Main Menu

পল্লী চিকিৎসক পান খান, এমবিবিএস মার খান!

ডা. তুলি সদ্য এমবিবিএস পাস করে মফস্বলে তার বাবার চেম্বারে বসা শুরু করে দিয়েছেন। তার বাবা একজন নাম করা চিকিৎসক। তুলি বড় হয়েছে তার বাবার নামডাক শুনে শুনে।

সবাই খুব শ্রদ্ধার চোখে দেখে তুলির বাবাকে, তুলিদের পরিবারের সবাইকে। অনেক বাঘা বাঘা প্রফেসরের প্রেসক্রিপশনকে তুলির বাবা তার টেবিলের এক কোণে রেখে, ভাই রাখুন এসব ঔষধ আর পরীক্ষা-নিরীক্ষা। আমি দেই, খান তারপর দেখেন’ এসব বলতে শুনেছে। এবং আশ্চর্য ক্ষেত্র বিশেষে রোগীদের নাকি সুস্থও হতে দেখেছে সে।

তাই ছেলেবেলা থেকেই তার বাবার প্রতি অগাধ বিশ্বাস আর ভালোবাসা।

বাবা দেলোয়ার আলি রশিদ তার চেম্বার সাজিয়েছেন সুন্দর করে। চকচকে ডিজিটাল সাইনবোর্ড। একপাশে তিনি বসেন আরেক পাশ ঠাসা ঔষধে। ডা. ডি.এ. রশিদ চৌধুরী মেডিকেল। তারা চৌধুরী বংশের না। কিন্তু তার বাবা এটা ব্যবহার করেন।

সেই মেডিকেল সেন্টারে রাতদিন রোগীতে গাদাগাদি। পাশেই দিয়েছেন ডা. তুলির চেম্বার। সে শুধু মহিলা রোগী দেখে। উচ্চতর পড়াশুনা করছে তাই সপ্তাহে দুতিন দিন দেখে।

ডা. তুলি একটা বিষয় খেয়াল করলো, তার বাবার চেম্বারে শো খানেক রোগী লেগেই থাকে কিন্তু তার কাছে দু’ চার জনের বেশি হয় না। তার বাবা যে আহামরি কিছুদেন তাও নয়। বিষয়টি তার খুব খারাপ লাগে। অপমানিত বোধ করে, কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলে না।

তার বাবা একজন পল্লী চিকিৎসক, চিকিৎসাবিদ্যায় তার কোনো জ্ঞান নেই। তারপর ও শত শত রোগী। রোগীতে রোগীতে ঠাসাঠাসি, গাদাগাদি মারামারি।

একদিন এক রোগী এসে তুলির চেম্বারে মহা তুলকালাম বাঁধিয়ে দিলো। ‘আপনার বাবা আজীবন চিকিৎসা করলো, এক বেলা খাওয়ার পর আমরা সুস্থ, আর আপনাকে তিন তিনবার দেখালাম, এতো এতো ভিজিট দিলাম, কই উপকার তো পেলাম না। আপনি আপনার বাবার সঙ্গে বসেন মা, ডাক্তারি ভালো করে শিখেন মা, আপনারই ভালো হবে’।

বিব্রত, অপমানিত তুলি একদিন ডায়নিং টেবিলে বসে তার বাবাকে বললো, ‘বাবা আমি আর চেম্বার করবোনা, আমার সামনে এফসিপিএস পরীক্ষা’। বাবা বিষয়টি বুঝেন।

একদিন তাকে ডেকে আদর করে মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, ‘মা’রে কোন ডাক্তার কি তার চেম্বারের মায়া ছাড়তে পারে। আমি জানি তুই কেনো চেম্বারে করতে চাচ্ছিস না। আমি কিছুই জানি না অথচ এ জীবনে হাজার হাজার, লাখ লাখ রোগীকে আমি আন্দাজে চিকিৎসা দিয়ে দিলাম। কেউ সুস্থ হলো, কেউ হলো না, আবার কেউ বা মারাও গেল। কিন্ত আজ পর্যন্ত কেউ আমার বিরুদ্ধে টু শব্দটিও করলো না। আমি কিছুই জানি না, আর তোর কাছে রোগীরা যেতেই চায় না’।

তুলি কোন কথা বলে না। তার চোখ ছলছল। বাবা তাকে কাছে টেনে নেন।

‘শোন মা, আমি ছেলে বেলায় এক বিলেতি ডাক্তারের ব্যাগ টানতাম। আমার যোগ্যতা বলতে সেটাই। একটা ভালো মানুষের সঙ্গে আমি অনেকদিন ছিলাম। উনি ছিলেন আমাদের গ্রামের বিলেত ফেরত বড় ডাক্তার। খুব অমায়িক।

তিনি মাঝেমধ্যে আমাকে ডেকে বলতেন, ‘রশিদ মিয়া, তুমি দেখো আমি সব রুগী কে প্রায় একই ঔষধ দেই। কুইনাইন আর কয়েকটি সিরাপ। আসলে দেবার মতো ভিন ভিন্ন কোন ঔষধ আমার কাছে নেই। আবিষ্কারও হয়নি। তাই আমাকে কৌশল অবলম্বন করতে হয়। আমার ঔষধের অভাব আমি পূরণ করি কৌশলটি। আমার কৌশল হলো তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা, ভালোভাবে দুটো কথা বলা..’।

‘তুলি আমি সেই বিলেতি ডাক্তারের কৌশলটাই রপ্ত করেছি, আর তা দিয়ে চলেছি বিগত ৫০- ৬০ বছর। আমরা পল্লী চিকিৎসকদের বেশিরভাগই এরকম। আমি ডাক্তারি জানি না সত্য তবে আমি যা জানি সেটা তুই সেটা জানিস না। আমি আজীবন কৌশলে থাকি রোগী দের খুশি রাখতে। ভালো ব্যবহার দিয়ে যাদুর মতো ধরে রাখতে। আমার ডাক্তারি জ্ঞান নেই বলে আমাকে এটা করতে হয়। কিন্তু তোর ডাক্তারি জ্ঞান আছে তাই তুই এ নিয়ে ভাবিস না। এটাই তোর দূর্বলতা।

আমি জানি না তোর কী করা উচিত। তুই বড় ডাক্তার, তোকে জ্ঞান দেবার সাধ্য আমার নেই। কিন্তু আমারও খারাপ লাগে যখন রোগীরা এসে আমাকে মিষ্টি পান খাওয়ায় আর তোদের মতো বড় বড় ডাক্তারদের অপমান করে।


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT