Main Menu

সুপ্রভাত টোকিও

রাশেদুল ইসলাম: 

৬ নভেম্বর,  ২০১৮ । সোমবার ।  সকাল ৬.৪০ । থাই এয়ারলাইন্স থেকে জাপানের  হানেদা বিমানবন্দরে পা দিতেই মনটা ভালো হয়ে যায় । উজ্জ্বল ঝলমলে একটা সকাল। স্বচ্ছ স্ফটিকের মত সাদা গ্লাস দিয়ে ঘেরা বিমানবন্দর । সকালের ঝলমলে রোদ,  আর ফকফকে সাদা গ্লাসের সংমিশ্রণে মায়াবী এক দৃশ্যে মন ভরে যায় আমার । নিজের অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে আসে ‘সুপ্রভাত টোকিও’। আমি শুভ কামনা জানাই জাপানের রাজধানী টোকিওকে ।

হানেদা টোকিওর পুরাতন বিমান বন্দর । নতুন বিমানবন্দরের  নাম নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর । ২০০৮ সনে আমার প্রথম আমেরিকা  যাওয়ার সুযোগ হয় । আমেরিকার হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ। সে সময় নারিতা বিমানবন্দরে আমার  যাত্রাবিরতি ছিল । তাই, নারিতা আমার অপরিচিত নয় । তবে, সুন্দর এই সকালে হানেদাকেই আমার কাছে অনেক  বেশী আকর্ষণীয় মনে হয় । বাংলাদেশে এখন রাত ৩.৪০ । এই মন ভালো হওয়া সূর্য বাংলাদেশের মানুষ দেখবে আরও  ঘণ্টা দুয়েক পরে । কারণ, প্রশান্ত মহাসাগরের এই দ্বীপরাষ্ট্র এশিয়ার সর্ব পূর্বে অবস্থিত । সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে । তাই, জাপানের  মানুষ সূর্যকে সবার আগে দেখে । এ কারণে জাপানের আর এক নাম ‘সূর্যোদয়ের দেশ’ ।

বিমানবন্দর পার হতেই আমার মন কাড়ে এ শহরের  মানুষের শৃঙ্খলা ও পরিচ্ছন্নতাবোধ । জনসংখ্যা বিচারে পৃথিবীর  একনম্বর জনবহুল মেট্রোপলিটান শহরের নাম টোকিও । মোট জনসংখ্যা ৩ কোটি ৮০ লক্ষ । ১৯৯১ সনে বাংলাদেশের একজন উচ্চপদস্থ সরকারি  কর্মকর্তা টোকিও সফর করেন । সে সময় জাপানকে তিনি একটি খাঁটি মুসলমানের দেশ হিসেবে মনে করেন । তিনি বলেন জাপানের মানুষ অলিগলি, রাস্তাঘাট যেভাবে পরিচ্ছন্ন রাখে,  বাংলাদেশের মানুষ তাদের শোবার ঘরও এমন পরিষ্কার রাখে না । ইসলামে পরিষ্কার – পরিচ্ছন্নতাকে ঈমানের অঙ্গ বলা হয়েছে । একমাত্র একজন খাটি মুসলমানই নিজেকে এবং নিজের আশপাশ এমন পরিষ্কার রাখতে পারে । জাপানের মানুষ মিথ্যে কথা বলে না, গীবত করে না, কারো কানকথা শোনে না, অন্যের  জিনিষ স্পর্শ করে না, অন্যের পিছনে লাগে না, প্রতিবেশীর সাথে ভালো সম্পর্ক রাখে, কথা কম বলে; সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করে এবং নিজের পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নতির চেষ্টা করে । শুধু ধর্মবিশ্বাস ছাড়া একজন আদর্শ মুসলমানের চরিত্রে যেসব গুণাবলি থাকা প্রয়োজন; তার সবকটি গুণ একজন জাপানি নাগরিকের আছে । এই মন্তব্য শোনার ২১ বছর পর একজন  শ্রোতা কর্মকর্তা ২০১২ সনে নিজে জাপান সফর করেন । সেই সফরকালে তিনি তাঁর শোনা কথার সত্যতা খুঁজে পান । একই কর্মকর্তা আমার এবারের সফরসঙ্গী । তিনি জানান, তিনি তাঁর ২১ বছর আগে শোনা মন্তব্যের সাথে সেবার একমত পোষণ করেন । এবার আমার পালা । তিনি এবিষয়ে আমার নিজের মতামত জানতে চান ।

আমার কাছে জাপানি  এক বিস্ময়কর জাতির নাম । সৃষ্টির শুরুতে পৃথিবী এমন সুন্দর ও বাসযোগ্য ছিল না । দুর্লঙ্ঘ পাহাড়- পর্বত, অজেয় সমুদ্র এবং হিংস্র জন্তু জানোয়ারে ভরা জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল এই পৃথিবী । যুগ যুগ ধরে লাখো মানুষের শ্রম ও আত্মত্যাগে এই পৃথিবী আজকের এই অবস্থায় এসেছে । জাপান  জীবন্ত আগ্নেয়গিরির দেশ। ভুমিকম্প, সুনামিসহ যাবতীয় প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ একটি দেশের নাম জাপান । এই দেশে ১৯২৩ সনের ভয়াবহ এক ভুমিকম্পে ১ লক্ষ ৪০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে । ২০১১ সনের ৯.১ রেকটর স্কেলের ভুমিকম্প ও সুনামিতে জাপানে জানমালের যে  পরিমাণ ক্ষতি হয়, বিশ্বব্যাংকের হিসাবমতে পৃথিবীর ইতিহাসে তা ভয়াবহতম । এমনতর প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করেও জাপানিরা শুধু যে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে তা নয়; সমৃদ্ধ অর্থনীতির দিক দিয়ে পৃথিবীতে এ দেশের অবস্থান তৃতীয় । ২০১৫ সনের হিসাব অনুযায়ী সামরিক শক্তির দিক দিয়ে জাপানের অবস্থান চতুর্থ  । উচ্চশিক্ষায় কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ জনশক্তির দিক থেকে জাপানের অবস্থান প্রথম । এসব কারণে জাপানের মানুষকে আমার কাছে যুগযুগান্তরের লড়াকু ও অদম্য মানুষের প্রতিচ্ছবি মনে হয় ।

তবে, তাত্ত্বিক কথা নয়; জাপানের উপর আমার নিজের মতামত দিতে হলে আমাকে এদেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাপন বুঝতে হবে । প্রচলিত ব্যবস্থায় জাপানি জনগন নিজেরা নিজেদের সুখী মনে করে কিনা; তাঁদের নিজেদের মধ্যে  পারস্পারিক সম্পর্ক কেমন - তা বুঝতে হবে । তবে, পৃথিবীতে একমাত্র ভুটান ছাড়া আর কোন দেশ জনগণের ‘সুখ’কে উন্নয়নের মাপকাঠি হিসেবে গণ্য করে না । আবার এটাও সত্য জাতিসংঘ থেকে প্রকাশিত সুখী দেশের তালিকার প্রথম ১০ টি দেশের মধ্যে সেই ভুটান বা এশিয়ার কোন দেশের নাম নেই । তালিকায় সরব উপস্থিতি  স্কান্দিনেভিয়ান দেশগুলোর । যেমন ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, ডেনমার্ক, আইসল্যান্ড ইত্যাদি । সুইজারল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা –এসব দেশের নাম আছে । কিন্তু, এশিয়ার কোন দেশের নাম নেই । অবশ্য ‘সুখী দেশ’ আমার এ লেখার বিষয় নয় । আমি জাপান এবং এদেশের সাধারণ মানুষের উপর লিখতে চাই । কিন্তু, থাকার মেয়াদ ৩ দিনের বেশী নয় । এই সময়ের মধ্যে এদেশের সাধারণ মানুষের সাথে আমার  মেশার সুযোগ হবে কি ?

(চলবে)।  


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT