Main Menu

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০১৮ - দল বদল, আদর্শ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা

দল বদল, তারও পূর্বে জোট গঠন ইত্যাদির সাথে আদর্শের কতটা মিল বা অমিল রয়েছে? আদৌ আদর্শের দিকটা নির্বাচনে কোনো প্রভাব ফেলবে? তার ওপর রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং পক্ষ-বিপক্ষ। কতটা প্রভাবিত করবে আসন্ন নির্বাচনকে ইত্যাদি মৌলিক প্রশ্নসমূহ বুদ্ধিজীবি মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে। ভোটারদের মাঝে এর কতটা প্রভাব পড়বে?

 

দল-বদল সব দল স্বাগত জানাচ্ছে এবং সকল দল লুফে নিচ্ছে সকল আদর্শচ্যুত ব্যক্তিগনকে। দল বদল ব্যক্তির রাজনীতিতে টিকে থাকার সিদ্ধান্তের সাথে জড়িত।দীর্ঘ সময় দল করে নানান প্রতিকুলতার বিরুদ্ধে গিয়ে হয়তো একজন স্থানীয়ভাবে নিজের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।এই টিকে থাকার সময়টা পর্যন্ত ব্যক্তির মাঝে দলের আদর্শ দৃঢ়ভাবে কাজ করে।শত চাপের মুখেও এই সমস্ত নেতাদের কম সংখ্যককেই দল পরিবর্তন করতে দেখা যায়।ব্যক্তি যখন নিজেকে প্রস্তুত করেন নির্বাচনে দলকে নেতৃত্ব দেবার জন্য, তখনই দল অন্যদলের আদর্শচ্যুত ব্যক্তিদের দলে টেনে দলের আদর্শ বিষর্জন দিয়ে থাকে। অর্থাৎ, দলই ব্যক্তির মাঝে লালনকৃত আদর্শে চির ধরায়। এক্ষেত্রে আদর্শ গৌন হয়ে যায়। আদর্শ বিষর্জন দিয়ে হলেও নির্বাচনে জয়লাভ যখন লক্ষ্য তখন ব্যক্তির আদর্শচ্যুতি কোনো ক্রমেই আর নির্বাচনে জয়-পরাজয়ে কাজ করবেনা। সুতরাং, আদর্শের বুলি উচ্চারন করে আর লাভ হবেনা।

 

দল বদলের পূর্বে আমরা জোট-গঠন পর্যায়ে কি দেখলাম? মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী ড: কামাল হোসেন, আসম আ: রব, বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা আ: কাদের সিদ্দিকী বীরোত্তম, সুলতান মো: মনসুর এবং মাহমুদুর রহমান মান্না বিএনপির সাথে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করলেন। বিএনপি একটি মধ্য-ডানপন্থী দল হিসেবে পরিচিত। তারা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করে। তারা উদার গনতন্ত্রী এবং সাম্প্রদায়িক শক্তির মধ্যে অবস্থান করে উভয় পক্ষের মধ্যে সমন্বয় করে রাজনীতি করছে এবং সেটি তাদের ঘোষিত নীতি। এই নীতির ক্ষেত্রে তাদের রাখ-ঢাক নেই। সে কারনেই তাদের সাথে স্বাধীনতা বিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তি জামায়াত যেমন রয়েছে, তেমনি উদার গনতন্ত্রে বিশ্বাসী অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ রাজনীতিকগনও রয়েছেন। এরই মধ্যে ড: কামাল হোসেনের নেতৃত্বে যারা বিএনপির সাথে জোটবদ্ধ হলেন তাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে কোনো ক্রমেই প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবেনা।অপরদিকে, ডা: বি চৌধুরী বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা, জেনারেল জিয়াকে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক বলে মনে-প্রাণে মানেন এবং বিশ্বাস করেন।তিনি দীর্ঘ সময় বিএনপিতে থেকে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। এমনকি জনাব চৌধুরী’র দল বিকল্পধারা’র মহাসচিবকে অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে ছিলেন বলে চিহ্নিত করেন। সত্যতা প্রমানিত নয়। 

 

অপর পক্ষে অসাম্প্রদায়িক এবং মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী, বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের ধারক এবং ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বস্ত আওয়ামীলীগের কথিত আদর্শ-ভিত্তিক ১৪ দলীয় জোটের সাথে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী বিকল্পধারা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে বিশ্বাসী সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদের জাতীয় পার্টি, রয়েছে ৬৯ টি সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে বিশ্বাসী সরাসরি ইসলামিক দল। এই ইসলামী দলগুলোর সবাই আবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বস্ত তা’ গ্যারান্টি দিয়ে বলা যাবেনা।

 

তা’হলে কোন্ পক্ষ আদর্শে স্থির? কারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারন করে? কারা অসাম্প্রদায়িক এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিতে বিশ্বাস করে? কারা মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা গনতন্ত্র এবং আইনের শাসনে বিশ্বাস করে? একটি পক্ষের প্রধান শক্তি বিএনপি মধ্যখানে অবস্থান করে এবং দু’পক্ষের সাথে সখ্যতা রাখে সেটি স্পষ্ট। তারা তাদের কথিত জাতীয়তাবাদী ধারা বজায় রেখেছে। সেক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক/অসাম্প্রদায়িক সবাইকে সমন্বয় করে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বিএনপি রাজনীতি করে যাচ্ছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রধান রাজনৈতিক দল মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমন্বয় করে রাজনীতি করছে তা’ এই সময়ে চিৎকার করে গলা ফাটায়ে বললেও কেউ বিশ্বাস করবেনা। কারন, গত দশ বছরের যে উন্নয়ন যজ্ঞ তারা করেছেন সেখানে ন্যায়ভিত্তিক বা সমতা ভিত্তিক উন্নয়ন করতে সক্ষম হয়নি, গনতন্ত্র এবং আইনের শাসন অনেকাংশেই অনুপস্থিত ছিলো, সাম্প্রদায়িক শক্তির সাথে compromised ছিলো,আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্পষ্টত: ন্যায্যতা ছিলোনা। উন্নয়নের সাথে ব্যাপক corruption হয়েছে যার বিরুদ্ধে সরকারের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ ছিলোনা। তা’হলে আদর্শের রাজনীতির ভিত্তিতে কেউ আওয়ামীলীগ এবং বিএনপি কোনো পক্ষকেই ভোট দিবেনা। সেক্ষেত্রে বিএনপির থেকে আওয়ামীলীগ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।কারন বিএনপি আদর্শ নিয়ে ততোটা উচ্চকিত নয় যতটা আওয়ামীলীগ।

 

রাজনৈতিক দলগুলোর যেহেতু প্রতিষ্ঠিত আদর্শ নেই, সেখানে ব্যক্তির আদর্শ নিয়ে আলোচনা করে কোনো লাভ হবেনা। তাই ড: কামাল হোসেনদের আওয়ামীলীগের কর্মী-সমর্থকরা যতই গালাগাল এবং নীতিভ্রস্ট প্রমান করার চেষ্টা করেননা কেনো কোনো কাজে আসবেনা। কাজে আসবেনা ব্যক্তি মুক্তিযোদ্ধা আবু সাঈদ এবং রনিকে নীতিহীন রাজনীতিক হিসেবে চিহ্নিত করে। বরং এই সময়টা ভোটারদের কাছে গিয়ে আপনাদের ভোট দেয়ার অনুরোধ রাখুন। একান্ত অনুরোধে তারা ঢেঁকি গিলতেও পারে।

 

একদিকে আওয়ামীলীগ যেসমস্ত ক্লীন ইমেইজের মানুষদেরকে এক প্রকার বিপক্ষে ঠেলে দিলেন অনেকটা অবজ্ঞা এবং তুচ্ছ ভেবে, অপর দিকে দলে নোমিনেশন দিলেন বদির মতো চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীর স্ত্রীকে বা মুক্তিযোদ্ধা হত্যাকারী রানার বাবাকে। কি কারনে মানুষ বিশ্বাস করবে আওয়ামীলীগ অপরাধ দমন করে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে? হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি করে যখন পার পেয়ে যায়, তখন বিরোধী পক্ষের কেউ প্রকৃতপক্ষেই দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হলেও মানুষ বিশ্বাস করতে চায়না। টানা দশ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামীলীগ অনেকটা বিএনপির কোমর ভেঙ্গে দিয়েছে। তারপরও কি ভেবে দেখেছেন কি কারনে কোমর-ভাঙ্গা বিএনপি নির্বাচনে আপনাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি? বুঝবেন কি করে? দশ বছরে আপনাদের সখ্যতা তৈরী হয়েছে গোয়েন্দা সংস্থার সাথে, কুচিন্তা ফাউণ্ডেশনের মতো ফাউণ্ডেশনের সাথে। তারা একের পর এক মিথ্যা জরিপে আপনাদেরকে বহু পূর্বেই বিজয়ী বানিয়েছে। প্রার্থী বাছাইয়ের শেষ পর্বে এসে এখন নানা বিক্ষোভের মুখে আবার জরিপের কথা বলে হাস্যরস তৈরী করছেন। এতো এতো জরিপ কি সব বিভ্রান্তিকর ছিলোনা?

 

ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের এখন বড় চ্যালেন্জ হবে দলকে একত্রিত রাখা এবং নির্বাচনমুখী করা। মনোনয়ন বন্চিতদের এবং তাদের সমর্থকদের দলত্যাগ ঠেকানোও কঠিন কাজ হবে। তারপরেও যারা অন্যদলে যাবেননা কিন্তু দলের অভ্যন্তরে থেকে দলের বিরুদ্ধে কাজ করবে। সেটা দলের জন্য আরো ক্ষতিকর হবে। দল যদি আদর্শে অটুট থাকতো তা’হলে ব্যক্তি চরিত্রের স্খলন ঘটতোনা। তাই দলত্যাগীদের আদর্শচ্যুত বলে যেহেতু কোনো কাজ হবেনা সেহেতু দলের অনুগত কর্মী-সমর্থকদের নির্বাচনমুখী করাই হবে উত্তম কাজ।

 

বিএনপি এবং তার জোটের মধ্যে এই বিরোধ অপেক্ষাকৃত কম। প্রধান শরীক দল বিএনপির নেতা-কর্মীরা শুধুমাত্র বিবেচনা করবে দল ক্ষমতায় গেলে তাদের মামলার ঝামেলা থেকে মুক্তি পাবে। তার থেকেও বড় কথা হচ্ছে দল ক্ষমতায় গেলে তাদের নেত্রী বেগম জিয়া মুক্তি পাবেন এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়া দেশে ফিরতে পারবেন। সঙ্গত কারনেই বিএনপিকে অপেক্ষাকৃত কম অভ্যন্তরীণ বিরোধ মোকাবেলা করতে হবে।এই দলের রয়েছে ওপেন ডোর পলিসি। আসলে স্বাগতম, চলে গেলে গুডবাই।তাদের থেকে কেউ চলে গেলে খুব একটা আদর্শের ব্যত্যয় ঘটেছে বলে কেউ মনে করেননা। এ নিয়ে তাদের দলের কেউ দলত্যাগী ব্যক্তির সমালোচনায় মাতম করেননা। আওয়ামীলীগ ত্যাগ করলেই তার ওপর আওয়ামীলীগ নেতা-কর্মীরা হামলে পড়ে। কোনো দলেই যেহেতু নীতি-নৈতিকতার বালাই নেই সেহেতু দলত্যাগী ব্যক্তির ব্যাপারে জনমনে তেমন প্রতিক্রিয়া নেই।

 

দলত্যাগ অবশ্যই আদর্শচ্যুতি এবং অনেকটা নৈতিক স্খলনও বটে। ব্যক্তির আদর্শচ্যুতি এবং নৈতিক স্খলন যতটা না দেশের ক্ষতি করে তার চেয়ে ঢের ক্ষতি করে দলের আদর্শচ্যুতি এবং নৈতিক স্খলন। স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের একমাত্র এবং প্রধান ভিত্তি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হচ্ছে গনতন্ত্র এবং আইনের শাসন, ন্যায় ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা, ধর্ম নিরপেক্ষতা এবং বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ। এর কোনো একটি বাদ দিয়ে শুধুমাত্র উন্নয়ন দিয়ে মানুষের মন জয় করা সম্ভব নয়। কোনো পক্ষই আর মু্ক্তিযুদ্ধের মূল চেতনায় নেই। সুতরাং আসন্ন নির্বাচনে দলবদল বা আদর্শচ্যুতির শ্লোগান বা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ বলে ভোট প্রাপ্তিতে সুবিধা করা যাবেনা। দলত্যাগীদের নির্বাচিত হতেও কোনো সমস্যা তৈরী হবেনা। সকল পক্ষের চেতনা শানিত হোক। গনতন্ত্র এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হোক। সকল অপশক্তি নিপাত যাক্।

 

 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT