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। চকবাজার থানা পুলিশের আবেদনে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত গতকাল মঙ্গলবার এ আদেশ দেন। আলোচিত এই মামলার তদন্তভার ইতোমধ্যে গোয়েন্দা সংস্থা ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। চকবাজার থানায় আবরারের বাবার করা হত্যা মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম সাদবীর ইয়াসির আহসান চৌধুরী এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
যাদের রিমান্ডে পাঠানো হলো : বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফুয়াদ হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান ওরফে রবিন, গ্রন্থ ও প্রকাশনা সম্পাদক ইশতিয়াক আহমেদ ওরফে মুন্না, ছাত্রলীগের সদস্য মুনতাসির আল জেমি, খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম ওরফে তানভীর, মোহাজিদুর রহমান, অনীক সরকার, মেফতাহুল ইসলাম ও ইফতি মোশারেফ।
আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডে ছাত্রলীগের গ্রেফতার হওয়া ১০ জনকে গতকাল ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে হাজির করে ১০ দিন রিমান্ডের আবেদন করে পুলিশ।

আদালতে শুনানিতে বলা হয়, বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে এই ১০ আসামি পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছেন। তাকে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করা হয়েছে। আর হত্যায় এই ১০ আসামি যে জড়িত তা ভিডিও ফুটেজে প্রমাণিত। এরা ছাত্র নামের কলঙ্ক। আবরার ফাহাদকে খুন করার পর তারা বীরদর্পে ঘুরেছেন। ডাক্তারও ডেকে আবরারকে চিকিৎসা দেয়ার প্রয়োজনও বোধ করেননি।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হেমায়েত উদ্দিন খান আদালতের উদ্দেশে বলেন, একজন সহপাঠী আরেকজন সহপাঠীকে এমন নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করতে পারেন? কী দোষ ছিল আবরারের? তারা সবাই খুনি? এই খুনের রহস্য উদঘাটনের জন্য প্রত্যেক আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা জরুরি। এ সময় ১০ আসামির মধ্যে দুইজনের আইনজীবী আদালতে পাল্টা যুক্তি তুলে ধরেন। আসামি ইশতিয়াক আহমেদের আইনজীবী হুমায়ুন কবির আদালতের কাছে দাবি করেন, আবরার ফাহাদ হত্যায় তার মক্কেল কোনোভাবেই জড়িত ছিলেন না। তাকে রিমান্ডে নেয়ার আবেদন নাকচ করে জামিন দেয়া হোক।
আদালত উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে আবরার হত্যা মামলায় গ্রেফতার হওয়া ১০ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীকে পাঁচ দিন করে রিমান্ডে নেয়ার আবেদন মঞ্জুর করেন।

আবরার ফাহাদকে রোববার রাত ৮টার দিকে তার রুম থেকে ডেকে নিয়ে যায় ওই হলের ছাত্রলীগের বেশকিছু নেতাকর্মী। ফেসবুকে ভারতবিরোধী স্ট্যাটাস দেয়ার দায়ে রাতভর আবরারকে পিটিয়ে নিথর দেহটি এক ও দোতলার সিঁড়ির মাঝখানে ফেলে চলে যান তারা। পরে বুয়েটের ডাক্তার ডেকে আনা হলে আবরারকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

আরো তিনজন গ্রেফতার : এ দিকে আবরার ফাহাদকে হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আরো তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য বিভাগ থেকে গতকাল এ তথ্য জানানো হয়। গ্রেফতারকৃতরা হলেনÑ শামসুল আরেফিন রাফাত (২১), মনিরুজ্জামান মনির (২১) ও আকাশ হোসেন (২১)। এদের মধ্যে মনিরুজ্জামান মনির ও আকাশ হোসেন আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। তবে শামসুল আরেফিনকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে ডিএমপির মিডিয়া বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে। সন্ধ্যার পর ডেমরা এলাকা থেকে মনিরকে এবং গাজীপুরের বাইপাইল থেকে আকাশকে ডিবির পৃথক দল গ্রেফতার করে। অপর দিকে বিকেল সাড়ে তিনটায় রাজধানীর জিগাতলা এলাকা থেকে রাফাতকে গ্রেফতার করা হয়। এনিয়ে গ্রেফতারের সংখ্যা দাঁড়াল ১৩।

কুষ্টিয়া ও কুমারখালী (কুষ্টিয়া) সংবাদদাতা জানান, হাজার হাজার মানুষের ভালোবাসা এবং দোয়া নিয়ে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ। গতকাল সকাল ১০টা ২০ মিনিটে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কয়া ইউনিয়নের রায়ডাঙ্গা পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। এর আগে হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণে রায়ডাঙ্গা ঈদগাহ ময়দানে আবরারের তৃতীয় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে এলাকাবাসী শিলাইদহ সড়কের ওপর বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড হাতে ফাহাদের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে সেøাগান দিতে থাকেন। পরে পুলিশি বাধায় বিক্ষোভকারীরা স্থান ত্যাগ করে। নামাজে জানাজায় ফাহাদের দাদা আবুল কাশেম বিশ্বাস, বাবা বরকতউল্লাহসহ পরিবারের লোকজন আত্মীয়স্বজন এবং এলাকাবাসী অংশগ্রহণ করেন।

এর আগে সকাল সোয়া ৮টায় আবরারের লাশবাহী গাড়ি কুষ্টিয়া শহর থেকে আবরারের গ্রামের বাড়ি রায়ডাঙ্গা বিশ্বাস বাড়িতে পৌঁছলে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। আত্মীয়স্বজন ও এলাকাবাসীর আহাজারিতে সেখানকার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। বৃদ্ধ দাদা-দাদী তার বড় নাতি আবরারের লাশ দেখে মূর্ছা যান। তারা চিৎকার দিয়ে বিলাপ করতে থাকেন। সত্তরোর্ধ্ব দাদা আবুল কাশেম বিশ্বাসকে গতকাল সকালেই নাতির মৃত্যুর খবর জানানো হয় আর দাদী মৃত্যুর খবর পেয়ে সোমবারই কুষ্টিয়া শহরের বাসায় গিয়েছিল। গতকাল ভোর থেকেই রায়ডাঙ্গা গ্রামের এই বিশ্বাস বাড়িতে ফাহাদের লাশ দেখার জন্য হাজার হাজার নারী ও পুরষের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। ফাহাদের লাশ পৌঁছানোর খবরে মহিলা পুরুষসহ সব বয়সের মানুষ সেখানে ভিড় জমায়। সোয়া ১ ঘণ্টা ফাহাদদের বাগান বাড়িতে লাশবাহী গাড়ি থামে। সেখানে ফাহাদের লাশ লোকজন শেষবারের মতো দেখেন। ফাহাদের গ্রামের বাড়িতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ছিল। জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান, সহকারী পুলিশ সুপার দিশা, কুষ্টিয়া ও কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

সোমবার রাত সোয়া ১০টায় বুয়েট থেকে রওনা হওয়া ফাহাদের লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি কুষ্টিয়ায় পৌঁছায় ভোর সাড়ে ৫টায়। ফাহাদের লাশের অপেক্ষায় পরিবারের লোকজনের পাশাপাশি সাংবাদিকরা সারা রাত কুষ্টিয়া শহরের পিটিআই সড়কের বাড়ির আশপাশে বিচরণ করছিলেন।
সেখানে তার মা এবং আত্মীয়-স্বজনেরা ফাহাদের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে দীর্ঘসময় আহাজারি করতে থাকেন এবং দোয়া পড়তে থাকেন। স্থানীয় এমপির প্রতিনিধি ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতাসহ আওয়ামী লীগের নেতারা ফাহাদের লাশ দেখতে যান। সকাল সোয়া ৬টায় এমপি হানিফের বাড়ির সামনের সড়কে ফাহাদের দ্বিতীয় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শত শত মানুষ অংশগ্রহণ করেন। নামাজে জানাজা শেষে সকাল ৭টায় ফাহাদের মা প্রথমবারের মতো ফাহাদের লাশের গাড়ির সামনে আসেন ১০ মিনিট পর দ্বিতীয়বারের মতো ফাহাদের মা লাশবাহী গাড়ির সামনে এসে ফাহাদের লাশ দেখেন। এ সময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং আহাজারি করতে থাকেন মেধাবী এই পুত্রের জন্য। তিনি আল্লাহর দরবারে খুনিদের শাস্তি চেয়ে আহাজারি করেন। পৌনে ৮টায় ফাহাদের লাশের গাড়ি গ্রামের বাড়ি রায়ডাঙ্গার দিকে রওনা দেয়।

ফাহাদের নামাজে জানাজায় শরিক হয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেনÑ সাবেক এমপি খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জু, অনিন্দ ইসলাম অমিত ও জয়ন্তু কুমার কুণ্ডু। নামাজে জানাজা শেষ হতেই একদল গ্রামবাসী প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে সেøাগান শুরু করেন। এ সময় তাদের সাথে এলাকার সব মানুষ প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। এলাকাবাসী তাদের সন্তান ফাহাদের খুনিদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি জানান। বিক্ষোভকারীরা এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেন। পরে পুলিশ এসে বিক্ষোভকারীদের শান্ত করলে তারা ঘটনাস্থল থেকে চলে যান। আগামী শুক্রবার ফাহাদের কুলখানি অনুষ্ঠিত হবে রায়ডাঙ্গার বাড়িতে।

বিশ্বাস বাড়ির স্বপ্ন ভেঙে চুরমার : এলাকাবাসীর ভালোবাসার স্থানটি ছিল বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী মরহুম ফাহাদের দাদার বসতবাড়ি কুমারখালীর কয়া ইউনিয়নের রায়ডাঙ্গা গ্রামের বিশ্বাস বাড়ি। কুষ্টিয়া শহর থেকে দুই কিলোমিটার দূর মাঝে রয়েছে গড়াই নদী। শহরের ঘোড়াঘাট দিয়ে গড়াই নদী পার হয়ে মাইলখানেক পথ পেরিয়ে রায়ডাঙ্গা গ্রাম। ঘোড়াঘাট-শিলাইদহ সড়কের সাথে ফাহাদের দাদার বসতবাড়ি। ছেলেমেয়ে ও নাতি-নাতনী নিয়ে ৫০-এর বেশি সদস্য এই বিশ্বাস বাড়িকে আলোকিত করেছে। এই পরিবারের প্রথম সন্তান বরকতউল্লার প্রথম সন্তান আবরার ফাহাদ। বংশের প্রথম তাই ফাহাদকে নিয়ে পুরো পরিবারের ছিল আশার স্বপ্নচূড়া। মেধাবী ফাহাদ সবার স্বপ্ন পূরণে ছিল প্রস্তুত। ফাহাদের মৃত্যুতে সেই বিশ্বাস বাড়িতে আকস্মিক ছন্দপতন ঘটেছে। ফাহাদের অনুপস্থিতি সবাইকে কাঁদিয়েছে।

গতকাল সকালে কাশেম বিশ্বাসকে তার প্রিয় নাতি ফাহাদের মৃত্যুর খবর দেয়া হলে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। ফাহাদকে শেষবারের মতো দেখতে এসেছিল ফাহাদের স্কুলের সহপাঠী বন্ধুরা, গ্রামের সব বয়সের মানুষ এমনকি বুয়েটে অধ্যয়নরত বন্ধুরা। সবার মুখে ফাহাদের বর্ণনা এবং তার আচরণের প্রশংসা ছিল। গ্রামের মহিলাদের দেখা গেছে আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে। ফাহাদ তাদের কাছে অনেক আশার আলো ও প্রদীপের মতো ছিল।
বাবা-মায়ের দাবি : আবরারের বাবা বরকতুল্লাহ নয়া দিগন্তকে জানান, আমার ছেলে শিবির নয়, কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত ছিল না। আবরারকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করে সঠিক তদন্তের দাবি জানাচ্ছি। সেই সাথে হত্যাকারীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে ফাঁসির দাবি জানাচ্ছি। যেন আমার মতো আর কাউকে এভাবে সন্তানহারা হতে না হয়। আবরারের মা রোকেয়া খাতুন নয়া দিগন্তকে জানান, আমার আবরারের স্বপ্ন ছিল ও বিজ্ঞানী হবে ও দেশের জন্য কাজ করবে কিন্তু ওরা তা হতে দিল না। আমি আমার সন্তানের হত্যার বিচার চাই, কেউ যেন কোনো রাজনৈতিক ছায়াতে পার পেয়ে না যায়।

এ দিকে আবরার হত্যার প্রতিবাদে আজ বুধবার কুমারখালীর বাসস্ট্যান্ডে মানববন্ধনের ডাক দিয়েছে স্বপ্নপূরণ ফাউন্ডেশন, ব্লাড ডোনেশন ক্লাব, মনির খান সঙ্ঘসহ কয়েকটি সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। আবরারের নামাজে জানাজায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, চরমোনাই পীরের দলের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীসহ হাজারো মানুষ।
বিক্ষোভ ও মানববন্ধন
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, চট্টগ্রাম নগরীর ষোলশহর রেলস্টেশন চত্বরে মানববন্ধন করেছে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ চট্টগ্রাম শাখা। গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যানারে করা এ মানববন্ধনে নগরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শত শত শিক্ষার্থী অংশ নেন। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, আবরার হত্যার বিচার না দেখে ছাত্রসমাজ ঘরে ফিরবে না। আবরারের খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন চবি শিক্ষার্থী আমির হোসেন জুয়েল, নিজাম উদ্দিন, জাহেদুল ইসলাম, রাইসুল ইসলাম, নাছির উদ্দিন, কামরুল হাসান, ইমতিয়াজ ইমতু, রিয়াজ উদ্দিন, কামরুন নাহার, লুবনা নূর প্রমুখ।

এদিকে আবরার ফাহাদ হত্যার বিচারের দাবিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) একাই আন্দোলনে নেমেছেন পরিসংখ্যান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র খালেদ সাইফুল্লাহ। গতকাল বেলা ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার চত্বরে বিভিন্ন ধরনের প্ল্যাকার্ড নিয়ে অবস্থান করেন তিনি।
খুলনা ব্যুরো জানায়, বুয়েট ছাত্র আবরার হত্যার প্রতিবাদে খুলনায় মানববন্ধন কর্মসূচি ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে নগরীর শিববাড়ী মোড়ে ‘আগুয়ান-৭১’ নামের একটি সংগঠনের ব্যানারে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এ কর্মসূচি পালন করে। এ সময় শিক্ষার্থীরা বাকস্বাধীনতার দাবিসহ বুয়েট ছাত্র আবরার হত্যার প্রতিবাদে বিভিন্ন স্লোগান খচিত প্ল্যাকার্ড বহন করে। মানববন্ধন কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা অবিলম্বে আবরার হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ভবিষ্যতে আর কোনো আবরারকে যেন এমন নির্মমতার শিকার হতে না হয় তা নিশ্চিত করার দাবি জানান। মানববন্ধন কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন আগুয়ান ৭১-এর সভাপতি মো: আব্দুল্লাহ চৌধুরী। বক্তৃতা দেন আবিদ শান্ত, সালেহ আহমেদ, নাগরিক নেতা অ্যাডভোকেট কুদরত-ই খুদা, গোলাম সারোয়ার সাগর ও নিশাত তাসনিম।
যশোর অফিস জানায়, সাধারণ ছাত্র পরিষদ যশোরের ব্যানারে মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় প্রেস ক্লাব যশোরের সামনে এক মানববন্ধনের আয়োজন করে সাধারণ ছাত্র পরিষদ। ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধনে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি এম এম কলেজসহ বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। যারা এর সাথে জড়িতদের তাদের তাদের বিচারের আওতায় এনে ফাঁসির দাবি জানান শিক্ষার্থীরা। একই সাথে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সুস্থ রাজনীতি চর্চার আহ্বান জানানো হয়।

বগুড়া অফিস জানায়, মঙ্গলবার দুপুরে শহরের সাতমাথায় ছাত্র ইউনিয়ন বগুড়া জেলা শাখার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এক মানববন্ধন থেকে হত্যার সাথে জড়িতদের দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। এ সময় বক্তব্য দেন সিপিবি বগুড়া জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ফরিদ, যুব ইউনিয়ন জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক শাহ নেওয়াজ খান পাপ্পু, ছাত্র ইউনিয়নের জেলা সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন প্রমুখ।
রংপুর অফিস জানায়, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও কারমাইকেল কলেজ ক্যাম্পাসে গতকাল দিনভর বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা এ ঘটনায় দায়ীদের ফাঁসির দাবি জানান। রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আলমগীর কবির, মিজানুর রহমান, রাব্বী ইসলাম, নজরুল ইসলাম রিনা মুরমু, হাসান মাহমুদ প্রমুখ। অন্য দিকে দুপুরের পর কারমাইকেল কলেজ গেটসংলগ্ন লালবাগ চত্বরে সাধারণ ছাত্র পরিষদের ব্যানারে প্রতিবাদ সমাবেশ করেন কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা। এ সময় বক্তব্য রাখেন হানিফ খান সজীব, রুহুল আমিন, রাসেল মাহমুদ, তাজুল ইসলাম প্রমুখ।
ময়মনসিংহ অফিস জানায়, ময়মনসিংহে মুখে কালো কাপড় বেঁধে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে প্রগতিশীল ছাত্র জোট ও বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ ময়মনসিংহ শাখা। মঙ্গলবার নগরীর শহীদ ফিরোজ-জাহাঙ্গীর চত্বরে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন কর্মসূচিতে ছাত্র ইউনিয়ন, যুব ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, সুজন ও সিপিবি নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করে সংহতি জানায়। এ ছাড়াও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাধারণ ছাত্রছাত্রী ও গণ্যমান্য নাগরিকবৃন্দ এতে অংশ নেন।

গফরগাঁও (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা জানান, ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা গফরগাঁও প্রেস ক্লাবের সামনে গতকাল মঙ্গলবার মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধনে বক্তব্য দেন গফরগাঁও সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী আলিম আকন্দ নাঈম, ইসলামিয়া সরকারি হাইস্কুলের শিক্ষার্থী রুপক মিয়া, আবিদ হাসান, জারিফ উল বাশার, গফরগাঁও জে এম মাদরাসার শিক্ষার্থী মুশফিক ইমাম মারুফ, রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জোনায়েদ হোসেন রিয়াদ, ঢাকায় নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী রাইয়ান রাকিব, রোস্তম আলী গোলন্দাজ উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোস্তাকিম প্রমুখ। শিক্ষার্থীরা তাদের বক্তব্যে সরকারের কাছে দ্রুত এ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচার দাবি করেন।
কুমিল্লা সংবাদদাতা জানান, কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয়, ভিক্টোরিয়া ও সরকারি কলেজসহ জেলার বিবেকবান ছাত্র সমাজ মঙ্গলবার বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছে। কুমিল্লা নগরীর কান্দিরপাড় টাউনহলের সামনে এ বিক্ষোভ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা আবরার হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি করে বলেন, একটি স্বাধীন দেশে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়াকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা হতাশাজনক। কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখেন কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র মাজহারুল ইসলাম হানিফ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্র মহিউদ্দিন আকাশ, শরিফ খান ও কুমিল্লা সরকারি কলেজের ছাত্র সৈকতসহ সচেতন অভিভাবক ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

গাজীপুর সংবাদদাতা জানান, গাজীপুরে মানববন্ধন করেছে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট) শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার সকালে ডুয়েট ক্যাম্পাসের সামনে শহীদ জামান সড়কে ঘণ্টাব্যাপী এ মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়।
ভোলা সংবাদদাতা জানান, গতকাল দুপুরে ভোলা কালীনাথ রায়ের বাজার বন্ধুজন পরিষদ কার্যালয়ের সামনে বন্ধুজন পরিষদের প্রধান সমন্বয়কারী আসিফ আলতাফের নেতৃত্বে মানববন্ধন করেছে জাতীয় বন্ধুজন পরিষদ ভোলা।

গোপালগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, মঙ্গলবার বিকেলে গোপালগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সামনে ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন বশেমুরবিপ্রবি শাখা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। এতে বক্তব্য রাখেন ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মালিকুলার বায়োলজি বিভাগের ২য় বর্ষের ছাত্র মো: আল আমিন, গোপালগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মো: সিয়াম গাজী প্রমুখ। বক্তারা তাদের বক্তব্যে হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
পটুয়াখালী সংবাদদাতা জানান, গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পটুয়াখালী সরকারি কলেজের সর্বস্তরের ছাত্র সমাজের ব্যানারে পটুয়াখালী সরকারি কলেজে ও বাউফল উপজেলায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। কলেজের প্রধান ফটকের সামনে আধা ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী মানিক, হাসান, সুমন ও মাহাদি। বক্তারা আবরার হত্যার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে দোষীদের দ্রুত বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর দাবি জানানোর পাশাপাশি দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানান।

রাজবাড়ী সংবাদদাতা জানান, ছাত্র ইউনিয়ন রাজবাড়ী জেলা সংসদের আয়োজনে প্রেস ক্লাবের সামনে গতকাল দুপুরে মানববন্ধন ও স্বাধীনতা চত্বরে এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর আগে শিক্ষার্থীরা আবরারের হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে রাজবাড়ী শহরে এক বিক্ষোভ মিছিল করে। মানববন্ধন চলাকালে বক্তব্য রাখেন জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি আব্দুস সামাদ মিয়া ও ছাত্র নেতা রিপন আহমদ।

সৈয়দপুর (নীলফামারী) সংবাদদাতা জানান, নীলফামারীর সৈয়দপুরে শহীদ ডা: জিকরুল হক রোডস্থ প্রেস ক্লাবের সামনে সৈয়দপুর রেলওয়ে সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থী সাদা কাগজে হাতে লেখা প্লাকার্ড নিয়ে ছোটভাইদের প্রতিবাদ নামে এক মানববন্ধন করে। পরে তাদের সাথে প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এম এ করিম মিস্টার, সাপ্তাহিক জনসমস্যা সম্পাদক প্রভাষক শওকত হায়াৎ শাহসহ আরো অনেক সাংবাদিক, পথচারী অংশ নেন।
সিলেট ব্যুরো জানায়, সিলেটে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা গতকাল মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় নগরীর চৌহাট্টাস্থ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে এ মানববন্ধনের আয়োজন করে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। সংগঠনের সিলেট বিভাগীয় প্রধান সমন্বয়ক মো: নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে ও যুগ্ম আহ্বায়ক নোমান হোসেন খন্দকারের পরিচালনায় মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, আবরার হত্যার পেছনে ছাত্রলীগের অতিমাত্রায় ভারতপ্রেম প্রেরণা জুগিয়েছে। ভারতের সাথে কয়েকটি দেশবিরোধী চুক্তির সমালোচনা করায় আবরারকে হত্যা করা হয়েছে।

জাবি সংবাদদাতা জানান, আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের ফাঁসির দাবিতে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১টার দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা শহীদ মিনার থেকে বিক্ষোভ মিছিল করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক পার হয়ে মহাসড়কে অবস্থান নেন। প্রায় আড়াই ঘণ্টা রাস্তা অবরোধ করে রাখায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের দুইপাশে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়েছে। এ সময় অবরোধকারীরা ফাহাদ হত্যা মামলায় অভিযুক্ত সবাইকে গ্রেফতার ও অবিলম্বে শাস্তি দেয়াসহ সাত দফা দাবিতে বুয়েট শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেন।
নোয়াখালী সংবাদদাতা জানান, নোয়াখালী টাউন হল মোড়ে গতকাল মঙ্গলবার সাধারণ শিক্ষার্থীদের মানববন্ধনে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় তাদের ধাওয়া করে লাঠিচার্জ করার চেষ্টা চালিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ। পরে শিক্ষার্থীরা পুনরায় নোয়াখালী প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন-সমাবেশে মিলিত হয়। আধা ঘণ্টাব্যাপী ওই কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন। এ সময় তারা হত্যার প্রতিবাদে ও বিচার দাবিতে নানা স্লোগান দেন। মানববন্ধনে পুলিশি বাধার বিষয়ে সুধারাম থানার ওসি নবীর হোসেন জানান, ঢাকার ঘটনায় নোয়াখালীতে কর্মসূচি ঠিক নয় বিধায় তাদের বাধা দেয়া হয়েছে। তা ছাড়া মানববন্ধনে বিএনপি জামায়াতের লোকজনও ঢুকে পড়েছে।
সাভার (ঢাকা) সংবাদদাতা জানান, মুখে কাপড় বেঁধে ও মোমবাতি প্রজ্বলনের মাধ্যমে মানববন্ধন করে প্রতিবাদ করেছেন সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের (গবি) শিক্ষার্থীরা। গত সোমবার সন্ধ্যায় জাতীয় স্মৃতিসৌধের সামনে মুখে কালো কাপড় বেঁধে মোমবাতি প্রজ্বলন করে এ কর্মসূচি পালন করেন তারা। এ সময় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বলেন, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা দিন দিন লাগামছাড়া হয়ে যাচ্ছে। সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। ছাত্রলীগ আগেও বিভিন্ন ক্যাম্পাসে মেধাবী শিক্ষার্থীদের হত্যা করেছে। তাদের এই বর্বর কার্যকলাপের সর্বশেষ শিকার ফাহাদ। অবিলম্বে ফাহাদের হত্যাকারী ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
এ দিকে গতকাল সকালে রানা প্লাজার সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভে ছাত্র ইউনিয়ন আবরার হত্যার সাথে জড়িত ও দায়ীদের সর্বোচ্চ বিচার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পদত্যাগ দাবি করেছে। সাভার উপজেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক বাবলু ইসলাম অর্ণবের সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন সভাপতি সাইফুল শাওন। এ সময় তিনি বলেন, নির্যাতনের জেরে আবরারের মৃত্যুর ঘটনা বুয়েটের মতো প্রতিষ্ঠানের জন্য ন্যক্কারজনক। এ ঘটনার পক্ষে সাফাই গেয়ে ও সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব করে সে অপরাধের সাথে শামিল হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও। মানববন্ধনে আরো উপস্থিত ছিলেনÑ সাভার উপজেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক খালিদ রাব্বি, দফতর সম্পাদক আরিয়ান আহমেদ প্রমুখ।
এ দিকে একই কারণে বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী চট্টগ্রাম জেলা মহানগর কমিটির উদ্যোগে জামালখানস্থ প্রেস ক্লাব চত্বরে গতকাল মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক এস এম আলাউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে মায়ের কোলের মতো নিরাপদ হওয়ার কথা, সেখানে আজ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন সময় সাধারণ ছাত্রদের ওপর নির্মম নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডে শিক্ষার পরিবেশ হুমকির মুখের পড়েছে। এ অবস্থায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলে এ ধরনের সন্ত্রাস ও দুর্বৃত্তদের রুখে দিতে হবে। সভা সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী চট্টগ্রাম মহানগর সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক মো: ইউনুস ফয়সাল। সভায় আরো বক্তব্য রাখেনÑ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রনেতা ফাহিম, মো: মঈন উদ্দীনসহ সাইমুন, জয়ন্ত রায়, টুটুল সাজুসহ জেলা মহানগর নেতৃবৃন্দ।


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT