Main Menu

৭ ই নভেম্বর এবং একটি কালো অধ্যায়ের ইতিহাস 

আফরীন জামান লীনা: আজ ৭ই নভেম্বর । না--- এই দিনটা কোন বিশেষ ব্যাক্তির জন্মদিন বা মৃত্যুদিন নয়। আজকের দিনের বিশেষত্ব  একটু অন্যরকম।দীর্ঘদিন থেকে এই দিনটাকে কতিপয় একটা রাজনৈতিক দল বিপ্লবী ও সংহতি দিবস বলে পালন করে আসছেন।বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় দিনটার কথা খুব ঢালাও করে বিভিন্ন শিরনামে আসছে। কিন্তু আসলেই কি এই দিনের আসল ইতিহাস আমরা জানি?  

প্রায় সকল পত্রিকাতেই সংবাদ লেখা শেষ করবে তিন লাইনে। যার সারমর্ম হলো:  

১) ৭ই নভেম্বর একটি ঐতিহাসিক দিন।

২) সিপাহী- জনতা মিলে বিপ্লব করেছিলো।

৩)বাংলার  জনগন আন্দোলন করে গণজাগরণ ঘটিয়ে জিয়াউর রহমানকে এই মহান দিনে ক্ষমতায় বসিয়েছিল।  

 

আমি নিজেই একজন ইতিহাসের ছাত্রী। সেই সুবাধেই বলছি ইতিহাসের কোন জায়গাতেই এই দিনটির এমন কোন উদাহরণ আছে বলে আমি দেখিনি। আমি কেন, কোন ইতিহাসবিদ দেখেছেন বলেও মনে  হয়না। অথছ এই দিনটার প্রকৃত ইতিহাস ধামা চাঁপা দিয়ে অত্যন্ত নির্লজ্জের মত এই দিনটাকে একসময় সরকারী ছুটিও ঘোষনাও করা হয়েছিল।

 

সংক্ষেপে ৭ই নভেম্বর সম্পর্কে এভাবে একটা সমিকরন দাড় করানো যায়ঃ

৭৫ এর ১৫ই আগস্ট + ৩ রা নভেম্বর + খালেদ মোশাররফ এবং কর্নেল তাহেরের সামরিক উত্থান = ৭ই নভেম্বর ।

 

১৯৭৫ এর ১৫ই আগস্টে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা করা ছিল খন্দকার মুশতাক এবং  কতিপয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কিছু বখে যাওয়া সদস্যদের নীল নকশার ফলাফল। যা শুধু আমার  দেশের ইতিহাসকেই নয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাসকেও কলঙ্কিত করেছে।

 

কিছু সেনা কর্মকর্তাদের  দ্বারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৫আগস্ট স্বপরিবারে নিহত হবার পর  খন্দকার মুশতাক আহমেদ নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন। অবসর নিতে বাধ্য করান প্রধান সেনাপতি  জেনারেল শফিউল্লাহকে।নতুন প্রধান সেনাপতি হলেন জেনারেল জিয়াউর রহমান।রাতারাতি ঘটে গেল সব কিছু। সেনাবাহিনীতে টু শব্দটি হলনা। খন্দকার মুশতাকের ক্ষমতার নেপথ্যে ছিলেন ১৫ই অগাষ্টের  ঘটনার মুল নায়কেরা।  

 

মুলত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কিছু নিম্নপদস্থ কর্মকর্তা ১৯৭৫-এর ১৫ই আগস্টের অভ্যুত্থান পরিচালনা করে। এই অভ্যুত্থানের সাথে সেনাবাহিনীর শীর্ষস্থানীয় কোনো কর্মকর্তা জড়িত না থাকলেও ১৫ আগস্ট এবং ৭ই নভেম্বরের মুল ইতিহাস জানার পরে জিয়াউর রহমানের জড়িত থাকার প্রমান উড়িয়ে দেয়ার  কোন যুক্তিই থাকে না।

এই দিনটা কেন ঐতিহাসিক দিবস হলো বা কেন বাংলাদেশীদের জন্যে গুরু্ত্বপূর্ন বা প্রকৃত পক্ষে সেইদিন কি হয়েছিল, একটু ঘাটাঘাটি করলেই তার সত্যতা খুজে পাওয়া যাবে।

 

৭ই নভেম্বরের আসলে কি ঘটেছিল?

 

যারা সেইদিন ক্ষমতা দখল করছিল তারাই পরবর্তিতে ইতিহাসটা তাদের মতো করে সাজিয়ে ছিলেন। কিন্তু যেহেতু সেই ঘটনার প্রকৃত সত্যকে প্রকাশ করার ক্ষমতা এইসব নির্লজ্জ শাসকদের ছিলনা তাই অনেকটা এই গল্পটা রুপকথার মতো শুনায়। অনেক টা ছেলে বেলার দাদী নানীর কাছের সেই রুপকথার রাজার  গল্পের মতই। ভিন দেশের এক সেনাপতি হাতী ঘোড়া নিয়ে আসলো আর রাজ্য জয় করে রাজা হয়ে গেল।

 

১৫ই আগস্টের পর কয়েকজন মেজর আর কর্নেলকে নিয়ে খন্দকার মুশতাক দেশে একটা অরাজকতা চালাচ্ছিলো।এই অবস্থার অবসানের লক্ষ্যে মুক্তিযোদ্ধারা জেনারেল খালেদ মুশাররফের নেতৃত্বে একটা প্রচেষ্টা নেয়। জেনারেল ওসমানীর মধ্যস্থতায় মুশতাক আহমদে বেঁচে যায় - কিন্তু  ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে রচিত হয় ইতিহাসের আরেক কালো অধ্যায়ের। নৃশংস ভাবে ৩রা নভেম্বর ভোর বেলাতে হত্যা করা হয় জাতীর শ্রেষ্ঠ চার নেতাকে। বঙ্গবীর তাজউদ্দিন আহমেদ,ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, কামুরুজ্জামান এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম কে। বঙ্গবন্ধুর চার বিশ্বস্ত সহচর আর বাঙ্গালী জাতির মুক্তির এই চার মহান নেতাকে অনৈতিক এবং অরাজনৈতিক ভাবে জেল খানার ভেতরে যে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।    

 

খুব সুনিপুনভাবে নিরীক্ষণ করলে এই হত্যাকাণ্ডের সাথেও জিয়াউর রহমানের সম্পৃক্ততা সুস্পষ্ট ভাবে ধরা পড়ে। ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যাকাণ্ডের পর ২৪ আগস্ট সেনাপ্রধান কে এম শফিউল্লাহকে সরিয়ে খুনি ফারুক রসিদ চক্রের মতামতের উপর ভিত্তি করে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান করা হয়।সেনাবাহিনীর সিনিয়র অফিসাররা ফারুক রসিদ চক্রের এই ধরনের নোংরা প্রবৃত্তি দেখে উত্তেজিত হতে থাকেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও বীরউত্তম সিজিএস ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে জড় হতে থাকেন।

 

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বরের মধ্যরাতে ৪৬ ব্রিগেডের কিছু অফিসারের সহযোগিতায় ব্রিগেডিয়ার খালেদ  মোশাররফের নেতৃত্বে এক রক্তপাতহীন সেনা-অভ্যুত্থান ঘটে । সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করে নতুন সেনাপ্রধান হন খালেদ মোশাররফ।

 

খালেদ মোশাররফ ক্ষমতা হাতে নিয়েই সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। তিনি  বঙ্গভবন ও শহর থেকে সেনাবাহিনীর সকল ক্ষমতায়ন সরিয়ে ক্যান্টনমেন্টে ফেরত পাঠান।শুধু তাই নয় বঙ্গভবনে বসে ফারুক-রশিদের কার্যক্রম নস্যাৎ করে তাদের ক্যান্টনমেন্টে ফিরিয়ে এনে ‘চেইন ইন কমান্ড’-এর অধীন করার সিদ্ধান্ত নেন। খন্দকার মুশতাক সহ ফারুক-রসিদ চক্র বুঝে যায় তারা ক্যান্টনমেন্টে ফিরে গেলে কোর্ট-অব-মার্শালের মাধ্যমে বিচারের সম্মুখিন হবে।

 

তখন মুশতাক চক্র জেনারেল ওসমানির মাধ্যমে খালেদ মোশাররফের সাথে মধ্যস্ততা করে এই সকল খুনিদের দেশের বাইরে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন।তবে যাবার আগে তাদের ভয় থাকে খালেদ মোশাররফের হাত ধরে আবার যদি আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসে? খন্দকার মুশতাক ২১ জনকে নিয়ে তার মন্ত্রী পরিষদ গঠন করলেও হাত করতে পারেন না জাতীয় চার নেতাকে।সরাসরি মুশতাকের অনুমতিতেই তাদের গ্রেফতার করা হয় এবং ৩ রা নভেম্বর ভোর ছয়টায় ফারুক রসিদ চক্রের  মাধ্যমেই হত্যা করা হয়। যার প্রমান তৎকালীন জেলার আমিনুর রহমান ২০১০ সালে বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাবে দেন।ব্রিগেডিয়ার আমিনুল হককে খালেদ মোশাররফ জেলহত্যার  তদন্তে নিয়োগ করেছিলেন। ৭ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ নিহত হওয়ার পর এবং জিয়াউর রহমান ক্ষমতা গ্রহণ করে জেলহত্যার তদন্ত বন্ধ করে দেয়। যে তথ্য ব্রিগেডিয়ার আমিনুল হক যুক্তরাস্ট্র থেকে ঢাকা এসে তাজউদ্দীনের মেয়ে শারমিন আহমেদকে জানান।তথ্যটা শারমিন আহমেদ তার লেখা ‘জেলহত্যার পূর্বাপর’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং এখানেই সুস্পষ্ট জিয়াউর রহমান জেল হত্যাকান্ডের সাথে পরোক্ষ এবং প্রতক্ষ ভাবে জড়িত।


 

অন্যদিকে ওসমানীর মধ্যস্থতা মেনে নিয়ে মুশতাককে প্রধানমন্ত্রী রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে জীবনের সবচেয়ে  বড় মূল্যটাও পরিশোধ করেন খালেদ মোশাররফ। কর্নেল (অবঃ) আবু তাহের সে সময় চট্টগ্রামে অবস্থান করছিলেন।কর্নেল তাহের ছিলেন জিয়াউর রহমানের একজন বিশেষ শুভাকাংখী। তিনি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন।সৈনিক-অফিসার বৈষম্য তার পছন্দ ছিলনা। তার এই নীতির জন্য তাহের সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈনিকদের মাঝেও দারুণ জনপ্রিয় ছিলেন।কর্নেল তাহের বিশ্বাস করতেন জিয়াও তারই আদর্শের লোক। জিয়া তাঁর বাসভবনে বন্দী হয়ে থাকেন। খালেদ মোশারফের নির্দেশে তাঁকে বন্দী করে রাখেন তরুণ ক্যাপ্টেন হাফিজুল্লাহ। জিয়ার বাসার টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। কিন্তু ক্যাপ্টেন হাফিজুল্লাহ একটি ভুল করেন। তিনি ভুলে যান বেডরুমেও একটি টেলিফোন আছে। জিয়া কৌশলে বেডরুম থেকে ফোন করেন তাহেরকে। খুব সংক্ষেপে বলেন "সেভ মাই লাইফ"। তাহের জিয়ার আহবানে সাড়া দেন। তিনি ঢাকাতে তার অনুগত ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সিপাহীদের পাল্টা প্রতিরোধ গড়ার নির্দেশ দিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা রওনা হন। এ সময়  তার সফর সঙ্গী ছিল শত শত জাসদ কর্মী। কর্নেল তাহেরের এই পাল্টা অভ্যুত্থান সফল হয় ৭ইনভেম্বর। কর্নেল তাহের, জিয়াউর রহমানকে বন্দী দশা থেকে মুক্ত করে নিয়ে আসেন। ঐ দিনই পাল্টা অভ্যুত্থানে ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা জেনারেল খালেদ মোশাররফ সহ অনেক সেনাবাহিনীর সদস্যকে হত্যা করে।    

 

কথা ছিল, জিয়াউর রহমানকে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের করে আনা হবে। তারপর জাসদের অফিসে তাঁকে এনে তাহেরদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হবে। পরে সিপাহী-জনতার এক সমাবেশ হবে। সেখানে বক্তব্য রাখবেন জিয়া আর তাহের।

 

কিন্তু মুক্ত হওয়ার পরে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। জিয়া তার রুপ বদলে ফেলেন। তিনি ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হতে সম্মত হন না। উর্ধ্বতন সামরিক অফিসাররা তাঁকে পরামর্শ দিতে থাকেন। তাহের জিয়াকে ভাষণ দিতে বলেন। জিয়া ভাষণ দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তাহের বুঝতে পারেন জিয়া তাঁদের সাথে আর থাকছেন না। তিনি পুনরায় সংগঠিত হতে থাকেন। কিন্তু জিয়া বুঝতে পারেন ক্ষমতায় টিকতে হলে তাহের সহ জাসদকে সরাতে হবে। তারপর জিয়াউর রহমান দ্রুতই তার আসল চেহারা খোলশ থেকে বের করে ফেলে। একটা পাতানো আদালত বানিয়ে তাহেরকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়। শত শত জাসদ কর্মীকে জেলের ভেতরে হত্যা করা হয়। মুলত এই দিনটাকে তিনটা রাজনৈতিক দল বিপ্লবী ও সংহতী দিবস হিসাবে পালন করে এরা হচ্ছে ১। বি এন পি, ২। জাসদ, ৩। জামাত,

 

বিএনপি মুলত জন্ম নেয় এই ৭ই নভেম্বরে।তবে তাদের ভেতরে যদি ন্যুনতম লজ্জা আর সততা থাকত তাহলে তাদের আলোচনায় তাহেরে প্রতি কৃতজ্ঞতার বিষয়টা উল্লেখ করা হত। কারন যদি কর্নেল তাহের  সেইদিন জিয়াউর রহমানকে বিশ্বাস না করতেন - তাহলে হয়তো ৭ই নভেম্বর জিয়াউর রহমান মৃত্যু বার্ষিকী পালন করা হতো এবং পরবর্তিতে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু বার্ষিকিতে জন্মদিন পালন করার দুঃসাহস বেগম জিয়া দেখাতে পারতেন না।

 

বিশিষ্ট সাংবাদিক নির্মলেন্দু সেনের একটা লেখা থেকে ৭ই নভেম্বর অনেক তথ্যই জানা যায়। ১৯৭৫ এর নভেম্বরের এক দুপুরে কর্নেল তাহের তাকে তার বাড়িতে ডেকে নিয়ে যান। তাহের তাকে তার সেনা জীবনের বর্নাঢ্য কাহিনি শোনান।মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনান। কিভাবে যুদ্ধে গুলি খেয়ে পা হারালেন সেই গল্প শোনান। যুদ্ধ পরবর্তিকালে কর্নেল তাহের চেয়েছিলেন সেনা বাহিনীতে কোন বৈসম্য থাকবে না। মেজর থেকে মেজর জেনারেল সবাই একই সাথে এক ছায়াতলে আসবে। কিন্তু তার সপ্ন আর পুরন হয় না।তার কথার শেষে নির্মলেন্দু সেন বলেন কর্নেল সাহেব আপনাকে তো গ্রেফতার করা হবে। আমি আপনার বাড়ির বাইরে অসংখ্য সামরিক ও বেসামরিক গোয়েন্দা দেখে এলাম। কর্নেল তাহেরের চোখ জ্বলে উঠল। তিনি ইংরেজিতে বললেন, জিয়া আমাকে স্পর্শ করার সাহস পাবে না। আমাকে স্পর্শ করলে প্রতিটি সেনানিবাসে বিদ্রোহ হবে। এবং বললেন, নির্মল সেন আমি ভারতের দালাল নই। আপনাদের মিথ্যাচার বন্ধ করুন। আপনি আমাকে একদিন মনে করবেন। কারণ আমিই সেনাবাহিনীতে শ্রেণী সংগ্রাম চালু করেছি। তিনি একটি কথা উল্লেখ করলেন যে, জিয়ার কোনো খবর পাচ্ছি না। জিয়া কখনও আমার ফোন ধরছে না।

 

১৯৭৫ সালের ২৪ নভেম্বর জেনারেল জিয়ার সরকার কর্নেল তাহেরকে গ্রেফতার করে। পরবর্তীকালে গ্রেফতার হন মেজর জলিল, আ স ম আব্দুর রব, হাসানুল হক ইনু, ড. আখলাকুর রহমান প্রমুখ জাসদ নেতা। তাঁদের গ্রেফতারের ৭ মাস পর এবং সামরিক শাসন জারির ১০ মাস পর রাষ্ট্রপতি সায়েম একটি  অধ্যাদেশ জারি করেন। তাহের বা অন্যদের বিচারের জন্য বিশেষ সামরিক আদালত গঠিত হয়।

 

সাধারণ সামরিক আইন আদালতে বিচার বিভাগ থেকে বিচারক নেয়া হয়--- কিন্তু এই সামরিক আইন আদালতে  বিচার বিভাগ থেকে কোনো বিচারক নেয়া হয়নি। ৫ বিচারকের মধ্যে ৩ জন ছিলেন সামরিক কর্মকর্তা, দুজন ছিলেন তৎকালীন সামরিক প্রশাসনের ম্যজিস্ট্রেট। তাহের ও অন্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয় কর্নেল তাহেরসহ অভিযুক্ত ব্যক্তিবর্গ ১৯৭৩ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত আইনত প্রতিষ্ঠিত সরকারকে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উৎখাত করে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরে বিভিন্ন তৎপরতা চালায়!!! যদিও জিয়া নিজেই অভ্যুত্থানকারীর সহায়তায় ক্ষমতায়  এসেছিলেন। আদালতে সাতজন রাজসাক্ষী হাজির করা হয়। তারা এক সময় সহ-অভিযুক্ত ছিল। নিরপেক্ষ কোনো সাক্ষী এ মামলায় ছিল না। সরকার পক্ষ সরকার উৎখাতের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ আদালতে দিতে পারেনি। এমনকি সরকারি উকিল মৃত্যুদন্ড দাবি না করলেও আদালত তাহেরকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করে। এমনকি যে আইনে তাঁর বিচার হয়েছে, সে আইনেও মৃত্যু্দন্ডের বিধান ছিল না।

 

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ১৭ জুলাই আদালতের রায় অনুমোদনের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয়। তিনি ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই এ রায় অনুমোদন করেন। অথচ ১৯১৯ সালের জেল কোড অনুযায়ী কোনো  আসামির মৃত্যুদন্ড কার্যকর করতে হলে ২১ দিন পূর্বে জেল সুপারেন্টেনডেন্টকে ওয়ারেন্ট পাঠাবার বিধান আছে। কিন্তু তাহেরের সবচেয়ে ভয়াবহ এবং অমানবিক হচ্ছে, যে আইনে তাহেরকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয়েছে, কোন কালেই সে আইনের কোনো অস্তিত্ব ছিল না।

 

২১ জুলাই তাহেরের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার পর ৩১ জুলাই আইন মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনে সামরিক আইনের ২০তম সংশোধনী জারি করা হয়। এই সংশোধনীতে সামরিক বাহিনীতে রাজনৈতিক মতবাদ  প্রচারের শাস্তি মৃত্যুদন্ডের বিধান প্রবর্তন করা হয়। এ ঘটনা দেশবাসীর কতজনের জানা আছে?

 

মুক্তিযুদ্ধের এই অকুতোভয় সেনাকে যেভাবে কোনো আইনের তোয়াক্কা না করে ফাঁসি দেয়া হয়েছে, তার তুলনা ইতিহাসে বিরল। এ অবৈধ কাজ যাঁরা করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াই তো শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিকের একমাত্র দায়িত্ব এবং কর্তব্য। আজকে এই কাজের জন্য যারা দায়ী ছিল তারা অনেকেই জীবিত নেই। কিন্তু কর্নেল তাহেরের বিরুদ্ধে যে মিথ্যাচার করা হয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে তো ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। এই দেশে জিয়ার মত একজন বেঈমানের হত্যার বিচার হলে, বিডিয়ার বিদ্রেহের বিচার হলে কর্নেল তাহেরের হত্যার বিচার হবে না কেন?

 

মুলত ৭ই নভেম্বর সেইদিন-- যেদিন স্বাধীন-সার্বভৌম-গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ আবার দীর্ঘদিনের জন্য চলে  গিয়েছিল একনায়কতন্ত্রের কালো থাবার ভিতরে ।

 

১৯৭৫ সাল বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরকালই এক হিংস্র-ভয়াবহ- বিভ্রান্ত সময়ের ডায়েরি হয়ে বেঁচে থাকবে। বিবেচিত হবে এক চরম লজ্জা ও দুঃসময়ের বছর রূপে। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে এই সময়ে একের পর এক ঘটে গেছে চূড়ান্ত বিপর্যয়ের ঘটনাগুলো, যা ছিল একই সাথে দুঃখ এবং লজ্জাজনক এবং বিশ্ব ইতিহাসে কলঙ্ক।

 

এক সময় শুনতাম কাক নাকি কাকের মাংস খায়না। একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে জিয়াউর রহমান যেভাবে আরেকজন মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল তাহেরকে ক্ষমতার লোভে এবং ৭ই নভেম্বরের ইতিহাসকে ঢাকার জন্য হত্যা করেন তাতে এটাই প্রমানিত হয়----- ১৯৭৫ এর ১৫ই আগস্ট থেকে শুরু করে জেলের ভেতরে  জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করে ক্ষমতায় আসার নীল নকশার সাথে জিয়াও জড়িত ছিলেন।

 

বেঈমানি আর প্রতারনা বিএনপির রন্ধ্রে রন্ধ্রে। যার প্রমান বিএনপির জন্ম থেকে পরবর্তিতে বেগম জিয়া ১৫ই আগস্টকে নিজের মিথ্যা জন্মদিন পালন এবং ২১ আগস্টের মত ভয়াবহ ঘটনা ঘটিয়ে প্রমান দিয়েছেন। স্বাধীনতার ঘোষক থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লক্ষ শহীদ নিয়ে দিনের পর দিন প্রহসনের আর মিথ্যার জাল বিছিয়ে বারে বার এই দেশের ইতিহাসকে কলঙ্কিত করার অপঃ তৎপরতা চালিয়ে গিয়েছেন। মোদ্দা কথা যাদের জন্মই এত বড় প্রতারনা দিয়ে তারা আর কত আলোকিত ইতিহাসের জন্ম দিতে পারবে?

 

ইতিহাসের প্রতিটা অন্যায়ের বিচার একদিন না একদিন হয়ই । যেই সামরিক উত্থান করিয়ে জাতির জনককে হত্যা করা হয়, হত্যা করা হয় তার পরিবারকে , জেলের ভেতরে জাতীয় চার নেতাকে এবং বীরবিক্রম কর্নেল তাহেরকে ,পরবর্তিতে সেই সামরিক উত্থানেই জিয়াকে ও প্রান হারাতে হয়। আর সেইবিচারেও পরবর্তিতে প্রহসন মুলক ভাবেই আরেক সেনাপতি এরশাদ সাহেব বাংলার জনগনকে উপহার দিয়েছিলেন। একেই বলে ধর্মের কল বাতাসে নড়ে।

 

যেসব বিশেষ ব্যাক্তিবর্গরা ৭ই নভেম্বরকে আমাদের সামনে এমন গর্বিত অধ্যায়ের মত করে তুলে ধরার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন তাদের উদ্দেশ্য করেই বলি-----  আমরা নুতুন প্রজন্ম,আমরা কিন্তু এখন আর  আপনাদের ঘুম পাড়ানি মাসী পিসীর গল্প শুনে ঘুমিয়ে নেই। আমাদের ইতিহাস এখন আমাদের সাথেই  থাকে। হাত বাড়ালেই গুগল বা উইকিপিডিয়া খুজলে পেয়ে যাই সকল তথ্য। সুতরাং আর মিথ্যাচার করে নিজেদের মহান না বানালেই হয়ত আপনাদের নির্লজ্জতা একটু কম হয়।যদিও এটার অভাব আপনাদের নেই।

 

মুলত ৭ই নভেম্বরে একজন মুক্তিযোদ্ধা কিভাবে দেশের সাথে প্রতারনা করল ,প্রতারিত হলো একটা দল আর বিশেষ করে প্রতারিত হলেন মহান মুক্তিযোদ্ধা খালেদ মোশারফ এবং কর্নেল তাহের--- তারই দলিল প্রমান বহন করে। তাই এই বিষয়গুলো দেখার পর সাধারন জনগন এই দিনটি জাতীয় প্রতারনা দিবস হিসাবে পালন করতে পারেন। আর তার পরেও আজ যারা এই দিনটাকে বিপ্লব ও সংহতি দিবস পালন করছেন, তাদের কাছে প্রশ্ন ৭ই নভেম্বরের বিপ্লবের নায়ক কে? জেনারেল জিয়াকে মুক্ত করেছিল কে? তাহেরকে বেআইনিভাবে হত্যা করেছে কে?

 

 বিঃ দ্রঃ প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলাকথার এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলাকথা কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT