Main Menu

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০১৮ - ইশতেহারের গুরুত্ব

মোঃ শফিকুল আলম:জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে যে নির্দিষ্ট মেয়াদে একটি রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করতে পারলে সুনির্দিষ্টভাবে দেশের জন্য যা’ যা’ ১০০% বাস্তবায়ন করবেন তার বিস্তারিত বিবরন লিখিত আকারে প্রকাশ করে জনগনের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে থাকেন - এটিই মূলত: ইশতেহার। এক্ষেত্রে এই চুক্তির শুধুমাত্র ৫% বিচ্যুতি গ্রহনযোগ্য। চুক্তিভঙ্গের জন্য জনগনের যেকোনো প্রতিনিধি আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন। তার জন্য দেশের সাধারন চুক্তি আইনই যথেষ্ট। সুতরাং ইশতেহার একটি আইনী বিষয়ও বটে।

 

আবারও বলছি ইশতেহার একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের সাথে সম্পৃক্ত। কোনোক্রমেই একটি রাজনৈতিক দলের দীর্ঘ মেয়াদের ভিষনকে সম্পৃক্ত করে এই চুক্তিনামাকে লঙ্ঘনের সুযোগ নেই। কোন্ রাজনৈতিক দল আগামী একশ’ বছরে কি করবেন তা’ সম্পূর্ণ ভিন্ন দলিল। সেই দলিলে পাঁচ বছর মেয়াদে কি করবেন তা’ও থাকতে পারে এবং সেটা যেকোনো সময়ে একটি রাজনৈতিক দল প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু কোনো মতেই নির্বাচনকে সামনে রেখে শত শত পৃষ্ঠা সম্বলিত একশ’ বছরের কর্মসূচী ইশতেহারে সংযোজন করে নির্দিষ্ট পাঁচ বছর মেয়াদের জনগনের সাথে করা চুক্তি লঙ্ঘনের সুযোগ নেই। অর্থাৎ এই মেয়াদে করতে পারি নাই কিন্তু পূণ:নির্বাচিত করলে আমাদের শত বছরের অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে আগামী মেয়াদে করবো বলার কোনো সুযোগ নেই। তাই ইশতেহারের গুরুত্ব নেই বলে যেসব বিদ্বান, সুশীল, জ্ঞানী/গুনী টকশোতে গলাবাজী করছেন তারা হয়তো ইশতেহারের সজ্ঞা বুঝতেই ভুল করছেন। যারা একশ’ বছরের করনীয়কে ইশতেহার বলে কোনো কোনো রাজনৈতিক দলকে ক্রেডিট দিতে চাচ্ছেন তারা আহাম্মকের স্বর্গে বাস করছেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে পাঁচ বছরে সীমাবদ্ধ থাকুন।

 

ইশতেহার কখনো ভেগ টার্মে হয়না। ইশতেহার অনেকটা পাঁচ বছরের আগাম বাজেট। অর্থাৎ ইশতেহারের প্রতিটি বিষয় আর্থিকভাবে পরিমাপযোগ্য হতে হবে। এবং প্রতি বছরের আলাদা আলাদা করনীয় নির্দিষ্ট করে তার আর্থিক ব্যয় এবং আয়ের উৎস পর্যন্ত বলে দিতে হবে। ইশতেহার পুরোপুরি ক্যালকুলেটিভ হতে হবে।

 

এবারে দুটি প্রধান জোট এবং দু’টি জোটের প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দলের প্রকাশিত ইশতেহার নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করা যাক্। ইশতেহারের সজ্ঞানুযায়ী কোনো একটি ইশতেহার যে করা হয়নি সেটা স্পষ্ট। তারপরও যে যেভাবেই প্রকাশ করে থাকুন কিছুটা আলোকপাত করা যাক্। ক্ষমতাসীন মহাজোটের প্রধান শরীক আওয়ামীলীগ সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রী চলোমান উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করে ২১ দফা কর্মসূচী ঘোষনা করেছেন। কোন্ কাজটি পাঁচ বছর মেয়াদের কোন্ আর্থিক বছরে করবেন, ব্যয়ের বিবরন বা আয়ের উৎসের কোনো নির্দিষ্ট বিবরন নেই। তরুনদের ব্যাপক কর্ম-সংস্থানের কথা বলা হয়েছে। দেশে এবং বিদেশে কর্ম-সংস্থানের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কর্মক্ষম করে তোলার জন্য কি অবকাঠামোগত (শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ) পদক্ষেপ নিবেন এবং তার জন্য প্রতিবছর কি পরিমান বরাদ্দ থাকবে এর কোনো সুনির্দিষ্ট বিবরন নেই। উন্নয়নের কথা দৃঢ়ভাবে উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু গনতন্ত্র, সুশাসন এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গত শাসনামলে যে ব্যত্যয় ঘটেছে তা’ পূণ:প্রতিষ্ঠায় ততটাই ক্ষীণ কন্ঠ উচ্চারিত হয়েছে। দুর্নীতি এবং মাদক ব্যবসায় দমনে জিরো টলারেন্সের কথা বললেও চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের এবং চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী বদির স্ত্রীকে নোমিনেশন দিয়ে ইশতেহারে বর্নিত প্রতিশ্রুতি প্রথমেই ভঙ্গ করা হয়েছে। সরকারে থেকে যা’ করা হয়নি, সরকারে পূণরায় গিয়ে করার অঙ্গীকার কতটা বিশ্বাসযোগ্য হবে? ২১ দফা ইশতেহারে নতুন কিছু নতুন করে উল্লেখ করার নেই। দীর্ঘ মেয়াদের কর্মসূচী সংযুক্ত করে বরং নির্দিষ্ট মেয়াদে করনীয়কে insignificant করা হয়েছে।

 

অপরদিকে বিরোধীজোট বা ঐক্যফ্রন্টের ঘোষিত ইশতেহারে তেমন অমিল নেই। গত দশ বছরে নাগরিক সমাজের কিছু জনপ্রিয় দাবী-দাওয়া যোগ করে বিশেষ করে ঐক্যফ্রন্ট অনেকটা আগামী মেয়াদে ক্ষমতায় গেলে কি করবেন তার একটা বর্ননা দিয়েছেন। ইশতেহারের বেসিক ক্যারেক্টার এখানেও নেই। ঊনিশ দফা ইশতেহারের দু’একটা নিয়ে আলোচনা করা যায়। এই ইশতেহারে তারা গনতন্ত্র এবং আইনের শাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর জোর দিয়েছেন। নির্বাচনী ব্যবস্থা স্বচ্ছ করার কথা বলেছেন। তারা দেশ পরিচালনায় সবপক্ষের অংশগ্রহনের সুযোগের কথা বলেছেন যেটা সংসদীয় গনতন্ত্রের মূল কথা। তারা রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যের কথা বলেছেন। এটি সংসদীয় গনতন্ত্রের কনসেপ্টের সাথে যায়না। সংসদীয় গনতন্ত্রে প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রীপরিষদ সংসদের কাছে জবাবদিহি থেকে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষিত হয়। রাষ্ট্রপতি এখানে অর্নামেন্টাল। তারা এই ভারসাম্য কিভাবে নিশ্চিত করবেন তা’ও বলেননি। তারা চাকুরীতে প্রবেশে বয়সসীমা না রাখার কথা বলেছেন। অস্ট্রেলিয়াসহ উন্নত দেশে চাকুরীতে প্রবেশের বয়সসীমাকে আইনানুযায়ী discriminatory এবং দণ্ডনীয় করা হয়েছে। ধর্ম, বর্ন বা বয়সের কারনে চাকুরী পাওয়া থেকে কাউকে বন্চিত করা যাবেনা। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমার বিবেচনায় গ্রহনযোগ্য নয়। তরুন শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠীর মাঝে ক্ষোভের জন্ম দিবে। এটি বাস্তবতাবিবর্জিত হয়েছে বলে আমার মনে হয়েছে। সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছে সংস্কারের কথা বাস্তবসম্মত এবং সময়োপযোগী। বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল সিকিউরিটি এ্যাক্ট বাতিল করা যেমন সময়ের দাবী তেমনি ডিজিটাল ক্রাইম বন্ধের ব্যাপারে বাস্তবসম্মত কোনো বিকল্পের কথা বলা হয়নি। স্পেশাল পাওয়ার এ্যাক্ট বাতিল করা সমর্থনযোগ্য। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার অব্যাহত রাখা এবং কমিশন গঠন করে ধারাবাহিকভাবে যেকোনো সময়ে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার অব্যাহত রাখা উচিত। সেক্ষেত্রে Rapid Action ব্যাটেলিয়ানসহ বিভিন্ন বাহিনী বিভিন্ন সময়ে যে গুম, খুন করে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে তারও বিচার নিশ্চিত করা যাবে। আর্থিক খাতে দুর্নীতি তদন্তেও কমিশন গঠন করা উচিত।

 

বর্তমান সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ৩০ ডিসেম্বর একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করে জনগনকে তাদের নিজেদের সরকার গঠনের সুযোগ দেয়া। যারাই ম্যাণ্ডেট পাবেন তখন তারা তাদের ইশতেহার বাস্তবায়নের মূলত: আইনগত অধিকার পাবেন। আমার ধারনা এই নির্বাচনটি ইতোমধ্যে যেমন অংশগ্রহনমূলক হয়েছে তেমনি সুষ্ঠু পরিবেশে সাধারন মানুষের ভেটাধিকার প্রয়োগের মধ্য দিয়ে সর্বকালের ইতিহাস ম্লান করে দিয়ে স্বচ্ছ, অবাধ এবং নিরপেক্ষ হবে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে নির্বাচনী পরিবেশ পুরো পাল্টে যাবে।

 

ক্ষমতাসীন জোটের নেতারা যা’ই বলুন এবং যে আচরনেই থাকুন বা আছেন তা’ ইতোমধ্যে পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী সুষ্ঠু নির্বাচনে জয়লাভের ব্যাপারে confident রয়েছেন। তাঁর মধ্যে জনগনের ওপর গভীর আস্থা রয়েছে। তবে সাধারন সম্পাদকসহ অধিকাংশের মধ্যে হেরে যাওয়ার ভয় রয়েছে। সেকারনে একটা অস্থির পরিবেশ এখনও রয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত থাকবেনা। অপরদিকে যেকোনো পরিস্থিতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকছেন বিরোধী জোট। নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার সম্ভাবনা সেখানেই। সকল অশুভ দূর করে গনতন্ত্রের ধারা অব্যাহত থাক্।


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT