Main Menu

৭২ বছরের এক তরুণ

‘বয়স নয়, মনের জোর এবং সুশৃঙ্খল জীবনই মানুষকে সুস্থ, সবল ও সুঠাম দেহের অধিকারী করার মূলমন্ত্র’ এই ভাবনাকে নিয়েই ৫৬ বছর ধরে নিজে নিয়মিত ব্যায়াম করে ও অন্যকে প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছেন ৭২ বছর বয়সী রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ কে এম মাতলুবুল হক। তার শারীরিক গঠন দেখে বেশ অবাকই হতে হয়। তরুণদের মতোই এই ৭২ বছর বয়সেও নিজের শরীরকে চনমনে রেখেছেন এই ব্যায়ামবীর।  রাজশাহীর কাজীহাটায় রেডিও সেন্টারের উল্টোদিকে মাসল কেয়ার জিম নামের প্রতিষ্ঠানটিতে গিয়ে দেখা মেলে এই জিমের প্রতিষ্ঠাতা এ কে এম মাতলুবুল হকের। তিনি জানান, এই জিমটি তিনি ও তার ছেলে মিম রাফিউল হক মিলে ২০০০ সাল থেকে চালাচ্ছেন। এ কে এম মাতলুবুল হকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৬৩ সালে ক্লাস নাইনে পড়ার সময় বন্ধু মোখলেসুর রহমানের শরীরের গঠন দেখে তিনি ব্যায়ামের প্রতি উদ্বুদ্ধ হন। তারপর থেকে ওই বন্ধুর জিমেই ব্যায়াম শুরু করেন। তখনকার সময়ে ব্যায়ামের আধুনিক কোনও যন্ত্রপাতি ছিল না। কাঠের মুগুর দিয়েই শুরু করেন শরীর চর্চা। সেখানে দুই বছর এভাবে ব্যায়াম করার পর রাজশাহী কলেজে ভর্তি হন মাতলুবুল হক।  রাজশাহী কলেজে ভর্তি হওয়ার পর ব্যায়ামের প্রতি আগ্রহ দেখে শিক্ষকরা মাতলুবুল হকের কাছে জিমের চাবি দিয়ে দেন। এই জিমের চাবি ১৯৬৫ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ছিল মাতলুবুলের কাছে।  এরপর কলেজের অধ্যক্ষের প্রেরণায় মিস্টার রাজশাহী কলেজ চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণ করেন মাতলুবুল। পরপর তিনবার চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথম হন। এখান থেকে ১৯৭০ সালে বিএসসি পাস করার পর রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে চাকরি শুরু করেন তিনি। সংসার, চাকরি ও ব্যায়াম একইসঙ্গে কিভাবে চালিয়েছেন জানতে চাইলে মাতলুবুল বলেন, জীবনের প্রথম থেকেই সুশৃঙ্খলভাবে জীবনকে যাপন করেছি। ঘুম থেকে উঠেই ফজরের নামাজ পড়ি। কোনোদিন ফজরের নামাজ কাজা করিনি। নামাজ পড়ে আর ঘুমাইনি। সাতটার দিকে অফিস ছিল। ফজরের নামাজের পর হালকা নাস্তা করে অফিসে চলে যেতাম। এরপর দুপুর দুইটার দিকে বাসায় ফিরে একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার অফিসে চলে যেতাম। তবে রোজার মাসে আমি জিম বন্ধ রাখি। এই বয়সেও কেন ব্যায়াম করেন জানতে চাইলে মাতলুবুল হক বলেন, প্রথমত স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য আমি ব্যায়াম করি। দ্বিতীয়ত ইয়াং জেনারেশন আমার বডি ফিটনেস দেখে আকৃষ্ট হয়। তারাও জিম করতে আসে। এতে তারা সুশৃঙ্খল জীবনে ফিরে আসে।      মাতলুবুল হকের ডাক নাম টিপু। এলাকার সবার কাছে তিনি টিপু ভাই। বয়স্ক লোকেরাও টিপু ভাইর কাছে আসেন শরীর চর্চার কসরত শিখতে। তারা জানতে চান এই বয়সেও শরীর ধরে রাখার রহস্য। মাতলুবুল হক তাদের পরামর্শ দেন। জিমে আসার আমন্ত্রণ জানান।  মাতলুবুল হক মনে করেন, মনের জোর আর সুশৃঙ্খল জীবন ছাড়া কেউ জিম করতে পারবে না। কোনও ধরনের বদ অভ্যাস থাকলেও জিম করা সম্ভব নয়। তবে যে একবার জিমে ঢুকে গেছে, আকর্ষণীয় শরীরের প্রতি লোভ সৃষ্টি হয়েছে সে আর কোনোদিন জিম ছাড়তে পারবেন না। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে মাতলুবুল হক বলেন, অনেক ছাত্র আছে যারা নেশা করত। তারা জিম করার পর সেসব ত্যাগ করেছে। পরবর্তীতে তারা ভালো ভালো চাকরি পেয়েছে দেখে আমার ভালো লাগে। আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া জানিয়ে মাতলুবুল হক বলেন, ৫৬ বছর ধরে ব্যায়াম করছি। আল্লাহর রহমতে এখন পর্যন্ত আমার ডায়াবেটিস, প্রেশার, অনিদ্রা বা বড় কোনও ধরনের অসুখ হয়নি।   বয়স্কদের প্রতি মাতলুবুল হকের পরামর্শ, যাদের বিভিন্ন ধরনের অসুখ রয়েছে তাদের জিম না করাই ভালো। কিন্তু যারা বড় ধরনের অসুখে ভুগছেন না, তাদের নিজের জিমে আমন্ত্রণ জানান মাতলুবুল হক। ইয়াং জেনারেশনের যারা বডি বিল্ডাপ করতে আসেন তাদের প্রতি মাতলুবুল হকের পরামর্শ, ক্যালসিয়াম, প্রোটিন এবং ফ্যাটের সমন্বয়ে খাদ্য গ্রহণ করতে হবে। যারা ওয়েট লস করতে আসে তাদের খাবার আরও কমিয়ে দেই। ফাস্টফুড টোটালি অফ করতে বলি।  পারিবারিক জীবনে দুটি ছেলে সন্তানের জনক মাতলুবুল হক। তারাও জিমের সঙ্গে যুক্ত। এক সন্ধ্যায় মাতলুবুল হক ও তার ছেলের জিমে গিয়ে দেখা যায় বিভিন্ন বয়সী মানুষ জিম করছেন। মাতলুবুল হক তাদের সাহায্য করছেন। মাতলুবুল হকের জিমে আসা আজাদ নামের এক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা বলেন, টিপু ভাইকে দেখে আমরা জিম করতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছি। তার পরামর্শেই এই বয়সে জিম করে যাচ্ছি। আমার দুই ছেলেও এখানে জিম করে।   মাসুল কেয়ার জিমে প্রায় ১৬ বছর ধরে জিম করছেন ফয়সাল মুরাদ খাঁন। তিনি একজন ব্যাংকার। তিনি জানান, আমি গর্বিত একজন লিজেন্ড বডিবিল্ডার্সের কাছে ব্যায়াম শিখছি। উনাকে ফলো করলে বুঝা যাবে বয়স কোনও ব্যাপার না। জিমে কথা হয় সারোয়ার জুয়েল নামের এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে।  তিনি বলেন, দেড় বছর ধরে আমি জিম করছি। মূলত শখের বসেই আমার জিম করতে আসা। টিপু আঙ্কেলকে দেখে অনুপ্রাণিত হই।  মাসুল কেয়ার জিমের ওনার মিম রাফিউল হক জানান, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হচ্ছেন আমার বাবা এ কে এম মাতলুবুল হক। উনাকে আমরা ছোট থেকেই দেখে আসছি উনি সব কিছুতেই ডিসিপ্লিন ফলো করেন। ফলে এতো বছর বয়সেও উনি এতোটা ফিট। কেউ যদি ৪০ বা ৫০ বছর বয়সে লাইফ স্টাইলটা পরিবর্তন করবে তবে সেও আমার বাবার মতো ডিসিপ্লিন ওয়েতে নিজেকে সুস্থ রাখতে পারবে। বয়সটা আসলে ব্যাপার না। হেলদি লাইফ স্টাইলটা একটা বড় ব্যাপার। আমরা আগে এতটা ফিট ছিলাম না। এখন প্রতিদিন ব্যায়াম করার ফলে আমরা সুস্থ আছি এবং ভালো আছি।


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT