Main Menu

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০১৮ এবং নানান বিশ্লেষন

মোঃ শফিকুল আলম:নির্বাচনের সকল কার্যক্রম দৃশ্যত: একটি যৌক্তিক পরিনতির দিকে এগুচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। পরিবেশ অনেকটাই ১০ ডিসেম্বরের পরে স্পষ্ট হবে। প্রার্থীতা বাছাই পর্বে রিটার্নিং অফিসারগন নির্দিষ্ট নিয়মের ছকের মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে বেশ কিছু প্রার্থীর প্রার্থীতা বাতিল করেছেন। এর মধ্যে মনোনয়ন ফর্মের সাথে সাপোর্টিপ পেপারের দু’একটিতে প্রার্থীর সহি না থাকার কারনেও করা হয়েছে। এসব ভুল রিটার্নিং অফিসার তাৎক্ষণিকভাবে প্রার্থীকে তাঁর সামনে সহি দেয়ার সুযোগ দিয়ে নিষ্পত্তি করতে পারতেন। এটি পৃথিবীর সর্বত্রই করা হয়ে থাকে। রিটার্নিং অফিসারগন এই সামান্য কারনে প্রার্থীতা বাতিল করে ব্যাপক সংখ্যক মনোনয়ন প্রার্থীকে যেমন নির্বাচন কমিশনে আপীল করতে বাধ্য করে নির্বাচন কমিশনের কর্মযজ্ঞ বাড়িয়ে দিতে সাহায্য করেছে তেমনি প্রার্থীদেরকে অনেকটা হয়রানির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। যারা ঋণখেলাপী এবং দণ্ডপ্রাপ্ত তাদের প্রার্থীতা বাতিল হলে এতো আলোচনা হতোনা। আবার একইভাবে প্রশ্ন উঠেছে সরকারী দলের কিছুসংখ্যক দণ্ডপ্রাপ্ত প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ করা হয়েছে। রিটার্নিং অফিসারগনের ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের তারতম্যের কারনে যেমন বৈষম্যমূলক আচরনের প্রশ্ন উঠেছে তেমনি দায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ওপর বর্তেছে।

 

এতদ স্বত্বেও নির্বাচন কমিশন যদি ঋণখেলাপী এবং দণ্ডিতদের বাদে সামান্য ভুল ইগনোর করে অধিকাংশের প্রার্থীতা ফিরিয়ে দেন তা’হলে নির্বাচন অনুষ্ঠানটি সুষ্ঠু হওয়ার পথে আরেক ধাপ এগিয়ে যাবে। দু’টি প্রধান জোটের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের ইতিবাচক/নেতিবাচক বক্তব্য রয়েছে। কিন্তু লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে মহাজোটের প্রধান নেতা আওয়ামীলীগ প্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকারী রুটিন ওয়ার্কের বাইরে কোনো মন্তব্য করছেননা। নির্বাচনটি সরকারে থেকে তিনি সম্পূর্ণ সুষ্ঠু, অবাধ এবং নিরপেক্ষ করার যে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিলেন তা’ তিনি কার্যত: এখন পর্যন্ত প্রমানিত করতে পেরেছেন। অপর দিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড: কামাল হোসেন খুবই কম কথা বলছেন। তার অর্থ হচ্ছে significant কোনো ব্যত্যয় তিনিও এখন পর্যন্ত দেখছেননা। বিএনপি মহাসচিব যা’ই বলুননা কেনো নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত থাকার ব্যাপারে দৃঢ় রয়েছেন।

 

নানান আলোচনা, ব্যাখ্যা এবং বিশ্লেষন চলছে। বিজয়ের ব্যাপারে কোন্ জোটের পক্ষে কি কি factor কাজ করবে ইত্যাদি বিশ্লেষন চলছে। বিশ্লেষকদের এক পক্ষ ভাবছেন আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট আসন্ন নির্বাচনে ভাসমান ভোটারদের বিশেষ করে নবীন ভোটারদেরকে অধিক মাত্রায় আকর্ষনে সক্ষম হবে। অধিকাংশ বিশ্লেষক এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অভূতপূর্ব উন্নয়ন এবং ভিশনারী লীডারশীপ প্রভাবকের কাজ করবে বলে মনে করছেন। তাদের মতে প্রধানমন্ত্রী তরুন প্রজন্মের কাছে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ভিজুয়ালাইজ করতে পেরেছেন। 

 

আওয়ামী জোটের বিজয়ের ব্যাপারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তবে অনেকটা বিতর্কিত বিষয় কাজ করবে বলেও বিশ্লেষকগন মনে করছেন। বিষয়টি অত্যন্ত সেন্সেটিভ এবং বাংলাদেশের সৃষ্টির সাথে সম্পর্কিত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা- গনতন্ত্র এবং আইনের শাসন, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা, বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মনিরপ্ক্ষতা। অনেকেরই ধারনা স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামীলীগই এই চেতনা এখনও ধারন করে এবং সেকারনেই ঐক্যফ্রন্টের জামায়াত সম্পৃক্ততার বিপরীতে জনগন তাদেরকেই ভোট দিবে। বিতর্কিত এই কারনে যে বিশ্লেষকদের ধারনা আওয়ামীলীগ আর স্বাধীনতাপূর্ব আদর্শে নেই। তারা গত দশ বছর স্বাধীনতার মূলমন্ত্র গনতন্ত্র এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পুরোপুরি বিপরীত অবস্থানে ছিলেন। আইনের শাসনের নামে আইনকে প্রতিপক্ষ দমনে ব্যবহার করেছেন। উন্নয়নের নামে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার নামে বৈষম্য বাড়িয়েছে। বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের বিপরীতে সাম্প্রদায়িক শক্তির সাথে সখ্যতা বাড়িয়েছে আওয়ামীলীগ। সেক্ষেত্রে স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে আওয়ামীলীগ এবং তাদের জোট ভাসমান ভোটারদের আকর্ষিত করতে সক্ষম হবেনা। এক্ষেত্রেও এই জোটের পক্ষের বিশ্লেষকগন বলছেন সরকার বরং দেশের অভ্যন্তরে সকল পক্ষের মধ্যে একটি চমৎকার সমন্বয় সাধন করে শান্তিপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করে দেশে ব্যাপক উন্নয়ন করতে সমর্থ্য হয়েছে। এটি সরকার পরিচালনার কৌশল, আদর্শের ব্যত্যয় নয়।

 

অপরপক্ষে বিশ্লেষকদের একটি বিরাট অংশ মনে করেন ড: কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষে একটি গনজোয়ার তৈরী হতে পারে। যদিও এই জোটে সরাসরি স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী জামায়াত রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে বিএনপির সাথে ড: কামাল হোসেন, আসম আ: রব, আ: কাদের সিদ্দিকী, মাহমুদুর রহমান মান্না, সুলতান মো: মনসুর থাকায় বিএনপির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অনেকটা গ্রাহ্য হবেনা। গত দশ বছর মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে না পারার ব্যাপারে ক্ষুব্ধ রয়েছে। বিএনপির নেতা-কর্মীদের ওপর অন্যায় আচরন হয়েছে এবং আইনের অধিকার থেকে বন্চিত রাখা হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। ব্যাংকিং ক্ষেত্রে বড় বড় দুর্নীতির বিচার হয়নি। তাদেরকে আইনের আওতায় আনায়ন করা হয়নি ইত্যাদি নানা কারনে ক্ষমতাসীন দল এবং জোটের বিরুদ্ধে ভোটারদের নেতিবাচক রায় দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

 

এসকল বিশ্লেষন কতটা যুক্তিপূর্ণ তার থেকেও একটি বড় প্রশ্ন হচ্ছে নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হবে। তার ওপরই সকল বিশ্লেষন একটি যৌক্তিক পরিনতি পাবে।

 

নির্বাচনটি সুষ্ঠু হওয়া এখন শুধুমাত্র সরকারের ওপর নির্ভর করেনা। দশ বছরে শুধুমাত্র সরকারে থাকা দলগুলোই নয়, তাদের নেতা/সমর্থকগনই নয় তাদের সহযোগী হিসেবে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থাসমূহ অনৈতিক সুবিধা গ্রহন করেছে। প্রতিপক্ষকে নিগ্রহের সাথে জড়িত ছিলেন। সরকার পরিবর্তন হলে তাদের এই সমস্ত সহযোগীরাও জনরোষের শিকার হবে সে কথা বলাই বাহুল্য। সে কারনেই পুলিশ এবং সিভিল প্রশাসনের অনেকেই নির্বাচনটি বর্তমান ক্ষমতাসীনদের পূন:নির্বাচনের পক্ষে কাজ করতে গিয়ে নির্বাচনটি বিতর্কিত করতে পারে।

 

নির্বাচনটি সুষ্ঠু না হওয়ার পক্ষে সকল সম্ভাবনার বিপরীতে আবার স্বল্প সংখ্যক কারনই নির্বাচনটিকে সুষ্ঠু, অবাধ এবং নিরপেক্ষ করতে পারে। সেক্ষেত্রে একটি মাত্র কারন- বিরোধীপক্ষের নির্বাচনের মাঠে শেষদিন পর্যন্ত টিকে থাকাই নির্বাচনটিকে অর্থবহ করবে।

 

দু’টি জোটের মধ্যে প্রধান দু’টি দল আওয়ামীলীগ এবং বিএনপি সম্পর্কে অবশ্য আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ রয়েছে। আওয়ামীলীগ স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের এখনও প্রধান শক্তি। আওয়ামীলীগ দল হিসেবে তাদের আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্র দূরে সরে যায়নি। বরং আওয়ামীলীগ নেত্রী অত্যন্ত দৃঢ়তা এবং সাহসের সাথে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে সোপর্দ করে তা’ অব্যাহত রেখেছেন। তবে দল হিসেবে আওয়ামীলীগ এবং সরকারের মধ্যে একটা বাহ্যিক পার্থক্য নির্দেশ করা যাবে। কিন্তু সেই বিশ্লেষনে আওয়ামীলীগককে আদর্শচ্যুত হয়েছে বলে বিবেচনা করা যাবেনা। কারন, সরকার হচ্ছে দেশের সকল মানুষের জন্য শুধু আওয়ামীলীগের নয়। সরকার পরিচালনায় যদি নমোনীয়তা এবং আপোষকামীতা না থাকে তা’হলে সেটি দেশের সকল মানুষের সরকার হয়না। প্রকারান্তরে স্বৈরাচারী হতে পারে। আওয়ামীলীগ সরকার সেক্ষেত্রে দেশে অবস্থানকারী চরম সাম্প্রদায়িক শক্তি হেফাজতে ইসলামকেও অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ম্যানেজ করেছে। সরকারের এই কৌশলকে কিছুতেই আওয়ামীলীগের সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে আত্মসমর্পন হিসেবে দেখা যাবেনা।

 

অপরপক্ষে বিএনপি একটি মধ্য-ডানপন্থী দল। এই দলটির প্রতিষ্ঠাতা বীর মুক্তিযোদ্ধা সাবেক সেনা প্রধান, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিরোত্তম। দলটির মধ্যে যেমন রয়েছেন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধাগন তেমন রয়েছেন সাবেক মুসলিম লীগ ঘরনার অসংখ্য নেতা-কর্মী। দলটি মধ্যখানে অবস্থান করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষের মধ্যে, বামপন্থী-ডানপন্থী সকলের মধ্যে সমন্বয় করে নমোনীয় রাজনীতি চর্চা করে থাকে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে না বিপক্ষে তা’ কখনো স্পষ্ট করেনি। স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতের সাথে রাজনীতি করতে অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেনা।

 

আওয়ামীলীগ এবং বিএনপি সম্পর্কে আমার যে বিশ্লেষনই থাকুকনা কেনো আসন্ন নির্বাচনে আদর্শের বিষয়টি যে ভোটারদের কাছে প্রাধান্য পাবেনা সে ব্যাপারে আমিও একমত। তার একটি মাত্র কারন হচ্ছে আওয়ামীলীগ সরকার গত দশ বছরে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। তবে আমি এও বিশ্বাস করি আওয়ামীলীগ পরবর্তী মেয়াদে ক্ষমতায় আসলে দেশে গনতন্ত্র এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা তাদের অন্যতম প্রধান কর্মসূচী হবে।

 

সবশেষে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে চাই আসন্ন নির্বাচনটি সত্যিকারার্থে সুষ্ঠু, অবাধ এবং নিরপেক্ষ হবে। রাজনৈতিক দলসমূহ দায়িত্বশীল আচরন করবে। সকল পক্ষ সহনশীল থাকবে। বিশেষ করে গনমাধ্যমে এবং সাংবাদিকদের কাছে দায়িত্বশীল আচরন প্রত্যাশিত। গনতন্ত্র এবং আইনের শাসনের জয় হোক।


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT