Main Menu

হলুদ সাংবাদিকতা

কালাম ফয়েজী: পীর হাবিব তো সত্য পীর না, তিনি মূলত ভ- পীর। কথায় কথায় বললেন প্রেসক্লাবের একজন বিজ্ঞ সাংবাদিক। তিনি দুঃখ করে বললেন  ‘হাবিব কিভাবে ধানের শীষকে অভিশপ্ত ধানের শীষ বলতে পারেন? যদি আমরা সব নৌকাকে গয়রহ অভিশপ্ত নৌকা বলি, কথাটা কি ঠিক হবে? যে নৌকায় চড়ে তার বাবা মায়ের মৃত্যু হয়েছে, কেবল আমরা সে নৌকাটাকে অভিশপ্ত নৌকা বলতে পারি। সব নৌকাকে আমরা অভিশপ্ত নৌকা বলতে পারি না, বলা ঠিক না। বললে নিজের অজ্ঞানতা-মূর্খতাই প্রকাশ পায়।’
সাংবাদিক সাহেব আরো বলেছেন ‘পীর হাবিবের কথার তীর্যক ফলার ধার দেখে মনে হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর অনুদান হিসেবে দেয়া বিশ কোটি টাকার একটা ভাল হিস্যা তার পকেটেও ঢুকেছে। হিস্যার গরমে উত্তেজিত হয়ে এখন উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করছেন। যতই সত্যকে অসত্য আর মিথ্যাকে সত্য বলে জাহির করুন না কেন, মানুষ আর তাদের কথায় আলোড়িত হবে না। কারণ, মানুষ এখন আর বোকা না। তাদের বোকা মনে করাও বোকামি ছাড়া আর কিছু না। জয়বাংলা সেøাগান দিয়ে রাতের অন্ধকারে ডাকাতি করবেন, আর দিনের বেলা নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিয়ে ক্রেডিট নিবেন, সেরকম ব্লাফ দেয়ার দিন আর আসবে না।”
কথা উঠেছিল গতকাল ১০ নভেম্বর ২০১৮ইং ‘বাংলাদেশ প্রতিদিনে’ প্রকাশিত সাংবাদিক কলামিস্ট পীর হাবিবের একটি লেখা নিয়ে। লেখার শিরোনাম ছিল “নয়া বোতলে পুরনো বিষ, মনোনয়ন বাণিজ্যে অভিশপ্ত ধানের শিষ”। আদ্যপান্ত লেখাটা পড়লাম। কিন্তু কোন অংশ উল্লেখ করে তাকে ধন্যবাদ দিবÑ এমন একটা লাইন পেলাম না। পুরো লেখা জুড়ে গাঁজাখুরি এবং আষাঢ়ে গল্পের মত তাচ্ছিল্যের প্রকাশ। অবশ্য শেষের দিকে বিএনপি নেতা শামসুজ্জামান দুদু, এড. তৈমুর আলম খন্দকার, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, এহসানুল হক মিলন এবং রুমিন ফারহানা সহ এমন কয়জন নেতার নাম উল্লেখ করেছেন, নিয়োগ বাণিজ্যের জন্য যারা মনোনয়ন লাভে ব্যর্থ হয়েছেন। তাদের ত্যাগের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি দুঃখে দু’ফোটা চোখের জলও ফেলেছেন। তার মত এত বড় পীরের চোখে জল দেখে আমার চোখে জল চলে এসেছিল। আমি অনেক কষ্টে সে জল ঠেক দিয়ে রাখার চেষ্টা করেছি আর কি!
মুশকিল হল, পীর হাবিবরা সবসময় বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের কষ্ট দেখে কষ্ট পান, কিন্তু আওয়ামী দুঃশাসন দেখে কষ্ট পান না। আওয়ামী নির্যাতন এবং গণতন্ত্রহীন একদলীয় শাসন-শোষণে দেশব্যাপী যে হাহাকার উঠেছে সেটাও তিনি দেখতে পান না। আওয়ামী পৈশাচিক নির্যাতনে বিএনপি নেতাকর্মীরা বছরের পর বছর বাড়িছাড়া, এলাকা ছাড়া, কেউ কেউ দেশছাড়া, সেটা তিনি দেখেন না। কত নেতাকর্মী খুন-গুমের শিকার হয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, হাজার হাজার সমৃদ্ধ সম্মানিত পরিবার পথে বসেছে, সেটাও তিনি দেখতে পান না।
অবশ্য তিনি এক জায়গায় বিএনপি নেতাকর্মীদের ত্যাগের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে একটা সত্য বাক্য বেফাঁস বলে ফেলেছেন। তিনি বলেছেন  “টানা ১২ বছর বিএনপি নেতাকর্মীরা নির্যাতন নিপীড়ন ও নির্বাসনের সাজা ভোগ করেছেন। তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার, মামলার জালে আটকা। পুলিশের তাড়া খেয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত। স্বাভাবিক জীবনযাপনের শান্তি ও স্বস্তি হারাম। অনেকের প্রত্যাশা ছিল এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জয়-পরাজয় যা-ই হোক বিএনপি ঘুরে দাঁড়াবে।”
পীর হাবিবকে যদি প্রশ্ন করিÑ বিএনপি নেতাকর্মীরা কোন অপরাধে নিপীড়ন নির্যাতনের শিকার? কি কারণে তারা বাড়িছাড়া, দেশছাড়া? নিজেদের পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে? বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া থেকে শুরু করে একজন ওয়ার্ডকর্মী পর্যন্ত লাখ লাখ নেতাকর্মী কয়েদখানায় পঁচছে, কী তাদের অপরাধ? কেন এক একজন নেতাকর্মীর নামে শয়ে শয়ে মামলা? 
নির্বাচনের তারিখ ঘোষিত হয়েছে। একপক্ষ হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেও দিব্যি ভোটের মাঠে নৌকা প্রতীক নিয়ে সোচ্চার প্রচার-প্রচারণায় নেমে পড়েছে। আরেক দল ভোটের মাঠে তো যেতেই পারছে না, বরং কোর্টের বারান্দায় ঘুরে ঘুরে তাদের দিন কাটছে। কোর্টে গেলে দেখবেন অতিশয় নিরীহ নিরপরাধ গরীব দুঃখী মানুষগুলি গায়েবী মামলার আসামী হয়ে একটু জামিনের জন্য কীভাবে দিনের দিন কষ্ট পাচ্ছে। তাদের নেই থাকার জায়গা, নেই খাওয়ার নিশ্চয়তা। যারাও সব বাধা অতিক্রম করে মাঠে যেতে সক্ষম হয়েছেন, তারাও নানারকম মারধরের শিকার হচ্ছে। প্রশাসনও তাদের সহযোগিতা দেয়ার সাহস পাচ্ছে না। আপনাদের মতো একচোখা পীররা মানুষের এ অবর্ণনীয় কষ্ট দেখতে পান না।
লীগ সরকার ক্ষমতায়। তারা কি বৈধ বা অবৈধ সেটা আমার বলার বিষয় নয়। সেটা বলবেন রাজনীতিকরা। যাচাই করবে ইতিহাস। কিন্তু তারা যে দেশশাসনের নামে দেশে একধরনের ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেনÑ সেটা কি আপনি অস্বীকার করতে পারবেন? এক বন্ধুকে বলছিলাম " তুমি লীগের সমর্থক বলে তাদের অন্যায়টা তোমার চোখে পড়ে না। যদি একটু সাহস করে সামান্য সময়ের জন্যও একটু বিপক্ষে অবস্থান নাও, দেখতে পারবে আওয়ামী লীগ কী চিজ। তোমার খারাপ লোক হতে সেকেন্ড সময়ও লাগবে না। আর রাজাকার উপাধি পেতেও তেমন বেগ পেতে হবে না।
পীর হাবিব ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন। এখনো তিনি অন্ধভাবে লীগ সরকারের পক্ষেই কাজ করে যাচ্ছেন। তার লেখা পড়লেই যে কেউ বুঝতে পারবেন, লেখায় উল্লেখ করার মত কোন উপাত্ত নেই। তবুও ইনিয়ে বিনিয়ে কতভাবে বিএনপিকে নিয়োগ বাণিজ্যের প্রসঙ্গ টেনে ঘায়েল করার চেষ্টা করেছেন। একসময় প্রেসক্লাবে এমন কথাও শুনতামÑ “বিএনপির বিরুদ্ধে কলাম লেখার জন্য তথ্য উপাত্তের দরকার হয় না।” এখনো লীগসমর্থক সাংবাদিকরা সেই ধারণা থেকেই বিএনপির বিরুদ্ধে যাচ্ছেতাই লেখেন, ইচ্ছেমত কষে গাল দেন। এভাবে গাল দিতে গিয়ে নিজেরা যে ভিতরে ভিতরে মর্যাদা হারান, সেটাও তারা বুঝতেও চান না।
পীর হাবিব ধানের শীষকে অভিশপ্ত বলেছেন, আমার কষ্টটা এখানেই। এজন্যই আমি প্রতিবাদস্বরূপ এই লেখাটা লিখছি। পীর হাবিবের জ্ঞাতার্থে বলছি, পীর হাবিব ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন, অবশ্য একসময়কার ছাত্রলীগ সভাপতি অনলবর্ষী বক্তা এডভোকেট ফজলুর রহমানের চেয়ে নিশ্চয়ই বড় নেতা ছিলেন না। তিনি ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত লীগের চরম দুঃসময়ে ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং টানা ৩২ বছর আওয়ামী রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি সম্প্রতি একুশে টিভিতে প্রচারিত একটা টক শোতে বলেছেন, কিভাবে খোদ আওয়ামী লীগের প্রতিবাদী সাহসী নেতারা দল থেকে ছিটকে পড়েছেন। তিনি সে সাক্ষাৎকারে বড় বড় লীগ নেতাদের একটা ফিরিস্তি তুলে ধরেছেন। আমি এত নেতার নাম মনে রাখতে পারিনি। আমি কেবল আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা ভাসানী, সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কর্নেল এম এ জি ওসমানী থেকে শুরু করে আজকের ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শাহ মোয়াজ্জেম, সাধারণ সম্পাদক কে এম ওবায়দুর রহমান, মাহমুদুর রহমান মান্না, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর, আ স ম আব্দুর রব, এ কে খন্দকার, অধ্যাপক আবু সাঈদ, মোস্তফা মহসিন মন্টু, রেজা কিবরিয়া, গোলাম মাওলা রনি পর্যন্ত কয়জনের নাম বলছি মাত্র। এরা কি আওয়ামী লীগের বড় নেতা ছিলেন না? ফজলুর রহমান বলেছেনÑ আওয়মী লীগ একটি অভিশপ্ত রাজনৈতিক দল। সেবা নেয়ার সময় দলটি তার কর্মীনেতাদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ সেবা নেয়। পরে সে আর তার সন্তানদের মনে রাখে না। তিনি তাদের তালিকায় শেখ মুজিবের চার খলিফা হিসেবে পরিচিত এবং আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ ত্যাগস্বীকারকারী নেতা শাজাহান সিরাজ, নূরে আলম সিদ্দিকী, সিরাজুল আলম দাদাভাই, আব্দুল কুদ্দুস মাখনসহ অনেকের নাম বলেছেন। তাদের মধ্যে আছেন ৬৬-এর পরের লীগ অফিসে বাত্তি জ্বালানোর একমাত্র কা-ারী আমেনা বেগম, স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠকারী অধ্যাপক ইউসুফ আলী, ছাত্রলীগ নেতা মুকুল বোস, ছাত্রলীগ সভাপতি ফেরদৌস আহম্মদ কোরেশী, ছাত্রলীগ সভাপতি আব্দুর রউফ, ছাত্রলীগ সভাপতি শেখ শহিদুল ইসলাম, ছাত্রলীগ সভাপতি মনিরুল হক চৌধুরী, এছাড়া সাধারণ সম্পাদক এম এ রশিদ, এম এ আউয়াল, বাহালুল হক চুন্নু, ক্ষুদিরাম হিসেবে পরিচিত বিশ্বজিত নন্দি, জাগপার শফিউল আলম প্রধানÑ এ উচ্চস্থানীয় নেতাদের কে আওয়ামী লীগ করেননি?
আমি যদি পীর হাবিবকে প্রশ্ন করিÑ খোদ শেখ মুজিব কি আওয়ামী লীগ করে মরতে পেরেছেন, তিনি কী উত্তর দেবেন? মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ, প্রথম অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুর আলী প্রমুখ দিকপাল নেতারাও কি আওয়ামী লীগ করে মরতে পেরেছেন? পারেননি। তারা মরেছেন বাকশালের সদস্য হিসেবে। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়রি শেখ মুজিব যখন সকল রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে একমাত্র দল বাকশাল গঠন করলেন, তখনই বলা চলে মুজিব নিজ হাতে আওয়ামী লীগের কফিনে পেরেক ঠুকে দেন। পরে তার জীবদ্দশায় আওয়ামী লীগ স্বনামে আর কোন কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেনি।
এই আওয়ামী লীগ একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে পুনর্জন্ম লাভ করে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়, ১৯৭৮ সালে, যখন তিনি এক অধ্যদেশের মাধ্যমে সকল রাজনৈতিক দলকে  বৈধতা দেন, তখন কেবল আওয়ামী লীগ একটি দল হিসেবে নতুন করে স্বীকৃতি পায়।
আমি বলব, সাংবাদিকতা ভাল, কিন্তু হলুদ সাংবাদিকতা ভাল না। আর একচোখা সাংবাদিকতা তো পেশাদারিত্বের মধ্যেই পড়ে না। আশা করছি, তিনি যা লিখবেন চোখকান খোলা রেখেই লিখবেন। একচোখা হরিণের মতো একদিকে তাকিয়ে লিখবেন না। তাহলে সাংবাদিক শব্দটির প্রতি অবিচার করা হয়।

বিঃ দ্রঃ প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলাকথার এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT