Main Menu

নারীদের পরিধেয় পোশাক ও স্যানিটারি ন্যাপকিন

রোকসানা ইয়াসমিন রেশনা: বয়সের তুলনায় অতিরিক্ত ভুলোমন হয়ে গেছে আমার। আর আমার পারফেকশনিস্ট হাজব্যান্ডের কী, কেন, কোথায় এর গুতোনে আরো বেশী আউলা ঝাউলা অবস্থা। অধিকাংশ সময়ই একটা কাজ করতে তিনবার সাফা মারোয়া করা লাগে আমার। দেখা যাচ্ছে, আমি একটা জিনিস আনতে বাইরে গেছি, সেটাই না নিয়ে ফিরে এসেছি। যার জন্য আমার সারা মাসের ঔষধ প্রথম সপ্তাহে যেদিন মনে পড়ে সব গুলো এক সাথে নিয়ে আসি। বিল হয় ৪৩৮০ টাকা মতো।

 

তো, আমি যে দোকান থেকে প্রতি মাসে ঔষধ কিনি, সে দোকানে কিউট দুইটা বাচ্চা আছে। আমার ঔষধের টোটাল দাম থেকে শুরু করে কী কী ঔষধ সব ওদের মুখস্থ। বাচ্চা দুইটা লেখা পড়া করে নিজেদের খরচে। নোয়াখালী বাড়ী তো। পরিশ্রমী ও সুন্দর ব্যবহারের অধিকারী। হাত পা গুলে যাওয়ায় সকালে ঘুম থেকে উঠতে কষ্ট হতো দেখে ২০০৫ সালে নিপ্সনের এক ডাক্তার কী বুঝে যেনো একটা ঘুমের ঔষধ প্রেস্ক্রাইব করেছিল। বিষয়টা খানিকটা মানসিক ছিল কী না জানিনে, আমি এখনো এটা ফলো করি মাঝে মাঝেই। একদিন দোকানে গিয়ে ছোট ছেলেটাকে বললাম, আমাকে একপাতা জিওনীল দাও ও ০৪ প্যাকেট সেনোরা দাও। ছেলেটা বেশ স্বাভাবিক ভাবেই বললো, আপনি তো বক্স ধরে ধরে ঔষধ নেন। এটাও এক বক্স দেই?

বললাম, আমার ১৫ দিনে অর্ধেক করে সাড়ে সাতটা ঔষধ লাগে। কিন্তু এক পাতায় যেহেতু ১০টা থাকে, এক পাতাই দাও।

আন্টি, পরে আবার লাগতে পারে তো।

আমার কাছে প্রেসক্রিপশন নেই। ঘুমের ঔষধ এক বক্স ক্যামনে দিবা?

আপনি আমাদের অনেক দিনের পরিচিত। সমস্যা নেই।

আমি এক পাতাই দাও বলাতে ঔষধ আনতে ঘুরে গেলো ছেলেটা। কথাগুলো কিন্তু প্রকাশ্যে সবার সামনেই হলো। ঔষধ নিয়ে এসে এবার আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বললো, সেনোরা নুতন একটা এসেছে। বেশ ভালো। ওটা দিবো আন্টি? আমি ফিসফিস করে বলা দেখে খানিকটা অবাক হলাম। স্বাভাবিক ভাবেই বললাম, দেখি তো। এক্সট্রা কী কী সুবিধা আছে এতে।

 

কী বুঝলো কে জানে। বড় একটা কাগজের প্যাকেট নিয়ে চুপটি মেরে নিচে বসে পড়লো। তারপর চারটি প্যাকেট ভালো করে কাগজে মুড়িয়ে প্যাকেটের মধ্যে ঢুকিয়ে হাতে দিয়ে আবারো ফিসফিস করে বললো, বাসায় নিয়ে দেখেন আন্টি। দোকানে তো অনেক মানুষ। পছন্দ না হলে ফেরত দিয়ে যাবেন।

 

আমার হাসি পেয়ে গেলো। এতোটুকু ছেলে (!), একটু আগে জীবননাশকারী ঘুমের ঔষধ এক বক্স কোন প্রকার প্রেসক্রিপশন ছাড়াই আমাকে নেয়ার জন্য সাধাসাধি করলো সবার সামনে আর এখন স্যানিটারী ন্যাপকিনে কী পরিমান গোপনীয়তা রক্ষা করছে! মনে হচ্ছে আমি কোনো নিষিদ্ধ জিনিস কিনছি, যা অন্যরা জানলে মহা সর্বনাশ হয়ে যাবে।

 

আরেকদিনের ঘটনা বলি। গ্রীন লাইফ মেডিকেলের কয়েকটা ছেলে দোকানে দাঁড়ানো। আমি বাচ্চাটাকে স্যানিটারী ন্যাপকিনের কথা বলতেই ছেলেগুলো মাথা নীচু করে ওখান থেকে সরে গেলো। এই রকম ঘটনা আমার মনে হয় সব মেয়েদের সাথেই হয়। বাধ্য হয়ে আমার মেয়েকে একদিন আনতে বলেছিলাম। সে রাজী হয়নি। বললো, দোকানদাররা খুব হাসাহাসি করবে মা। আমি অনেক আন্টিরা চাইলেও দেখেছি, দোকানদাররা কেমন যেনো মজা করে।

আমাদের সমাজ, আমাদের পারিবারিক শিক্ষা ছেলেগুলোকে এটাই শিখায় যে প্রকাশ্যে চুমু খাওয়া এই দেশে অপরাধ, ঘুষ খাওয়া কক্ষনই নয়। থুক্কু, জীবননাশাকারী ঔষধ প্রকাশ্যে নেয়ে যায়, স্যানিটারী ন্যাপকিন কখনোই নয়।।

 

এবার অন্য একটা প্রসংগে আসি। এটার সাথেও মনে হয় কম বেশি সব নারীদেরই পরিচয় আছে।

আমাদের পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে প্রথমে তিন বোন তারপর দুই ভাই। গ্রামে যৌথ পরিবারে বড় হলেও আমার মা যথেষ্ট সুশিক্ষিত। দাদীর কোনো বিষয় নিয়ে তেমন মাথা ব্যাথা ছিল না। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে চাচাতো দাদীদের থেকে মাঝে মাঝে বেশ কিছু বিষয় নিয়ে কিছু কটু কথা শুনতে হোতো, যা দাদীদের রসিকতা বলে মেনে নিতাম। কিন্তু একটা কথা শুনলে মেজাজটা ধরে রাখা খুব কষ্ট হয়ে যেতো, তা হচ্ছে মাগী, যেটা হর হামেশাই তারা ব্যবহার করতো।

আমাদের ছোট ভাই, ও খুব ফ্যাসানিস্ট ছিল(!)। তবে পোশাকের ব্যাপারে বাছ বিচার করতো খুব কম। যেমন আমরা তখন খুব পাঞ্জাবী পরতাম। ওর পছন্দ হলো, পরে হেঁটে দিলো। সেটা যে মেয়েদের পাঞ্জাবী এবং তার যথেষ্ট বড় হয়েছে তাতে কোন সমস্যা ছিল না। আবার একটা স্যান্ডেল কেনা হয়েছে, একটু অন্য রকম ডিজাইন, ভালো লাগলো, পরে বের হয়ে গেলো। গ্রামের বাড়ী। যথারীতি গোসল করে কাপড় নাড়া হতো উঠানে তার বা বাঁশের উপর। বিকাল বেলায় দেখা যাচ্ছে আমি ঘরে কাজ করছি, ও আসছে। বললাম, ভাইয়া কাপড় গুলো তুলে নিয়ে আয়তো। যেখানে হয়তো আমাদের আন্ডার গার্মেন্টসও জামার নীচে (নিয়ম অনুযায়ী) নেড়ে দেয়া। ওর কোনো সমস্যা ছিল না। সব গুলো কাপড় তুলে ঘরে আলনার উপর এনে রাখতো। কিন্তু সমস্যা হোতো আমাদের চাচাতো দাদীদের। কতোবার যে শুনেছি, এই মাগী, তোদের কী লজ্জা শরম নেই? ভাই কে দিয়ে এই সব কাপড় চোপড় তুলিস? আমার খুব মেজাজ খারাপ হলেও চেপে গিয়ে বলতাম, তোমার সমস্যা কী? বলতো, ভাই কে দিয়ে এইসব গোপন কাপড় চোপড় তুলিস লজ্জার ব্যাপার তো আছেই, সাথে মেয়েদের কাপড়ে কতো রকম অশৌচ থাকে।

সে তো সেই ৩০/৩২ বছর আগের কাহিনী। কিন্তু এখনকার সময়েও কী সেই অশৌচ আদৌ কেটেছে। আমার বাসার মালিক খালাম্মা একটা কলেজে শুধু প্রিন্সিপ্যাল হিসেবেই ২৭ বছর দ্বায়িত্ব পালন করেছেন। আমাকে খুব স্নেহ করেন। পুরানো বিল্ডিং এর দুই পাশে দুইটা গ্যারেজ। এখনকার সময় হলে যেখানে তিন ইউনিটের বাসা হতো উনি সেখানে দুই পাশে হিউজ জায়গা ছেড়ে দিয়ে মাত্র এক ইউনিটের বাসা বানিয়েছেন। যার ফলে দুই পাশে বিশাল সাইজের দুইটা বারান্দা আছে। বারান্দা দুইটা এতো বড় যে খুব অনায়াসে বেড রুম হিসেবে ইউজ করা যায়। সামনের বারান্দার বিপরীতে যে বিল্ডিং সেটা মেডিকেল কলেজের মেয়েদের হোস্টেল। তো প্রথম যখন উঠি উনি তখনই আমাকে বললেন, সামনের বারান্দায় কিন্তু মেয়েদের কাপড় নাড়া যাবে না। আমি জানতে চাইলাম কেনো খালাম্মা। সেই দাদীদের মতোই বললো, সামনের বারান্দায় মেয়েদের কাপড় নাড়া দেখতে ভালো দেখায় না। চারিপাশে বিল্ডিং এর পর বিল্ডিং। সেখানে পুরুষেরা তাকালেই মেয়েদের কাপড় দেখবে, বিষয়টা কেমন না? কাপড় নাড়ার ক্ষেত্রে পিছনের বারান্দা ইউজ করবেন, ঠিক আছে? বললাম, আচ্ছা।

 

এর মাস ছয়েক পরে পিছনের পুরানো বিল্ডিং গুলো ভেঙ্গে ওখানে কন্সট্রাকশনের কাজ শুরু হলো। ধুলাবালিতে বাসায়ই টেকা দায়। সেখানে বারান্দায় কাপড় নাড়া একটা ডিজাস্টারের ব্যাপার ছিল। তো বাধ্য হয়ে আবার সামনের বারান্দা ব্যবহার শুরু করলাম। উনার বয়স তখন ৮২/৮৩ বছর হবে। বাইরে বের হতে পারেন না। কিন্তু খবর ঠিকই সংগ্রহ করেন। যথারীতি আমি শোকজে পড়লাম। প্রয়োজনে ধুলাবালি থেকে মুক্তি পেতে পিছনের বারান্দা কাপড় দিয়ে ঘিরে নিতে হবে। তবুও সামনের বারান্দা ব্যবহার করে যাবে না। মনে মনে ভাবি, যে নারীর পেট থেকে নারী পুরুষ উভয়েরই জন্ম, সেই নারীর পরার কাপড়ের অশৌচ যুগ যুগ ধরে একই রকম রয়ে গেলো!!


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT