Main Menu

ভূতের গল্প

টিএস রহমান:আশৈশব আমি ভূতে বিশ্বাস করি না।
বাবা বলতেন, বাস্তবে ভূত বলতে কিছু নেই। তবে ভূতের ভয় আছে। ভয়টা থাকে মানুষের মনে।
এজন্য গাঁয়ে গেলে সারারাত আমি ভূতের ভয়ে মরি। নৈশপ্রহরী সশব্দে পাহারা দেন, অ্যাগ্রোফার্মের গণ্ডাখানেক কর্মচারী ঘুমান আমার শোবারঘরের বাইরে চারিদিক ঘিরে। সকাল অবধি ঘরেবাইরে লাইট থাকে জ্বালানো।
তবুও কাটে না ভূতেরভয়।

আমার জীবনে অনেক গল্প আছে ভূতের। সেগুলি বলার আগে অন্যের একটি পরিচিত গল্প বলি।

বর্ষাকাল। গাঁয়ের এক লোক গেছেন হাটে। সাথে ছাতা বা জোংরা কিছুই নেই। ফলে বৃষ্টি না থামা পর্যন্ত তাঁকে বসে থাকতে হলো কোনো দোকানের বারান্দায়। যখন ফিরলেন তখন বেশ রাত।

বাড়ির পাশেই রাস্তাসংলগ্ন কবরস্থান। খানিকটা দূরে থাকতেই তিনি বিদ্যুচ্চমকে খেয়াল করলেন, একটি কবর থেকে কে যেনো হাত বের করে দুদিকে নাড়ছে। লোকটি একটু গোঁয়ার কিসিমের। তাঁর জেদ গেলো চেপে। পাশের জিয়লগাছ থেকে ভাঙলেন একখানা মোটা কচা। সেখানা হাতে নিয়েই ছুটলেন কবরের দিকে। কাছাকাছি পৌঁছেই হাতখানা লক্ষ্য করে মারলেন প্রচণ্ড এক বাড়ি।
এ মা, এ যে হলুদপাকা কচুপাতা। কবরের উপরে বাতাসে দুলছিলো। মনে হচ্ছিলো কেউ হাত নেড়ে তাঁকে সামনে এগোতে নিষেধ করছে।

আমারও বাস্তব জীবনে এ রকম ভূতের গল্প আছে অনেক। সেগুলি থেকে দু’একটি শোনাবো। গল্পগুলি খুব বেশি ভুতুড়ে নয়। সাহসী হলে ভয় পাবেন না।

স্বাধীনতাযুদ্ধ চলছে। ফলে কেউই নিজের বাড়িতে ঘুমাতে পারে না। যুবক-কিশোররা তো নয়ই। আমি তখন কিশোর। ঘুমাতে যাই এক বন্ধুর কাছে ওদের কাচারিঘরে।

আশ্বিনমাসে নিম্নচাপ। ঝুম বৃষ্টি থেমে গেলেও পিরপির করে ঝরছে। বৃষ্টির সাথে বইছে হিমেল হাওয়া। রাতে খেয়েদেয়ে চাদর গায়ে একটি মানকচুর পাতা মাথায় দিয়ে রওয়ানা দিলাম আখড়ার উদ্দেশ্যে। ভূতের ভয়ের চাইতেও জানের মায়া বড়।

কৃষ্ণপক্ষের ঘোর অন্ধকার রাত। পথভর্তি পেড়িকাদা। গুঁড়িগুড়ি বৃষ্টি এবং মাঝে মাঝে খাড়াঝিলিক। ঠাটাও পড়ছে। কাচারিতে ওঠার কিছুটা আগে আমার বন্ধুর এক জ্ঞাতি দাদার কবর। কবরের ওপর বাঁশঝাড়। বাতাসে দুলছে, ঝিরঝির শব্দও হচ্ছে বাঁশপাতার। কবর বরাবর আসতেই মনে হলো পায়ের নিচে পড়েছে একটি বিরাট শোলমাছ। সেটি দ্রুত নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ছড়ছড় করে ঢুকলো গিয়ে কবরের মধ্যে। এবং কবরের ভেতর থেকে গোরুর মতো ঘোঁৎ ঘোঁৎ আওয়াজ করতে থাকলো। কিছুটা হলেও চমকে গেলাম আমি। ভয়ে হিম হলাম না ঘেমে গেলাম মনে নেই।

হতে পারে বড়োসড়ো শোল বা গজার মাছ। বৃষ্টির পানি পেয়ে কর্দমাক্ত রাস্তায় উঠে এসেছে। কিন্তু সেটি গোরুর মতো ঘোঁৎঘোঁৎ আওয়াজ করবে কেনো?

মাটির হাঁড়িতে রাখা পানিতে পা ধুয়ে কাচারিতে উঠলাম। ওদেরকে বললাম না কিছুই। আমি চমকে গেছি। কিন্তু ওরা বুদ্ধিমান, ভয় পাবে। বুদ্ধিমান মানুষের ভয় বেশি। সকালে বললাম, ‘তোদের কোনো গোরু কি গোয়ালের বাইরে ছিলো?’ ওরা নিশ্চিত করলো যে, কাল রাতে ওদের প্রতিটি গোরুই গোয়ালে বাঁধা ছিলো।
গতরাতের ঘটনাটি বললাম ওদেরকে। ওরা টোয়াগোনা করতে থাকলো। জানালো ওদের দাদীকে।
এই বৃদ্ধাই উদ্ঘাটন করলেন রহস্য। সন্ধ্যায় জানালেন, তাঁদের বাড়িতে আছে একটি বিরাট গুঁইসাপ। স্থানীয় ভাষায় বলে শনগুঁই। এর লেজ পড়েছিলো কাল পায়ের নিচে। ছুটে কবরে ঢুকে এটিই করেছে ঘোঁৎঘোঁৎ।
কথায় যুক্তি আছে, বিশ্বাস করলাম।

স্বাধীনতার পরের বছর। অটোপ্রমোশনে নাইনে উঠে গেছি। হাইস্কুলটি আমাদের গ্রাম থেকে মাইল পাঁচেক উত্তরে। প্রায়ই আড্ডা দেই স্কুলসংলগ্ন বাজারে।

সেদিন আড্ডাটি জমেছিলো ভালো। স্বাভাবিকভাবে প্রসঙ্গ ছিলো ভূতের গল্প। আমি নানান যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করতে চাইছিলাম যে ভূতপেত্নী বলতে কিছু নেই। কিন্তু আড্ডাশেষে যখন পথে নামলাম তখন আমাকে পেয়ে বসলো ভূতের ভয়ে। কারণ, ‘যুক্তি দিয়ে দূর করা যায় না ভূতের ভয়।’

জ্যৈষ্ঠমাস। আকাশে বেলেবেলে জোছনা। মাঠের মাঝখান দিয়ে রাস্তা। রাস্তার পুবপাশ ধরে নয়ানজুলি। জোয়ারের নতুন পানি উঠেছে তাতে। হাঁটছি উত্তর থেকে দক্ষিণে।আশেপাশে মাইলখানেকের মধ্যে কোনো বাড়িঘর নেই তবে একটি শ্মশানঘাট আছে। অনেকেই নাকি সেখানে ভাদ্রের অমানিশিতে কল্লাকাটা মানুষ দেখেছেন। আমার হাতে হাত-চারেক লম্বা একখানা চিকন বাঁশের লাঠি। ডাইনের পশ্চিমাকাশে অস্তায়মান আধোচাঁদ।

আচমকা একটি দমকা বাতাস বয়ে গেলো। মনে হলো, শ্মশান থেকে কোনো ভূত উঠে এসে ফিসফিসিয়ে কথা কইছে কোনো পেত্নীর সাথে। হঠাৎ দেখলাম, রাস্তার বামে নয়ানজুলির পাশে সাদা কাফন পরানো একটি লাশ। ভীষণ চমকে উঠলাম। কিন্তু ভয় পেয়ে বীরের মতো পালাতে গেলে তো লাশরূপী ভূতটি আমাকে ধরে ঘাড় মটকাবে। অতএব পেছানো যাবে না। এক পা সামনে এগোতেই লাশটি দ্বিগুণ লম্বা হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। দেখে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। আর তো উপায় নেই। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে হাউমাউ শব্দ করে ছুটলাম লাশের দিকে। কাছে পৌঁছেই হাতের লাঠি দিয়ে মারলাম বাড়ি।
ছিটকে উঠলো কিছু পানি।

ঘটনা হলো, কৃষকেরা পাতো বা ধানের চারা তুলে আঁটি বাঁধে। এ রকম কুড়িখানেক আঁটি একটার সাথে আরেকটা জুড়ে জমিতে লাগানোর জন্য টেনে নিয়ে যায় অন্যত্র। ফলে পাতোটানা পথের মাটি সরে গিয়ে নালার সৃষ্টি হয়। জ্যৈষ্ঠমাসের জোয়ারে পুবদিকের সেই নালায় উঠেছে পানি আর পশ্চিমাকাশের চাঁদের ক্ষীণ আলো পড়ে সেটাকে বানিয়েছে কাফন পরানো লাশ। ঐ যে মনের মধ্যে ভূতের ভয়। প্রথমে দেখেছি কোনাকুনি, তাই মনে হয়েছে ছোট। সামনে এগোতেই সেটি সোজাসুজি হয়েছে, হয়েছে লম্বাও। বিভ্রম বা হেলুসিনেশনে দেখেছি লাশ।

তখন আজিমপুর সরকারী কলোনিতে থাকি একটি ভবনের নিচতলায়। পশ্চিমদিকে বিখ্যাত সেই কবরস্থানটি। আজিমপুর কলোনিতে থাকার লাভটা হলো, মরলে সস্তায় দাফন করতে পারবে আত্মীয়রা। পরিবহন খরচ নেই বলতে গেলে। এজন্য বাসা ছাড়ি না।

নিম্নচাপের ফলে সন্ধ্যা থেকে ঘোর বৃষ্টি। বাড়ছে পানি। বাইরে পানি উঠে গেছে মেঝে থেকে ফুটখানেক ওপরে। বাসার আউটলেটগুলি বন্ধ করে দিয়েছি বলে পানি ঘরে ঢুকতে পারছে না। কিন্তু সমস্যা মেইন গেটে। সেখানে ইট এবং কাদা দিয়ে গেঁথে পানি ঠেকিয়ে রেখেছি। আমার যখন এই বিপদ, উপরতলার লোকেরা তখন নাক ডেকে ঘুমাচ্ছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তো থাকেন আরও উপরে।
কাজেই আমি একাকি জেগে আছি।

রাত দুটো নাগাদ মনে হলো আরও কিছু ইট গেঁথে দেয়া দরকার। ছাতা মাথায় একখানা দা এবং গামলা নিয়ে বাইরে নামলাম ইট এবং কাদা আনার জন্য।

কোমরজল পেরিয়ে এগোচ্ছি পুবদিকে। হঠাৎ দেখলাম সাদা কাফন প্যাঁচানো একটি শিশুর লাশ ভাসছে পানিতে। এতো রাতে একাকি বৃষ্টির মধ্যে একটি লাশের সামনে পড়ে খানিকটা চমকে গেলাম। তবে খুব একটা ঘাবড়ালাম না।
কিন্তু লাশটির তো হিল্লে করতে হয়।

হঠাৎ মনে হলো, বইছে তো পুবাল হাওয়া। পশ্চিমদিকের গোরস্থানে সদ্য কবর দেয়া কোনো শিশুর লাশ কবর থেকে বেরিয়ে এলেও বাতাসের তোড়ে পুবদিকে তো ভেসে আসার কথা নয়। যাবে তো পশ্চিমে। আর দেরি করলাম না। হাতের দাওখানা দিয়ে ভাসমান বস্তুটির মাঝ বরাবর সজোরে মারলাম কোপ। ফেটে গেলো সেটি।
সাদা কভার পরানো একটি কোলবালিশ। ভেতরে তুলো নেই, আছে শোলা এবং ফোম। ফলে ভেসে আছে বানের পানিতে।

যারা ভূতে বিশ্বাস করেন না তাঁদেরই ভূতের ভয়টা বেশি। ভীতু মন সবকিছুতে হেলুসিনেশন দেখে। অন্ধকারে দড়িকে মনে হয় সাপ, কোলবালিশকে লাশ। বাতাসের শব্দকে মনে হয় ভূতের ফিসফিসানি।

অনুসন্ধিৎসু মনে একটু সাহস নিয়ে এগোলেই খুলে যায় রহস্যের সব জটাজাল॥


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT