Main Menu

নিজের ঘরে পরবাসী নাকি বৃদ্ধাশ্রম?

বর্ধিত

এখন ফেসবুক কাঁপছে নির্বাচনের জোয়ারে, মাঝে কিছু দিন অরিত্রীর দুঃখজনক বিদায় আমাদের কাঁদিয়েছিল। এর মাঝেও আমার আগের পর্বটা পড়ে অনেকে মন্তব্য করেছেন, আমার নিজস্ব দুই একটা উদাহরণের উপর ভর করে আমি নাকি এটা লিখেছিলাম।

 

আসলে বিষয়টা মোটেও সেরকম না। আমরা অধিকাংশ মানুষ বাইরের ঠাঁট বাট বজায় রাখাতেই ব্যস্ত থাকি, সত্য বলতে ভয় পাই, অন্যকে গালি দিয়ে সুখ পেতে চাই মনে। কিন্তু আমার অনেক আগে থেকেই মনে হয়, যে মা বাবা এতো যত্ন করে আমাদের এতো বড় করে তুলেছেন, তাদের যদি যত্ন করে না রাখতে পা্রি, ঘরের এক কোনায় ফেলে রাখি অবহেলায় বা ভাগাভাগি করি ভাইবোন মিলে তার থেকে সুন্দর পরিবেশ দেখে তাদের পছন্দ মতো একটা জায়গা বেছে নিতে বলাটাই শ্রেয়।

 

 

এখন কিন্তু প্রায়ই একটা খবর শেয়ার হতে দেখা যায়, শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা নাকি বেশি অমানুষ হয়। খবরটা এখন দেখলেও এই বিষয়টারও প্রমাণ পেয়েছিলাম ১৫/১৬ বছর আগে। আমার এক কলিগ ছিল। উনারা অনেক গুলো ভাই বোন। মাশআল্লাহ সব গুলো ভাই বোনই শিক্ষিত ও প্রতিষ্টিত। উনার মা কে দেখেছি কী না মনে নেই। কিন্তু বাবার কথা স্পষ্ট মনে আছে। সাদা ধবধবে পাজামা, পাঞ্জাবী, টুপি ও সেই সাথে দাঁড়ীতে উনাকে দেখতে লাগতো একদম সিনেমায় দেখা শ্বেত সুভ্র দরবেশ বাবাদের মতো। আমার ভীষণ ভালো লাগতো উনাকে। অনেকদিন পর পর দেখতাম ওই কলিগের বাসায়। মাঝে বেশ কিছুদিন দেখতে না পেয়ে একদিন কথা প্রসঙ্গে জানতে চাইলাম আপনার বাবাকে দেখি না অনেক দিন। উনি বাসায় নেই? বেশ সাবলীল ভাবেই উত্তর দিল, সেজো ভাই এর বাসায়।

 

ওহ। আপনার বাবাকে আমার খুব ভালো লাগে। উনি কী আপনার সেজো ভাই এর বাসাতেই থাকে?

 

কিছুক্ষণ চুপ থেকে উত্তর দিলো, আসলে মা বাবা আমাদের সব ভাইদের বাসায় দুই মাস করে থাকে।

 

আমি তো বিষম খাওয়ার জোগাড়। ভাবছেন অন্যদের পার্সোনাল বিষয় নিয়ে ঘাটাঘাটি করছিলাম কী না? না, ওই কলিগের সাথে আমার বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলার মতো যথেষ্ট সুসম্পর্ক ছিল। যাই হোক, ভাগের মা প্রবাদটা পড়েছি বইতে। মা বাবা ভাগাভাগি করে ছেলেমেয়ের বাসায় থাকে তাও শুনেছি, দেখেছি টিভি নাটকে। কিন্তু এতো কাছাকাছি তার প্রয়োগ দেখে আমার বিস্ময় কাটছিল না। তাছাড়া উনার মতো ভদ্রলোকের তো মা বাবাকে একাই দেখা উচিত। বললাম, আপনাদের তো অনেক বড় বাড়ী বলেছিলেন। তা সবার বাসায় পালাক্রমে না থেকে নিজের বাড়ীতে থাকলেই তো পারে।

 

বাড়ী সবাই ভাগ করে নেয়ার পর এই বন্দোবস্ত হয়েছে।

 

সেই দিনই প্রথম আমার আশ্রমের কথা মনে আসে। কারণ আমি তখনও জানতাম না, বাংলাদেশে প্রবীন নিবাস আছে কী না। বললাম, দুইমাসে তো উনাদের পিছনে আপনাদের একটা খরচ হয়। এক কাজ করতে পারেন তো। সব ভাইদের যে টাকা খরচ হয়, সেটা দিয়ে কোনো একটা আশ্রমে রেখে দিতে পারেন। অযথা উনারা টানাটানির হাত থেকে বেচে যায়। আপনাদেরও ঝামেলা কম হয়।

 

কী উত্তর দিয়েছিল এখন মনে নেই। তবে তারও ৩/৪ বছর পরে ফেসবুকে জয়েন করার পর, দেখলাম প্রচুর বিশিষ্ট মানুষের মা বাবাই গ্রামের বাড়ীতে একা থাকে। উনারা মাঝে মাঝে বাড়ীতে যান। সুন্দর সুন্দর বাড়ীর ছবি, মা বাবাকে জড়ায় ধরে ছবি তুলে ফেসবুকে আপলোড দেন। মনে মনে ভাবতাম, ছয় মাসে বা বছরে গিয়ে মা বাবাকে এতো ভালোবাসা দেয়, তাহলে সারা বছর কাছে রাখে না কেন? ভাবনার কারনও ছিল। আপুর শ্বাশুড়ী ও আমার মা আপুর বাসায় থাকতো। আমার শ্বাশুড়ী ধানের সময় বাদ দিয়ে বাকি সময়টা আমাদের সাথে থাকতো। এরপর পদ্মার পানি অনেক দূর গড়িয়েছে। আমার জানা শোনা, দেখার পরিধি বেড়েছে। আমার শ্বাশুড়ি তার কম্ফোর্ট জোন তার স্বামীর ভিটায় স্থায়ী হয়েছে। এখন শুধু মাঝে মাঝে আসা যাওয়া করে। আমার মা ও তার স্বাধীন মতো যেখানে খুশি সেখানে থাকে।

 

এখন কথা হচ্ছে, এই যে বিশাল বিশাল বাড়ীতে মা বাবারা একা থাকে, আসলেই কী উনারা ভালো থাকে? কথা বলার মানুষ নেই, অসুস্থ হয়ে পড়লে ডাক্তার ডাকার মানুষ নেই, খাচ্ছে কী খাচ্ছে না তা দেখার মানুষ নেই। থাকবেই বা ক্যামনে? নিজের ছেলেমেয়েরাই যেখানে তাদের খোঁজ নেয়ার সময় পায় না, সারাদিন ফোনের উপর থাকলেও মা বাবাকে ফোন দেয়ার সময় পায় না, সেখানে থাকলোই না হয় একজন পেইড কেয়ার টেকার, তারাই বা আর কতোটুকু করবে?

 

এই পর্যন্ত পড়ে বা তার আগেই যারা আমাকে গালি দিতে শুরু করেছেন, তারা একটু ভেবে দেখুন এটাই কিন্তু বাস্তবতা। আপনা মা বাবা যদি আপনার কাছে থাকে, সারাদিন পর কাজ থেকে ফিরে এসে তাদের খোঁজ নেন একটুও? হাসি মুখে কথা বলেন? না কি অসুস্থ মা বাবাকে ফেলে রেখে ঘরে দরজা দিয়ে গল্প করেন?

 

এখন আবারও রিপিট করি, মধ্যবিত্ত সেন্টিমেন্ট বাদ দিন, অযথা লোক দেখানো কান্নাকাটি বাদ দিয়ে নিরপেক্ষভাবে বলেন তো, নিজে যদি মা বাবাকে কাছে রাখতে নাই পারেন, কাছে রাখলেও খোঁজ খবর নেয়ার সময় যদি না পান, তাহলে তাদের জন্য কোনটা ভালো হয়? নিজের ঘরে পরবাসী হয়ে থাকা নাকি বৃদ্ধাশ্রম। শুধু মনে রাখবেন, বাড়ীতে একা থাকলেও তাদের আপনার জন্য মন কাঁদবে, বৃদ্ধাশ্রমে থাকলেও আপনার জন্য মন কাঁদবে। বৃদ্ধাশ্রমে বরং সমবয়সী অনেক গুলো মানুষের সাথে থাকবে। বাড়ীতে যেমন মাঝে মাঝে দেখতে যান, ওখানেও না হয় দেখতে গেলেন। জড়িয়ে ধরে ছবি তুলে ফেসবুকে দিলেন, খেয়াল রাখলেন, যেন বৃদ্ধাশ্রমের নামটা ক্যামেরায় না আসে।

 

শেষ

 

  

 

 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT