Main Menu

কাশ্মীরে সুইসাইড বোম্বিং, ৪০ মিলিটারী পুলিশের প্রাণহানি এবং দু’দেশের যুদ্ধংদেহী অবস্থান

মোঃ শফিকুল আলম:পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী জনাব এমরান খান সর্বশেষ জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তিনি বলেছেন যদি পাকিস্তান গত বৃহস্পতিবারের কাশ্মীর বোম্বিং এর কারনে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভারত কর্তৃক আক্রমনের শিকার হয় তবে তারা প্রত্যাঘাত করবে।

 

দুই আনবিক শক্তি সম্পন্ন প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে বিরাজমান উত্তেজনা গত বৃহস্পতিবারের কাশ্মীরে সুইসাইড বোম্বিং-এ ৪০ জন ভারতীয় মিলিটারী পুলিশ প্রাণ হারানোর মধ্য দিয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। কাশ্মীরের এই অংশটি ভারত নিয়ন্ত্রিত এবং হিমালয় পাদদেশ সংলগ্ন।

 

এই আক্রমন ভারতের জনগনকে প্রতিশোধপরায়ন করেছে। ভারতের সামাজিক মাধ্যমে প্রতিশোধের ডাক দেয়া হয়েছে। এমনকি কাশ্মীরি মুসলমানদের ওপরতো বটেই ভারতের অন্যান্য অন্চলের মুসলমানদের ওপরও হিন্দুপ্রধান দেশটিতে বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ছে।

 

পাক প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন যে তিনি এই আক্রমনকারীদের বিরুদ্ধে তদন্তের ব্যাপারে সাহায্য করবেন বলেছিলেন। জাইশ-ই-মোহাম্মাদ চড়মপন্থী গ্রুপ এই আক্রমনের দায় স্বীকার করেছে। অবশ্য ভারত বলছে এই সন্ত্রাসী গ্রুপকে পাকিস্তানই মদদ দিচ্ছে। পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ এই সন্ত্রাসী গ্রুপের সাথে কোনো প্রকার সম্পর্ক থাকার কথা অস্বীকার করে আসছে। এবং পাকিস্তান জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ প্রত্যাশা করছে।

 

কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রমোদী এবছরের মে মাসে অনুষ্ঠিতব্য সাধারন নির্বাচনকে সামনে রেখে জনগনের চাপের মুখে রয়েছেন। জনগন প্রতিশোধ নিতে চাপ প্রয়োগ করছে। তাই মোদী বলেছেন এ বিষয়ক সিদ্ধান্ত গ্রহন তিনি সামরিক বাহিনীর হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। সামরিক বাহিনী যথাযথ এবং শক্ত জবাব দিবে।

 

এমরান খান জাতির উদ্দেশ্যে এক টেলিভিশন ভাষনে ভারতের প্রতিশোধ নেয়ার বিষয়টি জনগনকে অবহিত করেছেন। তিনি অবশ্য ভারতের শুভ বুদ্ধির উদয় হবে বলে প্রত্যাশা করেছেন। মি: খান পরোক্ষভাবে ভারতকে বলে দিয়েছেন যে পাকিস্তান কিন্ত প্রত্যাঘাত করবে এবং পরিস্থিতি তখন কোথায় প্রবাহিত হবে সে কথা ভারতকে জিজ্ঞাসা করেন।

 

জাতিসংঘ দু’দেশের মধ্যে বিরাজমান উত্তেজনা বৃদ্ধিতে উদ্বিগ্ন। জাতিসংঘ মহাসচিব উভয় দেশ চাইলে মধ্যস্ততা করার ব্যাপারে প্রস্তুত রয়েছেন বলে জানিয়েছেন। জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক সে কথাই বলেছেন। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী শাহ্ মাহমুদ কোরায়েশী জাতিসংঘকে সংযুক্ত হওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে পত্র দিয়েছেন।

 

জাতিসংঘ মুখপাত্র স্টিফেন দু’পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা হ্রাসের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন এবং উভয়পক্ষকে ধৈর্য ধারনের আহ্বান জানিয়েছেন।

 

দক্ষিন এশিয়ার এই দু’টি প্রতিবেশি রাষ্ট্র ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর এ পর্যন্ত তিন বার যুদ্ধে জড়িয়েছে এবং দু'বার শুধু কাশ্মীর নিয়ে। কাশ্মীরে মুসলিম মেজরিটি রয়েছে।

 

যদিও ১৯৯৮ সালে আনবিক শক্তি সম্পন্ন দেশ হওয়ার পর দু'দেশ কোনো পুরোপুরি যুদ্ধে অবতীর্ন হয়নি। মাঝে মধ্যেই অবশ্য সীমান্ত দাঙ্গা দেখা যায়।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই আক্রমনকে হায়েনার আক্রমন বলেছে এবং নিন্দা জানিয়েছে। কিন্ত উভয় দেশের সাথে ঘনিষ্ট যোগাযোগ রেখে চলছে এবং আলোচনা অব্যাহত রেখেছে। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র রবার্ট পলাডিনো সেরকমটিই ব্রিফ করেছেন।

 

মি: রবার্ট বলেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাস দমনে ভারতের সংগে যৌথভাবে কাজ করবে এবং তারা এই আক্রমনে তদন্ত কার্যক্রমে পাকিস্তানকে সহযোগিতা করার জন্য বলেছেন। তদন্ত সাপেক্ষে দোষী সন্ত্রাসী গ্রুপকে পাকিস্তান আইনের আওতায় আনায়ন করবে বলেও তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

 

জনাব এমরান খান অবশ্য বোম্ব এ্যাটাকের ব্যাপারে পাকিস্তানের কোনো হাত ছিলোনা বা থাকার সুযোগ নেই বলে পূণরাবৃত্তি করেন। তিনি দোষী ব্যক্তি বা গ্রুপকে সনাক্ত করা গেলে তাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান ব্যবস্থা গ্রহনে প্রস্তুত রয়েছেন বলে জানান।

 

ভারতের বিদেশ মন্ত্রী অবশ্য এমরান খানের এই বক্তব্য অগ্রাহ্য করে বলেন ইসলামাবাদ ইতোপূর্বে ২০০৮ এর মুম্বাই আক্রমনের প্রমান দেয়া সত্বেও কোনো ব্যবস্থা গ্রহন করেনি। এমনকি মুম্বাই আক্রমনের ব্যাপারে পাকিস্তানি তদন্ত আর কখনো এগোয়নি। বরং পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ প্রকৃত আক্রমনকারী গ্রুপকে বাদ দিয়ে অন্য একটি গ্রুপকে দায়ী করেও কোনো ব্যবস্থা গ্রহন করেনি।

 

ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রক আরো বলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সন্ত্রাসী গ্রুপকে লালন করার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে এবং এটা অনেকটা পাকিস্তানের বিদেশ নীতির অংশ হিসেবেই করে থাকে। ভারত গত ৩০ বছর ধরে পাকিস্তানিদের মুসলিম জিহাদী লালনের অভিযোগ করে আসছিলো এবং তা’ ভারতের একমাত্র মুসলমান প্রধান স্টেট কাশ্মীরেই ধারাবাহিকভাবে করে আসছে।

 

অপরদিকে পাকিস্তান বলছে তারা শুধু কাশ্মীরিদের আত্মনিয়ন্ত্রনাধিকারের প্রশ্নে নৈতিক এবং কুটনৈতিক সহযোগিতা প্রদান করে থাকে। কিন্তু ভারত সব সময়ই কাশ্মীরে সন্ত্রাসী গ্রুপকে পাকিস্তান মদদ দিয়ে আসছে বলে বিশ্বাস করে।

 

মি: খান ভারতকে উদ্দেশ্য করে বলছেন “এই পাকিস্তান আর আগের পাকিস্তান নয়। এই পাকিস্তান এখন এক নতুন পাকিস্তান। পাকিস্তান এখন নতুন মানসিকতায় গড়ে উঠছে। পাকিস্তান এখন নতুন করে ভাবছে।”

 

ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী কাশ্মীরে সুইসাইড বোম্বিং এর পর কঠোর ব্যবস্থা গ্রহন করেছে। গত তিন দশকের বিদ্রোহ দমনে নিরাপত্তা বাহিনী যেকোনো কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষমতাপ্রাপ্ত।

 

কাশ্মীরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কমান্ডার কেজেএস ধিলন পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই কাশ্মীরের বোম্বিং-এ জড়িতদের নিয়ন্ত্রক এজেন্সী হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং তার প্রতিফল ভোগ করতে হবে বলে তিনি মনে করেন। মি: ধিলন কাশ্মীরের সকল মুসলমান মা’দের প্রতি তাদের সন্তানদেরকে সন্ত্রাসের পথ থেকে ফেরাতে অনুরোধ জানিয়েছেন। অন্যথায় ভারতীয় জনগনের বিরুদ্ধে যে’ই বন্দুক তাক করবে সে’ই মৃত্যু বরন করবে বলে হুশিয়ারী উচ্চারন করেন।

 

গত বৃহস্পতিবারের বোম্বিং ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের ২০ বছর বয়সী এক যুবক করেছে বলে ভারতীয় সেনাবাহিনী মনে করে। এই যুবকের পিতা-মাতা বলছেন যেহেতু তাদের ছেলে ২০১৬ সালে সেনাবাহিনী কর্তৃক প্রহৃত হয়েছিলো তারপর থেকে সন্ত্রাসী গ্রুপে জয়েন করেছে।

 

মি: ধিলন অবশ্য পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা যে কাশ্মীর বোম্বিং এর সাথে জড়িত সন্ত্রাসী গ্রুপকে মদদ দিচ্ছে বলে ধারনা করছেন তার কোনো বিশ্বাসযাগ্য প্রমান দিতে পারেননি। শুধুমাত্র বলেছেন যে আইএসআই এর জেইএম বা জায়শ-ই-মোহাম্মাদ সন্ত্রাসী গ্রপের সাথে লিংক রয়েছে।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সীমান্ত রক্ষার অধিকার ভারতের রয়েছে বলে দৃঢ মত প্রকাশ করেছে এবং আত্মরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহনেরও অধিকার ভারতের রয়েছে।

 

একই সময়ে ইউএস মনে করে পাকিস্তানের দায়িত্ব রয়েছে আফগানিস্তানে তালিবানদের শান্তির পথে ফেরাতে বা ধাবিত হতে মৃদু ধাক্কা দেয়ার। কারন ইউএস আফগানিস্তানে দীর্ঘ যুদ্ধের অবসান চায়। আফগানিস্তানে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত বলেন যে ভারতীয় আক্রমন আফগানিস্তানের শান্তি প্রক্রিয়া বিঘ্নিত করবে। এমনকি পুরো রিজিয়নে অশান্তি আনায়ন করবে।

 

পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূতের এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় আফগান সরকারের সাবেক ডেপুটি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বলেন ত’হলে কি আফগানিস্তানের দীর্ঘ সময়ের গৃহযুদ্ধ আন্চলিক পরাশক্তির প্রতিযোগিতার ফসল? তিনি বলেন যে কাশ্মীরের সমস্যা কাশ্মীরের আলোকে সমাধান হবে। নিশ্চয়ই তা’ আফগানিস্তানের মাটিতে হবেনা। আফগানতো ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধক্ষেত্র নয়?

 

পাকিস্তানের ঘনিষ্ট বন্ধু চীন চায় আলোচনার মাধ্যমে দু’দেশের মধ্যে বিরাজমান উত্তেজনার প্রশমন হোক।


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT