Main Menu

পাগলা মামা

দশ

রাশেদুল ইসলাম: মামা হটাৎ উঠে দাঁড়ান । বলেন, ‘ চল একটু হাঁটি’ ।  আমি আঁতকে উঠি । বলি, ‘মামা এ অন্ধকারে কিছুই দেখিনে ।  হাঁটবো কী করে’ ? ‘শোন মানুষ নিজেও একটা নিশাচর প্রাণী’ । মামা বলেন,  ’৭১ সনে যুদ্ধের সময় এই অন্ধকার রাতই ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের কাম্য । অনেক মুক্তিযোদ্ধার জীবন বাঁচিয়েছে এই  কালো আঁধার । কালো রাতই ছিল পশ্চিমা শত্রুর ঘাঁটিতে আক্রমণের মোক্ষম সময় । তুই মুক্তিযুদ্ধে যাসনি; শত্রুর ভয়ে তোকে কখনো পালাতে হয়নি । তাই অন্ধকার  তোর কাছে ভয়ের ব্যাপার । কিন্তু অনেকের কাছে অন্ধকার মানে নিরাপত্তা । অন্ধকার মানে আশ্রয় । মামা হাঁটতে শুরু করেন । হাঁটতে হাঁটতে বলেন, ‘তুই এখানে আসার আগে  এই অন্ধকারে আমি গোটা চিড়িয়াখানা ঘুরে দেখেছি । প্রথমে শিম্পাঞ্জি, তারপর গণ্ডার, হায়েনা আর শুকর দেখার পর যাদুঘর । যাদুঘর পার হয়ে গাধা, ঘোড়া, জেব্রা দেখে উত্তর লেকের পাড়ে যাই ।  এরপর কুমির,সিংহ বাঘ, সাপ, বানর, জলহস্তী, চিল, শকুন, বাজপাখী দেখে বানরের খাঁচার সামনে গিয়ে দাঁড়াই । বানর মানুষের খুব প্রিয় একটা প্রাণী । কারণ, বানরের অনেক স্বভাব, আচরণ অনেকটা মানুষের মত । এ কারণে বানরের  খাঁচার সামনে দর্শকদের ভিড় বেশী হয় ।

‘আপনি কি করে জানেন বানরের খাঁচার সামনে মানুষের ভিড় বেশী হয়’ ? আমি জানতে চাই ।

‘যে কোন প্রাণীর খাঁচার সামনে গেলেই  বোঝা যায়, সেখানে মানুষের ভিড় কেমন হয় । যেমন-  একটা রাস্তা দেখলে বোঝা যায়, সেই রাস্তার লোক চলাচল কেমন ।  এর জন্য কোন গবেষক হওয়ার দরকার হয় না । তবে, আমি অবাক হয়েছি বাঘের খাঁচার সামনে গিয়ে’ -  মামা বলেন ।

‘কেন’? আমি জানতে চাই । মামা বলেন, ‘সেখানে একটা বাঘ বাম দিকে কাত হয়ে লম্বালম্বি শুয়ে আছে । দেখে   মনে হয় একটা মানুষ শুয়ে আছে । বাঘও যে মানুষের মত ঘুমায় আমার জানা ছিল না’ ।

মামার হাঁটার গতি বাড়ে ।  অন্ধকারে একটা কালো ছায়ামূর্তি  মনে হয় তাঁকে । চারিদিকে পোকামাকড়ের  কেমন যেন একটানা ঝা ঝা শব্দ । জোনাকি পোকার আলো জ্বলে আর নেভে । রাস্তার কিছুই দেখিনে আমি । অন্ধকারে আন্দাজে পা ফেলে মামাকে ধরতে চাই । একটা অশরীরী ছায়ার পিছনে  ছুটছি মনে হয় আমার । গা ছম ছম করে । সামনে মামার ছব্দবেশে কোন ভূত নয় তো ? আমি গ্রামের ছেলে । এরকম অনেক ভূতের গল্প আমার জানা ।

দুই বন্ধুর একসাথে  মাছ ধরতে যাবার কথা । ভোর রাতে কলিমুদ্দিকে ডেকে নেবে  ছলিমুদ্দি । যে কথা সেই কাজ । ঠিক ভোররাতে ডাক দেয় ছলিমুদ্দি । কলিমুদ্দি জাল  আর খালোই নিয়ে ছলিমুদ্দির পিছু পিছু যায় । জালে অনেক মাছ ধরা পড়ে । মাছগুলো ডাঙ্গায় রেখে কলিমুদ্দি আবার জাল বাইতে  নামে । হটাৎ ডাঙ্গার দিকে চোখ পড়ে তার । ছলিমুদ্দিকে দেখে চমকে উঠে সে । খালোইতে মাছগুলো না রেখে নিজেই গপ গপ করে খাচ্ছে  সে । ছলিমুদ্দির পায়ের দিকে তাকায় কলিমুদ্দি । হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে তার । ছলিমুদ্দির দু’পায়ের পাতা পিছন দিকে । তারমানে ছলিমুদ্দি নয়;   ছলিমুদ্দির ছব্দবেশে একটা ভূত ভুলিয়ে তাকে নিয়ে এসেছে । অজ্ঞান হয়ে যায় কলিমুদ্দি । পরদিন গ্রামের লোকেরা অজ্ঞান কলিমুদ্দিকে উদ্ধার করে । কপাল ভালো  মাথাটা ডাঙ্গায় ছিল । এজন্য সে যাত্রায় রক্ষা পায় কলিমুদ্দি ।

মামাকেও কেমন যেন ভূত মনে হয় আমার  । মনে হয় সামনের ছায়ামূর্তি মামা নয় । একটা ভূত । হটাৎ    ছায়ামূর্তিকে রাস্তা থেকে নামতে দেখি আমি । আমার শরীর ভয়ে ঠাণ্ডা হয়ে আসে । আমি দাঁড়িয়ে পড়ি । মামার ডাকে টনক নড়ে আমার । ‘কিরে  এখনও ভূতের ভয় তোর ? আমাকেও ভূত মনে করিস তুই’ ? আমি আবারও লজ্জা পাই । অন্ধকারে সাবধানে পা ফেলে মামার পাশে গিয়ে বসি আমি ।

মামা বলেন, ‘ওপাশে ওটা কিরে ? দ্বীপের মত মনে হয় । ওখানে যাওয়া যায় নাকি’  ?

অন্ধকারে কিছুই দেখিনে আমি । নিজের হাতও দেখা যায় না । আন্দাজে বলি,  ‘বাবলা দ্বীপ । লেক পার হয়ে যেতে হয় বোধহয় । আমি নিজে কখনো যাইনি’ । আমি প্রসঙ্গ পাল্টাতে চাই । বলি,  ‘ মামা, আপনি বলছিলেন মানুষের পূর্বপুরুষের জন্ম এ গ্রহে নয় । একটু ব্যাখ্যা দিয়ে বলবেন কি’ ?

মামা বলেন, ‘তুই বলেছিস এই চিড়িয়াখানায়  ১ শ’ ৩৮ প্রজাতির প্রাণী আছে । তোর কথা একদিক থেকে ঠিক । আর একদিক দিয়ে ঠিক নয় । ঠিক এই অর্থে যে, এখানে ১  শো ৩৮ প্রজাতির মোট ২ হাজার ৭ শ’ ৯২ টি খাঁচাই বন্দী প্রাণী আছে । আবার বেঠিক এই অর্থে যে,  এই হিসাব থেকে তোর-আমার মত মানুষ প্রজাতির প্রাণী বাদ দেয়া হয়েছে । ব্যাঙ, তক্ষক,  ছারপোকা, মশা, তেলাপোকা, জোনাকি পোকা, মাটির নিচের কেঁচো, হাজার হাজার কীটপতঙ্গের যে বিচিত্র শব্দ তোর কানে আসছে – এ সকল  প্রাণীর প্রজাতিদের এ হিসেব থেকে বাদ দেয়া হয়েছে ।  এ সকল প্রাণীর প্রজাতির হিসেবে নেওয়া হলে,  এই চিড়িয়াখানাতেই মোট প্রজাতির সংখ্যা হবে লক্ষাধিক । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ১৫ লক্ষ প্রজাতির প্রাণীর ডিএনএ ম্যাপিং এর কাজ চলছে । তারা আশা করে, দশ বছরের মধ্যে এ কাজ শেষ হবে । মানুষ ছাড়া এসব লক্ষ লক্ষ প্রজাতির প্রতিটি প্রাণীই সুনির্দিষ্ট একটা নিয়মে আবদ্ধ । একটা সুনির্দিষ্ট প্রাকৃতিক নিয়ম মেনে চলে তারা । কিন্তু, মানুষ একমাত্র  প্রজাতি যা প্রকৃতির কোন নিয়মে আবদ্ধ নয় । মানুষ প্রকৃতির নিয়মের  ব্যতিক্রম । মানুষের উন্নতমানের মস্তিস্কের কথা আমি আগে বলেছি । বিজ্ঞানীরা বলেন,   মানুষের মস্তিস্ক  বিশ লক্ষ কম্পিউটারের সমান ক্ষমতাসম্পন্ন ।   এ ধরণের মস্তিস্ক এই লক্ষ লক্ষ কোন প্রজাতির প্রাণীর মধ্যে  নেই । এই চিড়িয়াখানায় মোট ১৮ প্রজাতির তৃণভোজী বড় প্রাণী আছে । যেমন, এসিয়ান হাতি, গয়াল, জিরাফ, মায়া হরিণ, চিত্রা হরিণ, ঘোড়া, গাধা, জেব্রা, উঠ, জলহস্তী ইত্যাদি, ইত্যাদি ।  এসব প্রাণী তৃণ বা ঘাসপাতা জাতীয় খাবার খেয়ে থাকে । এ শ্রেণির কোন  প্রাণী মারা গেলেও কখনো মাংস খাবে না । একই ভাবে এই চিড়িয়াখানার ১১ প্রজাতির মাংসাশী প্রাণী আছে । যেমন-বাঘ, সিংহ, শিয়াল, হায়েনা, গ্রে হাউনড কুকুর, বনবিড়াল ইত্যাদি । এসব প্রাণী মাংস খেয়ে বাঁচে । এদের কেউ মারা গেলেও কখনো ঘাসপাতা খাবে না । নৃতাত্ত্বিক বিচারে  মানুষ একটি তৃণভোজী প্রাণী । মাংসাশী প্রাণী নয় । কিন্তু একজন মানুষ মাংসাশী প্রাণীর চেয়ে অনেক বেশী মাংস খেয়ে থাকে । তৃণভোজী প্রাণী হলেও মানুষ ঘাস খায় না । শাকপাতা ঠিকই খায়;  কিন্তু প্রকৃতিতে যেভাবে পাওয়া যায়,  সেভাবে নয় । মানুষের যে কোন খাবারের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হয় । জন্মের পর বিশেষ ব্যবস্থা না নিলে একটি মানবশিশু বাঁচে না । এই  মানবশিশু বড় হলেও তার থাকা খাওয়ার বিশেষ ব্যবস্থা না হলে, সে বাঁচে না । মানুষ যদি এই গ্রহের প্রাণী হত; তাহলে মানুষের জন্য এই বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন হত না। এ কারণে আমি মনে করি,  মানুষের পূর্বপুরুষ এ গ্রহের প্রাণী ছিল না’ ।

আমি প্রসঙ্গ পাল্টাতে চাই । বলি, ‘আজকাল মুসলমানদের মধ্যে বিদআত শব্দটি বেশ বিভ্রান্তির সৃষ্টি করছে । নামাযের পর কেউকেউ মোনাজাতে অংশ নেয় । কেউকেউ মোনাজাত না করেই চলে যায় । একদল বলে ফরয নামাযের পর সমবেত মোনাজাত করা বিদআত । আরেক দল বলে এ ধরণের মোনাজাতে কোন অসুবিধা নেই ।  একজন  ধর্মভীরু সাধারণ  নামাজীকে এ নিয়ে বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয় । এর কোন প্রতিকার আছে কি’?  

মামা বলেন, ‘তুই কি ‘বিদআত’ অর্থ জানিস’ ?   আমি চুপ থাকি । মামা বলতে থাকেন, ‘বিদআত একটি আরবী শব্দ । এর  আভিধানিক অর্থ ‘নতুনত্ব’ ।  ‘নবতর উদ্ভাবন’ । ‘বিদআত’ নিয়ে আলোচনা করতে  গেলে আগে নবী করিম (সঃ) নিয়ে কথা বলতে হবে । আমি আগেই বলেছি ইসলামকে বুঝতে গেলে আল্লাহ্‌র নবীকে বুঝতে হবে । পবিত্র কোরআনকে বুঝতে গেলে নবীকে বুঝতে হবে । নবী মোহাম্মদ (সঃ)কে না বুঝে কোরআন বা  ইসলামকে বোঝা সম্ভব নয় । এ কারণে, আগে আমাদের বুঝতে হবে  কোন ‘নতুনত্ব’  বা  নবতর উদ্ভাবন বা বিদআতকে নবী করিম (সঃ)  নিজে কিভাবে নিয়েছেন’ ।

মামা একটু দম নেন । চুপ থাকেন কিছুক্ষণ । তারপর আবার শুরু করেন, ‘আমি তোকে বলেছি মানুষের শিশুকালের কথা । একটা মানবশিশু জন্মের পর অবাক বিস্ময়ে পৃথিবীকে দেখে । তারপর একটার পর একটা প্রশ্ন করে । প্রায় সকল শিশুই বাবা মা বা আপনজনের  কাছে যে জবাব পায়,  তাই  মেনে নেয় ।  যেমন-জেলেপাড়ার একটা শিশু জানতে চায়,   তারা মাছ ধরে কেন ? সে জবাব পায়, তার বাবার বাবারাও   মাছ ধরেছে । মাছধরা তাদের পেশা । এ পেশা বংশগত । এ পেশার সাথে তাদের বংশের ইজ্জত জড়িত ।  সে নিজেও মনে মনে তৈরি হয় জেলে হওয়ার জন্য । প্রচলিত চলমান ব্যবস্থাকে সে শাশ্বত মনে করে । তাই, বড় হয়ে  সে প্রচলিত ব্যবস্থার কোন পরিবর্তন চায়না ।  কোন ‘নতুনত্ব’,   নবতর উদ্ভাবন  বা বিদআত নিয়ে তার কোন মাথাব্যথা থাকে না । কিন্তু, হাতেগোণা কিছু শিশু থাকে,  যারা পরিবার বা সমাজে প্রচলিত ব্যবস্থা বিষয়ে বাবা মা বা সমাজের দেওয়া জবাব মেনে নেয় না । পরিবর্তন চায় ।  এ ধরণের  উল্লেখযোগ্য একটি শিশুর নাম  মোহাম্মদ’ ।(চলবে)  


 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT