Main Menu

বিএনপি, ঐক্যফ্রন্ট ও জিরো থিওরি

রাষ্ট্রব্যবস্থায় সাধারণ থেকে শুরু করে সব শ্রেণীর মানুষের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলে রাজনীতি। ফলে কেউ রাজনীতির আওতার বাইরে থাকতে পারেন না। কোনো-না-কোনোভাবে রাজনীতির নিয়মে থাকতে হয়। এখনকার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র রাজনৈতিক দল ছাড়া পরিচালনা করা সম্ভব নয়। কোনো আদর্শ ঘিরে একদল লোক এ দল গড়ে তোলেন। উদ্দেশ্য থাকে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে তারা ওই আদর্শে রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন।

সমকালীন বিশ্বের যেসব দেশে গণতন্ত্র চর্চার ন্যূনতম সুযোগ রয়েছে; ওইসব দেশে কোনো একক দলের পক্ষে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রবণতা কমে এসেছে। এ কারণে ছোট-বড় দল মিলে জোট গঠন করে নির্বাচনে অংশ নিয়ে কাক্সিক্ষত বিজয় পাওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ প্রবণতা বাংলাদেশ, ভারত ও মালয়েশিয়াসহ বহু দেশে লক্ষ করা যায়। এ ক্ষেত্রে সমনীতিতে বিশ্বাসী ছোট দলগুলো বড় দলের নেতৃত্ব মেনে ঐক্য বা জোট গড়ে তোলে। এই জোট কখনো দীর্ঘ সময় ধরে জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম করে থাকে; কখনো শুধু নির্বাচনকালীন হতে দেখা যায়।

আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী দেশ ভারতের রাজনীতিতে কংগ্রেস ও বিজেপির সাথে যারা জোট গড়েন, তাদের ওই দুই দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে মেনেই জোটে শরিক হতে হয়। সর্বস্তরে থাকে এ দুই দলের নেতৃত্ব। একইভাবে বাংলাদেশে বিএনপি আর আওয়ামী লীগের সাথে কোনো দল জোট করতে চাইলে দল দু’টির শীর্ষ নেতৃত্বকে মেনেই ঐক্যে বা জোটে শরিক হতে হয়। এর ব্যতিক্রম আমরা দেখলাম, ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি, গণফোরাম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), নাগরিক ঐক্য, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম দলের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে। এ ফ্রন্টে ২০ দলীয় ঐক্যজোটের বিএনপি ব্যতীত অন্যরা আসেনি। কোনো জোট বা ঐক্য গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোকে সমমনা হতে হয়; কিন্তু ঐক্যফ্রন্টের কয়েকটি দল বিএনপির আদর্শের সাথে একমত নয়। তাদের নেতারা সবাই আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বে ছিলেন। এখনো তারা মনে-প্রাণে ওই ঘরানারই রয়ে গেছেন। ঐক্যফ্রন্টের প্রধান হলেন আওয়ামী লীগের সাবেক বড় নেতা ড. কামাল হোসেন। বাংলাদেশের রাজনীতি বহুদিন ধরে যারা পর্যবেক্ষণ করে আসছেন তারা মনে করছেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্ব ছেড়ে দেয়া বিএনপির জন্য বড় রাজনৈতিক ভুল।

বাংলাদেশে বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক দল। প্রতিষ্ঠার পর দলটি চারবার রাষ্ট্রক্ষমতায় এবং দুইবার সংসদে বিরোধী দল ছিল। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় আওয়ামী লীগ ‘ভোটারবিহীন’ নির্বাচনে ক্ষমতায় আবার এসে বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর অত্যাচারের স্টিমরোলার চালায়। জেল-জুলুম, গুম, হত্যা, নির্যাতন, গায়েবি মামলা দিয়ে অসংখ্য নেতাকর্মীকে ঘরছাড়া করে। রাজপথে বিএনপির নেতাকর্মীরা দাঁড়াতেই পারেননি। এ পরিস্থিতিতে সরকারের প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন, বর্তমানে কারাগারে বন্দী বিএনপি প্রধান বেগম খালেদা জিয়া। অন্য দিকে, লন্ডনে চিকিৎসাধীন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানও সরকারের মনোভাবের কারণেই দেশে আসতে পারছেন না। সাংগঠনিকভাবে অনেকটা অগোছালো, বিএনপি ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেখ হাসিনার অধীনে অংশগ্রহণ করবে না বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু পরে বিএনপির অনেক নেতা ড. কামালের নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও পুলিশ বাহিনীর সমন্বয়ে ব্যাপক নির্যাতনের মাধ্যমে বিএনপিকে নির্বাচনের মাঠে নামতে দেয়া হয়নি। ৩০ তারিখের ভোট ২৯ তারিখ রাতেই শেষ হয়ে যায় বহুস্থানে। নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি মাত্র আটটি আসন পেয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকার গত ১০ বছরে বিএনপির ওপর এত নির্যাতন, হামলা-মামলা চালালেও এই দলের খুব কম নেতাকর্মী দলত্যাগ করেছেন বা শঙ্কিতও হয়েছেন। সাংগঠনিক দুর্বলতায় সংগঠিত হতে পারেননি, এতটুকুই। কিন্তু তাদের মনোবল ভেঙে দেয়া যায়নি। অর্থাৎ কর্মী-সমর্থকের দিক দিয়ে বিএনপির অবস্থান শক্তিশালী। সংগঠনকে শক্তিশালী না করে জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির অংশ নেয়া কতটুকু যৌক্তিক ছিল; তা এখন পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

বিগত নির্বাচন ঘিরে বিএনপি যাদের নিয়ে ঐক্যফ্রন্ট গঠন করেছে; ওইসব দলের কর্মী-সমর্থক মিলিয়ে বিএনপির কোনো একটি অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠনের সাথেও তুলনীয় নয়। ফ্রন্টের মূল শক্তি হচ্ছে বিএনপি। মরহুম হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বলেছিলেন, শূন্যের সাথে শূন্য যোগ করলে যোগফল শূন্যই হয়। আবার এর সাথে ১০০ যোগ করলে মান ১০০ হয়। তেমনি বলা যায়, ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্ব যদি বিএনপির হাতে থাকত এবং বাকিরা বিএনপির নেতৃত্বে পরিচালিত হতেন, তাহলে একটি বিরাট শক্তি অর্জিত হতো। অনেকের মতে, বিএনপি যখন শূন্যের নেতৃত্ব মেনে নিয়েছে, তখন বিএনপিও ‘শূন্য’ হয়ে গেছে। এর খেসারত দলটির নেতাকর্মীদের দিতে হচ্ছে। একই সাথে দল হিসেবে বিএনপির অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে।

আত্মসমালোচনা ব্যক্তি, সংগঠন বা দলকে ভুল থেকে বের করে আনতে পারে। বিএনপি সাংগঠনিকভাবে হতে হলে অবশ্যই দলের মধ্যে আত্মসমালোচনার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। ঐক্যফ্রন্টে যোগদান বিএনপির জন্য কতটা যৌক্তিক ছিল, তা আত্মসমালোচনার মাধ্যমেই উপলব্ধি করতে হবে। ঐক্যের বিকল্প নেই এটি যেমন সত্য, ঠিক তেমনি বাস্তবতা হচ্ছে- জিয়া পরিবারের বাইরের কেউ বিএনপির নেতৃত্ব দিলে দলটি অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়ার আশঙ্কা বেশি। সুতরাং বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য জোরালো আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারলে বর্তমান সরকার এর সুবিধা নিয়ে দল হিসেবে বিএনপির অস্তিত্বে আঘাত হানবে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে, যা সামাল দেয়া বিএনপির জন্য দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়াতে পারে। বেগম জিয়ার অনুপস্থিতিতে বিএনপির এই দুঃসময় অতিক্রম করতে হলে তারেক রহমানকেও নির্দিষ্ট বলয়ের বাইরে বেরিয়ে দক্ষতার সাথে নেতৃত্ব দিতে হবে।

যেকোনো বড় দলের মূল শক্তি হচ্ছে এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন। বিএনপির বেশির ভাগ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনকে কয়েকজন ব্যক্তি দিয়ে বছরের পর বছর চালানো হচ্ছে। এতে নতুন নেতৃত্বের সৃষ্টি হচ্ছে না, আবার যোগ্য নেতৃত্ব দীর্ঘ দিন পদবঞ্চিত হয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে। বিএনপিকে নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করার জন্য যত দ্রুত সম্ভব এ সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে হবে।

আওয়ামী লীগ একটি ক্ষেত্রে বেশ সফল, যা বিএনপি হতে পারেনি। দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব যাই বলুন না কেন, তার নেতাকর্মীরা সেটাকে প্রতিষ্ঠার জন্য উঠেপড়ে লেগে যান। কেউ তাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার সাহস পায় না। তবে এ ক্ষেত্রে বিএনপির মধ্যে সমন্বয়ের অভাব তীব্রতর। তাদের মান-অভিমান প্রকাশ্য রূপ নেয়। দীর্ঘ দিন ক্ষমতার বাইরে থাকায় এবং রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকার নেতাকর্মীদের মনোবল ভেঙে পড়া অস্বাভাবিক নয়। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে অবশ্যই বর্তমান নেতৃত্বকে বাস্তবতার আলোকে গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে।


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT