Main Menu

১৯৭১ এর ৮ মাস ২১ দিনের যুদ্ধ কি মুক্তি-যুদ্ধ না শুধুই স্বাধীনতা-যুদ্ধ?

মোঃ শফিকুল আলম: ৭ মার্চ ১৯৭১-এ বঙ্গবন্ধু’র ঐতিহাসিক ভাষনের bottom line বিশ্লেষণ করে দেখি। “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

 

বিশিষ্ট বিদ্যান, জ্ঞানী-গুনিজন এবং গবেষকগণ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে একটি মহাকাব্য বলেছেন। ১৮ মিনিটের অলিখিত এই ভাষণের প্রতিটি লাইন এবং শব্দের ব্যবহার এবং চয়ন নিয়ে নানান সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।বক্তব্যের কথামালার পূর্বাপর বা তাঁর অভিব্যক্তির বিন্নস্তিকরন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বিশ্লেষকগনও বিস্ময় বোধ করেছেন যে একটি tensed moment-এ কোটি মানুষের অভিব্যক্তিকে নিজের অভিব্যক্তির সাথে এক করে সময়ের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে কি করে এত সারিবদ্ধভাবে তিনি এরকম একটি মহাকাব্য রচনা করলেন!

 

ইউনেস্কো এই কালজয়ী ভাষণটিকে ‘Memory of the World International Registrar’-এ অন্তরভূক্ত করে উপরোক্ত বিশ্লেষণের যথার্ততা প্রমান করেছে।

 

এবারে মুক্তির সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার সংগ্রাম নিয়ে কথা বলা যাক্।বাঙ্গালীর মুক্তির সংগ্রামের শুরু বহুকাল পূর্বে।অনেকের মতে হাজার বছরের সংগ্রাম। ইতিহাস থেকে, সাহিত্য-সংস্কৃতির বর্ননা থেকে এবং বিভিন্ন সময়ে যখন filming শুরু হয়েছে তখন থেকে নির্মিত সিনেমায় তার প্রমান পাওয়া যায়।

 

নানান শাসন-শোষন এবং বন্চনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, বিপ্লবের ধারাবাহিকতায় ভারত উপ-মহাদেশের বদ্বীপ অন্চল যেটির একটি আলাদা বৈশিষ্ট্য এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং ভাষাগত ঐক্যের কারনে সহজেই একটি আলাদা জাতিসত্বায় চিহ্নিত করা গিয়েছিলো এবং তা’ ছিলো বাঙ্গালী জাতিস্বত্বা।এই জাতিস্বত্বায় স্বাধীনচেতা মনোভাবটি সবচাইতে বেশি প্রবল ছিলো। এই বিশেষ অন্চলের সকল ধর্মের সকল মানুষ শোষনের বিরুদ্ধে একাট্টা ছিলো। শোষন এবং বন্চনার বিরুদ্ধে মুক্তির চেতনায় যে জাতিসত্বার উন্মেষ তার মধ্যেই গ্রোথিত ছিলো স্বাধিকার এবং আত্মনিয়ন্ত্রনাধিকারের (স্বাধীনতা এবং স্বাধীন ভূখন্ড) বীজ।

 

ভারত উপ-মহাদেশে সবচাইতে দীর্ঘ সময়ের ব্রিটিশ শাসন এবং শোষনের অবসানকল্পে পৌনে দু’শ বছরের সংগ্রামে বাঙ্গালীদের বীরোচিত ভূমিকার কথা সর্বজন বিদিত।ক্ষুদিরাম, তীতুমীর, মাষ্টারদা সূর্যসেন, প্রীতিলতা, নেতাজি শুভাষ প্রমুখ সংগ্রামীদের মুক্তি এবং স্বাধীনতার আন্দোলন এবং জীবনদান ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটাতে পারলেও মুক্তিপ্রিয় বাঙ্গালীকে মুক্তি বা স্বাধীনতা কোনোটিই দেয়নি।

 

মুক্তিকামী সকল সংগ্রামীগন মনের চেতনে-অবচেতনে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেন।তারা মনের ক্যানভাসে আত্মনিয়ন্ত্রনাধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুক্তির দিক-দর্শন আঁকেন।

 

ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটলেও বাঙ্গালীরা নতুন করে দ্বিজাতি তত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের শাসন এবং শোষনের বেড়াজালে আবদ্ধ হলো।বাঙ্গালীর মুক্তি বা স্বাধিকার সুদূর পরাহত হলো।

 

পাকিস্তানি শাসকগোস্ঠী বাঙ্গালী হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টানের মুক্তি আন্দোলনের প্রধান অস্ত্র ভাষার ওপর প্রথম আক্রমন করলো।বাঙ্গালীরা পাকিস্তানের পপুলেশনের মেজরিটি হলেও শাসকগোস্ঠী উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষনা পাকিস্তান সৃষ্টির ৬/৭ মাসের মধ্যেই ১৯৪৮-এর মার্চে বেশ জোড়ালোভাবে বলতে থাকে।

 

এসব ইতিহাস সবার জানা।শোষকরা কখনো জনগনের মনের অনুভূতি বা আকাঙ্খাকে সম্মান করেনা। ফলত: বাঙ্গালীর মুক্তির সংগ্রামে সৃষ্টি হলো আরেকটি রক্তাক্ত অধ্যায় ৫২’র ২১ ফেব্রুয়ারী।রক্তের আখরে বাঙ্গালী প্রতিষ্ঠিত করলো মায়ের ভাষা বাংলা।রফিক, শফিক, জব্বার, বরকতের রক্তদানে বাঙ্গালী প্রতিষ্ঠিত করলো তাদের প্রতিবাদের ভাষা।

 

২১-এর সেই মহালগ্নে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের চেতনা আর ধনতান্ত্রিকতার বদলে গনতান্ত্রিকতার উন্মেষ একটি প্রত্যক্ষ সংগ্রামে উজ্জ্বীবিত হয়েছিলো।প্রয়োজন ছিলো সকল প্রাণের প্রদীপে প্রদীপ্ত এক মহান নেতার।আবির্ভাব ঘটেছিলো সেই মহামানবের। শেখ মুজিবুর রহমান। একটি নাম, একটি চেতনা, একটি সৃষ্টিমুখর সংগ্রাম। তিনি এলেন জাতির কান্ডারী হয়ে। জাতীয়তাবাদের নৌকাটির হাল ধরলেন।

 

মুক্তির সংগ্রামে তিনি নতুন মাত্রা যোগ করলেন। ধীরে ধীরে মানুষের মনোজগতে সৃষ্টি করলেন স্বাধিকার এবং স্বাধীনতার চেতনা এবং দ্যোতনা। আমরা ইতিহাস থেকে এর ধারাবাহিকতাগুলো সম্পর্কে অবগত।১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৫৬-এর শাসনতন্ত্র আন্দোলন, ৫৮’র মার্শালল বিরোধী আন্দোলন, ৬২’র শিক্ষা-আন্দোলন,৬৬’র ৬-দফা বা স্বায়ত্বশাসন আন্দোলন, ৬৯’র গন-আন্দোলন ১৯৭০-এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামীলীগের নিরঙ্কুষ বিজয় মুক্তির আন্দোলনে এই পর্যায়ে যুক্ত করলো স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের ঘোষনা।

 

মুক্তি আন্দোলনের সকল নেতৃত্বকে ছাঁপিয়ে এই পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ হলো এক এবং অভিন্ন। একটি বজ্রকন্ঠ কোটি কন্ঠে ধ্বনিত হলো।একটি কন্ঠে গীত হলো, “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” এখানেও তিনি মুক্তির সংগ্রামের ঘোষনা প্রথমে বললেন। সেদিনের সাড়ে সাত কোটি মানুষের ভাষ্যকর শেখ মুজিব যাঁর অনুপস্থিতিতে বাংলার মানুষ তাদের প্রিয় নেতা এবং বন্ধুর বানীকে প্রমূর্ত করে তোলার দূর্জয় সাধনায় আত্মবলি দিতে মুক্তযুদ্ধে ঝাপিয়ে পরেছিলো।

 

তাহলে মুক্তিযুদ্ধকে শুধুমাত্র স্বাধীনতাযুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ করলো কারা এবং কখন? ১৯৭৫ সালের পরবর্তী সরকারের মধ্যে জনাব জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতাযুদ্ধের দ্যোতনাগত পার্থক্য বুঝেই ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকে স্বাধীনতাযুদ্ধে সীমাবদ্ধ করেছিলেন।কেন তিনি সেটি করেছিলেন তা’ সহজবোধ্য। ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ এই দীর্ঘ মুক্তির সংগ্রামে তিনি বা তাঁর সমর্থকদের কোনো অংশগ্রহণ ছিলোনা। তিনি সহজেই নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করতে মুক্তিযুদ্ধকে ৯ মাসের স্বাধীনতাযুদ্ধে সীমাবদ্ধ করেছিলেন এবং ইতিহাস বিকৃত করেছিলেন।

 

এখনো শোনা যায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের মুখবন্ধে নাকি মুক্তিযুদ্ধের স্থলে শুধুমাত্র স্বাধীনতাযুদ্ধ কথাটি রয়েছে। এমনকি সংবিধানের মুখবন্ধেও নাকি মুক্তিযুদ্ধ কথাটি নেই।এত দীর্ঘ সময় আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় থাকলেও এই সূক্ষ্ম বিষয়গুলিতে নজর দেয়ার সময় পায়নি বা দায়িত্বপ্রাপ্তরা তাদের নেতা বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটিই হয়তো হৃদয়ঙ্গম করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

 

যে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বা বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের চেতনায় বাংলাদেশ হলো সেদেশের সংবিধানে একটি বিশেষ ধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে সেই চেতনা বিষর্জন দেয়া হয়েছে।

 

মুক্তির আন্দোলন চলমান। মুক্তিযুদ্ধও চলমান।১৯৭২-এ বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন শেষে তাই তাঁর চলমান মুক্তির আন্দোলনের কথা পূণর্ব্যক্ত করে অর্থনৈতিক মুক্তির আন্দোলনের সুনির্দিষ্ট কর্মসূচী ঘোষনা করেছিলেন। ইতিহাস এবং ঐতিহ্যকে যতক্ষণ পর্যন্ত প্রজন্মান্তরে যথাযথভাবে উপস্থাপন করা না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত একটি দেশপ্রেমিক জনগোষ্ঠী গড়ে ওঠেনা।বর্তমান জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার জাতির এই মৌলিক বিষয়গুলিকে নিজের থেকে দেখবেন বলে সকলের প্রত্যাশা।


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT