Main Menu

জরুরী নির্গমন পথ

রাশেদুল ইসলাম: ৩১ মার্চ, ২০১৯ । আলো ঝলমল টোকিও । নারিতা আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে আমি । গন্তব্য দক্ষিন কোরিয়ার  ইঞ্চিয়ন । আড়াই ঘণ্টার বিমানযাত্রা । উজ্জ্বল আকাশে বিমানযাত্রা বেশ মজার । জানালা দিয়ে মেঘের বিচিত্র রুপ , আর লুকোচুরি খেলা দেখা যায় ।  আমার ভালো লাগে । এই কথাটিই কাউনটারের সুন্দরী মেয়েটিকে বলি আমি । বলি জানালার ধারে একটা ভালো আসন দিতে । মেয়েটি মুচকি হাসি দেয় । সামনে থাকা কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে ঝুকে পড়ে সে  । জানায় জানালার ধারে একটাই আসন আছে । তবে তা জরুরী নির্গমন পথের পাশে । শর্ত সাপেক্ষে আসনটি আমাকে দেয়া যেতে পারে ।

আমি দেশে-বিদেশে বহুবার বিমানে  চড়েছি । এ রকম শর্তযুক্ত কোন আসন বিমানে  আছে - আমার জানা ছিল না । আমি শর্তগুলো জানতে চাই । মেয়েটি জানায়  আসনটি জরুরী নির্গমন পথের পাশে । তাই এই আসনে যিনি বসেন, তাকে বিশেষ  দায়িত্ব পালন করতে হয় । যদি বিমান কোন দুর্ঘটনায় পড়ে তাহলে তাকে কেবিন ক্রূর নির্দেশ মেনে  চলতে হয় । আমার পিঠের শিরদাঁড়া হিম হতে থাকে । বিমান দুর্ঘটনা মানে কি ? ৪০ হাজার ফুট উঁচুতে উড়ে  চলা বিমানে দেখেছি বাইরের তাপমাত্রা মাইনাস ৫২ লেখা । এই উচ্চতায় যদি বিমান দুর্ঘটনায় পড়ে ? আর এ অবস্থায় বিমানবালা যদি আমাকে জরুরী নির্গমন দরজা খুলে যাত্রী নামাতে বলেন -তখন কি হবে ?   শূন্য ডিগ্রী তাপমাত্রায় পানি জমে বরফ হয়; তাহলে মাইনাস ৫২ ডিগ্রী তাপমাত্রায় একটা মানুষের দেহ কি হবে ? প্যারাসুট গায়ে জড়িয়ে বাইরে লাফ দেয়া মাত্রই তাকে বরফের মমি হয়ে নিচে পড়তে হবে । আমার  চিন্তার গতি বেড়ে যায় । কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে এসব চিন্তা করি আমি । তারপর আমার চিন্তার ধারা বদলে যায় । বিমান দুর্ঘটনা হলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা শতকরা এক ভাগেরও কম । এ ধরণের মৃত্যুর আগে যদি মানুষের  কোন উপকার করার সুযোগ পাওয়া যায়, তাহলে ক্ষতি কি? এই চিন্তা মাথায় আসতেই আসনটি নিতে রাজি হই আমি । বিমানে উঠে আসনে বসার সাথে সাথেই বিমানবালা আমার কাছে আসেন । এই আসনে বসার শর্ত আমার জানা আছে কিনা- তিনি জানতে চান । আমি চাইলে  আমার আসন পরিবর্তন করে দেয়া হবে বলে তিনি জানান । এ আসনে বসার শর্ত আমার জানা আছে –কথাটি আমি জানাই তাঁকে ।

যিনি জন্মেছেন; তিনি মারা যাবেন – এটাই নিয়ম । এটাই দুনিয়ার  শাশ্বত সত্য । কিন্তু, এই সহজ সরল সত্যকে আমরা মেনে নিতে পারিনে ।  এই না মানার কারণেই যত সমস্যা । এ বিষয়ে মহাভারতে একটা সুন্দর কাহিনী আছে । তবে ছেলেবেলায় পড়া । বর্ণনায় ভুল হতে পারে । তখন পঞ্চপাণ্ডব বনে বনে ঘুরছেন । ক্ষুধাতৃষ্ণায় কাতর  তাঁরা । সেই বনের মধ্যে বিশাল এক দিঘি । যুধিষ্টির ছোট ভাইদের পানি আনতে পাঠান সেখানে । একে একে নকুল, সহদেব, ভীম, অর্জুন সকলেই যান । কিন্তু, পানি আনতে ব্যর্থ হন । কারণ, দিঘির মাঝখানে বড়  এক বক বসা । দিঘির রক্ষক সেই বক । একটাই শর্ত তার । যে তার ৩ টি প্রশ্নের সঠিক জবাব দেবে - কেবল সে-ই দিঘির পানি নিতে পারবে । পঞ্চপাণ্ডবের ৪ জন তার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি । ফলে,  পানি দেওয়া হয়নি তাঁদের । শেষে ধর্মপুত্র যুধিষ্টির পানি আনতে যান । বকের একটি প্রশ্ন ছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী অবাক করা বিষয় কোনটি ? যুধিষ্টির বলেন, মানুষ মরণশীল । কোন মানুষের সামনে এমন কোন উদাহরণ নেই যে, সুদীর্ঘ কাল থেকে কেউ  একজন বেঁচে আছেন । অথচ, যিনি মারা যাচ্ছেন- এক মুহূর্ত পরে যিনি মারা যাবেন; তিনিও বিশ্বাস করেন না যে, তিনি মারা যাবেন । এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে অবাক করা বিষয় ।

সমাজে বাবা মায়েরা সন্তানের  আগে মারা যান, এটাই ধারণা করা হয় । কিন্তু, এই বাবা মারা যখন তাঁদের মৃত্যু নিয়ে  কথা বলতে চান; তখন মুখের উপর হাত রেখে আমরা তাঁদের কথা বলা থামিয়ে দিই । তারমানে  আমরা মনে করি মৃত্যুর কথা না বললেই, আমাদের বাবা মারা বেঁচে থাকবেন । কিন্তু, বাস্তবে তা হয় না । ঠিকই  বাবা মা এক সময় মারা যান । কিন্তু মৃত্যুর আগে মৃত্যু বিষয়ে কোন কথা বলার সুযোগ পান না তাঁরা । ফলে, মৃত্যুর পর ধর্মমতে কোথায় তাঁদের দাফন বা সৎকার করা হবে;   তা নিয়ে অনেক সময় জটিলতার সৃষ্টি হয় । শুধু বাবা মা’ র দাফন বা সৎকার করাই শেষ কথা নয়; তাঁদের জন্ম বা মৃত্যুদিন পালন করা হবে কিনা; হলেও কিভাবে হবে; বা তাঁদের  বিষয়ে আর কিছু করার আছে কিনা- অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা জানা হয় না ।

আমরা প্রত্যেকেই  এই চলমান পৃথিবীর জরুরী নির্গমন পথের  পাশের আসনে বসা । কারণে অকারণে এ আসন থেকে  হটাৎ ছিটকে পড়া সময়ের ব্যাপার মাত্র । যে কোন সময় এই জরুরী  নির্গমন পথ দিয়ে সীমাহীন শূন্যে মিলিয়ে যেতে পারি আমি । আমরা ।  কিন্তু, আমাদের এই আকস্মিক বিদায়ের স্বরূপ কেমন হওয়া উচিত ? কবি বলেছেন,

‘প্রথম  যেদিন তুমি এসেছিলে ভবে,

কেঁদেছিলে একা  তুমি হেসেছিল সবে ।  

এমন জীবন তুমি করিবে গঠন,  

মরণে  হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন’ ।

কবির বর্ণনার সাথে মিলে যায় এমন দুটি তাজা  প্রাণ ঝরে গেল অতি সম্প্রতি । দেশের সব শ্রেণির মানুষকে চোখের জলে ভাসিয়ে  বিদায় নিয়েছেন তাঁরা । একজন বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিসের অকুতোভয় সৈনিক সোহেল রানা । অন্যজন  সোনাগাজীর মেয়ে রাফি। নুসরাত জাহান রাফি ।


 

C:\\Users\\DELL\\Desktop\\57174944_805302886493985_73178082285977600_n.jpg C:\\Users\\DELL\\Desktop\\57216725_2374315379281720_4981239920996646912_n.jpg

                     নুসরাত জাহান রাফি                                                 সোহেল রানা


 

গত ২৮ মার্চ, ২০১৯  বনানীর একটা বহুতল ভবনে  ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে । সেই আগুনে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করতে গিয়ে ফায়ারম্যান সোহেল রানা অগ্নিদগ্ধ হন । সিঙ্গাপুরে চিকিৎসারত অবস্থায় এই অকুতোভয় সৈনিকের মৃত্যু ঘটে । এখানে উল্লেখ্য,  কোথাও অগ্নিকাণ্ড হলে সেই আগুন নেভানো এবং আক্রান্ত জানমাল উদ্ধার করা ফায়ারম্যান সোহেল রানার রুটিন দায়িত্ব । সেই রুটিন দায়িত্ব যথাযথ পালন করতে গিয়েই তাঁকে জীবন দিতে হয়েছে । দার্শনিক প্লেটোর মতে নিজের দায়িত্ব যথাযথ পালন করার নাম দেশপ্রেম । এখানে নিজের দায়িত্ব ঠিকমত পালনের মাধ্যমে সোহেল রানার দেশপ্রেমের প্রকাশ যেমন ঘটেছে; পাশাপাশি তাঁর এই আত্মত্যাগ তাঁকে জাতীয় বীরের মর্যাদায় ভূষিত করেছে । এক্ষেত্রে  মুদ্রার অপর দিকটাও বিবেচনা করা দরকার । সেই বহুতল ভবন নির্মাণের সাথে যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন, ভবন নির্মাণের সময় তাঁরা তাঁদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেননি । সে সময় সংশ্লিষ্ট সকলের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা হলে, বর্তমানে এই অকুতোভয় যুবকের এমন করুণ মৃত্যু হত না ।

নুসরাত জাহান রাফির কাহিনী আরও  করুণ । নিজের কলেজের অধ্যক্ষ দ্বারা রাফি  শ্রীলতাহানীর শিকার হন । বিষয়টি তিনি তাঁর বাবা মাকে জানালে তাঁরা সংশ্লিষ্ট অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা রজু করেন । এই মামলা প্রত্যাহারের জন্য রাফি এবং তাঁর পরিবারের উপর চাপ দেয়া হয় । অকুতোভয় রাফি তাঁদের প্রস্তাবে রাজী না   হলে প্রকাশ্য দিবালোকে তাঁর গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয় । ১১ এপ্রিল, ২০১৯ তারিখ রাতে অগ্নিদগ্ধ রাফি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে মৃত্যুবরণ করেন । এই অসম সাহসী মেয়েটি সমাজের অনেক কদর্য মানুষের মুখোশ খুলে দিয়েছে।  মেয়েটি মানুষের সুপ্ত বিবেককে জাগিয়ে দিয়ে, সকলকে চোখের জলে ভাসিয়ে বিদায় নিয়েছে । তবে, এই ঘটনায় মুদ্রার অপর পিঠও বিবেচনার দাবী রাখে । রাফি ও রাফির পরিবার সংশ্লিষ্ট অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে শ্রীলতাহানীর অভিযোগ এনে এবং এ বিষয়ে কোন আপোষ প্রস্তাবে রাজী না হয়ে তাঁদের নাগরিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন । কিন্তু, স্থানীয় প্রশাসন ও  সমাজপতিগনসহ সংশ্লিষ্ট সকলে তাঁদের দায়িত্ব ঠিকমত পালন করেননি । তাঁরা সংশ্লিষ্ট সকলে যদি নিজ নিজ ধর্মীয়, সামাজিক বা পেশাগত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতেন; তাহলে অসীম সম্ভবনাময় ফুটফুটে সুন্দর এই মেয়েটির এমন করুণ মৃত্যু হত না ।

সোহেল রানা এবং নুসরাত জাহান  রাফির সাহসী ও অর্থপূর্ণ মৃত্যু দেশের  সকল শ্রেণির মানুষকে নাড়া দিয়েছে । মানুষের  সুপ্ত বিবেককে জাগ্রত করেছে এই দুটি মৃত্যু । এমন  সুসন্তানের বাবা মা’ দের প্রতি আমি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি ।  মহান আল্লাহ্‌ তাঁদের এই অপূরণীয় ক্ষতির শোক সহ্য করার তৌফিক দিন এবং  ছেলেমেয়ে দুটির বেহেশত নসিব করুন ।

আমরা আমাদের  বিবেকবোধকে জাগ্রত রেখে  নিজনিজ দায়িত্ব পালন করব – যাতে এ ধরণের করুণ মৃত্যু আর না ঘটে । এটাই  প্রত্যাশা ।


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT