Main Menu

হিংসা কি এবং কেনো হিংসা এতো আঘাত করে?

মোঃ শফিকুল আলম: তুলনা করা থেকে হিংসার উৎপত্তি। তুলনা করতে আমরা শিক্ষা পেয়ে থাকি।আমরা যেনো তুলনা করতে শর্তাধীন। আমরা সর্বদা তুলনা করে থাকি। অন্য একজন সুন্দর বাড়ীর মালিক, তিনি সুঠাম দেহের অধিকারী, তিনি অঢেল অর্থের মালিক এবং তাঁর রয়েছে আকর্ষনীয় ব্যক্তিত্ব। তুলনা চলতে থাকে। চলতে পথে যাকে চোখে পড়ে তার সাথেই তুলনা করতে হয়। ফলাফল আর কিছুই নয়। মনের মধ্যে হিংসার আগুন জ্বলে ওঠে। তুলনা করতে গিয়ে উপজাত দ্রব্য হিংসা জন্ম নেয়।

 

অন্যথায় তুলনা করা বন্ধ করো। হিংসা উবে যাবে। তখন তুমি সম্বিৎ ফিরে পাবে। দেখতে পাবে তুমি তো তুমি। তুমি অন্য কেহ নও। তোমার প্রয়োজন কম। অভাবের অনুভূতি নাই বললেই চলে। এটা ভালো যে তুমি তোমাকে গাছের সাথে তুলনা করছোনা। তা’হলে তুমি সবুজ নও কেনো এই ভেবে গাছের ওপর হিংসাপরায়ন হতে পারতে। আবার গাছ হলে এ-ও ভাবতে পারতে অস্তিত্বের লড়াই এতো প্রবল কেনো? আবার এ-ও ভাবতে পারতে আমার কেনো ফুল নেই? আবার এ-ও ভালো তুমি তোমাকে পাখী, নদী কিম্বা পাহাড়ের সাথে তুলনা করছোনা। অন্যথায় তুমি হয়তো আরো বেশী কষ্ট পেতে। তুমি হয়তো শুধুই অন্য মানুষের সাথে তুলনা করছো; কারন, তুমি সেরকমই শর্তাধীন। তুমি নিশ্চয়ই নিজেকে ময়ুর অথবা ময়নার সাথে তুলনা করছোনা - কষ্ট অনেক বেড়ে যেতো। কষ্টের বোঝা সইতে পারতেনা। পৃথিবীটা তোমার জন্য একেবারেই বাসযোগ্য মনে হতোনা।

 

তুলনা করা হচ্ছে বোকামী স্বভাব। কারন প্রত্যেকটি মানুষ এক এবং অভিন্ন এবং তুলনাযোগ্য নয়। তুমি শুধুই তুমি। তোমার মতো দ্বিতীয়টি নেই এবং আসবেনা। এমনকি তোমাকেও অন্যের মতো হওয়ার প্রয়োজন নেই। স্রষ্টার সৃষ্টি আদি এবং অনন্ত। এই সৃষ্টির কপি হয়না।

 

তুমি হয়তো পাশের বাড়ীর লনের দিকে দৃষ্টি নিবন্ধিত করে আছো আর ভাবছো আহা! পাশের বাড়ীর লনটা আমাদেরটার থেকে সবুজ। তাদের গোলাপ গাছটির গোলাপ কতটা গোলাপী! তুলনা চলছেই। প্রত্যেকে আমার থেকে কতো সুখী! পাশের বাড়ী থেকে হয়তো একই ভাবনা। তারা হয়তো ভাবছে তোমার বাড়ীর লনটা অধিকতর সবুজ। আসলে সব সময় দূর থেকে অধিকতর সবুজ মনে হয়। তুমি হয়তো ভাবছো পাশের বাড়ীর লোকটার বউ কতো সুন্দর! আমি একজন অসুন্দর স্ত্রী’র সাথে থাকতে বাধ্য হচ্ছি। আমি কতো দূর্ভাগা! তুমি হয়তো মুক্তির পথ খুঁজছো। একই সাথে হয়তো তোমার প্রতিবেশী ভাবছে তোমার স্ত্রী কতো সুন্দর!

 

প্রত্যেকে তুলনা করতে গিয়ে হিংসার আগুনে জ্বলছে। নিজেরাই নিজেদের পৃথিবীটাকে নরক বানাচ্ছে। প্রকারান্তরে আমরা নিজেদেরকে অত্যন্ত নীচু করছি।

 

একজন বয়স্ক মানুষ বন্যায় ভয়াবহতা দেখে প্রতিবেশীকে চিৎকার করে বলছেন, “তোমাদের হাঁসগুলো বন্যায় ভাসিয়ে নিয়ে গেছে।” প্রতিবেশী জিজ্ঞেস করলেন রহিম সাহেবের গুলোর কি হয়েছে? তিনি উত্তর দিলেন ভেসে গেছে। তা’হলে রামের গুলোর কি হলো? উত্তরে বললেন সেগুলোও ভেসে গেছে। প্রতিবেশী বেশ খুশী হলেন এই ভেবে যে সবারই তো ক্ষতি হলো। ভালোই হয়েছে। সবাই হারিয়েছে। সবাই হারালে আমরা খুশী হই। কেউ জিতলে আমাদের কষ্ট হয়। আমাদের হিংসে হয়।

 

কেনো এমন হয়? আমাদের ভেতরটা যখন শূন্য হয় তখন সেটা দেখা যায়না। আমরা তখন বাহিরে তাকাই। বহির্ভাগ দেখা যায়। আমরা আমাদের ভেতরকার শূন্যতা টের পাই যখন অন্যের ভেতরটা দেখতে পাইনা। অন্যের বহির্ভাগের হাসিমুখ তখন আমাদেরকে ব্যথিত করে। একইভাবে অন্যেরা আমার ভেতরের শূন্যতা দেখতে পায়না। আমি জানি আমি কিছুইনা। একটা অথর্ব। অন্যে বুঝতে পারেনা। এখানেই হিংসার জন্ম।

 

প্রাচীন সুফীবাদ থেকে নেয়া একটি গল্প: একজন মানুষ কষ্টে ভারাক্রান্ত। স্রষ্টাকে তার প্রশ্ন তাকে কেনো এতো কষ্ট দেয়া হলো? অন্য কাকে নয় কেনো? তার প্রার্থনা ছিলো তার কষ্ট লাঘব করে প্রয়োজনে অন্য একজনের কষ্ট তাকে আরোপ করা হোক। সেই রাতে সে একটা সুন্দর স্বপ্ন দেখলো। স্রষ্টা নিকট আকাশে আসলেন এবং বললেন, “তোমরা তোমাদের সকলের কষ্টগুলো নিয়ে কাল উপাসনালয়ে আসো।” সকলে তাদের কষ্টগুলোকে ব্যাগভর্তি করে উপাসনালয়ে আসলো। যথারীতি সেই মানুষটিও গেলো। সবাই তাদের ব্যাগগুলো দেয়াল ঘেঁষে রাখলো। স্রষ্টা এবার যে যার খুশী মতো ব্যাগ পাল্টে নিতে বললেন। কিন্তু দেখা গেলো সবাই তাদের নিজ নিজ ব্যাগ নেয়ার জন্য এগিয়ে গেলো। কারন, একটা অজানা আশঙ্কা তাদের মাঝে কাজ করলো। তারা ভাবলো যে কষ্টগুলোর সাথে তারা অভ্যস্ত এবং অবগত সেগুলো বরং ভালো সামলাতে পারবে। নতুন এবং অপরিচিত কষ্ট সামলানো তাদের পক্ষে সম্ভব না-ও হতে পারে। এখন আর তাদের মধ্যে কষ্ট থাকলোনা। তাদের পরিচিত এবং দীর্ঘ দিন অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া কষ্ট সামলাতে তাদের বেগ পেতে হবেনা সেই ভেবে তারা সবাই খুশী।

 

প্রত্যুষ্যে সেই ব্যক্তি স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করলো রাতের স্বপ্নের জন্য সে স্রষ্টার কাছে কৃতজ্ঞ। এখন থেকে তার যা’ আছে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবে।

 

মোঃ শফিকুল আলম: শুধুমাত্র হিংসার কারনে মানুষ অনবরত কষ্ট ভোগ করে থাকে। মানুষ অন্য মানুষের সাথে নীচু আচরন করে থাকে। মানুষ মিথ্যা অভিনয় করে থাকে। অন্যের কাছে একটা মিথ্যা ভান ধরে থাকে। যা’ নয় তা’ প্রকাশের মিথ্যা প্রচেষ্টা করে থাকে। মানুষের মধ্যে কৃত্রিমতা তৈরী হয়। নকল মানুষ তৈরীর প্রবনতা পরিলক্ষিত হয়।

 

হিংসুটে মানুষ মূলত: এই পৃথিবীটাকেই নরক তৈরী করে। প্রকারান্তরে সেই নরক যন্ত্রনা নিজেই ভোগ করে। তুলনা করা বন্ধ করো; হিংসা উবে যাবে। মিথ্যা এবং মেকী মন দূরে রাখো; হিংসা উবে যাবে। নীচুতা দূর করো। মনের উদারতা বৃদ্ধি করেই নীচুতা দূর করা সম্ভব; অন্যথায় নয়। মনের দিক থেকে বড় হও, একজন খাঁটি মানুষ হও। নিজেকে সম্মান করো। স্রষ্টাকে সম্মান করো যেভাবে তিনি সৃষ্টি করেছেন তা’হলেই তোমার জন্য এই পৃথিবী এবং অপর পৃথিবী সব যায়গায় বেহেস্ত নিশ্চিত হতে পারে। এই দরজা সব সময়ই খোলা ছিলো। তুমি হয়তো কখনো যখাযথভাবে তাকাওনি।


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT