Main Menu

কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের সিডনি আগমন

মোঃ শফিকুল আলম: কথা সাহিত্যিক বা কথা শিল্পী ঔপন্যাসিক সেলিনা হোসেন এসেছিলেন ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ সিডনিতে। তিনি এসেছিলেন একুশ একাডেমি, অস্ট্রেলিয়ার আমন্ত্রণে। আয়োজকগন তাঁকে নিয়ে ২৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ০৭:৩০ টায় হার্স্টভিল সিভিক সেন্টারে তাঁর বিখ্যাত দু’টি ‘উপন্যাস গায়ত্রী সন্ধ্যা’ এবং ‘যাপিত জীবন’ শিরোনামে প্রবাসে বসবাসকারী সাহিত্যানুরাগীদের জন্য একটি উপভোগ্য সন্ধ্যার আয়োজন করেছিলেন। তাঁর সফর সঙ্গী ছিলেন এক সময়ের তুখর ছাত্রলীগ নেতা এবং বিশিষ্ট মুক্তিযাদ্ধা তাঁর স্বামী জনাব আনোয়ার হোসেন খান। বরন্যে এই কথা সাহিত্যিকের আগমন উপলক্ষ্যে সিডনিবাসী পরিচিতজনদের মহতি সন্ধ্যায় সরাসরি ঔপন্যাসিকের দু’টি উপন্যাসের সময় (বহু গবেষক যেখানে সময়কেই সেলিনা হোসেনের উপন্যাসের নায়ক বলে বিবেচনা করেছেন।), পাত্র-পাত্রীদের উপাখ্যান নিজ মুখের বর্নায় শুনতে আহ্বান জানিয়ে একটি ফেইসবুক পোষ্ট দিয়েছিলাম। ফেইসবুক পোষ্টটিকে আরেকটু বিস্তৃতাকারে লেখার প্রয়াস অনুভব করলাম। তিনি ২৮ সেপ্টেম্বর সাহিত্যানুরাগীদের একটি অনলাইন গ্রুপ পেন্সিল-অস্ট্রেলিয়ার পূর্বনির্ধারিত অনুষ্ঠানে আয়োজকদের বিশেষ অনুরোধে অংশগ্রহন করেছিলেন।আমিসহ যারা এই গুনিজনের সান্নিধ্যলাভের সুযোগ পেয়েছি তারা সবাই অত্যন্ত গর্বিত বোধ করছি এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে দীর্ঘায়ু কামনা করছি।

 

 

সেলিনা হোসেন আউট এ্যান্ড আউট একজন কথাসাহিত্যিক। ঐতিহাসিক উপাদান নিয়ে রচনা করেছেন উপন্যাস। ঐতিহাসিক উপাদান এবং সমকালীন বাস্তবতায় তিনি সাহিত্য নির্মাণ করেছেন। ইতিহাসকে উপজীব্য করে নতুন সাহিত্য সৃষ্টির ধারায় তিনি অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর উপন্যাসে রাজনীতি, সময়, আন্দোলন এবং একই সাথে নারীর শাশ্বত দৃষ্টি, সনাতন আদর্শ বজায় রেখেছেন হয়তো তাঁর অনন্য সাধারন মেধা এবং মননের জোরে। দৃঢ় জাতীয়তাবোধ সমৃদ্ধ একজন মানুষ ব্যতিরিকে স্বদেশ এবং স্বজাতির ইতিহাস উপন্যাসে এভাবে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। সে কারনেই হয়তো মুক্তিকামী বাঙ্গালীর সংগ্রাম, বাঙ্গালীর ঐতিহ্য এবং উত্তরাধিকার তাঁর উপন্যাসে এতোটা গর্বিত রূপ পেয়েছে। মুক্তিকামী মানুষ তাঁর উপন্যাস পড়ে নিজেদেরকে উচ্চমাত্রায় ঐতিহ্যমণ্ডিত করেন। 

 

আমি লেখক নই। সেলিনা হোসেনকে বর্ননা করা বা তাঁর কোনো উপন্যাসের দৃষ্টিকোন্ ব্যাখ্যা করার মতো ভাষাজ্ঞান আমার একেবারেই নেই। তাঁকে নিয়ে, তাঁর লেখা নিয়ে বহুজন গবেষনা করেছেন, নানাভাবে বিশ্লেষন করেছেন। গবেষকদের কথাই আমি অনেকটা পূণর্মূদ্রণ করেছি মাত্র। উপন্যাস যে পড়ি তা-ও নয়। রাজনীতির বিষয়ে আগ্রহ বরাবরই ছিলো এবং এখনও আছে। সেলিনা হোসেনের সময় বা ইতিহাস উপজীব্য উপন্যাস সেকারনেই হয়তো বারবার আমাকে পড়তে আগ্রহী করেছে। তাঁর লেখা, কথা বলা, বাচনশৈলী এতো সহজ এবং সুন্দর যে একটি থেকে আরেকটিকে আলাদা করা যায়না। তাঁর উপন্যাসের পাত্র-পাত্রী একেবারেই জীবন্ত। তাদের জীবনালেক্ষ্য আমাদেরই জীবনের বাস্তব বর্ননা। সময়, ইতিহাস, ইতিহাসের মানুষগুলো যেনো আমাদের সাথে জীবন্ত কথা বলছে।

 

গায়ত্রী সন্ধ্যার মূল্যায়নে ‘সময়’ (১৯৪৭-’৭৫ সাল পর্যন্ত) পরিক্রমাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ উপন্যাসের চরিত্রগুলোর পারস্পারিক সম্পর্ক, টানাপড়েন, সমাজ-আখ্যান প্রভৃতি ছাপিয়ে ইতিহাস বা ‘সময়’ যে নায়কের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে তা নিশ্চিত। ইলা মিত্রের নির্যাতন, কৃষকদের তেভাগা আন্দোলন কিংবা রাজবন্দীদের অনশন ধর্মঘট সবকিছুই কালের শৈল্পিক চিত্রায়ন। সময় এবং রাজনীতির অনুষঙ্গে ব্যক্তি-চরিত্রের মনোজাগতিক বিশ্লেষণের পারঙ্গমতা তাঁর সৃষ্টিকে আর সকলের থেকে আলাদা করেছে। তিনি রাজনীতির অনুসঙ্গকে না ছাপিয়ে উপন্যাসে বিধৃত ইতিহাস ছেঁকে রাজনীতির খোঁজ-খবর, চরিত্রের অন্তর্জগতের, কিংবা নস্টালজিয়াক্রান্ত চিন্তাচেতনার বিচার-বিশ্লেষণ-মূল্যায়ন যথার্থভাবেই করেছেন। অপরদিকে গবেষকগন একই সময়ে সেলিনা হোসেনের ‘যাপিত জীবন’ উপন্যাসের মূল্যায়নে নিরেট-নিরাবেগে এবং নির্মোহভঙ্গিতে চরিত্রগুলোর সাথে রাজনীতির সমীকরণ নিপুণ দক্ষতায় তুলে ধরেছেন।

 

 

কালের চিত্রায়ন সেলিনা হোসেনের প্রিয় বিষয়। ‘জল্লোচ্ছ্বাস’ (১৯৭২), ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ (১৯৭৬), ‘মগ্ন চৈতন্যে শিস’ (১৯৭৯), ‘যাপিত জীবন’ (১৯৮১), ‘নীল ময়ূরের যৌবন’ (১৯৮৩), ‘পদশব্দ’ (১৯৮৩), ‘চাঁদবেনে’ (১৯৮৬), ‘নিরন্তর ঘন্টাধ্বনি’ (১৯৮৭), ‘ক্ষরণ’ (১৯৯৮), ‘কাঁটাতারে প্রজাপতি’ (১৯৮৩), ‘খুন ও ভালোবাসা’ (১৯৯০), ‘কালকেতু ও ফুল্লরা’ (১৯৯২), ‘ভালবাসা প্রীতিলতা’ (১৯৯২), ‘টানাপোড়েন’ (১৯৯৪), ‘দ্বীপান্বিতা’ (১৯৯৭) এবং ‘যুদ্ধ’ (১৯৯৮) সর্বত্রই সেলিনা হোসেনের কাল নিমগ্নতা বা কাল-চিত্রণ স্পষ্ট। কখনও প্রেম বা সামাজিক দ্বন্দ্ব বা অন্য উপাদান প্রাধান্য পেলেও পাঠক সহজেই ঋদ্ধ হন তাঁর কাল বা সময় সচেতনতায় যা’ বর্তমান সাহিত্যে অনেকটাই দুর্লভ হয়ে উঠছে। সহজাত সে ক্ষমতাকে আশ্রয় করেই হয়তো সেলিনা হোসেন নির্মাণ করেছেন ১৯৪৭ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত পরিধিকে। ১৯৪৭ সময়টি কাকতালীয়ভাবে তাঁর নিজের জন্মসালও বটে। ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে দীর্ঘ দশবছর নিরবিচ্ছিন্ন কালমগ্নতার সৃষ্টিস্বরূপ আমরা বাঙালি পাঠক পেয়েছি দীর্ঘ প্রায় আটশ’ ত্রিশ পৃষ্ঠার ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’র তিনটি খণ্ড।

 

সাম্প্রতিক দশকগুলোতে উপন্যাস মানেই ৬/৭ র্ফমার একটি গল্পতে বদ্ধগ্রন্থ। কারো কারো সৃজনশীল প্রয়াস সে আয়তন দ্বিগুণের কাছে নিয়ে যায়, কিন্তু দু’শো/আড়াইশো কিছুতেই অতিক্রমন্য নয়। তবে শারীরিক আয়তন বা ব্যাপ্তিকে উল্লেখযোগ্য মনে না করে দেখেও এ আলোচনা চলতে পারে।

 

যোশেফ কনরাডের Heart of Darkness, জেমস্ জয়েসের ‘The Portrait of an Artist as a Young Man’, অথবা আর্নেস্ট হোমিংয়ের ‘The Old Man and the Sea’ উপন্যাসের আয়তন-স্বল্পতা সবার জানা। কিন্তু তাই বলে মার্সেল প্রুস্তের ‘Remembrance of Things Past’, লিও তলস্তোয়ের ‘War and Peace’, বা ‘Anna Karenina’ যে তাঁদের আয়তন প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ তা’ ভুলে যাওয়া চলে না। সবসময়ই আয়তন প্রশ্নে রিজিয়া রহমান বিশেষ উল্লেখের দাবিদার, আর সেলিনা হোসেনের ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’ সে মাত্রায় নতুন সংযোজন।

 

গায়ত্রী সন্ধ্যা’র যখন শুরু তখন ভারত স্বাধীন হচ্ছে। সেই উত্তাল সময়ে দেশান্তরী হওয়ার সময় ট্রেনে জন্ম নিচ্ছে উপন্যাসের একটি অন্যতম চরিত্র প্রতীক। ট্রেনে সে-সময় এক বিশাল সংখ্যার উদ্বাস্তু জনসমষ্টির সাথে রয়েছে প্রতীকের বাবা আলী আহমদ, মা পুস্পিতা এবং বড়ভাই ছয় বছরের প্রদীপ্ত। তারপর ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, এগারো দফা এবং গণঅভ্যুত্থান। একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে পাকবাহিনী যখন সাধারণ মানুষের উপর ঝাপিয়ে পড়েছে তখন প্রদীপ্ত’র স্ত্রীর সন্তান পৃথিবীর বাতাস নিতে আসছে। আর পঁচাত্তরের পনেরই আগষ্ট যখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নির্মমভাবে ঘাতকদের কর্তৃক খুন হন তখন প্রদীপ্ত’র সন্তান নেয় নতুনতর নাম অজেয় মৃত্যুঞ্জয় মুজিব। এই যে সংক্ষিপ্ত কাহিনী-কথা তা’ কিন্তু গায়ত্রী সন্ধ্যাতে অনেক গভীরে প্রোথিত, বহুধা এর শাখাপ্রশাখা। আর চরিত্র? কয়েকশ মানুষ এ কাহিনীতে অংশগ্রহণ করেছে এবং অপসৃত হয়েছে। কিন্তু বারবার ফিরে এসেছে যারা কাহিনীর স্তম্ভে, তাদের আশ্রয় করেই নির্মিতি পেয়েছে বাঙালি জাতিসত্ত্বার নির্মাণ ইতিহাস, তার সাতাশ বছর। প্রধান কলাকুশলীদের তালিকাটিও প্রসারিত হয়েছে। আলী আহমদ, পুষ্পিতা, প্রদীপ্ত, প্রতীকের সাথে যুক্ত হয়েছে মঞ্জুলিকা ও বন্যা – প্রদীপ্ত ও প্রতীকের দুই প্রেমাস্পদ।

 

স্বীকার করতেই হবে ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’তে সেলিনা হোসেন সাতচল্লিশ থেকে পঁচাত্তর কালপরিধির সকল রাজনৈতিক অভিঘাতকে শব্দরূপ দিয়েছেন। সাতচল্লিশোত্তর বাংলায় একের পর এক আমরা কী দেখেছি? ভাঙার প্রশ্নে পাকিস্তানিদের অনড় মানসিকতা, নাচোল বিদ্রোহ, খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ড, বাহান্নর ভাষা আন্দোলন, সামরিক শাসন, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, এগারো দফা, গণআন্দোলন, নকশাল আন্দোলন এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ। এখানেই শেষ নয়, লক্ষ শহীদের রক্ত দিয়ে কেনা মুক্তিযুদ্ধও যেনো দেশকে দিতে পারেনি একটি সুস্থ প্রতিবেশ। প্রকাশ ঘটে জাসদের, অস্ত্রের ঝনঝনানি ধ্বনিত হয় সর্বত্র, উত্তরাঞ্চলে প্রসস্ত মুখগহ্বর নিয়ে এগিয়ে আসে দুর্ভিক্ষ এবং চুড়ান্ত ঘটে যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এবং তাঁর পরিবার নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এবং ১৫ আগস্টের ঘটনার ভেতর দিয়েই শেষ হয় সেলিনা হোসেনের কাল পরিক্রমা।

 

গায়ত্রী সন্ধ্যা’র বৈশিষ্ট্য এখানেই যে এর চরিত্ররা রাজনৈতিক চালচিত্রের বাইরে কেউ নন। সামগ্রিকভাবেই তারা ঐ সকল ঘটনার অংশীদার। কখনও কখনও সম্পৃক্ততার প্রশ্নটিকে স্বাভাবিক করার জন্য সেখানে অনুপ্রবেশ ঘটেছে নতুন চরিত্রের যারা ভিন্ন প্রশ্ন মাথায় রেখে যুক্ত আলী আহমদ ও তাঁর পরিবারের সাথে।

 

গায়ত্রী সন্ধ্যা’র আর একটি অতিরিক্ত প্রাপ্তি হলো ইতিহাসের মানুষেরা এখানে বড় জীবন্তভাবে কথা বলেন। ইলা মিত্র, সোমেন চন্দ্র বা শহীদ সাবের নিজেই যখন প্রবেশ করে ফেলেন উপন্যাসের কাহিনীতে তখন আমাদের অনেক দ্বিধা অপসৃত হয়। সত্য অনেক বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যখন সাত মার্চ ১৯৭১ ভাষণ শুরু করেন তখন ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’র কাহিনী যেনো ইতিহাসের উপজীব্য অংশ হয়ে ওঠে সহজেই।

 

ভাষা-আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তাঁর দুটি উপন্যাস – ‘যাপিত জীবন’ (১৯৮১) এবং ‘নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি’ (১৯৮৭)। ‘যাপিত জীবন’ উপন্যাসের সময়কালও ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলন পর্যন্ত।সমকালীন রাজনীতি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের বাস্তবরূপ অত্যন্ত সাফল্যের সাথে বর্নিত হয়েছে এই উপন্যাসে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বর্নিত হয়েছে এই উপন্যাসে। সেলিনা হোসেন সময়ের ইতিহাসকে উপন্যাসের চরিত্রের মধ্যে কতোটা দক্ষতার সাথে , নিশ্চিন্তে, নির্ভাবনায় এবং সাবলীলভাবে প্রবিষ্ট করাতে সক্ষম তা’ সহজেই অনুমেয়।সেখানে ‘সময়’ই চরিত্র। সোহরাব হোসেন, মারুফ ও তার স্ত্রী সুমনা, জাফর, আঞ্জুম প্রতিটি চরিত্র পারিবারিক জীবনের দৈনন্দিনতার ভেতরে নিজস্ব মূল্যবোধ ও রুচির চর্চা করতে গিয়ে ইতিহাসকে নিজেদের জীবনে জড়িয়ে ফেলেছেন ওতপ্রোতভাবে। সেখানে রাষ্ট্রের সংগ্রামের সঙ্গে নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। চরিত্রগুলো সমস্ত ঘটনার সাক্ষী হয়ে চলন্ত জীবনপঞ্জিতে নড়াচড়া করে, সমস্ত ঘটনার কেন্দ্রিক চরিত্র হয়ে যায়। সেলিনা হোসেনের সৃষ্টির মুন্শিয়ানা এখানেই পরিলক্ষিত হয়। ‘যাপিত জীবন’ উপন্যাস প্রসঙ্গে প্রথমা রায়ের মন্তব্যটি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য : ‘নতুন দেশে জীবন যাপন শুরু হয় নতুন অস্তিত্বে। ব্যক্তিগত ভালোবাসা ও স্বদেশপ্রেমে একাকার হয়ে ওঠে; সঙ্গে আসে সমকালীন-আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্ত। উপন্যাসের সূচনায় যে ভয় ভীতির চিত্র উদ্ভাসিত হয় তা থেকে বেরিয়ে আসবার মধ্য দিয়ে উপন্যাসের পরিসমাপ্তি।

 

‘নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি’-তে মধ্যবর্তী শ্রেণির প্রস্ত্ততিকাল এবং সাংস্কৃতিক বিপ্লবে তাদের উত্থানের সাফল্য দেখানো হয়েছে। ঐতিহাসিক চরিত্র ‘সোমেন চন্দ’ বিকাশের মধ্য দিয়ে নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন। এ-উপন্যাসে ঢাকার আন্দোলনের পটভূমিতে ভাষা-আন্দোলনে প্রগতিশীল মধ্যবিত্তের যে-ভূমিকা তা’ দেখানো হয়েছে। এ-উপন্যাস দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কিছু আগে থেকে শুরু করে ১৯৫৩ সালে জেলখানায় বসে মুনীর চৌধুরীর কবর নাটক লেখা পর্যন্ত   বিস্তৃত। ‘নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি’র কেন্দ্রীয় চরিত্র মুনিম বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রনেতা। আসাদ, সালাম, রাহাত, বেণু, নীলা, রেণু এঁরা উপন্যাসের মূল কাহিনির সঙ্গে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় সহায়ক চরিত্র হিসেবে কাজ করেছে। মাত্র তিনদিনের ঘটনাপ্রবাহে আমরা দেখতে পাই একুশের চেতনা কীভাবে তিমিরবিনাশী আয়োজনে প্রগতিশীল ছাত্রদের আগামীর পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। তিনদিনের কাহিনিতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শোষক গোষ্ঠীর নিপীড়ন, দমননীতি, পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শোষকগোষ্ঠীর নিপীড়ন ও দমননীতির পাশাপাশি মুক্তিকামী বাঙালির অপ্রতিরোধ্য সাহসিকতা যেমন ফুটে উঠেছে, তেমনি বাঙালির চেতনাকামী ঐতিহ্য  কিভাবে উত্তরাধিকার খুঁজে পেয়েছে, তা বিধৃত হয়েছে। এ-উপন্যাসের কাহিনি আবর্তিত হয়েছে ঢাকাকে কেন্দ্র করে। এখানে রাজনীতি ও ইতিহাসের পাশাপাশি ব্যক্তিগত অনুভব, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের পথ এক প্রেমময় আবহের মধ্যে পূর্ণতা পেয়েছে। এখানেই সেলিনা হোসেনের স্বার্থকতা।

 

সেলিনা হোসেন বাংলা সাহিত্যে একটি নিজস্বতা তৈরী করেছেন। সাহিত্যিক হিসেবে যে একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে সে সম্পর্কে তিনি সদা সতর্ক থাকছেন। কখনো সামাজিক দায়বদ্ধতা এড়াতে চেয়েছেন, উপেক্ষা করেছেন তার প্রমান নেই। পরিবর্তনের দায়বদ্ধতা, সামাজিক অঙ্গীকারের চুক্তি, প্রগতিশীলতা, শিল্পের প্রতি টলারেন্স, নারীকে ব্যক্তি হিসেবে দেখা, ব্যক্তি স্বাধীনতা ইত্যাদি তাঁর সাহিত্য সাধনায় অত্যন্ত নান্দনিকতা পেয়েছে। তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খ ইতিহাস এবং সময়কে গলাগলি করে সাহিত্যের পথচলাকে নির্মান করেছেন। তিনি রয়েছেন আমাদের সার্বক্ষণিক পরিপ্রেক্ষিত হয়ে। তাঁর মসৃন পথচলা সমাজকে আলোকবর্তিকা হয়ে পথ দেখাবে। সৃষ্টিশীল মানুষটির দীর্ঘ জীবন কামনা করছি।


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT