Main Menu

অ্যামাজন ফরেস্ট, পৃথিবীর ফুসফুস কি পুড়ে গেছে?

মোঃ শফিকুল আলম: অ্যামাজন ফরেস্ট, পৃথিবীর ফুসফুস কি পুড়ে গেছে? না, স্যাটেলাইট ডাটা বলছে অ্যামাজন ফরেস্ট যেরকম ছিলো সেরকমই রয়ে গেছে!


পৃথিবীর সকল গনমাধ্যমে কয়েক সপ্তাহ ধরে পৃথিবীর ফুসফুস পুড়ছে এই মর্মে প্রধান শিরোনাম হয়েছে। বিশ্লেষকগনের নানান বিশ্লেষন শোনা গেছে। কিন্তু স্যাটেলাইটের ছবি দেখলে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। এবছর এবং এর পূর্বে আরো চার বছর অনুরুপ পুড়তে দেখা গেছে। অথচ স্যাটেলাইট তথ্য বলছে এ্যামাজন ফরেস্ট ইনট্যাক্ট রয়েছে। এটা কি বিশ্বাসযাগ্য?

কনফিউজড্? এটির কারন হচ্ছে অ্যামাজনের হৃদপিন্ডে কোনো অগ্নিকাণ্ড ঘটেনি। অগ্নিকাণ্ড মূলত: অ্যামাজনের প্রত্যন্তে ঘটেছে। এটাই হচ্ছে আসল ঘটনা এবং এখানেই সমাধানও নিহিত রয়েছে। আসলে বছরের এই সময়টায় উল্লেখিত স্থানসমূহে অগ্নিকাণ্ড অনেকটা নিয়মিত এবং তা’ মনুষ্য তৈরী অগ্নিকাণ্ড।
যেসমস্ত এলাকা পূর্বেই ডিফরেস্টেশন করা হয়েছে সেসমস্ত এলাকা কৃষিকাজের জন্য প্রস্তুত করতে মূলত: আগুন দেয়া হয়। মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটির জিওগ্রাফিকাল সায়েন্স বিভাগের গবেষকগন বলেন যে ব্রাজিল ২০০০ সাল থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে আবাদী জমির পরিমান প্রায় দ্বিগুন করেছে। আবাদযোগ্য জমি তৈরী করার জন্যই অধিকাংশ আগুন দেয়া হয়েছে এবং নির্দিষ্ট এলাকায়।

এই শতাব্দীর প্রথমভাগে ব্রাজিলের ডিফরেস্ট্রেশনের গতি বেশ শ্লথ ছিলো। কিন্তু অতি সম্প্রতিকালে ব্রাজিলে ডিফরেস্ট্রেশন এবং অ্যামাজনে অগ্নিকাণ্ড দু’টোই দ্রুত গতিতে বাড়ছে। এবছরের আগস্টের অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা ছিলো অন্যান্য বছরের অগ্নকাণ্ডের সংখ্যার থেকে তিনগুন বেশি। এবছরের আগস্টের অগ্নিকাণ্ড ১০,০০০ বর্গ কিলো মিটার প্রভাবিত করেছে।
ব্রাজিল বিশ্বের অন্যতম বড় গ্রিনহাউস গ্যাস নি:সরণকারী দেশ। আর এই গ্যাস নি:সরণের ৪৬% ভাগ শুধুমাত্র বন পুড়ে উজাড় করার কারনে হয়ে থাকে।

গত মাসের অগ্নিকাণ্ডের পর একটি স্যাটেলাইট ম্যাপে দেখানো হয়েছে যে পূর্বে বন উজাড় করা কতটুকুন জায়গায় পূনরায় আগুন দিয়ে ক্লিন করে কৃষিকাজের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে; এবং গত মাসে নতুন কতটুকুন জায়গা পোড়ানো হয়েছে। এবং এই অগ্নিকাণ্ডগুলো সব অ্যামাজনের প্রান্তে করা হয়েছে কৃষি জমি বৃদ্ধি করার জন্য। অর্থাৎ আগুন লাগেনি; আগুন লাগানো হয়েছে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পুরনো যে জায়গাগুলোর বন উজাড় করা হয়েছিলো কিন্তু নতুন করে আবার গাছপালা জন্মেছে সেগুলোতে নতুন করে আগুন লাগানো হয়েছে।

গত মাসে (আগস্ট) ব্রাজিলের সব চাইতে বড় নগরী সাও পাওলোর আকাশ শত শত মাইল ধরে ধোঁয়ার মেঘে আচ্ছন্ন থাকতে দেখা গিয়েছিলো। নগরীর মানুষদের কাছে দিন এবং রাত সমান হয়ে গিয়েছিলো। কথা হচ্ছে বনের যে অংশেই আগুন লাগুক বা লাগানো হোক সৃষ্ট ধোঁয়া এবং কালির ঝুল বাতাসে ভাসমান মেঘমালাকে দূষিত করে এবং তা’ পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের বাতাসও দূষিত করে। বিজ্ঞানীদের মতে বৃষ্টিপাতের পরিমানও কমিয়ে দেয়। বাতাসে কার্বনডাই অক্সাইড নি:সরিত হয়। এভাবে বন উজাড় করতে থাকলে পুরো দক্ষিন আমেরিকা মরুভূমিতে পরিনত হতে পারে।

ব্রাজিল কেনো কৃষি এবং আবাদি জমি বৃদ্ধির জন্য বন পুড়ছে? ব্রাজিলের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর এবং অর্থনীতির একটি বড় অংশ কৃষিপন্য রপ্তানি করে মেটানো হয়। জনসংখ্যার ১২% ভাগ বেকার বা ফুলটাইম জব পায়না। এই কর্মক্ষম বেকারের সংখ্যা হচ্ছে প্রায় দু’ কোটি চুরাশি লাখ। তাই বিগত কয়েক বছর ধরে ব্রাজিল একটানা বিশ্বের সবচেয়ে বড় গোমাংস এবং সয়া উৎপাদনকারী দেশ। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং চীন এই বিফ এবং সয়া আমদানিকারক। চীন-মার্কিন ট্রেড ওয়ার চলাকালীন সময়ে ব্রাজিলিয়ান সয়া বিন চীনের কাছে অধিক মাত্রায় চাহিদা বৃদ্ধি করেছে। এই চাহিদার কারনে ব্রাজিল অধিকমাত্রায় বন উজাড় করে আবাদি জমিতে পরিনত করছে।

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট বোলসোনারো দেশের অর্থনীতিতে গতি সন্চারনে যেমন প্রশংসিত হচ্ছেন তেমনি আগুন লাগিয়ে বন পোড়ানোর জন্য বিশ্বব্যাপী নিন্দিত হচ্ছেন। এমনকি বোলসোনারো জানুয়ারীতে ক্ষমতা গ্রহনের পূর্বে ঘোষনা দিয়েছিলেন অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে যে মন্ত্রনালয় পরিবেশ রক্ষা করেছে তার জট খুলবেন এবং তদন্ত করবেন। ক্ষমতা গ্রহনের পর তা’ না করলেও তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার পরিবেশ সংরক্ষণকে কমই গুরুত্ব দিচ্ছেন। পরিবেশ সংরক্ষণ ব্যয় বাজেটে ২৪% কমিয়ে দিয়েছেন। পরিবেশ বিভাগের কর্মচারীর সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছেন। পরিবেশ বিনষ্ট করলে যে জরিমানা নির্ধারিত রয়েছে তা’ কমানোর জন্য একটি রিভিউ কমিটি করে দিয়েছেন। বোলসোনারো অন্যান্য দেশের নেতৃত্বকে তীব্র সমালোচনা করেছেন পরিবেশ সংক্রান্ত তাদের দেশের পলিসি গ্রহনে প্রভাবিত করার চেষ্টার জন্য। তিনি বলেছেন তাঁদের প্রাকৃতিক সম্পদ তাঁরা কিভাবে ব্যবহার করবে তা’ নিয়ে অন্যের মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই।

অ্যামাজনে আগুন লাগার ফলাফল কোনো সীমানায় সীমিত থাকবেনা। এমনকি যারা আগুন লাগায় অনেক সময় তাদেরও ক্ষমতা থাকেনা আগুন নেভানোর। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট মনে করেন যদি পরিবেশ সংরক্ষণে উন্নত দেশগুলোর কিছু বলার থাকে তবে তাদের ব্রাজিলের অর্থনীতিকে সহযোগিতা করতে হবে। গত মাসে জি-৭ এর প্রস্তাবিত $২০ মিলিয়ন ডলারের বেশি দিয়ে অংশগ্রহন করতে হবে। মনে রাখতে হবে তাদের কৃষিপন্য আমদানিতে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে। অন্যথায় উন্নত দেশগুলোকে খাদ্যাভ্যাশ পরিবর্তন করতে হবে।

যদি প্রেসিডেন্ট বোলসোনারো ব্রাজিলের অর্থনীতিতে নব জাগরন সন্চারিত করতে চান তবে তাঁর সুযোগ রয়েছে। তিনি উন্নত বিশ্বকে জিজ্ঞেস করতে পারেন অ্যামাজন রেইন ফরেস্ট রিজার্ভ সংরক্ষণে কতোটা অংশগ্রহন করতে চায় বা আগ্রহী এবং সে অনুযায়ী বা সামর্থ্য অনুযায়ী সকলকে অংশগ্রহন করতে হবে। যদিও বন উজাড় করে বিশ্বকে অ্যামাজন রিজার্ভ সংরক্ষণে অর্থ প্রদানের ব্যাপারটি অনেকটা জিম্মি করার পর্যায়ে বিবেচিত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ব্রাজিল ঝুঁকির মধ্যে পরবে। প্রতিবেশি রাষ্ট্রসমূহ এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশও পরিবেশ দূষণের শিকার হবে।
 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT