Main Menu

অপরিকল্পিত নগরায়নে অগ্নিকান্ডসহ নানান দূর্যোগে অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি

মোঃ শফিকুল আলম: অপরিকল্পিত নগরায়ন, অগ্নিকান্ডসহ নানান দূর্যোগে অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি, আইন প্রয়োগের অনুপস্থিতি বা ক্ষমতাসীনদের প্রয়োজনে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে আইনের অপপ্রয়োগ

ঢাকার চকবাজারে অগ্নিকান্ডে পুরো বাংলাদেশ কেঁপে উঠলো। স্বজন হারানোর ব্যথা মুছতেনা মুছতেই বনানীর এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকান্ড অগনিত মানুষের মৃত্যুর মিছিলে শামিল হওয়া, কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি ভস্ম হয়ে যাওয়া ইত্যাদি অনেকটা নিয়মিত হয়ে যাচ্ছে। আবার অগ্নিকান্ড গুলশান কাঁচাবাজারে।

 

বনানী এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকান্ডের পর জানা গেলো ভবনটিতে অগ্নি নির্বাপনের কোনো ব্যবস্থা ছিলোনা। শুধুমাত্র অগ্নিকান্ডের সময় যে সিঁড়ি ব্যবহার করে মানুষ বেড়িয়ে যায় তা’ ফায়ার স্টেয়ার্স হিসিবে চিহ্নিত। অন্য স্বাভাবিক সময়ে এই সিঁড়ি ব্যবহার করা আইনত দন্ডনীয় (বাংলাদেশে এই আইন আছে কি-না জানা নেই)। উন্নত দেশে ফায়ার স্টেয়ার্সে কমপক্ষে দু’ঘন্টা অবস্থান করা যাবে। আগুন লাগার সাথে সাথে ফায়ার স্টেয়ার্সে এয়ার কম্প্রেশন মেসিন অটোমেটিক চালু হবে এবং ধোঁয়া শোষন করে নিবে।

 

শুধু তাই নয় প্রত্যেকটি কমার্শিয়াল বা এ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং-এ স্মোক এ্যালার্ম, ফায়ার এ্যালার্ম, ফায়ার ডিটেকটর, ফায়ার হাইড্রান্ট, ফায়ার এক্সটিংগুইসার থাকা আইনত: বাধ্যতামূলক। প্রত্যেকটি অফিসের ভেতরে ধুমপান নিষিদ্ধ। কারন স্মোক এ্যালার্ম রয়েছে। ধুমপানের জন্য ডেজিগনেটেড এরিয়া রয়েছে যেখানে স্মোক এ্যালার্ম নেই। বড় যেকোনো বিল্ডিং-এ বা ছোটো হলেও প্রত্যেকটি হাসপাতালে কম্পার্টমেন্ট রয়েছে। অর্থাৎ ফায়ার হওয়ার সাথে সাথেই যেমন ফায়ার এ্যালার্ম বাজবে একই সাথে প্রত্যেকটি কম্পার্টমেন্টের ফায়ার ডোরগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। ফায়ার ডোর বিশেষভাবে তৈরী। ফায়ার ডোর আগুনকে নির্দিষ্ট কম্পার্টমেন্টে কমপক্ষে দু’ঘন্টা কন্টেইন্ড রাখতে সক্ষম। এর বহু পূর্বেই নির্দিষ্ট যায়গায় ফায়ার সার্ভিস পৌঁছে যেতে পারে। একটি বিল্ডিং-এ আগুন লাগার সাথে সাথে যেমন ফায়ার এ্যালার্ম বেঁজে ওঠে তেমনি সিগনাল চলে যায় ফায়ার সার্ভিসের কাছে। ফায়ার সার্ভিসকে খবর দিতে হয়না। অটোমেটিক খবর পেয়ে যায়। শুধু তাই নয় কোন্ জায়গায় ফায়ার হয়েছে সে সিগনালও পৌঁছে যায়।

 

প্রত্যেকটি অফিসের পিয়ন থেকে শুরু করে চীফ এক্সিকিউটিভ পর্যন্ত সবার জন্য ফায়ার ট্রেনিং প্রতি বছরের জন্য (থিওরিটিকাল এবং প্রাকটিকাল) বাধ্যতামূলক। এতে করে বাস্তবে ফায়ার হলে পরে প্রত্যেকে জেনে যায় তখন তাদের করনীয়। প্রত্যেকটি কর্মচারী জানে কিভাবে কখন বেড়িয়ে গিয়ে এ্যাসেম্লিং পয়েন্টে জড়ো হতে হবে। প্রত্যেকে জানে যদি নিরাপদ হয় তবে কিভাবে প্রাথমিক পর্যায়ে ফায়ার হাইড্রান্ট বা এক্সটিংগুইসার ব্যবহার করে আগুন নেভাতে হয়। অর্থাৎ ফায়ার সার্ভিস না পৌঁছানো পর্যন্ত প্রত্যেকে প্রত্যেকের করনীয় সম্পর্কে অবগত। এই ট্রেনিং প্রতি বছর রিনিউ করাও বাধ্যতামূলক।

 

প্রত্যেকটি বিল্ডিং-এ কেন্দ্রীয়ভাবে একটি ফায়ার প্যানেল থাকে। এই প্যানেলে দেখা যায় বিল্ডিং এর কোন্ জোনে আগুন লেগেছে। ফায়ার ডিটেক্টর বলে দিচ্ছে কোন্ যায়গায় আগুন লেগেছে। একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান আইনানুযায়ী যখন আগুন লাগবে তখন ফায়ার প্যানেলে চলে যাবেন এবং সেখানে সাউন্ড সিস্টেম রয়েছে যা’ ব্যবহার করে তিনি চীফ ওয়ার্ডেন হিসেবে ডিরেকশন দিবেন এবং সবাই তার নির্দেশনা শুনে কাজ করবে। চীফ ওয়ার্ডেন ঐ সময়ে একটি সাদা হ্যাট পরিধান করবেন যাতে সবাই তাকে চিনতে পারে এবং অনুসরন করতে পারে। এ সবই আইনের অনুসরন।

 

পর পর অগ্নিকান্ডগুলো ঘটে যাওয়ার পর টিভি টকশো’র আলোচনা থেকে জানা গেলো বাংলাদেশেও বিল্ডিং কোড্ রয়েছে। কোড্ অনুযায়ী প্রত্যেকটি বিল্ডিং-এ এই সকল ফায়ার ইকুইপমেন্ট থাকার আইনী বাধ্যবাধকতা ছিলো কিন্তু মানা হয়নি। আইন মেনে সংশ্লিষ্ট এফ আর টাওয়ারে কোনো ফায়ার স্টেয়ার্স ছিলোনা। নবোনির্বাচিত (বিনা ভোটে) মেয়র হম্বি-তম্বি করে বললেন এসমস্ত আইন না মানলে সিটি কর্পোরেশন কোনো ট্রেড লাইসেন্স দিবেনা। কিন্তু আজকে জানা গেলো সিটি কর্পোরেশনের গুলশানস্থ কাঁচা বাজারে অগ্নিকান্ড হয়েছে এবং সেখানে কোনো ফায়ার ফাইটিং ইকুইপমেন্ট নেই। এমনকি ২০১৭ সালে একই বাজারে অগ্নিকান্ডের পর এসব নিয়ে বেশ আলোচনা হয়েছে। এখন মেয়র সাহেব কি বলবেন? কার বিরুদ্ধে কঠোর থেকে কঠোরতর ব্যবস্থা তিনি নিবেন? তার সাথে অবশ্য পুলিশ কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া যিনি সরকারের হয়ে বিরোধী দল দমনে যতটা মিথ্যা মামলা দিয়ে কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন বা রেখে চলছেন ততটাই সাধারন মানুষকে আইনী সহায়তা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনিও হম্বি-তম্বি করলেন। ২৭ টি মামলা থাকার পরও যখন একটি বাস অবাধে রাস্তায় চলাচল করে সম্ভাবনাময় যুবককে হত্যা করে তারপরও তার হম্বি-তম্বি করতে লজ্জা হয়না।

 

আমার ধারনা ঢাকা শহরের ৯৫% বিল্ডিং আইন মেনে তৈরী হয়নি এবং অনুরূপ ফায়ার ফাইটিং এর ব্যবস্থা নেই। তা’হলে আইনের প্রয়োগ কোথায়? সরকারের সকল উন্নয়ন যেকোনো সময় এই ধরনের মনুষ্য তৈরী দূর্যোগে ভেস্তে যেতে পারে। যে উন্নয়নের বড়াই করে দেশ থেকে গনতান্ত্রিক ধারাকে এই সরকার নির্বাসনে পাঠাচ্ছে সেই কল্পিত উন্নয়শীল এবং উন্নত দেশ হওয়ার স্বপ্ন নিমিষেই উবে যেতে পারে। সুশাসন এবং গনতন্ত্র ছাড়া যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরী হয় বিভিন্ন সেক্টরে চলোমান অব্যবস্থাপনা তার প্রকৃষ্ট উদাহরন।

 

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু একটি জাতীয় সরকার গঠন না করে দলীয় সরকার গঠন করলেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনকারী অপরাপর ছোটো ছোটো রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদেরকে অপাংক্তেও ভাবতে শুরু করলো। নবোগঠিত সরকারের বিরুদ্ধে ভেতর থেকেই বিরোধীতা শুরু হলো। সমস্যার খোলামেলা সমাধান না করে বঙ্গবন্ধু বন্দনাকারী চাটুকররা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার কথা বলে জাতীয় সরকার গঠনের পরামর্শ না দিয়ে সব দল বন্ধ করে দিয়ে সবাইকে একদল বাকশালে আসতে বাধ্য করা হলো এবং সেটাকেই তারা জাতীয় ঐক্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার অপপ্রয়াসে লিপ্ত হলো। সকল পত্রিকা বন্ধ করে দিয়ে মূলত: সেদিন বঙ্গবন্ধুকে অন্ধ করে দেয়া হয়েছিলো। যে যেভাবেই বাকশালকে মহিমান্বিত করার চেষ্টা করুননা কেনো এটি যেকোনো ঐতিহাসিক বিচারে গনতন্ত্র হত্যার শামিল ছিলো।

 

আওয়ামীলীগ অনেকটা সেই পুরনো খেলায় মেতে উঠেছে। গনতন্ত্র নির্বাসনে পাঠাচ্ছে। নির্বাচন পদ্ধতি আজ ধ্বংসন্মোখ। বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে স্থানীয় সরকারের নির্বাচনটি ওপেন করে দিয়ে ফ্রি এন্ড ফেয়ার করে নির্বাচন ব্যবস্থায় একটি আমেজ ফিরিয়ে আনতে পারতো। সে সুযোগটিও নষ্ট করলো। রাজনীতির এই বন্ধাত্বের মধ্যে হঠাৎ করে প্রধানমন্ত্রী নিজেই বাকশালের মহিমা প্রচার করতে গিয়ে জনগনকে নতুন করে একদলীয় গনতন্ত্রহীন ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার ইঙ্গিত দিলেন? বাকশাল হচ্ছে একটি অর্থনৈতিক কর্মসূচীর নাম। প্রধানমন্ত্রী কি সকল ব্যক্তিমালিকাধীন শিল্প, কারখানা সরকারীকরন করবেন? ইহা কি সম্ভব? পৃথিবী থেকে যখন সমাজতন্ত্রের সেই অলীক কল্পনা বিলুপ্ত প্রায় তখন এই বিতর্কিত পদ্ধতির পূনরোল্লেখ করার কোনো যুক্তিসংগত কারন নেই। তিনি বলার সাথে সাথে অবশ্য চামচারাও বলতে শুরু করেছে। 

 

যে প্রশাসন ব্যবহার করে ক্ষমতার সোপান নিশ্চিত হয় সেই প্রশাসন দিয়ে অন্তত: সরকারের কোনো আইন কার্যকর করা সম্ভব হয়না। তার প্রকৃষ্ট উদাহরন বিল্ডিং কোড্ না মেনে শত শত কমার্শিয়াল বিল্ডিং তৈরী করে মৃত্যুকূপ তৈরী করা হচ্ছে। প্রতিদিন মানুষ মরছে। সড়ক আইন বাস্তবায়ন হয়না। পরিকল্পনাহীন ফ্লাইওভার তৈরী হচ্ছে যা’ যানজট নিরসন নয় যানজট তৈরী করছে। উন্নয়নের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা যাচ্ছেনা। প্রয়োজনীয় খাতে বরাদ্দ না দিয়ে বড় বড় প্রকল্প গ্রহন করে বড় বড় দুর্নীতির সুযোগ তৈরী করা হচ্ছে। দুর্নীতি দমনের নামে শুধুই বাগাড়ম্বর। হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি করে এখনও সংসদ সদস্য রয়েছেন। বিচার হচ্ছেনা। তার থেকেও কম অপরাধে বিরোধীদের শাস্তি হচ্ছে। আইনের প্রয়োগ হচ্ছে সিলেকটিভলি। মানুষ পক্ষান্তরে আইনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হচ্ছে।

 

সরকারের চামচা রয়েছে। গঠনমূলক সমালোচক নেই। আহা বেশ বেশ গোষ্ঠী তৈরী হয়েছে। সাংবাদিক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবি, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ইত্যাদি থেকে শুরু করে সবাই কারনে অকারনে প্রধানমন্ত্রীর বন্দনা করছেন। প্রধানমন্ত্রীর চোখ অন্ধ করে দিচ্ছেন। সঠিক তথ্য সরবরাহ না করে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব খুঁজতে সবাই ব্যস্ত। ইতোমধ্যে বিরোধী দল বিএনপি’র মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। ১৯৭৫ সালেও সেই অর্থে কোনো বিরোধী দল ছিলোনা। ষড়যন্ত্র অবশ্যই ছিলো। তবে বাইরে থেকে নয়। ষড়যন্ত্র হয়েছিলো ভেতর থেকে। এখনও তাই হচ্ছে। যেভাবে বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরী হচ্ছে তাতে অপরাধীচক্র সরকারী ছত্রছায়ায় এমন এমন দূর্যোগ সৃষ্টি করতে পারে যে তা’ সামাল দেয়া অনেক সময় সম্ভব নাও হতে পারে।

 

এখনও সময় আছে। বর্তমান সরকারের পাঁচ বছরের মেয়াদ মাত্র শুরু হলো। বিরোধী পক্ষের সরকারকে নড়নোর কোনো শক্তি নেই। অন্তত: সিঙ্গাপুর স্টাইলে উন্নয়ন নিশ্চিত করতে আইনের কঠিন প্রয়োগ বজায় রাখুন। সুশাসন প্রতিষ্ঠা করুন। অপরাধীকে দলীয় বিবেচনায় নয় অপরাধী হিসেবে সমাজ বিরোধী, উন্নয়ন বিরোধী মনে করুন। অপরাধ বিবেচনায় বিচারে সোপর্দ করুন। প্রত্যেকটি অগ্নিকান্ডসহ, ব্যাংক লুটেরাদের এবং বড় বড় অপরাধের তদন্তে স্থায়ীভাবে বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করুন। অপরাধীদেরকে কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তি নিশ্চিত করুন। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনভাবে চলতে দিন। জনগন শান্তি চায়। জনগন রাজনীতির মারপ্যাচে যেতে চায়না। জনগনকে স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি দিন। জনগন আপনাদের আজীবন ক্ষমতায় রাখবে। রাতের বেলা প্রশাসনের সহায়তায় আপনাদের ভোটে জিততে হবেনা। রাজনীতিক হিসেবে জনগনের আস্থায় ফিরে আসুন।


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT