Main Menu

মোদি, রাহুল, না মমতা?

ভারতের লোকসভা নির্বাচন চলছে। সাত ধাপে এ ভোটগ্রহণ চলবে ১৯ মে পর্যন্ত। ভারত যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা অনুসরণ করে, যেখানে কেন্দ্র ও রাজ্যগুলোতে আলাদা আলাদা আইনসভা রয়েছে। লোকসভায় রয়েছে ৫৪৩টি আসন।

২৯টি রাজ্য ও ৭টি কেন্দ্রীয় অঞ্চলের ৫৪৩টি আসনে সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে দেশের জনগণ এ ৫৪৩টি আসনের জন্য প্র্রতিনিধি নির্বাচন করেন। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর নির্বাচন হয়। রাজ্যসভার সদস্যসংখ্যা ২৪৫। এবার লোকসভার নির্বাচনের সঙ্গে একযোগে অনুষ্ঠিত হচ্ছে অন্ধ্রপ্রদেশ, অরুণাচল প্রদেশ, ওড়িশা ও সিকিম রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন। সরকার গঠন করতে কোনো দল বা জোটের কমপক্ষে ২৭২টি আসন প্রয়োজন হয়।

এবারের নির্বাচন চলবে ৩৯ দিন ধরে। ভোট গণনার দিন ২৩ মে। উৎসব ও আনন্দমুখর পরিবেশে পুরো ভারত সেজেছে। শুধু ভারতীয়রাই নয়, সারা পৃথিবীর চোখ সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের নির্বাচনের দিকে। কে হতে চলেছেন দেশটির ১৭তম প্রধানমন্ত্রী? তা নিয়ে তৈরি হয়েছে সীমাহীন জল্পনা-কল্পনা আর অসংখ্য প্রশ্ন। ক্ষমতাসীন দল বিজেপি ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠার পর ১৯৮৪ সালে মাত্র দুটি লোকসভা আসনে নির্বাচিত হয়েছিল। সেই দলটি ২০১৪ সালের নির্বাচনে যে ভূমিধস বিজয় পায়, তা রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। ওইসময় দলটি নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ২৮২টি আসনে জয়লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। বিগত ৩০ বছরের মধ্যে যেটি ছিল এককভাবে কোনো দলের সর্বোচ্চ অর্জন। যদিও বর্তমান নির্বাচনে ওই ফলাফলের পুনরাবৃত্তি করা সম্ভব কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট প্র্রশ্ন উঠেছে।

ভারত স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই কংগ্রেস সর্বাধিকবার ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণকারী দল। সেই ১৯৫১ সাল থেকে জওহরলাল নেহেরুর হাত ধরেই প্রথম সরকার গঠন করে কংগ্রেস। এরপর ১৯৯০ সাল পর্যন্ত প্রায় প্রতিবারই দলটি নির্বাচিত হয়েছে। মাঝে কয়েক বছরের বিরতির পর ১৯৯৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত যুক্তভাবে সরকার গঠন করে। ফেডারেল গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থায় ভারতীয় সংসদে সরকার গঠনের জন্য ২৭২টি আসনের প্রয়োজন পড়ে এবং সে ক্ষেত্রে প্রায় সময়ই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সম্ভব হয় না। ২৭২-এর ওই ম্যাজিক ফিগার অর্জন করতে অনেক সময় ছোট ছোট প্রাদেশিক দলগুলো গভীর প্রভাব বিস্তার করে। উল্লেখযোগ্যভাবে বেশিরভাগ সময় এটা দেখা যায়, প্রাদেশিক দলগুলোর সমর্থনের ওপরই কেন্দ্রীয় সরকার গঠন অনেকাংশে নির্ভর করে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, মমতা ব্যানার্জির পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস, মায়াবতীর উত্তরপ্রদেশের বহুজন সমাজবাদী পার্টি, শারদ পাওয়ারের অন্ধ্রপ্রদেশের ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টি, চন্দ্র শেখর রাওয়ের তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতি, তামিলনাড়ুর প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতার দল এআইএডিএমকে এছাড়াও সিপিএম এবং সিপিআই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ভারতীয় লোকসভার উচ্চপদে আসীন হওয়ার ক্ষেত্রে প্রাদেশিক দলগুলো ইতিমধ্যেই তাদের অংশীদারিত্বের গুরুত্ব ভালোভাবে বুঝিয়েছে। এবারের নির্বাচনেও দলগুলো হয়ে উঠেছে মুখ্য নিয়ামক। বিজেপির রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে অসঙ্গতি থাকার কারণে প্রাদেশিক দলগুলো প্রায় ক্ষেত্রেই বিজেপির বিরুদ্ধাচরণ করেছে। এবার সেই মাত্রা অনেক বেড়ে গিয়েছে। এমনটাই দাঁড়িয়েছে যে, এখন ভোট হচ্ছে বিজেপি এবং অন্যসব ভারতীয় দলের মধ্যে। এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি।

১৯ জানুয়ারির কলকাতা ও পরে দিল্লির ব্রিগেড সমাবেশে ২৩টি বিরোধী দল মোদির বিরুদ্ধে সর্বভারতীয় বিরোধীদলীয় শিবির গঠন করেছে; একক ছাতার নিচে এসে ক্ষমতাসীন দল বিজেপিকে তারা এ বার্তাই দিয়েছে যে, এবার বিজেপির জন্য ক্ষমতায় যাওয়া খুব একটা সহজ হবে না। তেজস্বী যাদব, শত্রুঘ্ন সিনহা, এইচডি দেবগৌড়া ,শারদ পাওয়ার, চন্দ্রবাবু নাইডু, অখিলেশ যাদব, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, শেরকুমারস্বামী সতীশ মিশ্র, এমকে স্ট্যালিন, ফারুক আবদুল্লা, শরদ যাদবকে, অভিষেক সিঙ্ঘভি, অরুণ শৌরি, লালডু হোমা, যশবন্ত সিনহার মতো বাঘাবাঘা রাজনীতিক একত্রিত হয়েছেন বিজেপির শাসনের ইতি টানতে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিজেপি সরকারের বিগত পাঁচ বছরের দুর্নীতি, রাফাল বিমান কেলেঙ্কারি, বেকারত্ব, কৃষকের আত্মহত্যা, নাগরিকত্ব আইন নিয়ে জনমনের তীব্র ক্ষোভ। এর সঙ্গে অ্যান্টি-ইনকামম্বেন্সি ফ্যাক্টর বারবার ক্ষমতাসীন দলগুলোকে ক্ষমতাহীনতার স্বাদ দিয়েছে। যেমন- কিছুদিন আগে পাঁচটি রাজ্যের বিধান সভার নির্বচনে সবক’টিতেই বিজেপির ভরাডুবি হয়েছে; যেখানে তিনটি রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় ছিল ।

বিজেপি টানা দ্বিতীয়বারের মতো নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার উদ্দেশ্যে প্রচারণা চালালেও তাদের কড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে ফেলবে প্রাদেশিক আঞ্চলিক দলগুলো এমনটাই দাবি বিশ্লেষকদের।

নানা কারণে এ নির্বাচনকে ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে তাৎপর্যবহ নির্বাচন বলে অভিহিত করেছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, আসন্ন নির্বাচনে ভারতের সমাজ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হতে যাচ্ছে। পর্যবেক্ষকদের অনেকে এ নির্বাচনকে কয়েক দশকের মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।

অনেক দিক দিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ এবারের নির্বাচনটিকে বিশেষভাবে দেখা হচ্ছে ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির গ্রহণযোগ্যতা যাচাইয়ের নির্বাচন হিসেবে। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে যোগ দেয়া ভগ্নদশা থেকে পুনরুজ্জীবিত করতে সাহায্য করবে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসকে। অন্যদিকে বিজেপির তুরুপের তাস নরেন্দ্র মোদিই; যিনি দাবি করেন, ভারতের নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে এক যোগ্য নেতার দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

তবে সমালোচকরা মনে করেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান তৈরির যে আশ্বাস তিনি দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়িত হয়নি। মোদির নেতৃত্বে ভারতে ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্যবাদ এবং মেরুকরণের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলেও মনে করেন সমালোচকরা। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোদির নেতৃত্বে বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিতে কিছুটা ভাটা পড়েছে। বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশের আশপাশে থাকলেও দেশটির অন্যতম প্রধান সমস্যা বেকারত্ব। কর্মসংস্থান সংক্রান্ত নেতিবাচক পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হচ্ছে না- এমন অভিযোগ রয়েছে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে। এমনকি সম্প্রতি ফাঁস হওয়া এক সরকারি নথিতে দেখা যায়, ১৯৭০-এর দশকের পর বর্তমানে ভারতে কর্মসংস্থানের অভাব তূলনামূলকভাবে সবচেয়ে প্রকট। কৃষি খাত থেকে আয়ও অনেকটাই স্থিতিশীল পর্যায়ে পৌঁছেছে। কৃষিপণ্যের মাত্রাতিরিক্ত সরবরাহের কারণে পণ্যের দাম কমে যাওয়ায় কৃষকের ওপর ঋণের বোঝা বেড়েছে।

প্রত্যাশিতভাবেই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে দুই প্রধান দলই গ্রামের দরিদ্র শ্রেণীর চাহিদাকে প্রাধান্য দিয়েছে। ভারতের কৃষকের জীবন মানোন্নয়নে বিপুল পরিমাণ কল্যাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিজেপি; আর কংগ্রেসের প্রতিশ্রুতি দেশের দরিদ্র ৫ কোটি পরিবারের জন্য ন্যূনতম আয় নিশ্চিত করার প্রকল্প বাস্তবায়ন।

ফেব্রুয়ারিতে ভারতশাসিত কাশ্মীরে পাকিস্তানভিত্তিক একটি জঙ্গি সংগঠনের আত্মঘাতী আক্রমণে অন্তত ৪৯ ভারতীয় প্যারা মিলিটারি পুলিশ মারা যাওয়ার পর জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টিও নির্বাচনের অন্যতম প্রধান একটি ইস্যু হিসেবে প্রাধান্য পাচ্ছে। ওই ঘটনার পর পাকিস্তানে বিমান হামলা করে ভারত। তারপর থেকেই ক্ষমতাসীন বিজেপির নির্বাচনী প্রচারণায় জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি অন্যতম প্রধান ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে।

অন্যতম বৃহৎ দল কংগ্রেস এবারও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার ক্ষেত্রে হালে পানি পাবে না সেটাই জরিপে উঠে এসেছে। তবে অন্য দলগুলোর সঙ্গে কংগ্রেসের অন্তর্ভুক্তি বিজেপির জন্য কঠিন পরীক্ষা হবে বলে বিশ্লেষকদের মতামত। পশ্চিমবঙ্গের ধারাবাহিক সাফল্য ও নেতৃত্বের মাধুর্যতে মমতা ব্যানার্জি হয়ে উঠেছেন ভারতীয় রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম একজন আইকন।

যদি হিসাবের অঙ্ক ঠিক থাকে তাহলে হতে পারে মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে সর্বভারতীয় বিরোধী শিবির ক্ষমতার মসনদে আরোহণ করবে। আর যদি তাই হয়, তাহলে হতে পারে ভারতীয়রা পাবে স্বাধীন ভারতের প্রথম বাঙালি প্রধানমন্ত্রী। সব সম্ভাবনার উত্তর মিলবে ২৩ মে-এর ফলাফল ঘোষণার মধ্য দিয়ে। বিশ্ববাসীর মতো সুসম্পর্কের মেলবন্ধনে আবদ্ধ আমরা বাংলাদেশিরাও আশায় আছি ভারতীয় নতুন প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে।

মেহেদী হাসান : সহকারী অধ্যাপক, হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT