Main Menu

নিজের ঘরে পরবাসী নাকি বৃদ্ধাশ্রম?

রোকসানা ইয়াসমিন রেশনা:মা বাবার কাছে ইদানিং সব থেকে বেশি জনপ্রিয় শব্দ হচ্ছে, বর্তমান সময়ে ছেলে হওয়ার চেয়ে মেয়ে হওয়া ভালো। কারণ এখনকার ছেলেরা মা কে দেখে না, মেয়েরাই দেখে। এর বিপরীত চিন্তাটা কেউ করে না, মেয়েরা তার মা বাবাকে দেখছে বলেই ছেলেগুলো ভেড়া হয়ে গিয়ে নিজের মা বাবাকে বাদ দিয়ে শ্বশুর শ্বাশুড়ী কে নিয়ে পড়ে থাকছে। ইদানিং বিষয়টা অনেক বেশি ভাবাচ্ছে আমাকে।


 

আমার লিখতে ভালো লাগে। লিখতে পারি না জানি। তারপরও লিখতে ভালো লাগে। এই না পারার মাঝেও যা লিখি তার মাঝে সব থেকে কম আসে মনে হয় আমার মা এর প্রসঙ্গ। আসলে, মা কে নিয়ে লিখতে গেলে যে প্রসঙ্গ গুলো লিখতে আমার ভালো লাগবে, তা হয়তো অন্য ভাই বোন গুলোর ভালো লাগবে না। কেউ স্বীকার করুক আর না করুক, এটা কিন্তু সত্যি যে, মা বাবাও কারো কম আবার কারো বেশি থাকে। মানে মা বাবার উপর অধিকার। আমি কমের দলে পড়ি। সেইজন্যই বেশি অধিকারের ভাই বোনকে খেপাতে চাইনে।


 

কিন্তু ইদানিং কিছু কিছু বিষয় মাথায় এতো বেশি হেমারিং করছে যে খুব অসহায় বোধ করছি। এই অসহায়ত্বটা আরো বেশি বেড়ে যায় দোতলার খালাম্মার কাছে গেলে। ৮৪/৮৫ বছরের এই ভদ্র মহিলার দুইটা ছেলে কানাডা ও আমেরিকা থাকে। অথর্ব ও ছোট ছেলেটাকে নিয়ে দোতলায় থাকে। যার কথা আমি এর আগেও লিখেছি। খালাম্মা কারণে অকারণে আমাকে ডেকে পাঠায়। সব দিন যেতে পারি তা না। পরশু যেতে হয়েছিল। কিন্তু মনে হচ্ছিল না গেলেই ভালো হতো। কলিং বেল দিচ্ছি তো দিচ্ছিই। কেউ দরজা খোলে না। চলে আসবো কী না ভাবছি, সেই সময় দরজা খোলার শব্দ হলো। দরজা খুলতেই দেখলাম, খালাম্মা দাঁড়িয়ে কাঁপছে। প্রচন্ড জ্বর। আমি না ধরলে হয়তো পড়েই যেতো। উনাকে ধরে রুমের দিকে যেতেই ছেলের রুম থেকে গল্পের শব্দ এলো কানে। একটু থমকে দাঁড়ালাম। খালাম্মার নাতীটা স্পেশাল চাইল্ড। নাতীটা আমাকে খুব পছন্দ করে। ওকে নিয়ে আলাদা ভাবে কখনোই কোন ভাবনা আসেনি। কালই প্রথম মনে হলো প্রকৃতি কী এইভাবে শোধ নেয়? আজ তোমরা অসুস্থ মা কে ফেলায় রেখে ঘরের দরজা দিয়ে বসে বসে গল্প করছো, কাল তোমাদের কী হবে রে পাগলা? মন খুব খারাপ ছিল। হাজব্যান্ডকেও কথা শুনিয়ে ফেললাম, একটা কারেন্ট বিলের কপি আনতে বললে যখন বললো, তুমি যাও, উনি এতো কথা বলে যে মাথা ব্যাথা করে, তখন।

 

জার্নি আমাকে স্যুট করে না। কাল বাইরে প্রোগ্রাম ছিল। ফিরে এসে সেই অবস্থায়ই ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। ফোন বাজলেও শুনতে পাইনি। হাজব্যান্ড ডেকে তুলে বললো, আম্মা ফোন দিছে, দেখো ইমারজেন্সী কিছু কী না। চোখ বন্ধ করেই কথা বলছিলাম, কিন্তু আম্মার সিরিয়াস কথা শুনে (একজনকে একটা এসএমএস করার কথা ছিল, করেছি কী না) হেসে দিয়ে চোখ খুলে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকায় দেখি রাত প্রায় পৌনে দুইটা বাজে। গ্রামের বাড়ী, রাত পৌনে দুইটা!! ইদানিং প্রায়ই আম্মার এই রকম হচ্ছে। পাঁচটা ছেলেমেয়েই ঢাকায় থাকে। আম্মা খুব স্বাধীনচেতা মানুষ। যা পছন্দ করে তাই করে। কিন্তু তার দুইটা ছেলেমেয়ের কথাই সে শুধু একটু মেনে চলে এবং ঢাকায় থাকতে হলেও সে ঐ দুই ছেলেমেয়ের বাসায় থাকতে পছন্দ করে। না হলে তার স্বামীর বাড়ী। আমি সব ভাই বোনদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেই লিখতে চাই, তার সে দুই ছেলে মেয়ের বাড়ীতে থাকা হয়ে ওঠে না। ছেলের বাড়ী তার শ্বশুর শ্বাশুড়ী থাকে, ফেরেশতার মতো মেয়ের বাড়ীর কারণ আমি জানি না। আর আগেই বলেছি, অধিকারে আমি মাইনর। আমার কাছে থাকতে সে পছন্দ করে না। লাইফের অনেক ব্যর্থতার মাঝে এই আরেকটা ব্যর্থতা যে, আমার মা আমার কাছে থাকতে পছন্দ করে না। তাই সে বাড়ীতেই স্বাচ্ছন্দ্য।

 

মধ্যবিত্ত সেন্টিমেন্ট বাদ দিন। আমার সোজা সাপ্টা স্বীকারোক্তি নিয়ে প্যানপ্যান (শব্দটার জন্য দুঃখিত) না করে, একবার আপনার আশেপাশের, এমন কী আপনার নিজের ঘরের মা বাবাদের দিকে নিরপেক্ষ ভাবে চোখ বোলান তো- এই ঘটনা গুলো চোখে পড়ে কী না। যদি পড়ে, বড় বড় কথা না বলে এবার একটু মতামত জানাবেন, কোনটা মা বাবাদের জন্য ভালো? আপনার বাসায় অসুস্থ হয়ে ঘরের এক কোনায় অবহেলায় পড়ে থাকা নাকি বৃদ্ধাশ্রম? নিজের বিশাল দোতলা বাড়ীতে একাকী ঘুম না আসায় সময় জ্ঞান ভুলে ছেলেমেয়েকে ফোন দিয়ে একাকিত্ব কাটানোর চেষ্টা নাকি বৃদ্ধাশ্রম? যেখানে অন্ততঃ কথা বলার মানুষ থাকে, অসুস্থ হলে কারো না কারোর চোখে পড়ে।

 

আর আরেকটা জিনিসও ভেবে রাখেন, আপনি কোনটার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন?

 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT