Main Menu

ঘৃনা তৈরী করা এবং প্রচার করা প্রচারকদের একটি ডাটাবেইস থাকা উচিত

মোঃ শফিকুল আলম: তাসমান সমুদ্রের দু’পাশে অবস্থিত অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড একে অপরকে ভাই বলে সম্বোধন করে। অধিবাসীরা একে অপরকে কাজিন বলে সম্বোধন করে। গত শুক্রবার মসজিদের ভেতর বর্নবাদের বিশ্বাস থেকে অনুপ্রাণিত চরম ডানপন্থী উগ্র মতবাদে দ্বীক্ষিত সন্ত্রাসীর গুলিতে ৫০ জন সাধারন মুসলমান ধর্মপ্রাণ মানুষের মৃত্যুর পর দু’দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অনেকটা হামাগুড়ি দিয়ে ভাবছে কিভাবে অভিযুক্ত ব্রেনটন ট্যারান্টের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা তাদের নিরাপত্তা নেটওয়ার্কের বাইরে থাকলো। তারা এখন ভাবছে চরম ডানপন্থী এই সন্ত্রাস বিপরীত ধর্মী ডানপন্থী সন্ত্রাসকে যে আহ্বান করেছে তা’ এখন পুরো বিশ্বকে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে কিভাবে মোকাবেলা করা যাবে।

 

অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম প্রদেশ নিউ সাউথ ওয়েলস্ যার রাজধানী হচ্ছে সিডনি। সিডনি মহানগরের সাবেক ডেপুটি পুলিশ কমিশনার নিক কালদাসের মতে চরম দক্ষিনপন্থী উগ্রবাদী সন্ত্রাসীদের রুখতে এখন প্রয়োজন সকলের একই জাহাজের একই ডেকে অবস্থান করে একজন ক্যাপটেইনের নেতৃত্বে সকল হাত একত্রীকরন করা। তিনি মনে করেন নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের নির্মম হত্যাকান্ড শুধুমাত্র একটি ঘটনায় শেষ হবেনা। এর সমান এবং বিপরীত প্রতিক্রিয়ার কথা না বললেও সম্ভাব্য ঘটনা রোধে ঘৃনা সৃষ্টিকরন এবং সৃষ্টিকারীদের রুখতে তাদের ডাটাবেইজ তৈরী করা এখন অত্যাবশক।

 

কালদাসের মতে অস্ট্রেলিয়ার কোনো নিরাপত্তা এজেন্সী যথাযথভাবে ঘৃনা তৈরী করা এবং প্রচারনার অপরাধ সংক্রান্ত কোনো পরিসংখ্যান তৈরী করছেনা বা সংরক্ষণ করছেনা। মি: কালদাস সিডনি মর্নিং হেরাল্ডের মতামত কলামে এধরনের মতামত ব্যক্ত করেন। তিনি আরো বলেন যে পুলিশ এধরনের অপরাধকে পৃথক করে এবং অন্যান্য অপরাধ থেকে বিযুক্ত না করে সাধারনিকরন করে থাকে। তাঁর মতে বহুজাতিক এই সমাজে পুলিশকে এই ধরনের অপরাধ অনুসরনে এবং নির্মূলে কমিউনিটির প্রত্যেকটি অভিযোগ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।

 

মি: কালদাস বলেন, “আমাদের মনে রাখতে হবে এবং বিশেষভাবে বুঝতে হবে ইহুদিদের ধর্মশালায় জার্মান নাৎসী শ্লোগান এবং মসজিদের দেয়ালে বর্নবাদী লিখন ইহুদি বা মুসলমান ধর্মানুসারীদের মনের গভীরে আঘাত করে এবং যদি এধরনের ঘটনা সাধারন মনে করে যদি অনুসরনে না রাখা হয় তা’হলে নিউজিল্যান্ডের মতো বিয়োগান্তক ঘটনা ঘটার জন্য কেউ প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ঘৃনা তৈরী এবং প্রচারের কাজ শুরু করবে।”

 

ভিক্টোরিয়া প্রদেশের চীফ পুলিশ কমিশনার গ্রাহাম এ্যাস্টন নিশ্চিত করেছেন যে ক্রাইস্টচার্চের শুক্রবারের হত্যাকাণ্ডের পর তাঁরা দক্ষিনপন্থী উগ্রবাদীদের ওপর নজরদারী রাখার পদক্ষেপ গ্রহন করেছেন।

 

অস্ট্রেলিয়ার বিকল্প প্রধানমন্ত্রী বা সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা বিল শর্টেন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা কালদাসের মতামতকে বর্তমান সময়ের জন্য বেশ অর্থবহ মনে করছেন। বিল শর্টেন আরো মনে করেন এধরনের একটি ডাটাবেইজ থাকলে বরং নতুন আইন প্রনয়নেরও প্রয়োজন হবেনা। শুধুমাত্র হেইট-ক্রাইমের সকল বিচারিক ক্ষেত্রে একটি সাধারন সজ্ঞা থাকলেই উগ্র ডানপন্থী সন্ত্রাসীদের রোখা সম্ভব হবে। হেইট-ক্রাইমের একটা সার্বজনিন সজ্ঞা থাকলে এই ধরনের অপরাধীরা আইনের ফাঁক গলে বিচারের বাইরে থাকতে পারবেনা বলে মি: শর্টেন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন।

 

প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন বলেন ক্রাইস্টচার্চের ভয়াবহ ঘটনা থেকে আমরা শিক্ষা পেয়েছি এবং সব সময়ই সব ঘটনা থেকে শিক্ষনীয় আছে। মরিসন আরো বলেন যে অস্ট্রেলিয়ানদের রক্ষার জন্য বিশেষজ্ঞদের উপদেশ অনুযায়ী সরকার সবকিছু করবে। 

 

কিন্তু ডিকিন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ক্রেগ বার্টনের মতে চরম ডান-উগ্রপন্থীদের সম্পর্কে সতর্কতা সত্বেও মনিটর করা সহজ নয়। তাঁর মতে এই মতাদর্শের দ্বারা অনুপ্রানিত হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যতগুলো আক্রমন হয়েছে সে সম্পর্কে পুলিশ এবং গোয়েন্দা সংস্থা সতর্ক থাকা সত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও ৫০ জনের হত্যাকাণ্ড ঠেকানো যায়নি। একইভাবে ট্যারান্টের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘনো ঘনো পরিবর্তন, বিদেশ ভ্রমন এবং তার মতাদর্শের পারষ্পরিক যোগাযোগের তথ্য অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের গোয়েন্দারা ট্রাক করতে হিমশিম খাচ্ছে।

 

অধ্যাপক বার্টনের মতে দক্ষিন পন্থী উগ্রবাদী সন্ত্রাসীদের মনিটর করা কঠিন এইজন্য যে তারা ইসলামিক স্টেট জঙ্গীগ্রুপ বা আলকায়েদার মতো কোনো একটি নির্দিষ্ট নেটওয়ার্কে থেকে কাজ করেনা। ইসলামিক স্টেট বা আলকায়েদার নেট ওয়ার্ক সকল আইন প্রয়োগ সংস্থার কাছে স্পষ্ট জানা রয়েছে কিন্তু এদের (দক্ষিনপন্থী উগ্রবাদী) নেটওয়ার্ক কোনো নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ নয়।

 

বার্টনের মতে এই উগ্র ডানপন্থী মতবাদ সাধারনত: ফেইসবুক বা ট্যুইটারে পোষ্ট দিয়ে প্রচার করা হয় এবং এরকম অসংখ্য উগ্র মতামত এই সামাজিক মাধ্যমে প্রতিদিনই প্রকাশিত হয়। সুতরাং অনেকটা জঙ্গলে যেমন অসংখ্য নেকড়ে থাকে এবং আক্রমনকারী নেকড়ে ট্রেস করা যতটা কঠিন একইভাবে এই উগ্রপন্থী মতবাদের মধ্যে কারা নৃশংস মানুষ হন্তারক হবে তা’ খুঁজে বের করাও তেমনই কঠিন।

 

ক্রাইস্টচার্চে আক্রমনকারী নৃশংস হন্তারক (ঘৃনিত নামটি উচ্চারন না করার জন্য নিউজিল্যান্ড প্রধানমন্ত্রী অনুরোধ করেছেন) নরওয়ের সেই একক নেকড়ে গন-হন্তারক কর্তৃক অনুপ্রাণিত হয়েছিলো এবং তার মতোই নিজেকে বিখ্যাত হিসেবে প্রচারিত করার লক্ষ্যেই এই হন্তারক গনহত্যায় উজ্জীবিত হয়েছে।

 

তবে নিউজিল্যান্ড প্রধানমন্ত্রী জ্যাসিন্ডার ভাষ্যানুযায়ী এই নৃশংস হত্যাকারী নিউজিল্যান্ড কিংবা অস্ট্রেলিয়ার সিকিউরিটি এজেন্সীগুলোর নজরদারীর পুরো বাইরে ছিলো।

 

নিউজিল্যান্ড প্রধানমন্ত্রী জ্যাসিন্ডা আরডার্ন এই গন-হন্তারকের নাম উচ্চারন করে তাকে বিখ্যাত করতে চাননা। কারন এই হন্তারক বিখ্যাত হওয়ার খায়েশে এই জঘন্য হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বরং যাঁরা নৃশংস হত্যার শিকার তাঁদের নাম বারে বারে উচ্চারন করতে চান। কারন হন্তারক একজন হন্তারক, সন্ত্রাসী এবং জঘন্য অপরাধী। পার্লামেন্টে তিনি তাঁর বক্তৃতায় এই হত্যাকারীকে আলোচনার সময় নাম উল্লেখ না করে হত্যাকারী বলতে অনুরোধ করেছেন।

 

শুক্রবারের হত্যাকাণ্ডের শিকার পরিবারের লোকজন নিউজিল্যান্ডবাসীদের আন্তরিক সহযোগিতায় আবেগ-আপ্লুত। কিন্তু মৃতদেহ পেতে বিলম্ব হওয়ায় অনেকটা ক্ষুব্ধ। প্রধানমন্ত্রী’র আবেগ-আপ্লুত ভাষন পরিবার পরিজনকে মানসিকভাবে শক্ত রেখেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “আমি চেষ্টা করেছি পরিবারের সদস্যগণের সাথে সরাসরি কথা বলতে। আমি জানি তাঁদের বেদনা আমরা সেভাবে অনুধাবন করতে পারবোনা। তবে বেদনার্ত পরিবারের সদস্যদের সাথে পাশাপাশি হাটতে পারবো। তাঁরা যতোদূর হাঁটবেন আমরা ততোদূর হাঁটবো। আপনাদের জন্য আমাদের সকল ভালোবাসা, বন্ধুত্ব এবং সহযোগিতা থাকবে।”

 

ক্রাইস্টচার্চের গনহত্যাকারী উগ্র ডানপন্থী সন্ত্রাসী আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতবাদে বিশ্বাসী এবং তাঁর কর্তৃক অনুপ্রাণিতও বটে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিজয়ের পর পরই মার্কিন মুলুকসহ পুরো বিশ্বে তাদের সংখ্যাধিক্য বেড়েছে। সুতরাং ক্রাইস্টচার্চের ঘটনাকে একক ঘটনা হিসেবে মূল্যায়ন করে কোনো কার্যকর সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবেনা; বরং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেখে দক্ষিনপন্থী মতবাদ প্রচারকদের একটি সেন্ট্রালাইজ্ড্ ডাটাবেইজ তৈরী করে সার্বক্ষণিক নজরদারীতে রাখার ব্যবস্থা প্রত্যেকটি দেশের নিরাপত্তা এজেন্সীগুলোর করতে হবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে সমন্বয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে।


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT