Main Menu

অসহায়ত্ব মানুষকে হিংস্রও করে তোলে

রোকসানা ইয়াসমিন রেশনা:“স্বামীর পাশাপাশি চাকরি করতেন স্ত্রী জেবুন নাহারও। যা বেতন পেতেন তা থেকে প্রতিমাসে নিজের মা-বাবাকে কিছু টাকা দিতে চাইতেন তিনি। কিন্তু বাধ সাধেন স্বামী রফিকুল ইসলাম শেখ। শুধু বাধাই নয়, ওইসব ঘটনায় তাকে বিভিন্ন সময় মারধরও করেন বলে পুলিশের কাছে দাবি করেছেন জেবুন নাহার।

এক পর্যায়ে স্বামীর ওপর আক্রোশ জমে তার মনে। ফের ঝগড়া হলে সেই আক্রোশের বশবর্তী হয়ে স্বামীকে হত্যা করেন। এমনকি হত্যার পর স্বামীর মরদেহের ওপর ঠান্ডা মাথায় চালান নৃশংসতা”। গতকালের বিভিন্ন পত্র পত্রিকাতে এভাবেই খবর এসেছে কাল। অর্থাৎ স্ত্রী কর্তৃক স্বামি নৃশংস ভাবে খুন হয়েছে শ্রীপুরে।

 

আমাদের দেশে সব সময় এক্টা বিষয় বেশি আলোচনা হয় যে মা বাবা কতো কষ্ট করে ছেলে মানুষ করে, বিয়ের পর সেই ছেলেই মা বাবাকে দেখে না এবং এর জন্য আক্রমণের তীরটা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসে পড়ে বউ এর উপর। কেউ-ই মুদ্রার উলটো পিঠটা দেখতে চায় না।

 

আমি মনে করি ছেলেদের থেকে মেয়েদের মানুষ করে তুলতে বেশি কষ্ট তো বটেই, খরচও বেশি করতে হয় মা বাবাকে।  হায়ার এডুকেশনের ক্ষেত্রে একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়, প্রায় সব ছেলেরাই যাদের সামর্থ্য আছে তারাও, লেখাপড়ার পাশাপাশি একটা দুইটা টিউশনি করেই, বা অন্য কোন না কোন উপায়ে ইনকামের সাথে জড়িত থাকে, যা থেকে তারা হাত খরচের অনেকটা মেটাতে পারে। কারণ তাদের সে স্কোপ থাকে। কিন্তু ঢাকা শহরের কথা বাদ দিলে অন্যান্য এডুকেশন ইন্সটিটিউট গুলোতে যে সব মেয়েরা হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া করে তাদের খরচটা বাবা মা-ই বহন করে। কারণ তাদের ইনকাম করার কোন স্কোপ থাকে না। সেই মেয়েগুলোই লেখাপড়া শেষ করে যখন স্বাবলম্বী হয়, তখনও যদি তাদের বিয়ে হয়, তাদের আয়ের টাকাটা হয়ে যায় হাজব্যান্ডের। সেই মেয়ের আয়ের টাকা স্বাধীন ভাবে খরচের অধিকারও তার থাকে না। মা বাবার জন্য কিছু করতে গেলেও হাজব্যান্ডের মুখের দিকে তাকানো যায় না এবং হাজব্যান্ডের কালো মুখ দেখবে না বলে একটা সময় তাকে লুকিয়েই মা বাবার জন্য কিছু করে। সে মেয়ের লাখ টাকা আয় থাক বা হাজার টাকা আয় থাক।

 

আমাদের নীচ তলায় এক অবসর প্রাপ্ত সচীব দম্পতি থাকেন। যাদের আমি খালাম্মা ও আঙ্কেল বলেই ডাকি। আঙ্কেলের নিজের বাড়ী আছে মিরপুরে। আমাদের বাড়ীর মালিক খালাম্মার এই বাড়ীটা ৩৫ বছর আগের পুরোনো বাড়ী। লিফট নেই।  আঙ্কেল সিঁড়ি ভাংতে পারেন না বলে নীচতলায় ভাড়া নিয়েছেন। উনার দুইটা মেয়ে। বড়টা গ্রীন লাইফ হসপিটালে প্রাক্টিস করেন। এই মেয়ের ঘরে একটা নাতী। নাতীকে দেখার কেউ নেই বিধায় নিজের বাড়ী রেখে মেয়ের বাসার কাছাকাছি বাসা নিয়েছেন। হসপিটালে যাওয়ার সময় মেয়ে বাচ্চাটাকে দিয়ে যায়, ডিউটি শেষ করে যাওয়ার সময় নিয়ে যায়। কথা প্রসঙ্গে একদিন জানতে চাইলাম, আপনার তো দুইটাই মেয়ে, এই রকম আনা নেয়া করতে আপনাদেরও, আবার আপনার মেয়েরও কষ্ট হয়ে যায়। একটা বাসাতেই তো থাকতে পারেন। আঙ্কেল চুপ করে থাকলেন, কিছু বললেন না। খালাম্মা চা আনার কথা বলে রান্না ঘরে চলে গেলেন।

 

একদিন মাঝরাতে দেখি কান্নাকাটির শব্দ, কিছুক্ষন পরে ২/৩টা গাড়ী এসে আমাদের বাসার সামনে হাজির হলো। আমি যেহেতু রাতে জেগেই থাকি বুঝতে পারলাম, আমাদের নীচতলা থেকে আসছে এই শব্দ। একটু পরেই আবার গাড়ীগুলো বেরিয়ে গেলো। সকালে খোঁজ নিয়ে জানলাম, নীচতলার আঙ্কেল রাতে প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, তাই তাকে হসপিটালে নিয়ে যেতে হয়েছিল। গ্রীন লাইফ হয়ে বারডেম হয়ে ১০/১২ দিন পর উনি বাসায় ফিরলেন এক গাদা রিং বুকে ধারণ করে। যেদিন আসলেন, সন্ধ্যার পর আমি দেখতে গেলাম। ৮/৯ টার দিকে খালাম্মার মেয়েটা চোখ মুছতে মুছতে বের হবার সময় বলে গেলো, ‘তোমার জামাই সকালে বেরিয়ে গেলেই আমি চলে আসবো। আজ আর হসপিটালে যাবো না’। আঙ্কেল খুব হাসিখুশি মানুষ। মেয়েকে হাসি মুখেই বিদায় দিলেন। খালাম্মা একটু স্বাভাবিক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, জামাই ইঞ্জিনিয়ার। নিজের মতো থাকতে পছন্দ করে। তাই আমাদের সাথে মেয়েটা থাকতে পারে না। কিন্তু বড় মেয়ে তো, আরো বাবার ন্যাওটা। সারারাত ও ঘুমোতে পারবে না। কিন্তু আমাদের সাথে থাকবে, সে উপায়ও নেই। বুঝলাম, আগের দিনের উত্তর হয় তো আজ দিলো।  

 

এই যে নিজের আয়ের টাকা নিজের মা বাবাকে দিতে হবে চুরি করে, অসুস্থ বৃদ্ধ মা বাবার কাছে থাকতে না পারা ঘটনা গুলো হয়তো খুব স্বাভাবিক মনে হয় সবার কাছে। আর মনে হতে পারে বিচ্ছিন্ন ঘটনা। আসলে কিন্তু তা না। এই ঘটনা গুলো প্রতিটা ঘরে ঘরেই ঘটছে কম বেশি। আমরা ছেলের না দেখা নিয়ে যতো কথা বলি, ছেলের বউ এর ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে যতোটা পারি জীহবার ঝাল মেটাই, মেয়ের জামাই বা মেয়ের অসহায়ত্ব নিয়ে ততোটা কথা বলি না। এ যন্ত্রণা শুধু একটা মেয়েকে একাই বহন করতে হয়। সেই একাকীত্ব একটা মেয়েকে অসহায় করে তোলে, আর তার দুই একটা বিস্ফোরন্ হয়তো ঘটে এই রকম নৃশংস হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে।    

 

আমার আজকের লিখাটা কোন অবস্থাতেই একটা খুনকে বৈধতা দেয়ার জন্য না। আমি জাস্ট  বলতে চাইছি, একটা মেয়ে কতোটা অসহায় বোধ করলে, মনের ভীতর কতোটা ক্ষোভ জন্মালে এই ধরনের কাজ করতে পারে তার স্বপক্ষে কয়েকটি কথা। যদিও বেশ বুঝতে পারছি, এর আগের লেখাটার সাথে বেশ খানিক্টা বৈপরীত্য সৃষ্টি করতে পারে এটা।


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT