Main Menu

পাগলা মামা পর্ব ৯

রাশেদুল ইসলাম

 

লেকের পানিতে কিসের যেন শব্দ । অন্ধকারে বোঝার উপায় নেই । পাগলা মামা অন্যমনস্ক হয়ে পড়েন । । বলেন, ‘দ্যাখ, অন্ধকারকে আমার কালো  চাদর মনে হচ্ছে । মনে হচ্ছে অন্ধকারের কালো চাদর গায়ে জড়িয়ে আছি আমি’ । অদ্ভুত এক শব্দ করে হেসে ওঠেন মামা । আমার কেমন যেন ভয় ভয় করে । হটাৎ মামাকে ভীতিকর এক প্রাণী মনে হয় আমার  । আমি নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করি । বলি, ‘মামা, আপনি চার্লস ডারউইনের কথা বলছিলেন’ ।

মামা বলতে থাকেন, ‘চার্লস ডারউইন ১৮০৯ সালে ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন । বাবা ডাক্তার । বাবা চান চার্লস বাবার মত ডাক্তার হোক । এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলেকে পাঠান তিনি । কিন্তু, চার্লসের ডাক্তারি পড়া ভালো লাগে না । তাঁর পছন্দ প্রকৃতি । পছন্দ প্রকৃতির গাছপালা,  জীবজন্তু – এইসব । এ সময় একটি জাহাজে একজন প্রকৃতি বিজ্ঞানীর  দরকার হয় ।  জাহাজটির নাম এইচএমএস বিগেল । জাহাজটি সমুদ্রের বিভিন্ন দ্বীপে জরীপের কাজ করে । সেই জাহাজের যাত্রী হন চার্লস ডারউইন । এ  জাহাজে  বিভিন্ন দ্বীপে ঘুরে একটা মজার অভিজ্ঞতা হয় তাঁর । তিনি লক্ষ্য করেন একই ধরণের প্রাণী এক এক জায়গায় এক এক রকম দেখতে । যেমনঃ  সমতল ভূমির ইঁদুর এবং  দ্বীপের ইঁদুর দেখতে এক রকম নয় । দেখলে বোঝা যায় দু’টিই ইঁদুর । কিন্তু, দু’টির মধ্যে অনেক মিল যেমন আছে; তেমনি অমিলও আছে । তিনি বিভিন্ন প্রাণীর নমুনা সংগ্রহ শুরু করেন । বিভিন্ন প্রাণীর হাড়গোড় এবং কঙ্কাল নিয়ে গবেষণা শুরু করেন তিনি  । অতীতে একই  প্রাণীর শরীর কাঠামো  এবং  বিবর্তনের ধারায় পরিবর্তিত রুপ তাঁর গবেষণার বিষয় । এসব গবেষণায় তাঁর কাছে প্রমাণিত হয় যে,  একই ধরণের কিছু পূর্বপুরুষ থেকে সকল প্রাণীর সৃষ্টি হয়েছে । প্রকৃতিতে টিকে থাকতে সকল প্রাণীকেই সংগ্রাম করতে হয় । যারা টিকতে পারে না,  প্রকৃতির নিয়মে বিলীন হয়ে যায় সেই প্রজাতি । কেবল যোগ্যতম প্রজাতিই টিকে থাকে । এটাই চার্লস ডারউইনের বিবর্তনবাদ ।  তার মতে  মানুষও একটা প্রাণী । বানর প্রজাতির পূর্বপুরুষ থেকে  মানুষের জন্ম হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন । মানুষ সৃষ্টি সম্পর্কে চার্লস ডারউইনের এই মতবাদ চারিদিকে হৈ চৈ  ফেলে দেয় । ধর্মবিশ্বাসীরা এটা তাদের ধর্মবিশ্বাসের পরিপন্থী মনে করে । তবে, সারা পৃথিবীর মানুষের চিন্তার জগতকে কাঁপানো এরকম মতবাদ পৃথিবীতে আর নেই ।

‘চার্লস ডারউইনের এই মতবাদ কি  ধর্মীয় বিধানের  পরিপন্থী নয়’? আমি প্রশ্ন করি ।

মামা বলেন, ‘দ্যাখ, ধর্ম এবং বিজ্ঞান সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয় । বিজ্ঞানের ভিত্তি তথ্য -উপাত্ত ও  প্রমাণ । আর, ধর্মের  ভিত্তি হোল  বিশ্বাস । তাই,  এ দুটো বিষয়ের কোন  তুলনা করা সমীচীন নয় ।  তাছাড়া, কোন প্রশ্নের এক কথায় ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ উত্তরে অনেক ধোঁয়াশার জন্ম দেয় ।  তারপরও তুই যেহেতু প্রশ্নটা করেছিস, ধর্মীয় বিধানের  আলোকেই  আমি  তোর প্রশ্নের জবাব দেয়ার চেষ্টা করবো ।  ইসলাম ধর্মের কথাই বলি ।  তুই জানিস, পবিত্র কোরআনে মানুষকে একটি ‘সহজাত বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণী’  বলা হয়েছে । কোরআনে  মানুষকে তার এই ‘সহজাত বিচারবুদ্ধি’  বা ‘কমন সেন্স’ প্রয়োগের জন্য তাগিদও  দেয়া হয়েছে । তুই মনে কর,  বাংলাদেশের একটা ছেলে জানে তেঁতুল টক হয়, কাকের রং এবং মাথার  চুল কালো হয় । ছেলেটি থাইল্যান্ডে গিয়ে দেখল, সেখানে তেঁতুলের স্বাদ মিষ্টি । অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে দেখল, সেখানকার কাকের রং সাদা । ইউরোপে  গিয়ে দেখল সেখানকার মানুষের চুলের রং লাল অথবা সাদা । এখন যদি ছেলেটি  এই পার্থক্যের কারণ জানার জন্য গবেষণা শুরু করে, তাহলে কী  তা কোন ধর্মীয়  বিধানের পরিপন্থী  হবে ? তোর কি মনে হয়’ ? আমি চুপ থাকি । মামা আমার মৌনতাকে সম্মতির লক্ষণ ধরে নেন বোধহয় । তিনি বলতে থাকেন- ‘তাহলে  চার্লস ডারউইনের গবেষণা কর্মটি ধর্মীয় বিচারে অবৈধ কিছু নয় । এখন প্রশ্ন এই গবেষণার ফলাফল নিয়ে । ডারউইনের গবেষণার সবচেয়ে কার্যকরী সুফল ছিল মানুষের চিন্তার জগতকে খুলে দেয়া । তখনকার সমাজে অন্ধ ধর্মবিশ্বাসের কারণে মানুষের চিন্তাশক্তি একটা ‘গিটটু’ দিয়ে বাঁধা ছিল । ডারউইনের গবেষণা রিপোর্ট প্রকাশিত হবার পর এই ‘গিটটু’ খুলে যায় ।  এ কারণে বিভিন্ন গবেষণায় জীববিজ্ঞান, চিকিৎসা বিজ্ঞানসহ বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় প্রভূত উন্নতি ঘটে । চিন্তার ‘গিটটু’র  বিষয়টা আমি তোকে  একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে পারি । তুই জানিস এক সময় আমাদের দেশে শুধু আউস এবং আমন-  এই দুই জাতের ধান চাষ হতো । সে সময় এই ধানের আবাদ সম্পূর্ণ প্রকৃতি  নির্ভর ছিল । যে বছর সময়মত বৃষ্টি হত,  সে বছর ভালো ফসল হত । কিন্তু, অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টি হলে আবাদ ভালো হতো না । দেশে খাদ্য সংকট হতো । দুর্ভিক্ষ হতো ।  এ সমস্যা নিরসনের জন্য কৃষিবিজ্ঞানীরা  ইরি ধান আবিস্কার করেন । এ ধান আবাদের জন্য গভীর নলকূপের মাধ্যমে ক্ষেতে পানি দিতে হয় । এক শ্রেণির ধর্মীয় নেতারা তখন ঘোষণা দেন,  এ ব্যবস্থা ধর্মসম্মত নয় । গভীর নলকূপের মাধ্যমে পানি তোলা  ধর্মীয় বিধানের  পরিপন্থী । আল্লাহ্‌র  বৃষ্টি দিয়ে আবাদ করাই ধর্মের  বিধান । এ ধরণের কথা যখন  কোন ধর্মীয় নেতা  বলেন,  তখন  সাধারণ ধর্মবিশ্বাসীরা সেটাই  বিশ্বাস  করে । নিজেরা নিজেদের ধর্মগ্রন্থ  পড়ে  এ কথার সত্যতা  কেউ  যাচাই করার চেষ্টা করে না । এটাকেই চিন্তার  ‘গিটটু’ লাগা বলে ।  আমি  কোরআনের কথাই  বলি । কোরআনে এমন কোন বিধান নেই যে, প্রকৃতির নিয়ম মেনেই  আবাদ করতে হবে । পবিত্র কোরআনে মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব ঘোষণা করা হয়েছে । বলা হয়েছে মহান আল্লাহ্‌ ততক্ষন  একজন মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করে না;  যতক্ষন সেই মানুষ নিজে তার ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা না  করে । মানুষ তার অসীম ক্ষমতাসম্পন্ন মস্তিস্কের কারণেই সৃষ্টির সেরা জীব । সেই মস্তিষ্ক কাজে লাগিয়ে যখন মানুষ কিছু আবিস্কার করে;  মানুষের কল্যাণে সেই আবিস্কার কাজে লাগায়, তা কখনোই ধর্মের পরিপন্থী হওয়ার কথা নয় ।

‘মানুষ সৃষ্টি বিষয়ে চার্লস ডারউইনের  মতবাদ কি ধর্মীয় বিধানের  সম্পূর্ণ পরিপন্থী নয় ?  এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য  কি’ ? – আমি জানতে চাই ।  

‘চার্লস ডারউইনের  গবেষণা মতে একই পূর্বপুরুষ থেকে সকল মানুষের সৃষ্টি । আর এই পূর্বপুরুষ বানর জাতীয় প্রাণী । এটা অবশ্যই পবিত্র কোরআন বা বাইবেল সমর্থন করে না ।  কিন্তু, যে কোন গবেষণা একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া । চার্লস ডারউইনের  গবেষণা যেখানে শেষ হয়েছে, সেই ফলাফল নিয়ে অন্য একজন গবেষণা করবেন- এটাই নিয়ম । একটা গবেষণার ভুল বা সঠিকতা, অন্য একজন গবেষক  গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ করবেন । এই একাডেমিক বিষয়ে কোন ধর্মীয় গ্রন্থে বাঁধানিষেধ থাকার কথা নয় । তবে, একটা বিষয় এখানে বলা যেতে পারে । মানুষ একটা প্রাণী হলেও অন্যান্য প্রাণীর  সাথে মানুষের পার্থক্য নিয়ে তেমন কোন গবেষণা চার্লস ডারউইনের সময় হয়নি । তাছাড়া ডারউইন গবেষণা করেছেন সম্পূর্ণ বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে । তিনি ধর্মকে তাঁর বিবেচনায় আনেননি ।  তিনি বানর জাতীয় প্রাণীর শারীরিক কাঠামোগত দিক পরীক্ষা করেই তাঁর সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন ।  ডারউইনের সময় আধুনিক টেক্সনমি  আবিষ্কৃত হয়নি । বানর ও মানুষ একই শ্রেণিভুক্ত  হলেও তাদের জেনাস এবং স্পেসিসের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে । আধুনিক বিজ্ঞান মতে  একই জেনাস এবং স্পেসিসভুক্ত প্রাণী অন্য একই জেনাস এবং স্পেসিসভুক্ত প্রাণীতে রূপান্তর হওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব ।  একই প্রজাতির বিবর্তন নানা কারণে হতে পারে । কিন্তু, কোন ভাবেই সেই প্রাণী অন্য কোন প্রানীতে পরিণত হবে না’ । মামা  দম নেন । একটু থেমে আবার বলতে থাকেন-

’প্রাণীজগতের অন্যান্য প্রাণীর সাথে মানুষের  মৌলিক পার্থক্য আছে। আর, এ পার্থক্য জন্মগত । প্রায় ৮৬ বিলিয়ন নিউরন সমৃদ্ধ মস্তিষ্ক নিয়ে একটি মানবশিশু জন্মগ্রহণ করে । এ ধরণের অমিত সম্ভবনাময়  ক্ষমতা সম্পন্ন শক্তিশালী মস্তিষ্ক পৃথিবীর অন্য কোন প্রাণীর নেই । মানুষের মস্তিষ্ক নিয়ে পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা যে গবেষণা করেন তাতে বিস্ময়কর তথ্য জানা গেছে । একটা প্রাণী মাত্রই তার একটা ম্যামালিয়ান ব্রেন  আছে । এ ধরণের মস্তিষ্ক নিম্নস্তরের । ক্ষুধা, যৌন অনুভূতি, আত্মরক্ষার কৌশল প্রয়োগ ইত্যাদি এই ব্রেনের কাজ । বেশীরভাগ প্রাণীর কেবলমাত্র এই ম্যামালিয়ান ব্রেন আছে । শিম্পাঞ্জি, ইঁদুর, ডলফিন বা বানরের মত কিছু কিছু প্রাণীর ম্যামালিয়ান  ব্রেন ছাড়াও মিডব্রেন আছে । এ ব্রেন দ্বারা তারা অনুভূতি, ভয় এসব প্রকাশ করতে পারে । স্বল্প সময়ের জন্য তার স্মৃতিও ধরে রাখতে পারে । কিন্তু, মানুষ ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোন প্রাণীর কর্টেক্স ব্রেন নেই । দীর্ঘমেয়াদে স্মৃতি ধরে রাখা এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী ভবিষ্যতে কাজ করার মত মস্তিস্ক মানুষ ছাড়া  অন্য কোন প্রাণীর নেই । ডারউইনের সামনে মানুষের ব্রেন নিয়ে এ ধরণের গবেষণা রিপোর্ট বা আধুনিক টেক্সনমি ছিল না । এসব থাকলে মানুষ সৃষ্টি বিষয়ে ডারউইনের মতবাদ হয়ত ভিন্নরূপ হত’ । মামা একটু দম নেন । কিছুক্ষণ চুপ থাকেন । তারপর আবারও বলতে থাকেন , ‘দ্যাখ, একটা মানব শিশু অসীম ক্ষমতা সম্পন্ন একটা মস্তিষ্ক নিয়ে জন্মগ্রহন করে এটা সত্য । কিন্তু, অন্যের সাহায্য ছাড়া কোন  শিশু এই শক্তিশালী মস্তিষ্ক ব্যবহার করতে পারে না । আসলে একটা মানবশিশুর মত অসহায় কোন প্রাণী এ পৃথিবীতে নেই । জন্মের পর একটি মানবশিশুর প্রতি কেউ যদি যত্ন না নেয়; তাহলে সেই শিশু মারা যায় । ইঁদুর, বানর, হরিণ বা অন্য কোন প্রাণীর বাচ্চার ক্ষেত্রে এমনটি ঘটে না । কেউ কোন সাহায্য না করলেও অন্য যে কোন প্রাণীর বাচ্চা বেঁচে থাকে । কিন্তু, একটি মানবশিশু বাঁচে না । এ কারণে,  মানবশিশুকে অসীম সম্ভাবনাময় অসহায় একটি প্রাণী বলা যেতে পারে । তবে, অন্যের ভালোবাসা পেলে, যথাযথ সাহায্য পেলে- এই অসহায় শিশুটিই পৃথিবী জয় করার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে । একমাত্র  মানুষ ছাড়া এ ধরণের কোন প্রাণী পৃথিবীতে আর নেই ।  এ কারণে, আ্মার মনে হয় মানুষের পূর্বপুরুষের জন্ম এই পৃথিবী নামক  গ্রহে হয়নি’ ।

‘পবিত্র কোরআনে তো এ কথাই বলা হয়েছে । বলা হয়েছে আদি পিতা  হযরত আদম এবং মাতা বিবি হাওয়া থেকেই মানুষের জন্ম । আর আদম – হাওয়ার  জন্ম এ পৃথিবীতে হয়নি; বেহেস্তে হয়েছে’ – আমি বলি ।

‘না, কোরআনের  বিশ্বাস থেকে নয়;  আমি যুক্তি দিয়েই তোকে বিষয়টি  বোঝাতে চাই । আমি মনে করি মানুষের পূর্বপুরুষের জন্ম এ গ্রহে নয়’- মামা বলেন ।

আমি মামার মুখের দিকে তাকাই । কালো অন্ধকারে মামাকে কেমন যেন রহস্যময় মনে হয় । (চলবে)







 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT