Main Menu

ফেসবুক ও  মানবতার দেয়াল

রাশেদুল ইসলাম:   যে কোন কিছুর  ভালো এবং মন্দ-  দুটো দিকই আছে ।  একটি ছুরি দিয়ে যেমন মানুষ খুন করা যায়; তেমনি একই ছুরি দিয়ে  মানুষের জীবনও বাঁচানো যায় । একজন খুনি ছুরি দিয়ে মানুষ খুন করে থাকে;   অন্যদিকে একজন দক্ষ সার্জন ছুরি দিয়ে অপারেশন করেই মানুষের জীবন বাঁচিয়ে থাকেন ।  এখানে ছুরির কোন দোষ নেই । ছুরি যে ব্যবহার করে দোষ বা গুণ তারই । ব্যবহারকারির উদ্দেশ্যই বলে দেয় –তার কাজ  ভালো না মন্দ । ফেসবুকেরও তেমনি  ভালো এবং মন্দ-  দুটো দিক আছে । সমাজে  মন্দ দিক নিয়ে কথা বলার লোকের  অভাব নেই । তবে আমি নিজে সচেতনভাবে সবকিছুর ভালো দিক নিয়ে কথা বলি ।  এখানেও ফেসবুকের একটি ভালো দিক নিয়ে কথা বলতে চাই আমি । সেই ভালো দিক  হোল – ফেসবুকের মাধ্যমে  মানুষের মধ্যে সামাজিক সচেতনতা গড়ে  তোলা যায় এবং একই সাথে মানুষকে কল্যাণমূলক কাজে উদ্বুদ্ধ করা যায়  । উদাহরণ হিসেবে এ ধরণের কাজের সাম্প্রতিক একটি ঘটনার কথা আমি উল্লেখ করতে চাই ।  গত ২৯ জুলাই, ২০১৯ তারিখে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী নাটোরের সিংড়া  উপজেলা চত্বরে একটি ‘মানবতার দেয়াল’ উদ্বোধন করেন । অনুষ্ঠানটি ফেসবুকে সরাসরি প্রচার করা হয় । মাননীয়  প্রতিমন্ত্রী জনাব জুনায়েদ আহমেদ পলক তাঁর বক্তব্যে ‘মানবতার দেয়াল’ গঠনের উদ্দেশ্য ও কার্যাবলী তুলে ধরেন । তিনি  সমাজের সকলকে এ ধরণের কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের আহবান জানান । বিষয়টি আমাকে গভীরভাবে নাড়া দেয় । আমার আজকের এই লেখা মূলত সে  কারণেই । 

‘মানবতার দেয়াল’ গঠনের মূল উদ্দেশ্য সমাজের বিত্তবান  পরিবারের অপ্রয়োজনীয় দ্রব্য বিত্তহীন শ্রেণির মানুষের মধ্যে বিতরণের ব্যবস্থা নেওয়া । এ ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাজের  বিত্তবান মানুষের সাথে বিত্তহীন গরীব ও দুস্থ মানুষের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন রচনা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ।  

 ইউরোপ বা আমেরিকার দেশগুলোতে  ‘মানবতার দেয়াল’ উল্লেখ করা না হলেও এ ধরণের ব্যবস্থা আছে বলে আমার  জানা । সেখানকার নগরবাসী পরিবারের অপ্রয়োজনীয় দ্রব্য নির্ধারিত একটি স্থানে ফেলে রেখে যান । নগরের  অন্য কোন অধিবাসী প্রয়োজন অনুযায়ী যে কোন জিনিষ সেখান থেকে নিয়ে যেতে পারেন । এ ধরণের ব্যবস্থা যে আমাদের সমাজেও প্রচলন করা যায় এবং মানবকল্যাণমূলক একটা সংগঠন গড়ে তোলা যায় - এ চিন্তা আমার মাথায় আসেনি । তাই ‘মানবতার দেয়াল’  এর মত অতি প্রয়োজনীয় একটি মানবিক সংগঠন গড়ে তোলা এবং তা ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে প্রচারের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমি মাননীয় প্রতিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি । 

 

 

বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু । মূলত ধর্মীয় বিধানই এ দেশের মানুষের জীবনযাত্রা  নিয়ন্ত্রণ করে । স্বাভাবিক কারণেই কোন মানবিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে  এ দেশের মানুষ অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে । এ কারণে প্রচলিত ধর্মীয় বিধানের সাথে ‘মানবতার দেয়াল’  ধারণাটি সংগতিপূর্ণ কি-না তা বিবেচনা করা দরকার । সংগঠনটি টেকসই করার ক্ষেত্রে এটা জানা অত্যাবশ্যক । 

বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার  শতকরা ৯০.৩৯ ভাগ মুসলমান, ৮.৫৪ ভাগ হিন্দু, .৬০ ভাগ   বৌদ্ধ, .৩৭ ভাগ খ্রিষ্টান এবং শতকরা .১৪ ভাগ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী (আদম শুমারী ২০১১) ।  সময় স্বল্পতার কারণে আমি এখানে ৪টি ধর্মের বিধান নিয়ে আলোচনা করতে চাই । প্রথমে খ্রিস্ট ধর্ম ।

 পবিত্র বাইবেলে বলা হয়েছে, প্রত্যেক জাতির মধ্য থেকে যারা তাঁকে (ঈশ্বর) স্মরণ করে এবং সৎকর্ম করে তাঁদেরকেই তিনি  (ঈশ্বর) গ্রহন করেন (প্রেরিত ১০:৩৫) । যীশু বললেন, তোমাদের মধ্যে যে মহান হতে চাও, তাঁকে সেবক হতে হবে (মার্ক ১০: ৪৩-৪৪)। ফলে, সেবক হবার জন্য ‘মানবতার দেয়াল’ একটা ভাল মাধ্যম হতে পারে ।  

বৌদ্ধ ধর্মমতে জীবহত্যা মহাপাপ । এ ধর্মের শাশ্বত  প্রার্থনা, ‘জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক’ । ফলে, বৌদ্ধ ধর্মের বিধান  অনুসারে সমাজের বিত্তহীন মানুষকে সুখী করার জন্য ‘মানবতার দেয়াল’ একটা ভালো মাধ্যম হতে পারে । 

হিন্দুধর্ম সুপ্রাচীন কালের । এ ধর্ম বিষয়ে  উপমহাদেশের সুপণ্ডিত ব্যক্তিত্ব স্বামী বিবেকানন্দ । তিনি একটি বাক্যে হিন্দু  ধর্মের সারকথা প্রকাশ করেছেন । তাহলঃ 

 ‘জীবে প্রেম করে যেই জন; 

সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’ ।

ফলে,  হিন্দু  ধর্মমতে ‘মানবতার দেয়াল’ এর ব্যানারে সৃষ্টির সেবামূলক কাজ করা ধর্মপালনের একটা বড় মাধ্যম । 

 উল্লিখিত  ৩ টি ধর্মের অনেক পরে  প্রবর্তিত হয় ইসলাম ধর্ম । ইসলাম ধর্মেও   সৎকর্ম বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে । পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে সৎকাজে কে এগিয়ে আছে, তা পরীক্ষা করার জন্যই মানুষ সৃষ্টি করা হয়েছে’ (সূরা মূলক, আয়াত ২ )। বলা হয়েছে, ‘যে বিশ্বাসী ও  সৎকর্ম শীল সে বেহেস্তে যাবে’ (সূরা মায়েদা, আয়াত ৯) । অর্থাৎ শুধু বিশ্বাসী বা শুধু সৎকর্মশীল কেউ বেহেস্তে যেতে পারবে না । বেহেস্তে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে হলে একজন মুসলমানকে বিশ্বাসী হওয়ার পাশাপাশি  সৎকর্মশীল হতে হবে । ইসলামের ৫ টি স্তম্ভ (কলেমা, নামাজ, রোজা, হজ্ব ও যাকাত) বিশ্বাসের অঙ্গ । এই ৫টি অঙ্গ যথাযথ পালনই যথেষ্ট নয় । বেহেশত পেতে হলে এ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সৎকর্ম করতে হবে । হাদিসে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তির প্রতিবেশী না খেয়ে থাকে,  তার ইবাদত কবুল হয় না’ । এক্ষেত্রে ‘মানবতার দেয়াল’ মুসলমানদের সৎকর্ম করার ক্ষেত্রে একটি সুন্দর প্লাটফর্ম হতে পারে । 

  তবে আমার মনে হয়েছে  ‘মানবতার দেয়াল’ সংগঠনটি  বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় বাঁধা  ৩টিঃ 

(১) লক্ষ্যদলের কাছে সেবা পৌঁছানো; 

(২) কোনটা প্রয়োজন এবং কোনটা অপ্রয়োজন তা নির্ধারণ করা  এবং 

 (৩) টেকসই করা বা  সংগঠনটি দীর্ঘস্থায়ীভাবে টিকিয়ে রাখা । 

(১)  লক্ষ্যদলের কাছে সেবা পৌঁছানোঃ  বলা হয়েছে ‘মানবতার দেয়াল’ এর লক্ষ্য দল  সমাজের বিত্তহীন মানুষ । সমাজের বিত্তবান মানুষ তাদের  পরিবারের অপ্রয়োজনীয় দ্রব্যগুলো ‘মানবতার দেয়াল’ এ জড় করবে এবং  সমাজের বিত্তহীন মানুষ সেখান থেকে প্রয়োজনীয় সব দ্রব্য সংগ্রহ করবে । কিন্তু বাস্তবে দেখা যেতে পারে,   সমাজের সচ্ছল ব্যক্তিদের অনেকেই সেগুলো সংগ্রহ করছে । বিত্তহীন  মানুষেরা সেগুলো সংগ্রহের কোন সুযোগ পাচ্ছে না। এখানে একটা বাস্তব উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে । গত শীতের মৌসুমে ঢাকাস্থ চৌগাছা সমিতির ব্যানারে  এলাকায় কিছু শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয় । কয়েকজন উদ্যমী ছেলে এলাকার সুবিধাবঞ্ছিত শ্রেণির মানুষের একটি তালিকা তৈরি করে । সেই তালিকা অনুযায়ী বস্ত্রগুলো বিতরণ করা হয় । এর কিছুদিন পর আমি গ্রামে গেলে গ্রামের একজন অতিসচ্ছল প্রবীণ ব্যক্তি অভিযোগ করেন যে,  তাঁকে কোন শীতবস্ত্র দেওয়া হয়নি । আমি তাঁকে অনেকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করি যে, শীতবস্ত্রগুলো তাঁর মত সচ্ছল ব্যক্তির জন্য নয় । আসলে আমাদের মত মানুষেরা আর্থিক দিক দিয়ে সচ্ছল হলেও, আমাদের অনেকের মনের দীনতা কাটেনি । সামাজিক মর্যাদা প্রদানের বিষয়ে আমরা দরিদ্র ও বিত্তহীনদের ধারেকাছে ঘেঁষতে দিই না সত্য; কিন্তু যখন ত্রাণ বা দাণ গ্রহণের কথা বলা হয়,   তখন আমাদের অনেকেই অবলীলায় বিত্তহীনদের কাতারে দাঁড়িয়ে যাই । এ নিয়ে আমাদের মধ্যে কোন ধরণের সংকোচ কাজ করে না। সচ্ছল শ্রেণির মানুষের এ ধরণের মানসিকতার পরিবর্তন দরকার । ‘মানবতার দেয়াল’ এর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হলে হয়ত সুবিধা পাওয়া যেতে পারে । 

(২)  কোনটা প্রয়োজন এবং কোনটা অপ্রয়োজন তা নির্ধারণ করাঃ   একটা পরিবারে কোনটা প্রয়োজন এবং কোনটা অপ্রয়োজন তা নির্ধারণ করা বেশ কঠিন । আসলে আমরা নিজেরাই জানিনে,   কোনটা আমাদের জন্য প্রয়োজন এবং কোনটা অপ্রয়োজন । আমার স্ত্রী হাতে কিছু টাকা পেলেন । সেই টাকা দিয়ে তিনি আমার জন্য একটা শার্ট  কিনে আনলেন । আমার নিজের শার্টের প্রয়োজন আছে কিনা, তা তিনি বিবেচনা করেন না । আবার আমি নিজেও জানিনে, প্রকৃতপক্ষে আমার কতটি শার্ট দরকার । এটা জানা থাকলে অপ্রয়োজনীয় শার্টের সংখ্যা জানা যেত এবং সেগুলো বিতরণ করা সহজ হত । একজন মানুষ সত্যই যদি জানত  প্রকৃতপক্ষে তার কত টাকা প্রয়োজন; তাহলে মানুষের ঘুষ খাওয়াসহ অনেক সামাজিক অপরাধ এমনি এমনিই কমে যেত । একজন মানুষের কোনটা প্রয়োজন এবং কোনটা অপ্রয়োজন তা নির্ধারণ করা গেলে সমাজের অনেক মৌলিক সমস্যা মিটে যায় । দেশের তৃনমূল পর্যায় থেকে এ ধরণের ‘মানবতার দেয়াল’ গড়ে তুলে যথাযথ  প্রচারণা চালনো হলে, এ বিষয়ে সুফল পাওয়া যেতে পারে । 

(৩) টেকসই করা বা দীর্ঘস্থায়ী ভাবে টিকিয়ে রাখাঃ  একটি সংগঠন অনেক সময় কোন ব্যক্তি বা দলের আবেগ বা আগ্রহ থেকে গড়ে উঠে । এক সময় সেই ব্যক্তি বা দলের পরিবর্তনে   সংগঠনের কার্যক্রম থেমে যায় । এ কারণে ‘মানবতার দেয়াল’ প্রশ্নে আমি ধর্মের প্রসঙ্গ টেনেছি । এ সংগঠনের সাথে যদি মসজিদের ইমামদের  সম্পৃক্ত করা যায়; মসজিদের ইমামগণ যদি বলেন ‘মানবতার দেয়াল’ এর মাধ্যমে সৎকর্মে অংশ নেওয়া নামাজ পড়ার মতই ইবাদত, তাহলে সব শ্রেণির মানুষ এই  কর্মকাণ্ডে অংশ নেবে । একইভাবে অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পৃক্ত করতে হবে । কেবলমাত্র সকল ধর্ম ও শ্রেণিপেশার মানুষের অংশগ্রহন ‘মানবতার দেয়াল’ কে টিকিয়ে রাখতে পারে । 

 আমি  ফেসবুককে অভিনন্দন জানাই  এবং ‘মানবতার দেয়াল’ এর শুভ কামনা করি । মাননীয় প্রতিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট  যারা এই মহৎ কর্মযজ্ঞের সূচনা করেছেন - তাঁদের সকলের প্রতি আবারও গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি । 


 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT