Main Menu

পাগলা মামা

(বার)

রাশেদুল ইসলাম:মামা উঠে দাঁড়ান । লেকের দিকে কিছুদূর নেমে যান । আবার উঠে আসেন । তারপর দাঁড়িয়ে কথা বলতে থাকেন  তিনি । অন্ধকারে মামাকে কেমন যেন ছায়ামানুষ মনে হয় ।

মামা  বলেন, ‘তুই আগে ফরয নামাজের পর মোনাজাতের বিষয় জানতে চেয়েছিলি । এখন বললি ঈদে মিলাদুন্নবীর কথা । বলেছিস  মহানবী নিজে কখনো জন্মদিন পালন করেননি । ফলে, নবীর জন্মদিন বা ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করা বিদআত’ ।

আমি  বলি, ‘মামা এটা আমার কথা নয় । একদল এটাকে বিদআত বলে আমি সেটাই বলেছি । তবে,  সরকার ঈদে মিলাদুন্নবী (সঃ) পবিত্র দিন হিসেবে বিবেচনা করে এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দিনটি উদযাপন করে । এ দিনটি সরকারি ছুটির দিনও বটে ।

মামা বলেন, ‘ঠিক আছে ।  তুই বলেছিস মহানবী (সঃ)  নিজে কখনো জন্মদিন পালন করেননি । এটা অবশ্যই ঠিক । আবার এটাও ঠিক  মক্কায় সে সময় মহানবীর নিজের জন্ম নিবন্ধন করা হয়নি । মহানবী (সঃ) এঁর  কোন জাতীয় পরিচয় পত্র ছিল না । তাহলে এখন তুই আমি যে জাতীয় পরিচয় পত্র ব্যবহার করি -এটাও কি বিদআত ? এখন মানুষ চলাচলের জন্য যে ধরণের  যানবাহন ব্যবহার করে, দূরে কথা বলার জন্য মোবাইল ফোন বা বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে, এমন কি এখনকার মানুষ যে প্রক্রিয়ায় বা যা খাওয়াদাওয়া করে,   তার সবই কি বিদআত বলে গণ্য হবে ? মহানবী বেঁচে থাকতে এগুলোর কোনটাই তো তিনি কোনভাবেই ব্যবহার করেননি’ !

আমি কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খাই । বলি, ‘মামা,  আমি বলেছি নামাজের ক্ষেত্রে বিদআতের কথা । কেউ কেউ বলেন ফরয নামাযের পর ইমামের সাথে মোনাজাত করা বিদআত । রোজার মাসে  খতমতারাবি আমাদের গ্রামেগঞ্জে খুব জনপ্রিয় । অথচ, এখন কেউ কেউ বলেন, এটা বিদআত । কারণ, নবী করিম  (সঃ) নিজে কখনো খতমতারাবি পড়েননি বা কাউকে পড়তে বলেননি ।  স্বয়ং নবীর জন্মদিন বা ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করা নিয়েও ভিন্নমত রয়েছে । কেউ কেউ বলেন  এটাও বিদআত’ । এসবের প্রতিকার কি হতে পারে, আমি এটাই জানতে চেয়েছি’ ।

মামা বলেন, ‘তুই এখানে যে কয়েকটি বিষয়ের কথা বলেছিস, তার  সবই ইবাদত বা ইবাদতের অংশ । তুই যদি ইসলাম ধর্মের বিধানের কথা বলিস,  তাহলে একজন মুসলমানের খাওয়াদাওয়া, চলাফেরা, কথাবার্তা সবকিছুই ইবাদতের অংশ ।  ইবাদতের সবচেয়ে বড় মাধ্যম নামাজ । এখন তুই আমাকে বল নামাজ কি ?

  • নামাজ মুসলমানদের জন্য ফরজ একটি কাজ ।

 

  • এর মানে কি ?

 

-ইসলাম ধর্ম ৫ টি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত । যেমনঃ কলেমা, নামাজ, রোজা, হজ্ব ও যাকাত । এই পাঁচটি কাজ মুসলমানদের জন্য ফরজ ।  ফরয’ মানে অবশ্য করণীয় । সামর্থ্য থাকা স্বত্বেও এই ৫ টি ফরযের কোন একটা বাদ দিলে,  একজন মানুষ মুসলমান হতে পারে না ।

        -ঠিক আছে । তবে, একটা সহজ উদাহরণ দিয়ে আমি  বিষয়টা বুঝতে চাই । যেমনঃ জীবনধারনের জন্য মানুষ খাবার  খায় । খাবার না খেলে মানুষ বাঁচে না । সেক্ষেত্রে খাবার খাওয়া মানুষের  জন্য একটা ফরয কাজ । আমার এই যুক্তি কি ঠিক আছে ?

         -হ্যাঁ । যুক্তিটা ঠিক আছে । আমি বলি ।

          - এখন আমি যদি তোর কাছে জানতে চাই-  সারাদিন তুই কি কাজ  করেছিস ?  তুই কি বলবি ? আমি চুপ থাকি । মামা বলতে থাকেন, ‘তুই যদি কাজের কথা বলতে গিয়ে সারাদিন কি খেয়েছিস তার বর্ণনা দিস; তাহলে আমি তোকে কি  বলব ? আমি তোকে থামিয়ে দেব এবং বলব, এসব অজুহাত বাদদে; তুই আসল কাজের কথা বল । তারমানে খাওয়া মানুষের জন্য ফরজ হলেও, তা  কাজ হিসেবে গণ্য করা হয় না ।  উর্দু কবি মির্জা গালিব বলেছেন, আল্লাহ্‌র কাছে  নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করার নাম ইবাদত । ইসলাম ধর্মেও    নামাজ, রোজা বা অন্য কোন ধরণের ইবাদত পুরোপুরি  কাজ হিসেবে গণ্য করা হয় না । হয়তো এ বিষয়টিই বোঝানোর জন্য  রসুলে করিম (সঃ) বলেছেন, ‘তোমরা কখনো ধর্মকে অজুহাত হিসেবে নিও না’ ।

মামা কথা বন্ধ করেন । অনেকক্ষণ লেকের  দিকে তাকিয়ে থাকেন । তারপর ধীরে ধীরে আমার পাশে এসে বসেন । বলেন, ‘দ্যাখ কোরআনের অংশ বিশেষ আলোচনা করে  সঠিক সিদ্ধান্তে আসা কঠিন । কোরআনের শুরুতেই বলা হয়েছে, এই গ্রন্থ আল্লাহ্‌ সচেতন বিশ্বাসীদের জন্য । পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,  বিশ্বাসী ও সৎকর্মশীল মানুষ বেহেস্তে যাবে । এ কথার উপর অধিক গুরুত্ব দিয়ে কোরআনের অনেক জায়গায় বলা হয়েছে, ‘আমি আল্লাহ্‌ বলছি, যারা বিশ্বাসী ও সৎকর্মশীল,  তারা বেহেস্তে যাবে’ । অর্থাৎ, পবিত্র কোরআনের বিধান অনুযায়ী একজন মুসলমানকে বিশ্বাসী ও সৎকর্মশীল হতে হবে । শুধু বিশ্বাস বা শুধু সৎকর্ম দিয়ে কেউ  প্রকৃত মুসলমান হতে পারে না । তারমানে শুধু বিশ্বাসী হয়ে বা শুধু সৎকাজ করে কেউ বেহেস্তে যেতে পারবে না । মুসলমান হতে হলে বা বেহেস্তে যেতে হলে তাকে দুটোকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে । আর, বিশ্বাসী হওয়া  এবং সৎকর্ম করা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয় । বিশ্বাসী হওয়ার বিষয়টি ইবাদতের সাথে সম্পর্কিত । আর, এই ইবাদতের বিষয় নিয়েই যত বিতর্ক । একদল বলেন ইবাদতের ক্ষেত্রে মহানবী (সঃ) নিজে যেভাবে ইবাদত করেছেন;   হুবহু সেভাবে করতে হবে । এর অন্যথা হলে বিদআত হিসেবে গণ্য হবে এবং তা বর্জনীয় । অন্যদল বলেন ইবাদতের ক্ষেত্রে দেশকালপাত্র ভেদে যে নতুন পদ্ধতি সংযোজন হয়েছে; ধর্মের মৌলিক বিশ্বাসের সাথে পরীপন্থী না হলে; তা পালন করা যাবে । এটাকে তাঁরা বলেন বিদআতে  হাসানা । তবে, এটা বলা দরকার যে, এই দুই দলের কোন ব্যাখ্যাই ইবাদত তথা বিশ্বাসী হওয়ার ক্ষেত্রে মৌলিক কোন বিষয় নয় । লক্ষণীয় যে, মুসলমানদের সৎকাজ করার জন্য পবিত্র কোরআনে যে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে; সে বিষয়ে কোন পক্ষের কোন বক্তব্য নেই । অথচ, মুসলমানদের মধ্যে  সৎকাজ নিয়েই বেশী আলোচনা হওয়ার কথা । যেমনঃ খোলাফায়ে রাশেদীন এর যুগে এমন উদাহরণ আছে যে, যাকাতের অর্থ গ্রহণের জন্য কোন লোক পাওয়া যেত না । অনেকে বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো । সে রাস্তায় কোন কাফেলা গেলে তাদের থামিয়ে যাকাতের অর্থ বিতরণ করা হত । তখন কে কিভাবে যাকাতের অর্থ দাণ করেছে;  সেটাই তাদের আলোচনার বিষয় ছিল । এখনও মুসলমানেরা সারাদিনে কে, কিভাবে কত প্রকার সৎকাজ করেছে বা কে কিভাবে কত জনকে উপকার করেছে; সে আলোচনা করতে পারে এবং সকলে সৎকাজ করার একটা পরিবেশ গড়ে তুলতে পারে’ ।

 

আমি বলি, ‘মামা, আপনি  নিজেই বলেছেন বিদআত প্রশ্নে দুপক্ষের মধ্যে মতের ভিন্নতা রয়েছে । আবার এটাও বলেছেন,  দু’পক্ষের কোন ব্যাখ্যাই ইবাদতের মৌলিক কোন বিষয় নয় । কেন ?

মামা বলেন, ‘দ্যাখ, আমি বলেছি ইসলামের দৃষ্টিতে মুসলমানদের   মৌলিক করণীয় বিষয় দুটি- বিশ্বাসী হওয়া  ও সৎকর্মশীল হওয়া । বিশ্বাসী হওয়ার অন্যতম  শর্ত নামাজি হওয়া । নামাজ অবস্থা ভেদে শুয়ে, বসে,  দাঁড়িয়ে, ইশারাই বা যে কোন অবস্থায় পড়া যায় ।  তবে, আমাদের যত পীর, আওলিয়া, দরবেশ আছেন তাঁরা সাধারণ ধর্মবিশ্বাসী মানুষের মত নামাজ পড়েন কিনা – তা  আল্লাহ্‌ ভালো জানেন । এখানে কে বিশ্বাসী বা অবিশ্বাসী তা নির্ধারণের কোন দৃশ্যমান মাপকাটি নেই । একমাত্র  অন্তর্যামী আল্লাহ্‌ সেটা ভালো জানেন । আর ইবাদত কবুল করার মালিকও আল্লাহ্‌ । কার কতটুকু ইবাদত আল্লাহ্‌ কিভাবে কবুল করেন; এটা মানুষের বিচার্য  বিষয় হবার কথা নয় । এসব কারণে, ইবাদতের প্রকৃতি নিয়ে আলোচনার বিষয়টি মৌলিক কোন বিষয় নয় ।

আমি বলি, ‘কিন্তু মামা,  আমাদের দেশের সাধারণ ধর্মভীরু মানুষ তো এতকিছু বুঝবে না । তারা ধর্মের ব্যাপারে মতের  অমিল চায় না। রোজার সময় খতমতারাবি পড়া যাবে কি না, নামাজের পর ইমামের সাথে একসাথে মোনাজাত করা যাবে কি  না বা আমাদের নবী মোহাম্মদ (সঃ) এঁর জন্মদিন পালন করা যাবে কি- না – এসব বিষয়ে তারা একটা সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত চায় ।  এ ধরণের সিদ্ধান্ত কি দেয়া সম্ভব নয়’ ?

মামা বলেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই সম্ভব ।  তবে, এসব বিষয়ে দেশের ইমামগণকে একমত হতে হবে । ধর্মীয় যেকোন বিষয়ে  সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ইসলামের সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। কোন বিষয়ে পবিত্র কোরআনে  বিধান থাকলে, কোরআনই যথেষ্ট । যেমন; দৈনিক ৫ ওয়াক্ত নামাজের কথা, নামাজ পড়ার পদ্ধতি কি – এসব  পবিত্র কোরআনে উল্লেখ নেই । এগুলো হাদিস থেকে নেয়া । কোন বিষয়ে হাদিস ও কোরআনের আলোকে সিদ্ধান্ত নিতে  ইমামগণ একমত হলে তাকে ইজমা বলে । আবার অনেক বিষয় থাকে যে বিষয়ে অনুমান করে সিদ্ধান্ত নিতে হয় – এ পদ্ধতিকে কিয়াস বলে ।  এ ধরণের সিদ্ধান্তও ইমামগণকে নিতে হয় । ইজমা বা কিয়াসের মত ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মুজতাহিদ  আলেমগণ ইমামদের সাহায্য করতে পারেন । তুই, আমি ধর্মের উপর যত কথাই বলিনে কেন- যতক্ষন এসব বিষয়ে দেশের ইমামগণ একমত না হবেন; ততক্ষন এসব আলোচনা অর্থহীন । তবে, আমাদের আলেমসমাজে  ভাই গিরিশ চন্দ্র সেনের মত ভিন্নধর্মী মানুষের কাছ থেকেও পরামর্শ গ্রহণের সুন্দর উদাহরণ রয়েছে । ফলে, গ্রহণযোগ্য কোন সুপারিশ থাকলে; দেশের আলেমগণ তা বিবেচনা করতে পারেন বলে আমার মনে হয় ।  

আমি বলি, ‘মামা, সেক্ষেত্রে আপনি বিদআত বিষয়ে কয়েকটা সুপারিশ  রাখতে পারেন’ ।

মামা বলেন, ‘আমি আগেই বলেছি যে কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নিজেদের সহজাত বিচারবুদ্ধি এবং সময় পরিবতনের অপরিহার্যতা বিবেচনায় নিতে হবে । যেমন পবিত্র কোরআনে যাকাতের অন্যতম  খাত হিসেবে দাসমুক্তির কথা বলা হয়েছে । এখন দাসপ্রথা নেই । তাই, আক্ষরিক অর্থে এই খাতে দাণ করার কোন সুযোগ নেই । কিন্তু, দাসত্বের অন্তর্নিহিত অর্থ বিবেচনা করা হলে; এই খাতে দাণ করারও  সুযোগ পাওয়া সম্ভব । এরুপ ক্ষেত্রে ইজমা পদ্ধতিতে ইমামাগন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন ।

আমি বলি, ‘মামা,  আমার মনে হয়, আপনি নিজের মত করে বিদআত বিষয়ে কিছু সুপারিশ করতে  পারেন’ ।

মামা বলেন, ‘ঠিক আছে । আমি তাহলে প্রথমে নামাজের পর মোনাজাতের কথাই বলি ।  এখন তুই আমাকে বল, নামাজের পরে একজন নামাজি কি দোয়া পড়ে ?

আমি বলি,   

 

  • রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়াফিল  আখিরাতি; হাসানাতাও ওয়াকিনা  আজাবান্নার।

 

  • তুই কি এই দোয়ার বাংলা অর্থ  জানিস ?

আমি চুপ থাকি । মামা বলেন, এই দোয়ার বাংলা অর্থ - হে আল্লাহ্‌, তুমি আমাদের দুনিয়া ও আখিরাতের  শান্তি দাও এবং দোযখের আগুন থেকে রক্ষা করো’ ।  অর্থাৎ, এই দোয়া একবচনে করা হয়নি; বহুবচনে করা হয়েছে । ফলে, এই দোয়া সাধারণত একা পড়ার  জন্য নয় । জামাতে ইমামের পিছনে বসে নামাজ পড়া হলে, একসাথে এই দোয়া পড়াই সমীচীন মনে হয়’ ।   

মামা তার গলার স্বর পরিবর্তন করেন । বলেন, ‘আসলে ইসলাম ধর্ম  কারো একার জন্য নয় । সূরা বালাদে মানুষকে সংঘবদ্ধ হয়ে বসবাস করার কথা  বলা হয়েছে । তুই দ্যাখ, কারো  আপনজন কেউ কবরবাসী হলেও, সে শুধু সেই  আপনজনের জন্য দোয়া করতে পারে না । তাকে সকল কবরবাসীর জন্য দোয়া করতে হয় । আমি তোকে বলেছি,  এখানে আমার একটা বিশেষ কাজ আছে । এই কাজটা আসলে তেমন কিছু নয় । আমি এখানে একটু ধ্যানে বসতে চাই । পৃথিবীতে যত মুনি,  ঋষি, দরবেশ আছেন-  সকলেই রাতের এই প্রহরে ধ্যানে বসেন । নির্দিষ্ট একটা সময়ে ধ্যানে বসে সকলে একাত্ব হওয়ার সাধনা করেন তাঁরা । ইসলাম  ধর্ম এই একাত্ব হওয়ার কথা বলে । এই কারণে জামাতে নামাজ পড়ার উপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে । তাই, যেকোন নামাজের পর ইমামের সাথে মোনাজাতে শরিক হয়ে সবাই  আমিন আমিন বলা ইসলামে বর্ণিত মৌলিক বিশ্বাসের পরিপন্থী কিছু নেই ।   

 


 

আমি বলি, ‘মামা, রমজান মাসের খতমতারাবি পড়ার বিষয়ে ব্যাখ্যা কি হতে পারে ?

মামা বলেন, ‘আমার জানামতে খতমতারাবি একটা চমৎকার ব্যবস্থা । আমাদের দেশের শ্রমজীবী মানুষের একটা বড় অংশ কোরআন শরিফ পড়তে পারে না । তাই, নিজে কোরআন খতম করার কথা তারা কল্পনাও করত না । এই খতম তারাবি নামাজের  ব্যবস্থা তাদের মনে আশার আলো জ্বালে । অনেকে এই খতমতারাবি পড়ার জন্যই রমজান মাসের জন্য  অপেক্ষা করে । জরুরি কাজে যতই দূরে যাক,  রাতে খতমতারাবীতে শরিক হওয়ার জন্য তারা জীবন বাজী রেখে  মসজিদে ফিরে আসে’ ।

‘কিন্তু, কেউ কেউ বলেন খতমতারাবি শেষ করার নামে,  অনেক হাফেজ ভুলভাল উচ্চারণে কোরআন পড়ে । এ ধরণের  অশুদ্ধ উচ্চারণে কোরআন পড়া এবং তা দিয়ে নামাজ পড়া  অনেকে গুনাহের কাজ’ - আমি বলি ।

মামা বলেন- ‘এ প্রসঙ্গে আমি  তোকে হযরত বেলাল (রাঃ) এর কথা  বলতে পারি । হযরত বেলাল (রাঃ) এর সুরেলা কণ্ঠের আযান মুগ্ধ হওয়ার মত ছিল । কিন্তু, তিনি ক্রীতদাস ছিলেন । ইসলামে একজন ক্রীতদাসকে সাধারণ মানুষের মর্যাদা দেয়া হলেও; অনেকে তার আযান দেয়া পছন্দ করতেন  না । একজন ক্রীতদাসের আহ্বানে নামাজে আসা অনেকের পছন্দ হয়নি । তাদের কয়েকজন নবীর কাছে বেলালের উচ্চারণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন । তারা   অভিযোগ করেন, বেলাল এর উচ্চারণ শুদ্ধ নয় । তাদের কথায় নবী করিম (সঃ) বেলালকে আযান দিতে নিষেধ করেন । এরপর শুদ্ধ উচ্চারণে অন্য একজন আযান দেয়া শুরু করেন । কিন্তু, কয়েকদিন পর নবী  নিজেই বেলালকে আযান দিতে বলেন । কারণ, হিসেবে তিনি জানান স্বয়ং আল্লাহ্‌ বেলালের আযান পছন্দ করেন । শুদ্ধ উচ্চারণের  বিগত কয়েকদিনের আযান আল্লাহ্‌র দরবারে পৌঁছায়নি । এর অর্থ এই যে, ইবাদত বা বিশ্বাসের বিষয়টি  শুধু আলাহ নিজে ভাল জানেন । তাই,  কোন ইমামের  পড়ানো খতমতারাবি নামাজ কবুল হবে,  তা আল্লাহ্‌ নিজেই ভালো জানেন ।  আর এ ধরণের নামাজ ইসলামে বর্ণিত মৌলিক বিশ্বাসের পরীপন্থী হবার কথা নয় ।  নবীর জামানায় নবীসহ প্রায় সকল সাহাবীই কোরআনে হাফেজ ছিলেন । তাদের জন্য খতমতারাবি পড়ার প্রয়োজনও ছিল না । এসব বিবেচনায় ইমামগণ এ ধরণের তারাবি পড়ার অনুমতি দিতে পারেন’ ।

আমি বলি, ‘নবীর জন্মদিন বা ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করা বিষয়ে আপনার মতামত কি ?

মামা বলেন, ‘মহানবী (সঃ) এঁর জন্ম ও মৃত্যুদিন  আরবী হিজরি সনের ১২ রবিউল আউয়াল । এটা একটা বিশেষ দিন । বিশেষ মুহূর্ত । পবিত্র কোরআনে  ‘সূরা আসর’ সময়ের শপথ দিয়ে শুরু হয়েছে । অর্থাৎ, সময়কে পবিত্র কোরআনে মহামূল্যবান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে । আর, মহানবী (সঃ) এঁর জন্ম মুহূর্ত নিঃসন্দেহে আরও অনেক বেশী মূল্যবান । কারণ, নবীর জন্ম না হলে মানবধর্ম কেমন হতে পারে,  বিশ্বমানবতার স্বরূপ কেমন হতে পারে; তা হাতেকলমে জানা সম্ভব ছিল না । তাই, মহানবী (সঃ) এঁর জন্ম ও মৃত্যুদিন সকলের শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা উচিত’ ।

আমি বলি, ‘কিন্তু, মামা, মহানবী (সঃ) নিজে  কখনো জন্মদিন পালন করেননি বা কাউকে জন্মদিন পালনের কথা বলেননি’  ।

 

মামা বলেন, ‘দ্যাখ,  মহানবী (সঃ) এঁর মূল দায়িত্ব ছিল তাঁর উপর যে কোরআন অবতীর্ণ হয়, তার আলোকে  ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বরূপ কেমন হতে পারে, তা দেখানো  এবং অবিকৃত অবস্থায় সেই কোরআন মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া । তিনি সেই দায়িত্ব ঠিকমত পালন করেছেন কিনা,  এটাই তিনি তাঁর বিদায় হজ্বের ভাষণে উপস্থিত হাজিদের কাছে জানতে চান । উপস্থিত সকলে সমস্বরে জানান ‘হ্যাঁ’ তিনি সেই দায়িত্ব পালন করেছেন ।  মহানবীর সেই আমলে আজকের মত কাগজ কলম ছিল না । মুখস্থ করার মধ্যমেই মূলত কোরআন সংরক্ষন করা হত । আর, এই কোরআন অবিকৃত রাখার জন্যই মহানবী (সঃ)  জীবদ্দশায় তাঁর নিজের বিষয়ে কোন কিছু সংরক্ষন করতে নিষেধ করেন । কারণ, তাঁর ভয় ছিল কোরআনের হাফেজগন যদি নবীর জীবনী বা দৈনন্দিন কার্যক্রম মনে রাখার চেষ্টা করে,  তাহলে পবিত্র কোরআন অবিকৃত রাখা কঠিন হতে পারে । এ ধরণের বাস্তবতায় মহানবী (সঃ) নিজের জন্মদিন পালন করতে বলার বিষয়টি তখন একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক ছিল । তবে, পবিত্র কোরআন আধুনিক গ্রন্থ আঁকারে প্রকাশিত হওয়ার পর মুসলমানদের জন্য  মহানবী (সঃ) উপর লেখা এবং তাঁর জন্মদিন পালন করা খুবই প্রাসঙ্গিক এবং ধর্মীয় কারণে অত্যাবশ্যক ।

আমি বলি,’মামা, এ বিষয়টি আপনি  ব্যাখ্যা করে বলবেন কি’ ?

মামা বলেন,  'আমি তোকে বলেছি যে,পবিত্র কোরআনে  মুসলমানদের জন্য মৌলিক করণীয় বিষয় দুটি । একঃ   বিশ্বাসী হওয়া   এবং দুইঃ সৎকর্মশীল হওয়া । এই দুটি কাজের পূর্ণ প্রকাশ ঘটে মহানবী (সঃ) এঁর জীবনে । একারণে পবিত্র কোরআনকে ‘পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান’  বলা হয়েছে । বিবি আয়েশা (রাঃ) কোরআন বুঝতে হলে নবী করিম (সঃ) কে দেখতে বলেছেন । ইসলাম ধর্ম বাস্তবায়নের মাধ্যমে মহানবী (সঃ) তখনকার আরব সমাজে  কন্যা সন্তান হত্যা করার মত যে অমানবিক প্রথা ছিল; তা বাতিল করেন । এ কাজের দ্বারা হাজার হাজার নারীশিশু জীবনে রক্ষা পাওয়ার পাশাপাশি, নারীরা সমাজে যথাযথ মর্যাদার আসন পায় ।  কোরআনে দাসমুক্তির খাতে দাণের উপর অধিক গুরুত্ব দেওয়ার কারণে ধীরে ধীরে দাসপ্রথার মত অমানবিক প্রথার উচ্ছেদ ঘটে । এর ফলে হাজার হাজার ক্রীতদাস সাধারণ মানুষের মর্যাদা অর্জন করে । মহানবী (সঃ) এঁর জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এ ধরণের শতশত  সৎকর্মের উদাহরণ রয়েছে । জন্মদিন পালনের মাধ্যমে এই দিনে মহানবী (সঃ) এঁর জীবনের যাবতীয় ইবাদতকর্ম এবং সৎকর্ম –সাধারণ মানুষের কাছে বিশেষভাবে তুলে ধরা সম্ভব । এতে মহানবী (সঃ) এঁর জীবনাদর্শের আয়নায় সাধারণ মানুষ নিজেরা উজ্জীবিত  হওয়ার সুযোগ পাবে । ফলে, ইসলাম ধর্ম যথাযথভাবে অনুশীলন করা আরও সহজ হবে অনেকের জন্য’ ।

মামা  হটাৎ উঠে দাঁড়ান । ‘তুই এখানেই থাক’ বলে তিনি  একটু দূরে গিয়ে বসেন । বোধহয় ধ্যান করবেন  তিনি । আমি পা গুটিয়ে শুয়ে পড়ি । খোলা আকাশের দিকে তাকাই । অগণিত তারার মেলায় ঘুরপাক খাই আমি । বিভিন্ন প্রাণীর বিচিত্র ডাকে ঘুম ভাঙ্গে আমার । কোথায় আছি বুঝতে সময় লাগে । মামার কথা মনে হতেই উঠে বসি আমি । আশেপাশে কোথাও নেই পাগলা মামা । আমি   চিড়িয়াখানার গেটের দিকে ছুটে যাই । দারোয়ান জানায় অনেক আগেই বেরিয়ে গেছে একজন ।

চিড়িয়াখানার বাইরে আমি । ভোরের মৃদুমন্দ বাতাস । কেমন যেন ফুরফুরে ভাবের উদয় হয় মনে ।  হাঁটার নেশা জাগে আমার । আমি হাঁটতে থাকি । এবারও ভুল হোল । পাগলামামার ঠিকানা রাখা হয়নি ।

 

 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT