Main Menu

নর্থ কোরিয়ার নিউক্লিয়ার আক্রমন অত্যাসন্ন না হলেও অস্ট্রেলিয়ায় এই আক্রমনের সম্ভাবনা প্রকট

মোঃ শফিকুল আলম: নর্থ কোরিয়া ২০১৭ সালের এপ্রিলেই অস্ট্রেলিয়ায় নিউক্লিয়ার আক্রমনের চিত্র অংকন করেছে। অস্ট্রেলিয়ার নর্দান টেরিটোরির রাজধানি ডারউইন-এ এক কন্টিনজেন্ট মার্কিন মেরিন সৈন্যের ঘাঁটি রয়েছে। কিম জং-উন-এর টার্গেট অবশ্য ডারউইন। কোরিয়ান রেজিমের অফিসিয়াল দলীয় পত্রিকা ‘Rodong Sinmun’ বলেছে, “ যদি অস্ট্রেলিয়া ইউএসএ’র এক ব্রিগেড সৈন্যের মহরা ডারউইনে অব্যাহত রাখে তার অর্থ দাঁড়াবে অস্ট্রেলিয়া DPRK বা Democratic People’s Republic of Korea-কে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন রেখে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে আটকে রাখতে চায়।এটি হবে অস্ট্রেলিয়ার জন্য আত্মহত্যার সামিল। কারন অস্ট্রেলিয়া উত্তর কোরিয়ার নিউক্লিয়ার অস্ত্রের আঘাত রেন্জের মধ্যে অবস্থান করে।” ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে গত বছরের জুন এবং এ বছরের ফেব্রুয়ারীতে কিম জং-উন-এর দু’টি বৈঠক কি পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন আনায়ন করেছে?

 

ট্রাম্পকে দু’টি জিনিষের জন্য কৃতিত্ব দেয়া যায়। 

 

এক, ট্রাম্প যা’ বলেন তা’ স্পষ্ট এবং দৃশ্যমান। যদিও আমেরিকান সরকার কখনো ট্রাম্পের কৃতিত্ব স্বীকার করেনা। পূর্বে আমেরিকার সকল উদ্যোগ উত্তর কোরিয়ার নিউক্লিয়ার প্রোগ্রাম বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ওবামার তথাকথিত ‘কৌশলগত ধৈর্যধারণ’ নীতি কৌশলগত অকার্যকর ছিলো। ট্রাম্প সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে চেষ্টা করছিলেন।

 

দুই, কিমের সাথে প্রথম সাক্ষাতে ট্রাম্প ক্ষণকালের জন্য বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে বললেন, “আমরা একে অপরের প্রেমে পড়ে গেছি।” কিন্তু স্বল্পকালের মধ্যে তিনি সম্বিৎ ফিরে পেলেন এবং আবেগের প্রশমন করলেন। বিশেষ করে এক বছর পূর্বে পুরো বিশ্ব যখন ধরেই নিয়েছিলো যুদ্ধ অত্যাসন্ন তখনই উভয় পক্ষ যুদ্ধবিগ্রহের দিকে এগোয়নি। যুদ্ধে না জড়ানোর জন্য ট্রাম্প ক্রেডিট পেতে পারেন।

 

তবে আক্রমনের সম্ভাবনা অনেকটা হ্রাস পেয়েছে বলে আবার অনেকে মনে করেন। লা ট্রোব এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান মনে করেন অস্ট্রেলিয়া এই মুহূর্তে কিমের আক্রমন তালিকার শীর্ষে নেই। উত্তর কোরিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ইউয়ান গ্রাহাম বলেন কিম এই মুহূর্তে পুরোপুরি ডিপ্লোমেটিক মুডে রয়েছেন।

 

কিন্তু উত্তর কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়ার জন্য আপাতত: বা সমূহ বিপদ না হলেও অদূর ভবিষ্যতের জন্য মারাত্মক হুমকি স্বরূপ হয়ে দেখা দিবে। কিমের হাতে যত নিউক্লিয়ার যুদ্ধ সরন্জাম ট্রাম্পের সাথে প্রথম শাক্ষাতের সময় ছিলো তা’ সবই এখনও বর্তমান রয়েছে। এমনকি তাঁর কাছে আরো বিধ্বংসী অস্ত্র থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এমন কি কিম হয়তো আনবিক বোমা এবং মিসাইল তৈরী করে চলেছেন। অবশ্য গত সপ্তাহে ট্রাম্পের সাথে হ্যানয় বৈঠকে উত্তর কোরিয়ার বিখ্যাত ইয়ংবিয়ন আনবিক রিএ্যাক্টর অংশত বন্ধ করতে কিম সম্মত হয়েছিলেন।

 

বিপরীতে কিম জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক উত্তর কোরিয়ার ওপর আরোপিত ১১টি অর্থনৈতিক অবরোধের মধ্যে অন্তত: ৫টি তুলে নেয়ার দাবী করেছিলেন। এসকল অবরোধ উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতিকে অর্থবহভাবেই সংকুচিত করেছে। আমেরিকার স্টীমসন সেন্টারের অবরোধ বিশেষজ্ঞ বেনজামিন সিলবার্স্টেইনের মতে নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক আরোপিত অবরোধ মূলত: উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতির কন্ঠ রোধ করে দিয়েছে।

 

উত্তর কোরিয়ায় আরোপিত অবরোধের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- উত্তর কোরিয়ায় সকল প্রকার ধাতব পদার্থ, শিল্পের কাঁচামাল, কয়লা, শোধিত বা অশোধিত পেট্রোলিয়াম, পরিবহন সামগ্রী ইত্যাদির বিক্রি। মূলত: অস্ত্র ছাড়া প্রায় সবই।

 

ট্রাম্প কেনো চুক্তিতে পৌঁছাতে সক্ষম হলেননা? কেনো হ্যানয় বৈঠক চুক্তি ছাড়া শেষ হলো? অনেক প্রশ্ন রয়েছে। ট্রাম্পের সফর সঙ্গী একজন সিনিয়র আমেরিকান অফিসিয়াল বৈঠক ভেঙ্গে যাওয়ার পর শুধুমাত্র আমেরিকান সাংবাদিকদের গোপন ব্রিফিং করেছিলেন। তাঁর নামোল্লেখ না করা গেলেও তিনি দুই নেতার বৈঠক কেনো ফলাফলশূন্য শেষ হলো তার কারন ব্যাখ্যায় যা’ বলেছিলেন, “এই বৈঠকে আমরা উভয় সংকটে ছিলাম। উত্তর কোরিয়া তাদের সকল আনবিক মারনাস্ত্র কারখানা এই মুহূর্তে ফ্রিজ করতে নারাজ। সুতরাং, এই মুহূর্তে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নিলে উত্তর কোরিয়ায় থাকা অসংখ্য আনবিক মারনাস্ত্র ধ্বংস করার প্রক্রিয়া বরং ব্যাহত হবে।”

 

সুতরাং উত্তর কোরিয়া শুধুমাত্র একটি বড় রিএ্যাক্টরের অংশ মাত্র বন্ধ করার জন্য সম্মত হয়েছিলো- পুরো নিউক্লিয়ার অবকাঠামো ধ্বংস করতে রাজি হয়নি। শুধু তা’ই নয় তারা নতুন আনবিক অস্ত্র এবং মিসাইল তৈরী অব্যাহত রাখতে চাইছিলো। এক্ষেত্রে যদি আংশিক অবরোধ তুলে নেয়া হতো তবে নতুন করে বিশ্ব বানিজ্যের অংশ হিসেবে উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতিতে আইনগতভাবেই নগদ অর্থের সমাগম ঘটতো যা’ ব্যবহার করে তারা আরো নতুন মারনাস্ত্র তৈরীতে সক্ষম হতো।

 

অবশ্যই ট্রাম্পকে আমেরিকা এবং তাদের মিত্র দেশসমূহের কথা চিন্তা করে এই ভঙ্গুর কিন্তু আক্রমনাত্মক দেশটির প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করতে হয়েছিলো। সকৃতজ্ঞভাবেই ট্রাম্প সেটি করেছিলেন। ট্রাম্প এমনকি কিমকে উত্তর কোরিয়ায় আরো নতুন নতুন আনবিক রিএ্যাক্টরের খোঁজ যে তাঁরা পেয়েছেন তা’ও জানিয়েছেন।

 

দিনশেষে কিম এখনও নতুন আনবিক শক্তি সম্পন্ন অস্ত্র তৈরী করে চলছেন। কিন্তু বিশ্ব বানিজ্যে কিমের এ্যাকসেস নেই। সুতরাং কিমের রাজত্ব শেষ পর্যন্ত ব্যাপক অনাহারক্লিষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে হয়তো এতো দ্রুত নয়। একটি রাষ্ট্র বিশ্ব বানিজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার পরও এ পর্যন্ত সার্ভাইব করছে এবং এখনও ততটা খারাপ রয়েছে তা’ দৃশ্যমান নয়। গত সপ্তাহের ওয়াল স্ট্রীট জার্নালের রিপোর্ট অনুযায়ী চালের দাম উত্তর কোরিয়ায় স্থিতিশীল রয়েছে। গ্যাসোলিনের দাম অবরোধের পর পরই বেশ উঁচু ছিলো কিন্তু ২০১৭-তে অনেক নিম্নগামী হয়েছিলো এবং এখন আরো অনেক পড়ে গেছে। এ তথ্য অবশ্য উত্তর কোরিয়ায় যে সমস্ত মানবাধিকার সংস্থা কাজ করে থাকেন এবং পর্যটকদের কাছ থেকে পাওয়া।

 

গ্যাসোলিন বা পেট্রোলিয়াম হচ্ছে অবরোধে কাবু করার মূল উপাদান। এই উপাদানের দাম কি করে কম থাকে? নিশ্চয়ই অবরোধে কোথাও ফাটল রয়েছে। এমনকি পিয়ংইয়ং-এ নাকি কনস্ট্রাকশন শিল্পে বুমিং চলছে। যদি ইস্পাতসহ অন্যান্য কনস্ট্রাকশন ম্যাটারিয়ালসের ওপর অবরোধ থাকে তা’হলে এটা কি করে সম্ভব? যদি অবরোধে ফাঁক এবং ফাটল থাকে তা’হলে সম্ভব। উত্তর কোরিয়ার সাথে একজন আমেরিকান মধ্যস্থতাকারী ডেভিড আশার বলেন ফাটলের নাম চায়না। অর্থাৎ চায়না অবরোধ কার্যকর রাখার ব্যাপারে কোনো কাজ করছেনা। বরং চায়নাই উত্তর কোরিয়ার নিউক্লিয়ার কর্মসূচী উৎসাহিত করছে। চায়নার বানিজ্যিক লেনদেনের ডাটা তারই প্রমান বহন করে। অবরোধ সত্বেও অনেকগুলো চাইনিজ উদ্যোক্তা পিয়ংইয়ং-এর সাথে কাজ করছে।

 

সুতরাং অস্ট্রেলিয়া উত্তর কোরিয়ার আনবিক অস্ত্রের নিরস্ত্রীকরন খুব শীঘ্রই প্রত্যাশা করতে পারেনা। যদিও লা ট্রোব এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাহামের মতে, “আমাদেরকে উত্তর কোরিয়ার সক্ষমতা এবং একই সাথে সদিচ্ছার ওপর নজর রাখতে হবে।” তাঁর মতে এই মুহূর্তে কিমের ইনটেনশন শত্রুতামূলক মনে হচ্ছেনা। সক্ষমতার প্রশ্নে উত্তর কোরিয়ার ICBM (Intercontinental Ballistic Missile) সক্ষমতা বা আন্তমহাদেশীয় ব্যালিসটিক ক্ষেপনাস্ত্র সক্ষমতা রয়েছে এবং অস্ট্রেলিয়া তাদের ক্ষেপনাস্ত্রের রেইন্জের মধ্যে রয়েছে। সুতরাং অস্ট্রেলিয়াকে মিসাইল ডিফেন্সের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহন করতে হবে। অস্ট্রেলিয়াকে অবশ্যই সম্ভাব্য আক্রমনের টার্গেট ভেবে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে।


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT