Main Menu

মহাকাশে খনির সম্ভাবনার কথা

ড: নওশাদ হক,মেলবোর্ন:মহাকাশ মানুষকে নতুন কিছু জানতে অনুপ্রানিত করে। যখন বড় এয়ারবাস গুলো ১০ কিলোমিটার মাটির উপরে ঘন্টায় এক হাজার কিলোমিটার বেগে আকাশে ভেসে চলতে থাকে, বড় অবাক লাগে। আমরা তো মনে হয় ঘরের মধ্যে বসে এয়ার ক্রু মেম্বারদের দেয়া খাবার খাচ্ছি, ঘুমাচ্ছি, মুভি দেখছি। তখন মনে হয়, নভোচারীরা চারশ কিলোমিটার উপরে ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে আমাদের উড়োজাহাজের যাত্রীদের মতোই কিছু করছে। মাটিতে চারশ কিলোমিটার দুরত্ব তেমন কিছু নয়। আমাদের মেলবোর্ন থেকে হয়তো লেক্স এন্টার্ন্স বা ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়তো। এই দুরত্ব টাই খাড়াঁ মাটির উপরে। স্যাটেলাইট গুলো যতদুর জানি কয়েকশ কিলোমিটার থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার উপরে থাকে ব্যাবহার পরিকল্পনার উপর ভিত্তি করে।

মহাকাশ বিষয়ে তেমন কিছুই আমি জানিনা। তবে সাম্প্রতিক কিছু অভিজ্ঞতা ভাগ করছি। এটা তেমন কোন গোপনীয় গবেষনা ছিলো না। আমাদের সিএসআইআরও এস্ট্রোনমি ও স্পেস সায়েন্স, আমরা বলি ‘ক্যাস’ মহাকাশ বিষয়ে গবেষনা বিভাগ, অনেকটা অষ্ট্রেলিয়াতে আমেরিকার নাসার মতো। বস্তুত নাসা আমাদের বিজ্ঞানীদের, লোকবল ও ফ্যাসিলিটি ব্যাবহারের কারনে অনেক অর্থ বরাদ্দ রাখে। আমাদের ক্যানবেরা মহাকাশ অবকাঠামো মানুষের প্রথম চাঁদে অবতরনের প্রতিচ্ছবি পাঠাতে নাসাকে সাহায্য করেছিলো।

আমি একবার আমাদের কেন্দ্রীয় লিডারশিপ ট্রেনিং এর সময় আমার পাশে এক এস্ট্রোনমার সহকর্মী পেলাম। আমি ওদেরকে জানতাম ওয়াই ফাই এর আবিষ্কারক হিসেবে। জিজ্ঞেস করতেই জানলাম সে ওই ওয়াই ফাই গবেষক দলের সদস্য, অনেকটা কাকতালীয় ছিলো ব্যাপারটা। তারপর অনেকটা সময় আমরা একসাথে কাটিয়েছিলাম কারন আমাদের প্রশিক্ষনটা ছিলো আবাসিক। আমরা সব দলনেতারা একে অপরের বন্ধুর মতো হয়ে গিয়েছিলাম তখন কয়দিনে।

তারপর অনেকদিন মহাকাশ বিষয়ে অন্তত কিছু খোঁজ রাখিনি। মাঝে মধ্যে মনে হতো, ওরা কি গবেষনা করে? এরই মধ্যে অষ্ট্রেলিয়া দক্ষিন আফ্রিকাকে বিডে হারিয়ে বিলিয়ন ডলারের স্কয়ার কিলোমিটার এ্যারে পাথ ফাইন্ডার প্রকল্প জিতলো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায়। আমরা ইমেলে বিস্তারিত খবর পেতাম যে এখন নতুন নক্ষত্রের সন্ধান শুরু হবে। মাঝে রেডিও খবরে শুনলাম একটা নক্ষত্র পৃথিবীতে আঘাত করবে। কবে কখন? সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে বিজ্ঞানী হয়তো বললো পাঁচ বিলিয়ন বছর পরে। তখন মনে হতো পাঁচ বিলিয়ন? এই গবেষনার উপযোগিতা কি? আর এরা গবেষনার অর্থই বা পায় কোথায়?

অষ্ট্রেলিয়ার সরকার এবারে ১লা জুলাই থেকে নতুন মহাকাশ সংস্থার যাত্রা শুরুর জন্য অনেক অর্থ বরাদ্দ করেছে, বিস্তারিত লিংকে https://industry.gov.au/…/Industry…/SPACE/Pages/default.aspx
 . আমাদের প্রাক্তন প্রধান এর নেত্রীত্তে। বিশ্বব্যাপী মহাকাশ সংক্রান্ত শিল্পের মুল্য তিনশ তেইশ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের উপরে এবং এটা দ্রুতবর্ধমান। যখন এসব বিষয়ে কথা হচ্ছিলো এ বছরের গোড়ার দিকে, আমি একটা ওয়ার্কশপে অংশগ্রহনের আমন্ত্রণ পেলাম আমাদের সিড্নী গবেষনাগারে। আমার খনিজ পদার্থ প্রক্রিয়া গবেষনা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে ডেকেছে মহাকাশে খনি করতে কি কি লাগবে বা এ বিষয়ে মতামতের জন্য।যদিও স্পেস মাইনিং বিষয়ে শুনেছিলাম কিন্তু আমার তেমন কোনো জ্ঞান নেই। মিটিং এর কক্ষে গিয়ে দেখলাম ক্যাস এর সহকর্মীগন হাড্ কোর এ্যাষ্ট্রোনমার আর স্পেস সায়েন্সটিষ্ট। ওরা বলছিলো আমরা যতটা মহাকাশ থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন বিষয়ে যতটা তথ্য পাই কিন্তু পৃথিবী থেকে মহাকাশ বিষয়ে একই ভাবে পাওয়া যায় না। আরও কয়েকজন অন্য বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের। তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তার মধ্যে একটা। অনেক দেশই মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠিয়েছে, অনেক সময় তেমন বড় প্রয়োজন ছাড়াই। এটা সেই দেশের গর্ববোধ আর মানুষকে বিজ্ঞানের দিকে উজ্জীবিত করতে। শুনেছিলাম মহাকাশে আবর্জনাও (স্পেস ডেবরি) জমেছে অনেক যা একটা ক্রমবর্ধমান সমস্যা।

যাওয়ার আগে একটু গবেষনা করেছিলাম, দেখলাম আমেরিকানরা বেশ কিছু কাজ করেছে মহাকাশে সম্পদের সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে, খনিজ দ্রব্য তার মধ্যে অন্যতম। আমাকে বলল এনোরথাইট নামে একটা মিনারেল আছে, যেটা চাঁদের পাহাড়ের বেশীর ভাগ জায়গা গঠনে অবদান রেখেছে। আমি আমার সফ্টওয়ার ডাটাবেসে এই মিনারেলটার বিষয়ে সব তথ্য বের করলাম।এটাতে কিছু এলুমিনিয়াম আছে। তবে পৃথিবীতে আমরা বেশীর ভাগ মিনারেল ভূআকর্ষন শক্তি ব্যাবহার করে প্রক্রিয়া করি। মহাকাশে তা কিভাবে করা যায়? আমার সেদিনের সহকর্মীদের বলছিলাম আমার খনি বিষয়ক গবেষনা দলের সহযোগীরা হাসবে যদি আমি মহাকাশে খনির কথা বলি কারন পৃথিবীতেই এখনও অনেক খনি সমস্যার সমাধান আমরা দিতে পারছিনা। আমাকে বলা হলো যেহেতু আমাদের বড় খনি কোম্পানীর সাথে কাজের সম্পর্ক আছে ওদেরকে যুক্ত করার প্রস্তাব। আমি বললাম ওরাও হাসবে কারন সদ্য বানিজ্যিক স্কেলে লাভজনক প্রযুক্তি নিতেই তারা অনেক চিন্তা ভাবনাকরে। তবে এটা যেহেতু অনেক দুর ভবিষ্যত সপ্ন আর হতে পারে এই গবেষনা বর্তমান খনি সমস্যা সমাধানে ভুমিকা রাখবে তখন তারা আগ্রহী হতে পারে। মহাকাশ থেকে পরিবহন দুঃসাধ্য তবে ওখানেই যদি আহরন আর প্রক্রিয়া করে ব্যাবহার করা যায় তবে একটা উপায় হতে পারে। তবে একটা জিনিস সবাই বললো মহাকাশের কথা শুনলেই বিজ্ঞানীরা ছাড়াও বিজ্ঞান বিষয়ে সব জাতি এবং বয়ষের মানুষের মধ্যে অসীম আগ্রহ জন্মায়।

কিন্তু আমি এখন যুক্তিটা বুঝতে পারি মহাকাশে সম্পদ খোঁজার। আমাদের গবেষক দলের রুটি রুজির কাজ হচ্ছে কোথায় কতটুকু খনিজ পদার্থ আছে এবং কতদিন তা চলবে এখনকার হারে আহরন এবং ব্যাবহার হলে। বেশীরভাগই একদুই বংশধরের জীবনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে সরলভাবে হিসাব করলে। যৌক্তিক ভাবেই সাগর বা মহাকাশে দেখতে বা খুঁজতে হবে। সাগরের নীচে থেকে খনিজ পদার্থ আহরন খুব বেশী দুরে নয় তবে মহাকাশে অন্য গ্রহে বা চাঁদের পাহাড় (লুনার হাইল্যান্ডস্), এ্যাস্ট্রয়েড থেকে সম্পদ আহরন বেশ জটিল আর চ্যালেন্জিং। তবে কে জানে একদিন কি হবে। কোলারোডো খনি বিশ্ববিদ্যালয় মহাকাশে খনির উপর স্নাতক শুরু করেছে এবছর থেকে।

আমি আজ সকালে উঠে লিংক খুঁজছিলাম কোথায় বংগবন্ধু ১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ লাইভ দেখা যায়। সৌভাগ্য ক্রমে তিন থেকে কাউন্ট ডাউনের সময় থেকে দেখতে পেলাম, তারপর বাংলাদেশের উপর একটি প্রতিবেদন এবং মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর উদ্বোধনী বক্তব্য, সবশেষে বাংলাদেশের উপর বাংলায়, পুরোটাই স্পেসএক্স থেকে লাইভ। বাংলাদেশের জন্য এ এক নতুন অর্জন। হাজার তিনেক লাইভে ছিলো যেটা আমার কাছে বেশী মনে হলো না।

গত দুইমাস আগে ইলোন মাস্কের কোম্পানী টেস্লা এবং স্পেসএক্স এর ভাইস প্রেসিডেন্টের সাথে কথা হচ্ছিলো তখোনো ওদের সম্পর্কে এত জানতাম না। ঐই সময় ওরা মংগল গ্রহে ভবিষ্যতে বসতি গড়ার উপরে একটা প্রেজেন্টেশন দিয়েছিলো। অনেকটা গাজাঁখুরি গল্পই মনে হবে।

তবে একটু ভাবলে আমরা ছোট ছোট স্কৃনে লাইভ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ দেখছি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একই সাথে এবং সাথে সরাসরি মতামত দেয়া সহ তা যদি বলতাম দশ বা বিশ বছর আগে, কেমন সম্ভব ছিলো। তাই কি হবে আর হবে না কোনোকিছু ভবিষ্যতবানী করা বিপদজনক।

মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠানোতে যদি বিশাল একটা জনগোষ্ঠির মনন ও চিন্তায় বিজ্ঞান চর্চায় আগ্রহ জন্মায়, গর্ব আর আত্মবিশ্বাস বাড়ে, ছোট ছেলেমেয়ে, ছাত্র ছাত্রীরা বিজ্ঞান বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কিছু নেই। আমাদের উচিত এই সুযোগটা ব্যাবহার করা। আর এর বানিজ্যিক ব্যাবহার আর অন্য উপযোগিতাগুলো তো বোনাস।


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT