Main Menu

বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ প্রতিষ্ঠার ৭০ বছর

মোঃ শফিকুল আলম: বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের চেতনার উন্মেষ হাজার বছরের। কবি, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, সমাজ সেবক বহুজনের মধ্যে এই চেতনার সমৃদ্ধি ছিলো। প্রকাশ ঘটেছে নানানভাবে। বঙ্কিমের সাহিত্যে, রবীন্দ্রনাথের গান কিংবা কবিতায়, নজরুলের গান এবং কবিতায় অথবা নেতাজি সুভাস বোসের রাজনৈতিক চেতনা এবং বিপ্লবে। কিন্তু সহজভাবে বিশ্লেষনে দেখা যায় কোনো রাজনীতিবিদ, কবি, সাহিত্যিক, সমাজ সেবক বা রাষ্ট্র নায়কের চেতনায় কখনো বাঙ্গালীদের জন্য আলাদা জাতি-রাষ্ট্র ভাবনার প্রকাশ ঘটেনি। এই চিন্তা এবং চেতনার একক ধারক এবং বাহক হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনিই প্রথম বাঙ্গালীদের জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা। মহান এই দার্শনিক তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নে অত্যন্ত ধীর মস্তিষ্কে একটি সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা থেকে পাকিস্তান সৃষ্টির অব্যাবহতি পর পরই পাকিস্তান সরকারের কর্তৃত্ববাদী, অগনতান্ত্রিক এবং বৈষম্যমূলক শাসনের বিরুদ্ধাচারন করে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন তখনকার বাস্তবতায় নিখিল পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্মদাতাদের অন্যতম নিয়ামক ভূমিকায় অবতীর্ন হোন এবং জেলে থেকে নবগঠিত আওয়ামীলী মুসলিম লীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। সভাপতি ছিলেন জনাব মাওলানা ভাসানি এবং সাধারন সম্পাদক ছিলেন জনাব শামসুল হক। কে কখন কি ছিলেন তা’ নিয়ে আমি আজকে আলোচনা করবোনা। কারন, এ ইতিহাস কমবেশ সবার জানা। আমি বরং সৃষ্টি থেকে অদ্যাবধি আওয়ামীলীগের বিশেষ কিছু অর্জন, চলার পথে ব্যত্যয় এবং সময়ের সাথে চারিত্রিক গতিপথ পরিবর্তনের কিছু চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করবো। বিশ্লেষন যেহেতু ব্যক্তি হিসেবে একান্ত আমার এবং নিজস্ব; সুতরাং এই বিশ্লেষনের সাথে মতান্তর শ্রদ্ধার সাথে গ্রহন করবো। কারো তিক্ত সমালোচনায় মর্মাহত বোধ করবোনা। সমালোচনা আমার বিবেচনায় যুক্তিসংগত নাহলেও অসুবিধা নেই।

 

প্রথমেই বলেছি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাজার বছরের বাঙ্গালী চেতনায় কেনো অনন্য এবং শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী বলে বিবেচিত হচ্ছেন বা হতে থাকবেন। বলেছি বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের চেতনা একইভাবে বঙ্গবন্ধুসহ অনেকের মাঝেই বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের চেতনা অত্যন্ত তীব্রতর ছিলো। কিন্তু একমাত্র বাঙ্গালীদের জন্য আলাদা জাতি-রাষ্ট্র চিন্তা সময়ের বিবর্তনে তাঁকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

 

সময় কিভাবে সামাজিক বিবর্তনে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে সমাজ বিজ্ঞানের বিষয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে যারা গবেষনা করেন তারা হয়তো আওয়ামীলীগের টাইমলাইন অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষন করছেন। আমি সাধারন পাঠক হিসেবে যতটা বুঝেছি এবং দেখতে পাচ্ছি তা’ হলো ২৩ জুন ১৯৪৯ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত আওয়ামীলীগ টাইম লাইনে অসংখ্য স্টার মার্কস্ এবং পুরো সময়টাকে স্বর্ণযুগ হিসেবে। পুরো টাইমলাইনে ১৯৭১ সালটি ছিলো আওয়ামীলীগ-এর জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ এবং এর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর আজন্ম লালিত স্বপ্ন বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের চেতনায় বাঙ্গালীদের জন্য আলাদা জাতি-রাষ্ট্রের সৃষ্টি হলো।

 

পূর্ববঙ্গ কর্মীশিবিরের নেতা-কর্মীরাই ১৯৪৯ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে পরামর্শক্রমে প্রথমে মাওলানা ভাষানীকে সভাপতি, ইয়ার মোহাম্মাদ খানকে সাধারন সম্পাদক এবং খন্দকার মোস্তাককে দপ্তর সম্পাদক করে একটি সাংগঠনিক কমিটি করে যারা একই বছর ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার কেএম দাস লেনের রোজগার্ডেন প্যালেসে সম্মেলনের মাধ্যমে নিখিল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামীলী মুসলিম লীগ গঠন করেন। মাওলানা ভাষানী ছিলেন নবগঠিত দলের সভাপতি, সহ-সভাপতি হয়েছিলেন যথাক্রমে আতাউর রহমান খান, শাখাওয়াত হোসেন এবং আলী আহম্মেদ। সাধারন সম্পাদক হয়েছিলেন জনাব শামসুল হক এবং যুগ্ম-সাধারন সম্পাদক হয়েছিলেন যথাক্রমে শেখ মুজিবুর রহমান (জেলখানায় থেকে), মোস্তাক আহম্মেদ এবং একে রফিকুল হোসেনকে এবং ইয়ার মোবাম্মাদ খান ছিলেন ট্রেজারার। ১৯৫২ সালে শেখ মুজিব ভারপ্রাপ্ত সাধারন সম্পাদক এবং ১৯৫৩ সালে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ভাষানী সভাপতি এবং শেখ মুজিব সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হলেন এবং ভাষানীর সাথে ৪ বছর এবং দীর্ঘ ১৩ বছর শেখ মুজিবুর রহমান সাধারন সম্পাদক হিসেবে ছিলেন। ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর মুসলিম লীগ সরকারকে পরাজিত করার লক্ষ্যে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে দলটির সাধারন সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে কৃষক-শ্রমিক প্রজাপার্টি, পাকিস্তান গনতন্ত্রী দল এবং পাকিস্তান খেলাফত পার্টির সাথে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের শুরুতেই ৪২ দফা কর্মসূচী প্রনয়ন করে যা’ ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনী ইশতেহার হিসেবে গ্রহন করেছিলো। ৪২ দফার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দফাগুলো ছিলো রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলার স্বীকৃতি, এক ব্যাক্তির এক ভোট, গণতন্ত্র, সংবিধান প্রণয়ন, সংসদীয় পদ্ধতির সরকার, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং তৎকালীন পাকিস্তানের দু'অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য দূরীকরণ। ১৯৫৪ সালের মার্চের ৮ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক নির্বাচনে আওয়ামী মুসলিম লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে ১৪৩টি পেয়েছিলো। যুক্তফ্রন্ট মোট আসন পেয়েছিলো ২২৩টি। ২৪ বছরের পাকিস্তানি শাসন আমলে আওয়ামী মুসলিম লীগ দু’বছর পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকারে আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে এবং কেন্দ্রে কোয়ালিশন সরকারের অংশ হিসেবে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে ক্ষমতায় ছিলো।

 

১৯৫৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত তৃতীয় সম্মেলনে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে মুসলিম কথাটি বাদ দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামীলীগ করা হয় এবং দলকে আনুষ্ঠানিকভাবে অসাম্প্রদায়িকীকরন করা হয়। ১৯৫৭ সালে পররাষ্ট্রবিষয়ক নীতি নির্ধারনে মতদ্বৈততার কারনে মাওলানা ভাষানীর নেতৃত্বে ৭ এবং ৮ ফেব্রুয়ারী কাগমারী সম্মেলনে দল দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায় এবং মাওলানা ভাষানী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি নামে পৃথক দল গঠন করেন। ফলে বিশেষ কাউন্সিলে মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্ক বাগীশ সাহেবকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয়। ১৯৬৪ সালে নিয়মিত সম্মেলনে তর্ক বাগীশ সভাপতি নির্বাচিত হোন। ১৯৬৬ সালে ষষ্ঠ কাউন্সিলে শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতি এবং তাজ উদ্দিন আহমদ সাধারন সম্পাদক হলেন। তার পূর্বে ৬২ সালে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলন, ৬৬ এর ছয় দফা এবং ঊনসত্তরের গন অভ্যূত্থান, অত:পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তারপর ১৯৭০ এর নির্বাচন এবং জনগনের একক ম্যান্ডেট লাভ বঙ্গবন্ধুকে একক নেতৃত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত করলো। তারপর ১৯৭১ সালে ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মদান এবং দু’লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম হানি। বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর আজন্ম লালিত স্বপ্ন বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে আলাদা জাতি-রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা।

 

আওয়ামীলীগের ৭০ বছরের টাইম লাইনে উল্লেখিত প্রত্যেকটি সাল এবং সময় ঐতিহ্যের গৌরবগাঁথায় মণ্ডিত। বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গনতন্ত্র এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রত্যেকটি আন্দোলন, সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব লক্ষ স্থির করে সুপরিকল্পিতভাবে সংগঠনকে শক্তিশালী করে এবং কর্মসূচীভিত্তিক পদ্ধতিতে সাধারন মানুষকে সম্পৃক্ত করে অব্যর্থভাবে বিজয় অর্জন করেছিলেন।

 

আওয়ামীলীগ টাইমলাইনে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ কি ঘটেছিলো? এই পিরিয়ডে আওয়ামীলীগ সরকারে থেকে দল এবং জনগনকে কতোটা সরল রেখায় রাখতে পেরেছিলো? মাত্র স্বল্প সময়ের ব্যবধানে যে মহান নেতার একক নেতৃত্বে একটি স্বাধীন দেশ পেলো বাঙ্গালী তাদেরকে শাসন করতে কেনো গনতন্ত্র বিষর্জন দিয়ে সাড়ে তিন বছরের মাথায় এক দলীয় অগনতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় ১৮০ ডিগ্রী কৌনিক বিন্দুতে টার্ন নিতে হলো? আজীবন গনতন্ত্রী জনগনের নেতা এবং বন্ধুর ১৮০ ডিগ্রী কৌনিক বিন্দুতে টার্ন নেয়া জনগন গ্রহন করেনি। কিন্তু আওয়ামীলীগ এবং সরকার তা’ বুঝতে সক্ষম হয়নি। অনেকে বরং এখনও সেই বাকশাল বা একদলীয় শাসন ব্যবস্থার গনতন্ত্রের সুবিধা নিয়ে আলোচনা করতে দেখা যায়। এক দল তো এক দলই তাকে কখনো কেউ গনতান্ত্রিক শাসন বলবেনা। ঐ সময়টা অবশ্য বিশ্বের অধিকাংশ দেশ রাশিয়ার সমাজতন্ত্রের গন্জিকা সেবন করে মুক থুবরে ঝিমুচ্ছিলো! ঐ সময়টাও অবশ্য এর জন্য দায়ী ছিলো। যারা দলকানা তারা এবং এখনও যারা বর্তমানে ১৯৭৫ সালের মতোই শেখ হাসিনাকে সব বিষয়ের বিশেষজ্ঞ বানিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি থেকে বহু কিলো দূরে রাখছেন আমার লেখা পড়লে তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে পারেন।

 

১৯৭৫ সাল থেকে শুরু করে শেখ হাসিনার ১৯৮১ সালের ৩০ মে আওয়ামীলীগের সভাপতি হিসেবে দেশে ফিরে না আসা পর্যন্ত অনেক দুর্দিন দু:সময় অতিবাহিত করতে হয়েছে। শেখ হাসিনা আসার পর তাঁর দল পরিচালনায় ক্রমশ: অভিজ্ঞতা এবং তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা দলকে শক্তিশালী করেছে। সকল বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশ ফেইস করে মাঝখানে ভাঙ্গনের পরেও ১৯৯৬ সালে দলকে ক্ষমতায় আনায়ন করতে সমর্থ্য হোন। ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৯৬ এমনকি ১৯৯৬ সালের শেখ হাসিনার পুরো সময়টায় সরকার পরিচালনা পর্যন্ত আওয়ামীলীগের টাইম লাইনে গৌরব জনক ভূমিকা ছিলো। দল এবং দেশের মানুষের চাহিদার সাথে সামন্জস্যতা ছিলো।

 

আওয়ামীলীগ আবার কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থায় ফিরে গেছে ২০০৮ সালে ক্ষমতার শেষ দিকে শুরু করে এখনও অধিক মাত্রায় চলছে। গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে তারা কদাচিৎ দু’একটা কথা বলে লজ্জায় লালাভ রং ধারন করেন। এখন শ্লোগান শুধু একটাই। আর তা’ হচ্ছে উন্নয়ন। উন্নয়নে কতো টাকা বাজেট-বরাদ্দ এবং কতো টাকা ব্যয়িত হচ্ছে আর কতো টাকা দূর্নীতিবাজরা পকেটস্থ করছে তার কোনো জবাবদিহিতা নেই। জনগনের সম্পৃক্তি বা তাদের ম্যান্ডেটের তোয়াক্কা করছেনা। কারন তাদের ভোটের প্রয়োজন হচ্ছেনা। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হতে পারে বলেও বিশ্বাস করছেনা।

 

দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা বলে বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখাইতো দুর্নীতিকে আইনগত ভিত্তি দেয়া। কর যারা দেয়না তারা তাদের আয়ের সূত্র প্রকাশ করেনা; অর্থাৎ ক্রিমিনাল ওফেন্স করছে। তাদের এই আয় আইন বহির্ভূত। তারা চাঁদাবাজি করে, চাকুরী দিতে ঘুষ নিয়ে, দরপত্র অনুযায়ী কাজ না করে, মাদক ব্যবসায় করে নানা অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন করেছে। তাদেরকে ছাড় দিয়ে দুর্নীতির প্রতি বা মাদক ব্যবসায়ীদের প্রতি জিরো টলারেন্স কিভাবে কার্যকর করবেন? অর্থাৎ আওয়ামীলীগ ৭০ বছরের সময়কালে সময় রেখা থেকে পুরোপুরি বিচ্যুত রয়েছে। আওয়ামীলীগ নগ্নভাবে প্রশাসনকে সরকারের নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যবহার করায় তারা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। সর্বত্র অযোগ্য এবং স্তাবকদের দৌরাত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

 

ঘুষ না দিয়ে বর্তমান সময়ে অর্থাৎ এই সরকারের আমলে চাকুরী পাওয়া একটি অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার এ বিষয়গুলো ওপেন সেক্রেট। এখন আওয়ামীলীগের এই সমালোচনা কোনো বিরোধী পক্ষ করছেনা। দলের লোকজন সবচাইতে বেশী করছে। টাকার খেলায় দলের সবাই যেহেতু সুযোগ পাচ্ছেনা সেহেতু তারা এখন ফুঁসে উঠছে। সুযোগ পেলেই বিদ্রোহী প্রার্থীকে ভোট দিচ্ছে। যেখানেই প্রশাসন নিরপেক্ষ থাকছে সেখানেই নির্বাচনে আওয়ামীলীগ হারছে। অবশ্য এসব বিশ্লষনের সময় কর্তাব্যক্তিদের নাই।

 

বড় উন্নয়ন বাজেট দিয়ে বড় বড় দুর্নীতি হচ্ছে। আইন একেক জনের ক্ষেত্রে একেকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আইনের ওপর , আদালতের ওপর মানুষের বিশ্বাস নেই। মানুষ ক্ষমতাসীনদের ভয়ে মুখ খুলছেনা। একটা গুমোট অবস্থা। ব্যাংক থেকে সরকার লোন নিয়ে স্ফীত বাজেট দিচ্ছে তা-ও এখন সাধারন শ্রমিকও বুঝতে পারে। আওয়ামীলীগ প্রতিষ্ঠার ৭০ বছর অতিবাহিত হওয়ার সময়টায় আওয়ামীলীগ যেহেতু ক্ষমতায় সেহেতু অনেকের বিবেচনায় আওয়ামীলীগের স্বর্ণ যুগ মনে হতে পারে; কিন্তু আমার বিবেচনায় আওয়ামীলীগ তার ট্রাকে নেই। ট্রাকে ফিরে আসা জরুরী। গনতন্ত্রবিহীন পরিবেশ একটি বদ্ধ পরিবেশ। এতে উন্নয়ন হয়না। কারন, দেশে সুশাসনও নেই যে সিঙ্গাপুরের মতো উন্নয়ন হবে। দেশকে এবং দেশের মানুষকে দীর্ঘ সময় আবদ্ধ রাখা যায়না। সময় থাকতে দেশে একটি সুষ্ঠু, স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরী করুন। আপনাদের জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে।

 

 

 

 

 

প্রতিষ্ঠা

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশেমের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের একাংশের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার টিকাটুলীর কেএম দাস লেন রোডের রোজ গার্ডেন প্যালেসে 'পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ' প্রতিষ্ঠিত হয়, যার সভাপতি ছিলেন টাঙ্গাইলের মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং সাধারণ সম্পাদক টাঙ্গাইলের শামসুল হক। পরবর্তীকালে, ১৯৫৫ সালে মওলানা ভাসানীর উদ্যোগে ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগঠনটির নাম থেকে পরে 'মুসলিম' শব্দটি বাদ দেওয়া হয়; নাম রাখা হয়: 'পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ'।[৩]

আওয়ামী লীগের জন্মসূত্রের সঙ্গে ঢাকা ১৫০ নম্বর মোগলটুলিস্থ পূর্ববঙ্গ কর্মী শিবিরের উদ্যোগের সম্পর্ক অনস্বীকার্য। ২৩ জুনের সম্মেলনের আয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন শওকত আলী। তার উদ্যোগে ১৫০ নং মোগলটুলিস্থ শওকত আলীর বাসভবন এবং কর্মী শিবির অফিসকে ঘিরে বেশ কয়েক মাসের প্রস্তুতিমূলক তৎপরতার পর ২৩ জুনের কর্মী সম্মেলনে দলের ঘোষণা দেয়া হয়। শওকত আলীর অনুরোধে কলকাতা থেকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী একটি মামলা পরিচালনার কাজে ঢাকায় এলে তিনি শওকত আলীকে মুসলিম লীগ ছেড়ে ভিন্ন একটি রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার পরামর্শ দেন। শওকত আলী এ পরামর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে পূর্ববঙ্গ কর্মী শিবিরের নেতৃবৃন্দকে নতুন সংগঠন গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করেন। এসময় কর্মী শিবিরের প্রধান নেতা ছিলেন শামসুল হক। কামরুদ্দীন আহমদ, মো. তোয়াহা, অলি আহাদ, তাজউদ্দীন আহমদ, আতাউর রহমান খান, আবদুল আউয়াল, মুহম্মদ আলমাস, শামসুজ্জোহা প্রমুখ প্রথম দিকে এবং পরবর্তীতে শেখ মুজিবুর রহমান কর্মী শিবির কেন্দ্রিক রাজনৈতিক কর্মতৎপরতায় বিশেষভাবে যুক্ত ছিলেন। মুসলিম লীগের আবুল হাশিম-সোহরাওয়ার্দী গ্রুপ নেতৃবৃন্দ মুসলিম লীগের অন্যায় কাজগুলোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার লক্ষ্যেই এখানে কর্মী শিবির গড়ে তুলেছিলেন। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৪৯ সালে আসামের ধুবড়ী জেলখানা থেকে ছাড়া পেয়ে ঢাকা এলে তার সঙ্গে শওকত আলীর আলোচনা হয়। শওকত আলী মওলানাকে পূর্ববঙ্গ কর্মী শিবিরকেন্দ্রিক রাজনৈতিক তৎপরতার কথা জানান। এসময় মওলানা ভাসানী আলী আমজাদ খানের বাসায় অবস্থান করছিলেন। শওকত আলীর সঙ্গে তার প্রাথমিক আলোচনা সেখানেই হয়। এই আলোচনার সূত্র ধরে নতুন দল গঠনের জন্য একটি সাংগঠনিক কমিটি গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন শওকত আলী। সেজন্যে ১৫০ নম্বর মোগলটুলিতে একটি বৈঠকের আয়োজন করা হয়। মওলানা ভাসানী সেই বৈঠকে যোগদান করেন। এসময় খোন্দকার আবদুল হামিদের সঙ্গে পরামর্শ করে শওকত আলীর উদ্যোগে ও প্রচেষ্টায় মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি, ইয়ার মুহম্মদ খানকে সম্পাদক এবং খন্দকার মুশতাক আহমদকে দপ্তর সম্পাদক করে অন্যদেরসহ একটি সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হয়।[৪]

উপরোক্ত সাংগঠনিক কমিটি ১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন রোজ গার্ডেনে নতুন দল গঠনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে এক সম্মেলন আহ্বান করে। রোজ গার্ডেনে ২৩ জুনের বিকেল ৩টায় সম্মেলন শুরু হয়। সম্মেলনে উপস্থিত নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন শামসুল হক, শওকত আলী, আনোয়ারা খাতুন, ফজলুল কাদের চৌধুরী, আবদুল জব্বার খদ্দর, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, আতাউর রহমান খান, মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, আলী আমজাদ খান, শামসুদ্দীন আহমদ (কুষ্টিয়া), ইয়ার মুহম্মদ খান, মওলানা শামসুল হক, মওলানা এয়াকুব শরীফ, আবদুর রশিদ প্রমুখ।[৪]

প্রতিষ্ঠাকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি হন টাঙ্গাইলের মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, সহ-সভাপতি হন আতাউর রহমান খান, শাখাওয়াত হোসেন ও আলী আহমদ। টাঙ্গাইলের শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক। শেখ মুজিবুর রহমান, খন্দকার মোশতাক আহমদ ও এ কে রফিকুল হোসেনকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কোষাধ্যক্ষ হন ইয়ার মোহাম্মদ খান। এসময় শেখ মুজিব কারাগারে অন্তরীণ ছিলেন। অন্যদিকে, পুরো পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সংগঠনটির নাম রাখা হয় নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। এর সভাপতি হন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

২৪ জুন বিকেলে নবগঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগ মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে ঢাকার আরমানিটোলা ময়দানে প্রকাশ্যে জনসভা করে। সভায় আনুমানিক প্রায় চার হাজার লোক উপস্থিত হয়।

১৯৫২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। পরের বছর ঢাকার 'মুকুল' প্রেক্ষাগৃহে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সম্মেলনে তাকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত ১৩ বছর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন শেখ মুজিব। উল্লেখ্য যে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ ছিলো তৎকালীন পাকিস্তানে প্রথম বিরোধী দল।

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দলটি প্রাদেশিক স্বায়ত্ত্বশাসনের ওপর বিশেষ গুরুত্বসহ ৪২ দফা কর্মসূচি গ্রহণ করে। শুরুর দিকে দলটির প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে ছিল রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলার স্বীকৃতি, এক ব্যাক্তির এক ভোট, গণতন্ত্র, সংবিধান প্রণয়ন, সংসদীয় পদ্ধতির সরকার, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং তৎকালীন পাকিস্তানের দু'অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য দূরীকরণ।

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য অন্যান্য দলকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করতে আওয়ামী মুসলিম লীগ মুখ্য ভূমিকা পালন করে। ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর দলটি কৃষক শ্রমিক পার্টি, পাকিস্তান গণতন্ত্রী দল ও পাকিস্তান খেলাফত পার্টির সঙ্গে মিলে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে।

১৯৫৪ সালের মার্চের আট থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি আসন পায়। এরমধ্যে ১৪৩টি পেয়েছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ।

২৪ বছরের পাকিস্তান শাসনামলে আওয়ামী মুসলিম লীগ আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে দু'বছর প্রদেশে ক্ষমতাসীন ছিল এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে কেন্দ্রে ১৩ মাস কোয়ালিশন সরকারের অংশীদার ছিল।

১৯৫৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত দলের তৃতীয় সম্মেলনে দলের নাম থেকে 'মুসলিম' শব্দটি বাদ দেওয়া হয়; নতুন নাম রাখা হয়: 'পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ'।

পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে মতপার্থক্যের কারণে ১৯৫৭ সালে দল ভাঙন দেখা দেয়। ওই বছরের ৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি কাগমারি সম্মেলনে দলে বিভক্তির ঘটনা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় মাওলানা ভাসানী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন।[৫]

 

 সরকার গঠন

আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট-সরকার গঠন করে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে জয়লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকদের স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব ও শোষণের ফলস্বরূপ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ সংগ্রাম করে ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করে। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৩০টি আসন লাভ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে।

 ছয় দফা আন্দোলন

ছয় দফা আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ১৯৬৬ সালে পাঁচ ও ছয়ই ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর এক সম্মেলনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ছয় দফা দাবি পেশ করেন। ছয় দফা দাবির মূল উদ্দেশ্য- পাকিস্তান হবে একটি Federal বা যৌথরাষ্ট্র এবং ছয় দফা কর্মসূচীর ভিত্তিতে এই Federation বা যৌথরাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গরাজ্যকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। ছয় দফার সমর্থনে সর্ব প্রথম চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী লালদিঘীর পাড়ে চট্টগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ট সহচর তৎকালীন বৃহত্তর চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের প্রতিষ্টাতা সাধারণ সম্পাদক এক দফার প্রবক্তা চট্টল শার্দূল জননেতা এম এ আজিজের নেত্রীত্বে প্রথম প্রকাশ্যে সভা করেন বঙ্গবন্ধু। সেই সভায় এম এ আজিজ ঘোষনা করেন যে ছয় দফা না মানলে এক দফার আন্দোলন চলবে, সেটা হচ্ছে স্বাধীনতার আন্দোলন।পরবর্তীতে এই ৬ দফা দাবিকে কেন্দ্র করে স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন জোরদার করা হয়।

ছয় দফা দাবি-এর দাবিগুলো নিম্নরূপ:

* প্রথম দফা : সরকারের বৈশিষ্ট হবে Federal বা যৌথরাষ্ট্রীয় ও সংসদীয় পদ্ধতির; তাতে যৌথরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলো থেকে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক সভার নির্বাচন হবে প্রত্যক্ষ এবং সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে। কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক সভার প্রতিনিধি নির্বাচন জনসংখ্যারভিত্তিতে হবে।

* দ্বিতীয় দফা : কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব থাকবে কেবল প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক বিষয় এবং তৃতীয় দফায় ব্যবস্থিত শর্তসাপেক্ষ বিষয়।

* তৃতীয় দফা : পুর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য দুটি পৃথক মুদ্রা-ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যা পারস্পরিকভাবে কিংবা অবাধে উভয় অঞ্চলে বিনিময় করা চলবে। অথবা এর বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে একটি মুদ্রা-ব্যবস্থা চালু থাকতে পারে এই শর্তে যে, একটি কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যার অধীনে দুই অঞ্চলে দুটি রিজার্ভ ব্যাংক থাকবে। তাতে এমন বিধান থাকতে হবে যেন এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে সম্পদ হস্তান্তর কিংবা মূলধন পাচার হতে না পারে।

* চতুর্থ দফা : রাজস্ব ধার্য ও আদায়ের ক্ষমতা থাকবে অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে। প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক বিষয়ের ব্যয় নির্বাহের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রয়োজনীয় রাজস্বের যোগান দেয়া হবে। সংবিধানে নির্দেশিত বিধানের বলে রাজস্বের এই নির্ধারিত অংশ স্বাভাবিকভাবেই কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে জমা হয়ে যাবে। এহেন সাংবিধানিক বিধানে এমন নিশ্চয়তা থাকবে যে, কেন্দ্রীয় সরকারের রাজস্বের প্রয়োজন মেটানোর ব্যাপারটি এমন একটি লক্ষ্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে যেন রাজস্বনীতির উপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নিশ্চিতভাবে অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে থাকে।

* পঞ্চম দফা : যৌথরাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গরাজ্য যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে, সেই অঙ্গরাজ্যের সরকার যাতে স্বীয় নিয়ণ্ত্রনাধীনে তার পৃথক হিসাব রাখতে পারে, সংবিধানে সেরূপ বিধান থাকতে হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হবে, সংবিধান নির্দেশিত বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত অনুপাতের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যগুলো থেকে তা আদায় করা হবে। সংবিধান নির্দেশিত বিধানানুযায়ী দেশের বৈদেশিক নীতির কাঠামোর মধ্যে, যার দায়িত্ব থাকবে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে, বৈদেশিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক সাহায্য সম্পর্কে চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা আঞ্চলিক বা প্রাদেশিক সরকারগুলোর হাতে থাকবে।

* ষষ্ঠ দফা : ফলপ্রসূভাবে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার কাজে সাহায্যের জন্য অঙ্গরাজ্যগুলোকে মিলিশিয়া বা আধা-সামরিক বাহিনী গঠনের ক্ষমতা দিতে হবে।

 ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাংলাদেশের রাজনীতিক সংগ্রামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান। এক দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা আইয়ুব খান সরকারের পতন ঘটে এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। এই সময়ে শেখ মুজিব এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগসহ আরো কিছু ছাত্র সংগঠন এক সাথে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে তাদের ঐতিহাসিক এগারো দফা কর্মসূচী পেশ করেন যা মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে হিসেবে সহায়তা করে।

 একাত্তরের স্বাধীনতা আন্দোলন

গণআন্দোলন ও আইয়ুবের পতনের পটভূমিতে '৭০ এর নির্বাচনে কেন্দ্রীয় আইনসভায় (জাতীয় পরিষদ) পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ব পাকিস্তান থেকে ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭ আসন দখল করে আওয়ামী লীগ ৩১৩ আসন-বিশিষ্ট পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে এবং সরকার গঠনে ও শাসনতন্ত্র প্রণয়নের যোগ্যতা অর্জন করে। প্রাদেশিক পরিষদের আসনের মধ্যে ২৮৮ আসন পায় দলটি। জাতীয় পরিষদের সাতটি মহিলা আসন এবং প্রাদেশিক পরিষদের দশটি মহিলা আসনের সবগুলোতেই জয়ী হয় আওয়ামী লীগ।[৬]

সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনে আমন্ত্রণ জানানোর পরিবর্তে সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে বাঙালির অধিকার নস্যাৎ করার পথ বেছে নেয়।

 বাকশাল গঠন

১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারী এদেশের রাজনীতির ইতিহাসে রচিত হয়েছিল এক নতুন অধ্যায়ের। ওইদিন সংসদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান পেশকৃত চতুর্থ সংশোধনী বিল পাস হয়। এর মাধ্যমে দেশের সব রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে একদলীয় শাসন তথা বাকশাল গঠনের পথ উন্মুক্ত করা হয়। একইসঙ্গে এ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা চালু করা হয়। বিল পাসের সঙ্গে সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতিতে পরিণত হন। এক নজিরবিহীন ন্যূনতম সময়ের মধ্যে (মাত্র ১১ মিনিট) চতুর্থ সংশোধনী বিলটি সংসদে গৃহীত হয় এবং তা আইনে পরিণত হয়। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিলটি নিয়ে সংসদে কোনো আলোচনা বা বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়নি। এই বিলের মাধ্যমে প্রশাসন ব্যবস্থায় এক নজিরবিহীন পরিবর্তন সাধন করে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান দেশের নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণাধিকারী হন। আওয়ামী লীগ প্রধান হিসেবে তিনি।এ পদক্ষেপকে তিনি তার ‘দ্বিতীয় বিপ্লবে’র সূচনা হিসেবে উল্লেখ করেন।[৭]

 স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন

১৯৮৭ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংগঠিত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ করে। এই আন্দোলন চলাকালে ১০ই নভেম্বর পুলিশের গুলিতে যুবলীগ কর্মী নূর হোসেন নিহত হন।

 জোট গঠন

১৯৯৮ সালে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের দ্বি-দলীয় মেরুকরণের বাইরে বাম শক্তিকে একতাবদ্ধ করে একসঙ্গে আন্দোলন, নির্বাচন ও সরকার গঠন করার উদ্দেশে এগারোটি দল মিলে গঠন করে একটি রাজনৈতিক জোট। যা ১১ দলীয় জোট নামেই পরিচিত হয়।

২০০৪ সালে ২৩ দফা দাবিতে ১১ দলীয় জোটের সাথে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ-মশাল), ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ-কুঁড়েঘর) এই তিনটি দল মিলে গঠিত হয় ১৪ দলীয় জোট।

পরবর্তীতে, ৪টি দল ১৪ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে যায়। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল,বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মাহবুব) ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) - এই ৪টি দল ১৪ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে যায়। তবে, বাসদের একাংশ ১৪ দলীয় জোটে থেকে যায়। ফলে, ১৪ দলীয় জোটে দলের সংখ্যা হয় ১১টি।

অল্প কিছুদিন পরে, গণফোরাম বাংলাদেশ ১৪ দলীয় জোট ত্যাগ করলে দলের সংখ্যা হয় ১০টি।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে জাতীয় পার্টি (জেপি) ও তরিকত ফেডারেশন ১৪ দলীয় জোটে অন্তর্ভুক্ত হলে দলের সংখ্যা হয় ১২টি।

কিছুদিন আগে, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ (মশাল) দুই ভাগে বিভক্ত হয়। দুই ভাগই ১৪ দলীয় জোটে আছে বিধায় ১৪ দলীয় জোটের বর্তমান সদস্য সংখ্যা ১৩টি দল।[৮][৯]

 ৯ম জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগ

২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ এ অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পর ৬ জানুয়ারি ২০০৯-এ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দ্বিতীয়বারের মত শপথ নেন শেখ হাসিনা। ২ জানুয়ারি ২০০৯ নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা গেজেট আকারে প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। ৩ জানুয়ারি ২০০৯ স্পিকার ব্যারিস্টার জমিরুদ্দিন সরকার সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদের ৩য় তফসিলের ৫ বিধি অনুযায়ী আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ও স্বতন্ত্র ২৫৮ জন সংসদ সদস্যের শপথ বাক্য পাঠ করান। প্রথম দিনে শপথ গ্রহণকারীদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ২২৭ জন, জাতীয় পার্টির ২৫ জন, জাসদের ৩ জন, ওয়ার্কার্স পার্টির ২ জন ও স্বতন্ত্র ১ জন সংসদ সদস্য ছিলেন। শপথ গ্রহণের আগে মহাজোট নেত্রী শেখ হাসিনা গোপালগঞ্জ-৩ আসন রেখে বাকি দুটি আসন (রংপুর-৬ ও বাগেরহাট-১) ছেড়ে দেন। ৪ জানুয়ারি ২০০৯ আওয়ামী লীগের একজন, এলডিপি’র একজন ও স্বতন্ত্র তিনজনসহ মোট পাঁচজন সংসদ সদস্য শপথ গ্রহণ করেন।

শপথ গ্রহণের পরপরই আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের সভায় নেতা হিসেবে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। দলের প্রবীণ নেতা জিল্লুর রহমানকে উপনেতা নির্বাচন করা হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সংসদীয় নেতা হওয়ায় শেখ হাসিনাই সংসদ নেতা। নবম জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নির্বাচিত হন অষ্টম সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ।

 

 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT