Main Menu

‘খুব ভাল হয়েছে । কিন্তু, গাড়িতে চড়েন, উদ্যানে হাঁটেন ………’

রাশেদুল ইসলাম :লেখার শিরোনাম আমার নয় ।  এটা আমার এক ফেসবুক বন্ধুর মন্তব্য । কিছুদিন আগে আমি একটা স্ট্যাটাস দিই। একজন ফেসবুক বন্ধু সেই লেখার  উপর এ মন্তব্য করেছেন । আলোচনার সুবিধার্থে সেদিনের সেই স্ট্যাটাসটা হুবহু নিচে দেয়া হলঃ

(এক)

“ড্রাইভার গজ গজ করে । কয়েকদিন ধরে তার একই অভিযোগ । সামনের বাসার রিকসাভ্যানের কারণে সে গাড়ী বের করতে পারে না । ভ্যানটা একটু সরিয়ে রাখলে কোন অসুবিধা হয় না । কিন্তু, ভ্যানমালিক কোন অবস্থাতেই সেটা সরাবে না।  এটা সরকারি রাস্তা । সরকারি জায়গায় রাখার অধিকার তাদের আছে । তাই, তারা ভ্যানটা যেখানে রেখেছে , ওখানেই রাখবে। সরাবে না । আজ সকালে রিক্সাভ্যানটা সরাতে বললে, সে বাড়ির বৌ তাকে রীতিমত গালিগালাজ করেছে । কার কত ক্ষমতা আছে, তার জানা আছে । ভ্যানটা যেখানে আছে, ওখানেই থাকবে ।  আমার গাড়িচালকের ইচ্ছা- আমি নিজে যেন ভ্যানমালিকের সাথে কথা বলি ।

ঢাকা শহরে প্রতিবেশীদের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ খুব  কম । সবাই এক ধরণের যান্ত্রিক জীবনযাপন করে । আমি নিজেও ব্যতিক্রম কোন ব্যক্তি নই । সামনের বাসার বাসিন্দা পরিবর্তন হয়েছে বুঝতে পারি । কারণ, আগে এ বাসার সামনে রিক্সাভ্যান ছিল না । আমি দারোয়ানকে বলি ভ্যানের মালিককে ডেকে দিতে । বাড়ির মধ্য থেকে ফুটফুটে একটা মেয়ে বেরিয়ে আসে । জানায় ভ্যানটা তাদের । মেয়েটির নাম ফারিয়া । সে সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী । আমি বলি,’মা, তোমাদের এই ভ্যানের কারণে  আমাদের গাড়ী বের করতে কষ্ট হয় । তোমরা কি ভ্যানটা একটু সরিয়ে রাখবে’ ? মেয়েটি সাথে সাথে রাস্তায় নেমে আসে । নিজে ভ্যানটা টেনে সরিয়ে রাখে । আমার গাড়ীচালকের অতিকঠিন সমস্যা মেয়েটি একমিনিটে মিটিয়ে দেয় ।

ঘটনাটি সামান্য । উল্লেখ করার মত নয় । তারপরও বলা দরকার এ কারণে যে, এ ধরণের অতি  তুচ্ছ ঘটনা থেকে অনেক বড় দুর্ঘটনা ঘটে থাকে । আমাদের সমাজে এটা একটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার । আমি নিজে ড্রাইভারের কথায়  গুরুত্ব দিয়ে পুলিশ ডাকাডাকি করলে, দুই প্রতিবেশীর মধ্যে অহেতুক শত্রুতার সৃষ্টি হত । এ ঘটনায় আমার মনে হয়েছে, কারো কানকথা না শুনে,  নিজে যাচাই করে কোন কাজ করলে সমাজে অনেক অপ্রিয় ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়া যায় ।

(দুই)

ঢাকা শহরে সালাম দেয়ার কোন প্রচলন নেই । আমি রাস্তাঘাটের কথা বলছি। আমি  গ্রাম থেকে এসেছি । রাস্তায় মুরুব্বি গোছের কাউকে দেখলে সালাম দিতে হয় । এটা আমার মায়ের দেওয়া শিক্ষা । এখন আমি নিজেই মুরুব্বি হয়ে গেছি । তারপরও  ছোটকালের সেই বদঅভ্যাসটা (?) এখনও রয়ে গেছে । বিশেষ করে মুরুব্বি বা হুজুর গোছের কাউকে দেখলে নিজের অজান্তেই হাত কপালে উঠে । মুখ দিয়ে সালাম বেরিয়ে আসে । অনেকে সালাম শুনে  ডানে-বায়ে তাকান । তাঁকে যে কেউ সালাম দিতে পারে, হয়ত এটাই বিশ্বাস হয় না তাঁর ।

আমি চন্দ্রিমা উদ্যানে হাঁটি । প্রাতঃভ্রমণ করি । একজন লোককে প্রায়ই  দেখি হালকা দৌড়ের মধ্যে থাকেন । সামনে যেই পড়ুক -সকলকেই সালাম দেন তিনি । তাঁকে আগে সালাম দেয়া মুশকিল । নবী করিম (সঃ) এঁর  জামানায় সাহাবিদের মধ্যে আগে সালাম দেওয়ার একটা প্রতিযোগিতা ছিল । কথাটা মনে হতেই আমি তাঁকে আগে সালাম দেওয়ার চেষ্টা করি । যেদিন দিতে পারি, ভদ্রলোক লজ্জা পান । শিশুর মত হাসেন । আমার ভালো লাগে । একদিন আমার পাশ দিয়ে হাঁটা স্মার্ট একজন ব্যক্তি সেই  লোকটাকে সালাম দিতে দেখে ক্ষেপে যান । আমাকে বলেন, ‘দেখেন লোকটা কত বড় বেয়াদপ । নিজে বড় কোন পাপ করেছে । এখন পার্কে আসে সালাম দিয়ে পুণ্য কামাই করতে । আপনিই বলেন, পার্ক কি সালাম দেওয়ার জায়গা ? যত্তসব বাজেলোক’ ! লোকটার কথা শুনে আমার হাঁটার গতি থেমে যায় । তাৎক্ষণিক কোন জবাব খুঁজে পাইনে আমি । মোক্ষম জবাবটা  যখন আমার মাথায় আসে, ততক্ষনে স্মার্ট লোকটি অনেক দূরে চলে গেছেন । আসলে এটাই আমাদের বড় দোষ । নিজে তো কোন ভালো কাজ করবই না; অন্য কেউ ভালো কাজ করলে, তাঁকে এমনভাবে থামিয়ে দেব, যেন সেও কোন ভালো কাজ করার চিন্তা না করে ।

বলছিলাম সালাম দেয়ার কথা । কুশল বিনিময়ের কথা । শুধু ইসলাম ধর্ম নয়; পৃথিবীর সকল ধর্মেই পরস্পর কুশল বিনিময়ের বিধান রয়েছে । সব ধর্মেই এ ধরণের কুশল বিনিময়ের উপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে ।

মানুষ সামাজিক জীব । সামাজিক জীবনে পারস্পারিক সহযোগিতা ছাড়া মানুষ  বাঁচতে পারে না । কুশল বিনিময় মানুষের পারস্পারিক বন্ধনকে শক্ত করে । পারস্পারিক শ্রদ্ধা ও ভালবাসা বাড়ায় । সে বিচারে পরস্পর কুশল বিনিময় সামান্য কোন ব্যাপার নয় ।  তাই, আপনার আমার সাধারণ কুশল বিনিময় অনেক বড় পরিবর্তন আনতে পারে সমাজে । এটা ভাবার বিষয় নয় কি” ?

আমার এই স্ট্যাটাসের প্রেক্ষিতে ফেসবুক বন্ধু যে  মন্তব্য করেন, তা শিরোনামে বলা হয়েছে । তাঁর মতে লেখাটা ভাল হয়েছে । তবে, যিনি গাড়িতে চড়েন, তিনি আবার উদ্যানে হাঁটেন- এটা নিয়ে তাঁর সন্দেহ । লেখাটা  বিশ্বাসযোগ্য হলেও, তাঁর মনের মধ্যে খুঁতখুঁত একটা ভাব রয়ে গেছে । মন্তব্যে তিনি তাঁর মনের সেই খুঁতখুঁত ভাবটা গোপন করেননি । এজন্য তাঁকে ধন্যবাদ । আমি  ফেসবুকের সাধারণ নিয়মেই তাঁকে জবাব দিতে পারি । কিন্তু, আমার মনে হয়েছে, এটা কোন ব্যক্তিগত খুঁতখুঁতানি নয় । এই সন্দেহ বর্তমান সমাজের । তাই সমাজের এ ধরণের  মৌলিক দুটি সমস্যা নিয়ে আমি সচেতন পাঠকের সাথে শেয়ার করতে চাইঃ

প্রথমতঃ আমার উপরের  লেখাটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হলেও আমার  ফেসবুক বন্ধু সেটা বিশ্বাস করেননি । তিনি বিশ্বাস করেননি; কারণ,  এখন আমরা কেউ কাউকে বিশ্বাস করিনে । তারমানে বর্তমানে আমরা পরস্পরের প্রতি একধরণের আস্থাহীনতার সঙ্কটে আছি ।  এর কারণ এই হতে পারে যে, এখন আমরা সত্য কথা বলিনে । আর, নিজে সত্য কথা না বললে, অন্যের যেকোন কথা মিথ্যে মনে হওয়া স্বাভাবিক । মানুষ সামাজিক  জীব । পারস্পারিক বিশ্বাস না থাকলে সমাজে মিলেমিশে বাস করা মুশকিল । এর আর একটি দিকও বিবেচনার দাবী রাখে । বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ । মক্কার কোরাইশ বংশের  একটি ছেলে সত্য কথা বলে, এই ঘটনা দিয়েই ইসলাম ধর্মের যাত্রা শুরু । সেই ইসলাম ধর্মের অনুসারী মুসলমান হয়ে, যদি আমরা সত্যবাদী না হই; সেটাও আমাদের জন্য সম্মানজনক নয় ।  আবার বাস্তবে একে অপরকে অবিশ্বাস করার অন্য একটি খারাপ দিকও আছে । পেশাগত কারণে সব শ্রেণিপেশার মানুষের সাথে আমার মেলামেশার সুযোগ হয় । ভালো-মন্দ মানুষ সব পেশাতেই আছে । পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস না থাকলে যেকোন পেশার মন্দ মানুষেরা, ঘোলা জলে মাছ শিকারের মত সুযোগ পেয়ে যায় । যেমন,   নিজের বাবা খুন হয়েছে বলে থানায় মামলা করতে গেলে, সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা যদি মন্দ কেউ হন; তাহলে তিনি মামলা না নিয়ে ছেলেকেই সেই খুনের অপরাধে গ্রেপ্তার করতে পারেন । সমাজে নিজের ছেলে কর্তৃক বাবা খুন হওয়ার ঘটনা অতিব্যতিক্রম হলেও, মানুষের প্রতি অবিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে একজন মন্দ স্বভাবের পুলিশ কর্মকর্তা সেটা স্বাভাবিক বলে চালাতে পারেন  । অন্য পেশার মানুষও তাঁদের ক্ষমতা অনুযায়ী এধরণের সুযোগ নিতে পারেন । এভাবে মিথ্যাবলা চর্চা থেকে বা সবাই মিথ্যা কথা বলে- এ ধরণের বিশ্বাস সবার বদ্ধমুল হলে, সমাজে এক ধরণের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে । এ কারণে শুধু ইসলাম ধর্ম নয়; সকল ধর্মেই সত্যকথা বলার উপর অত্যাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে । আমার জানা মতে, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপের অনেক  দেশ তো বটেই, জাপান, ভুটানসহ এশিয়ার অনেক দেশেও মিথ্যে কথা বলার প্রচলন নেই। যদিও এসব দেশের কোনটাই মুসলিমপ্রধান দেশ নয় । আমাদের দেশেও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে ব্যক্তি, পরিবার এবং প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সত্যকথা বলার চর্চা শুরু হলে, সমাজে পারস্পারিক অবিশ্বাস থেকে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে । এ বিষয়ে আমাদের সকলের সজাগ হওয়া দরকার ।

দ্বিতীয়তঃ আমার ফেসবুক বন্ধু হয়ত মনে করেন, যিনি গাড়িতে চড়েন,  তিনি উদ্যানে হাঁটেন না । কারণ প্রবাদবাক্যে আছে- ‘লেখাপড়া করে যে, গাড়ীঘোড়া চড়ে সে’  । তাই সত্যসত্যই কেউ যদি গাড়ীঘোড়া চড়েন, তাহলে তিনি মাটিতে হাঁটবেন না । এ ধরণের প্রবাদবাক্য সমাজের অনেক ক্ষতি করেছে । এই প্রবাদবাক্য  সমাজকে সুস্পষ্টভাবে ‘গাড়িঘোড়ায় চড়া শিক্ষিত মানুষ’ এবং ‘গাড়িঘোড়ার সুবিধাবঞ্চিত’ অশিক্ষিত মানুষ’ - এ দুভাগে ভাগ করেছে । কোন কোন শিক্ষিত মানুষের মধ্যে এই বিভেদ  এমন বদ্ধমূল যে, তারা সাধারণ মানুষের সাথে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে লজ্জা বোধ করে । তবে, মহান সৃষ্টিকর্তা এ বিষয়ে সত্যিকারের ন্যায়বিচারকের ভূমিকা পালন করেছেন । তিনি মানুষের দেহকাঠামো এমনভাবে তৈরি করেছেন যে, কেবলমাত্র ঘাম ঝরালেই এই দেহগাড়ি সুস্থ থাকে । এ কারণে রাজাবাদশাদের ছেলেমেয়েদেরও ভোরের আরামের ঘুম  ভেঙ্গে, শারীরিক কসরত করতে দেখা গেছে । মুটে মুজুরের মত পরিশ্রম করলেও শরীরে ঘাম ঝরে; আবার শারীরিক কসরত করলেও শরীরে ঘাম ঝরে । এভাবে শরীরের ঘাম ঝরিয়ে সুস্থ থাকার ক্ষেত্রে মানুষে মানুষে কোন পার্থক্য নেই । আমরা মানুষে মানুষে যে পার্থক্য রচনা করি, তা একেবারেই কৃত্রিম; মৌলিক কিছু নয় । তাই, প্রয়োজনে হাঁটা, গাড়িতে চড়া বা জীবন- জীবিকার জন্য  শারীরিক পরিশ্রমের কোন কাজ করার মধ্যে হীনমন্যতার কিছু নেই । বরং, তা অনেক সম্মানের ।


 


 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT