Main Menu

স্বর্ন তৈরি ও ব্যবহারের ইতিবৃত্ত

ড: নওশাদ হক,  মেলবোর্নঃ স্বর্ন, সুবর্ন বা সোনার প্রতি মানুষের আগ্রহ আবহমান কাল থেকে। রাজা বাদশাহ থেকে শুরু করে ফকির মুসাফির পর্যন্ত স্বর্ন মুদ্রার প্রতি যুগে যুগে আকৃষ্ট হয়েছে। আর আমাদের মহিলা মহলে বিশেষত উপমহাদেশের মেয়েদের স্বর্নালংকারের প্রতি আসক্তি আমরা সবাই জানি। এক্ষেত্রে আমার গৃহিনী অনেকটা বাচিঁয়েছে আমাকে, তার অলংকারের প্রতি আগ্রহ সত্যিই কম। এই সত্যটা আমি স্বীকার না করলে পরে আবার গৃহবিবাদ শুরু হবে। হয়তবা গরীব শিক্ষক বা বিজ্ঞানীর সামর্থের কথা মাথায় রেখে সে শখের মাত্রা ঠিক করেছিল।

তবে কিছুদিন আগে দক্ষিন ভারতীয় এক লোকের কথা শুনেছিলাম যার স্ত্রী বা পরিবারের কারো এই মূল্যবান ধাতুটির প্রতি আকর্ষন না থাকলেও সেই ভ্দ্রলোক স্বর্নের তৈরি শার্ট বানিয়ে গায়ে লাগিয়ে লোকজনকে দেখিয়ে বেড়িয়েছেন। স্বর্ন কিনে জমানো তার অন্যতম শখের একটা। আমরা জানি বিভিন্ন দেশের সরকারী ব্যাংকগুলো স্বর্ন কিনে গচ্ছিত করে রাখে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য। এতদিন মানব ইতিহাসে যতখানি স্বর্ন উৎপাদন হয়েছে তার অনেক খানি এসব ব্যাংকেই জমানো আছে, বিশেষ করে আমেরিকার ব্যাংকে সবচেয়ে বেশী। যে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা যত ভালো আর আকার যত বড় সেদেশের স্বর্নের মজুদও তত বেশী।

এরকম ও শুনেছিলাম সৌদি বাদশাহ তার রাজকুমারীর বিয়েতে স্বর্নের তৈরি শৌচাগার উপহার দিয়েছিলো। স্বর্ন নিয়ে চোরাচালান, কেলেংকারী আর অপরাধ ঘটনা ও প্রবনতারও শেষ নেই। আমরা বাংলাদেশের বিমান বন্দর গুলোতে চুরি করে স্বর্ন আনা এবং তা বের করার বিভিন্ন পদ্ধতির কথা শুনেছি। এটা ভিন্নতার দিক দিয়ে একটা মাত্রায় পৌঁছেছে এবং আরো দেখতে হবে অপরাধীরা আর কত দুষ্টুবুদ্ধি বের করতে পারে। আইন শৃংখলা বাহিনী গুলো একই সাথে তাল দিয়ে উদ্ধারের পথ বের করতে হবে। বাংলাদেশে বিনে পয়সায় অপরাধীদের মাধ্যমে আসা যে স্বর্ন ধরা পড়ে আমি হিসেব করে দেখছিলাম তা অষ্ট্রেলিয়ার মাঝারি আকারের একটা খনির সমান হয়ে যাবে। যাহোক এটা সরকারের জন্য না চাইতে পাওয়া আয়ের মধ্যে পড়বে।

স্বর্নের প্রতি মানুষের আকর্ষনের কারন এর চাকচিক্যময়, মনোহারী রঙ, আর আসলে বৈজ্ঞানিক  ও রাসায়নিক দৃষ্টিকোন থেকে স্থায়ীত্তের জন্য। এ ধাতুতে মরিচা পড়ে না, অত্যন্ত শক্তিশালী বিজারক বা এসিডেও গলানো যায় না সহজে। অত্যন্ত পাতলা পাত তৈরী করে এটা ব্যবহার করা যায় যা একটা তুলনামূলক ভাবে ভালো দিক অন্য ধাতুর তুলনায়। এর রং যে মনোবাহার কারী তার প্রমান বিশ্বের বিভিন্ন বড় বড় ঐতিহ্যবাহী স্থাপনায়, ভাস্কর্য, দালানে এবং শিখরে এর ব্যবহার। আমরা সবাই জানি শিখ স্বর্নমন্দিরের কথা। ভারতের অনেক মন্দিরে স্বর্ন গচ্ছিত থাকাটা প্রাচীনকাল থেকেই সাধারন ব্যাপার ছিলো। এজন্য অনেক মন্দিরে বিভিন্ন সময়ে লুটতরাজও সংঘটিত হয়েছে বিভিন্ন শক্তির হাতে।

আমি কে স্বর্ন নিয়ে কথা বলার। আমার গবেষনার সুবাদে বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করতে হয়েছে। বনবিষয়ে পড়ালেখা শুরু করে পারমানবিক শক্তিতে কি পরিমান কার্বন নিশ:রিত হয় তানিয়ে গবেষনা প্রবন্ধ লিখে বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশ করতে গিয়ে মনে হয়েছিলো শিখতে চাইলে আর সময় দিলে বোধ হয় সবাই সবকিছু করতে পারে। এটা আমার অনুজদের উদ্দেশ্যে বললাম বিশেষত যারা গবেষনা নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে এই মুহর্তে সময় সময়ে হতাশ হচ্ছে। আমার ব্যাপারটাও অনেকটা তাই। আমিও স্বর্ন থেকে স্বর্ণালংকার তৈরী করা যায় ছাড়া আর কিছুই জানতাম না। 

আমি তখন ধাতু তৈরীর জীবনচক্র নিয়ে গবেষনা শুরু করেছিলাম। এ অনেকটা সোনার পাথরবাটির মত অবস্থা। যার জীবনই নাই তার আবার জীবনচক্র। যাহোক সে আরেক বিষয় আর আমাকে সে সময় খনিজ শিল্প আর ধাতূ তৈরীর আদ্যোপান্ত শিখতে হয়েছিল। আমার অবদানের ভিত্তিতে অষ্ট্রেলিয়ার খনিজ শিল্প ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সবচেয়ে নামকরা পেশাজীবি প্রতিষ্ঠানের একটি “অষ্ট্রেলেশিয়ান ইনষ্টিটিউট অব মাইনিং এন্ড মেটালার্জী” ফেলোশিপ নির্বাচন করেছিলো। তো আমি স্বর্ন ধাতুর ইতিবৃত্ত নিয়ে কিছু বলতেই পারি একধরনের গ্রহনযোগ্যতা সহ। তাছাড়া পাঁচ বছরের উপরে মনাস বিশ্ববিদ্যালয়ের খনি প্রকৌশলের ছাত্রছাত্রীদেরকে এর উপরে পড়ানোর অভিজ্ঞতা এবং বেশকিছু সোনার খনিতে নামা ও দেখার সুযোগও হয়েছে।

এখন ধান ভানতে শীবের গীত বাদ দিয়ে আসল কথা শুরু করি। আমরা অনেকগুলো ধাতু তৈরির উপায় একেবারে খনি থেকে শুরু করে খাঁটি ধাতু ও তার পুনর্ব্যবহারের উপায় নিয়ে গবেষনা করেছিলাম।  এগুলোর মধ্যে ছিলো লোহা, এলুমিনিয়াম, তামা, দস্তা, নিকেল, ম্যাংগানিজ, অপ্রতুল ধাতুগুলি, সংকর ধাতু আরো অনেক যৌগ পদার্থ। আমাকে দায়িত্ত দেয়া হয়েছিলো সোনার জীবনচক্র নিয়ে গবেষনা প্রকল্পের কাজ করার জন্য। আমরাই প্রথম এ বিষয়ে বড় ধরনের প্রকাশনা বের করেছিলাম। সেজন্য উইকিপিডিয়া সহ অনেক জায়গায়ই স্বর্নের খনি থেকে খাঁটি ধাতু তৈরীর কারনে কার্বন নি:শরনের মাত্রা জানতে ‘নরগেট এন্ড হক’ এর গবেষনা প্রবন্ধের রেফারেন্স পাওয়া যায়। সোনা তৈরীর কোম্পানী গুলো পরবর্তীতে অল্পবিস্তর কাজ করে থাকলেও তা কেউই প্রকাশ করেনি। আমাদের এই কাজের ভিত্তিতে গত বছরই লন্ডন ভিত্তিক বিশ্ব স্বর্ন পরিষদ আমাদেরকে এই কাজটা হালনাগাদ করতে এবং এগুলোর তথ্য জানতে ও জানাতে অনুরোধ করেছিলো।

মুলত ব্যাংক মজুদের বাইরে স্বর্নের সবচেয়ে বড় ব্যবহার অলংকার। এজন্য স্বর্নের চাহিদা এবং দাম অনেক সময় ভারতীয় উপমহাদেশের বিবাহ মৌসুমের উপর নির্ভর করে। এছাড়া দন্ত চিকিৎসা ও মেরামতে এর ব্যবহার আছে। বর্তমানে ইলেকট্রনিক দ্রব্যাদি প্রস্ততে স্বর্নের ব্যবহার অনেকখানি বেড়েছে। ইলেকট্রনিক বর্জ্য থেকে স্বর্ন পূনআহরন এখন আরেকটি গবেষনার বিষয় যা বেশ পোক্ত হচ্ছে যা নিয়ে আমরা ও বাংলাদেশের সহযোগীরা কাজ করছি।

এই ইলেকট্রনিক দ্রব্যাদি ছাড়া স্বর্নের সত্যিকারের ব্যবহারের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। এটা আমি বলছি মানব সভ্যতায় ধাতুগুলির অবদানের ভিত্তিতে। যেমন লোহা, এলুমিনিয়াম ও তামা ছাড়া আমাদের সভ্যতা অচল। সেজন্য এসব ধাতুগুলো তৈরীর পরিমান স্বর্নের তুলনায় অনেক অনেক গুন বেশী। কিন্তু স্বর্ন কম উৎপাদিত হলেও এর উৎপাদন প্রক্রিয়ায় শক্তির ব্যবহার, পানি

ব্যবহার, কার্বন নি:সরন আর বর্জ্যের পরিমান তুলনামূলক ভাবে অনেক বেশী অন্য ধাতুর তূলনায়। এর বড় কারন আকরিকে স্বর্নের পরিমান অন্য ধাতুর তুলনায় অনেক অনেক কম। আমার এক পিএইচডির ছাত্র হিসেব করেছিলো “ ভালোবাসার মূল্য”। এখানে সে একটা স্বর্নের আংটি তৈরীতে কি পরিমান কাঁচামাল ও শক্তি, পানি খরচ আর বর্জ্য তৈরী হয় তার হিসাব করেছিলো আমাদের গবেষনার ফলাফল ব্যবহার করে। সংখ্যাগুলো অনেক বড় বড়। 

তাই সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারে আমাদেরকে সতর্ক হতে হবে। ব্যবহার কমানো, পুন:ব্যবহার ও পুন:আহরন তথাকথিত “থ্রি আর তথা রিডিউস, রিউস আর রিসাইক্লিং” একটা বড় শিক্ষা দেশে দেশে দেয়া হচ্ছে। এবিষয়ে পাঠকরা আগ্রহ প্রকাশ করলে আরো বিস্তারিত লিখব আরেক পর্বে।
nhaque.geo@yahoo.com
 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT