Main Menu

শেষের চিঠি

রাশেদুল ইসলাম: একটা চিঠি পেলাম । খামের উপর লেখা ‘শেষের চিঠি’। ভিতরে একটা আধা সরকারি পত্র । বাংলাদেশ সরকারের একজন সচিবের লেখা । সচিবের নাম আকতারী মমতাজ । প্রজাতন্ত্রের একজন সুশীল সেবক হিসেবে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি । এখন অবসরে যাবার সময় হয়েছে তাঁর । তাই, প্রিয় সহকর্মীদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছেন তিনি । মাধ্যম এই শেষের চিঠি । সকলের সাথেই প্রীতিময় সম্পর্ক ছিল তাঁর । তারপরও কখনো কারো মনে আঘাত দিয়ে থাকেন যদি - এ জন্য ক্ষমা চেয়েছেন তিনি । আজ ১৯ অক্টোবর ২০১৮ । তাঁর অবসর জীবনের প্রথম দিন ।


সচিব আকতারী মমতাজের অধীনে আমার কখনো চাকুরী করা হয়নি । ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি আমার ঘনিষ্ঠ কেউ নন । তারপরও তিনি আমাকে তাঁর শেষের চিঠি পাঠিয়েছেন । এজন্য আমি তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ । চিঠিখানি আমি কয়েকবার পড়েছি । মানুষ ‘সহজাত বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন’ একটা প্রাণী । অনেক কারণে বিভিন্ন টানাপোড়েনে এই ‘সহজাত বিচারবুদ্ধি বোধ’ মানুষের লোপ পায় । এই চিঠি পড়ে আমার নিজের সুপ্ত বিচারবুদ্ধি বোধে কেমন যেন নাড়া লাগে । আজকের এই লেখা মূলত সে কারণেই ।


মানুষের জীবনকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা যায় । শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন এবং অবসর জীবন । মানুষ নিজে একটা প্রাণী । তবে, প্রাণীজগতের অন্যান্য প্রাণীর সাথে মানুষের মৌলিক পার্থক্য আছে । আর, এ পার্থক্য জন্মগত । প্রায় ৮৬ বিলিয়ন নিউরন সমৃদ্ধ মস্তিষ্ক নিয়ে একটি মানবশিশু জন্মগ্রহণ করে । এ ধরণের অমিত সম্ভবনাময় ক্ষমতা সম্পন্ন শক্তিশালী মস্তিষ্ক পৃথিবীর অন্য কোন প্রাণীর নেই । কিন্তু, অন্যের সাহায্য ছাড়া কোন মানবশিশু এই শক্তিশালী মস্তিষ্ক ব্যবহার করতে পারে না । আসলে একটা মানবশিশুর মত অসহায় কোন প্রাণী পৃথিবীতে আর নেই । জন্মের পর একটি মানব শিশুর প্রতি কেউ যদি যত্ন না নেয়; তাহলে সেই শিশু মারা যায় । ইঁদুর, বানর, হরিণ বা অন্য কোন প্রাণীর বাচ্চার ক্ষেত্রে এমনটি ঘটে না । কেউ কোন সাহায্য না করলেও অন্য কোন প্রাণীর বাচ্চা বেঁচে থাকে । কিন্তু, একটি মানবশিশু বাঁচে না । এ কারণে, মানবশিশুকে অসীম সম্ভাবনাময় অসহায় একটি প্রাণী বলা যেতে পারে । তবে, অন্যের ভালোবাসা পেলে, যথাযথ সাহায্য পেলে- এই অসহায় শিশুটিই পৃথিবী জয় করার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে । এ কারণে মানুষের শিক্ষাজীবন অন্যের সাহায্যের উপর নির্ভরশীল । যারা নিজেকে ‘সেল্ফ মেইড’ বলে দাবী করেন - তাদের এ দাবী সংগত কারণেই সঠিক নয় । কারণ, অন্যের সাহায্য ছাড়া কোন মানুষ বাঁচতেই পারেনা- স্বাবলম্বী হওয়া তো অনেক পরের ব্যাপার । এ দিক দিয়ে, একজন মানুষ জন্মগত ভাবে ঋণী । জন্মের পরে একটি শিশুকে তার মা বাবা ছাড়াও কতজনে কোলে নেয়, কতজন তাকে আগুন, পানি ও অন্যান্য বিপদ থেকে রক্ষা করে- তার হিসেব রাখা একজন দক্ষ পরিসংখ্যানবিদের পক্ষেও সম্ভব নয় । পবিত্র কোরআনে মানুষকে ঋণগ্রস্থ অবস্থায় মৃত্যুবরণ কর‍্তে নিষেধ করা হয়েছে । তাই, একজন মানুষ জন্মের পর থেকে যত ধরণের সাহায্য পেয়ে শিক্ষা লাভ করে বড় হয়, কাজ করার উপযুক্ত হয়ে ওঠে - কর্মজীবনে তার প্রতিদান দেয়া তার জন্মগত দায়িত্ব ।

 

প্রায় সকল ধর্মের সারকথা স্বামী বিবেকানন্দ এক কথায় বলেছেন । তা হোল, ‘জীবে প্রেম করে যেই জন; সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’ । অর্থাৎ, জীবজগতকে যারা ভালবাসে, তারা ঈশ্বরকে ভালবাসে । জীবন আছে যার, সে-ই একটি জীব । গাছপালার জীবন আছে; তাই গাছপালাও জীব । এ বিচারে স্বামী বিবেকানন্দের কথায় গাছপালাসহ সকল প্রাণিজগতের মঙ্গলে কাজ করার অর্থ ঈশ্বরের সেবা করা । পবিত্র কোরআনে মানুষকে মহান আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে । আল্লাহর প্রতিনিধির কাজ কি ? বাস্তব জীবনে আমরা দেখি, যিনি প্রতিনিধি পাঠান তিনি যা করেন – একজন প্রতিনিধি তাই করেন । যেমনঃ একজন চাঁদা আদায়কারী কোন প্রতিনিধি পাঠালে সেই প্রতিনিধি চাঁদা চেয়ে থাকেন । জীবনবীমা কোম্পানি কোন প্রতিনিধি পাঠালে, সেই প্রতিনিধি জীবনবীমা পলিসি খোলাতে চান । তাহলে আল্লাহর প্রতিনিধির কাজ কি ? পবিত্র কোরআনে আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা এবং পালনকর্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে । সেদিক থেকে নিজের ইবাদত বন্দেগির পাশাপাশি আল্লাহর সৃষ্টি এবং প্রতিপালনে সাহায্য করাই একজন আল্লাহর প্রতিনিধির কাজ । এ কারণে ইসলামে ‘হক্কুল ইবাদ’ বা ‘সৃষ্টির সেবা’র উপর অত্যাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে । শুধু জীবজগত নয়; জীববৈচিত্র্য রক্ষাসহ মহান আল্লাহ্‌র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যে কোন ধরণের সৃষ্টির প্রতি একজন মানুষের দায়িত্ব রয়েছে । আর, এ দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই একজন মানুষ তার জন্মগত ঋণ শোধ করার সুযোগ পায় ।

প্রশাসন সহ প্রজাতন্ত্রের যে কোন চাকরির একটা বিশেষ বৈশিষ্ট আছে । এ ধরণের চাকরি কেবল নিজের ও পরিবারের জীবিকা নির্বাহের মাধ্যমই নয়; সৃষ্টির সেবা করার একটি উত্তম সুযোগও বটে । একজন সরকারি চাকুরীজীবি সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে বিনা খরচে তাঁর নিজের ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করতে পারেন । ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের যে পরিচ্ছন্নতা কর্মী রাস্তার আবর্জনা পরিষ্কার করেন; তিনি অনেক পুণ্যের কাজ করেন । তিনি যদি তাঁর কাজে ফাঁকি না দেন, তাহলে তাঁর নিজের ধর্মীয় কাজের একটা বড় অংশ চাকরির দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই সম্পন্ন হতে পারে । একইভাবে যিনি পরিবেশ নিয়ে কাজ করেন, দারিদ্র বিমোচন নিয়ে কাজ করেন, বা প্রজাতন্ত্রের অন্য কোন বিষয় নিয়ে কাজ করেন- তার কাজের মধ্যে অবশ্যই সৃষ্টির সেবামূলক কাজের সম্পর্ক রয়েছে । এ কারণে প্রজাতন্ত্রের যে কোন কর্মচারী স্বীয় দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের মধ্য দিয়ে সৃষ্টিকর্তাকে খুশী করতে পারেন । নিজ ধর্ম পালনের পুণ্য অর্জন করতে পারেন ।

 

মানুষের অবসর জীবন বলতে তেমন কিছু নেই । যদি কেউ একেবারে শয্যাশায়ী না হন, তাহলে একজন মানুষ আমৃত্যু একটা না একটা কিছু কাজ করে থাকেন ।

 

সচিব আকতারী মমতাজ ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে,...’ - -জনপ্রিয় এই রবীন্দ্র সঙ্গীতের প্রথম কলি দিয়ে তাঁর পত্র শুরু করেছেন । কিন্তু, এ গানের ‘তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে’ কথাটি অনুসরণ করতে রাজি নন তিনি । আমাদের মধ্যে যে তিনি ছিলেন, সেটা মনে রাখার জন্য সকলকে অনুরোধ জানিয়েছেন তাঁর এই পত্রে। আসলে মানুষ কোন মানুষকে মনে রাখে না । মানুষ মনে রাখে একজন মানুষের কাজকে । পৃথিবীতে যারা সৃষ্টির সেবায় কোন না কোন কাজ করেছেন বা সৃষ্টির সেবার কাজ করতে চেয়ে শেষ পর্যন্ত কিছুই করতে পারেননি, তার আগেই জীবন দিতে হয়েছে তাঁর – এঁদের কাউকেই পৃথিবী ভুলে যায়নি । সযতনে তাদের স্মৃতি ধরে রেখেছে পৃথিবী । একই ভাবে আকতারী মমতাজও বেঁচে থাকবেন । জনস্বার্থ সুরক্ষার জন্য তিনি যে সেবা সাধারণ মানুষকে দিয়েছেন, যে কাজ ও আচরণ দিয়ে তিনি মানুষকে মুগ্ধ করেছেন; অনাগত দিনেও সে স্মৃতি ধরে রাখবে মানুষ ।

 

জনাব আকতারী মমতাজ সুদীর্ঘ চাকরি জীবনে তাঁর সহকর্মী ও সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় সিক্ত হয়েছেন । তাঁর বাকী জীবনও একইভাবে অতিবাহিত হোক এটাই কাম্য । একজন মানুষ আমৃত্যু সৃষ্টির সেবামূলক কাজে অবদান রাখতে পারেন । তিনি সে সুযোগ নিবেন- এই প্রত্যাশা করি ।

 

বেগম আকতারী মমতাজের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি ।

 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT