Main Menu

ওরিয়েন্টালের পথেই কি হাঁটছে ফারমার্স ব্যাংক

দেশের ব্যাংকিং খাতে চরম অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, অথর্ লোপাট আর তহবিল তছরুপের নজির হয়ে আছে সাবেক ওরিয়েন্টাল ব্যাংক। বতর্মানে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক নামে পরিচালিত ব্যাংকটির দেশজুড়ে নেটওয়াকর্ থাকলেও লোকসানের বৃত্ত থেকে বের হতে পারেনি। খেলাপি ঋণের পরিমাণ এত বেশি যে, ব্যাংটির এখন মরণদশা। গত ১১ বছরের বিভিন্ন উদ্যোগেও ঘাড় সোজা করে দঁাড়াতে পারেনি ব্যাংকটি। আমানতকারীদের অথর্ও ফেরত দিতে পারছে না। আথির্ক খাত বিশ্লেষকরা বলছেন, একই পরিণতি বা নজির গড়তে যাচ্ছে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরের নতুন প্রজন্মের ব্যাংক ফারমাসর্ ব্যাংকটিও। ঋণ বিতরণে অনিয়ম, জালিয়াতি ও লুটপাটে অতীতের যে কোনো ব্যাংক কেলেঙ্কারি অনিয়মকে ছাড়িয়ে গেছে ফারমাসর্ ব্যাংক। ইতোমধ্যে বিপুল মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে ব্যাংকটি। এ অবস্থায় ডুবতে বসা ফারমাসর্ ব্যাংক আগামী জানুয়ারি থেকে পুরোদমে নতুন করে কাযর্ক্রম শুরু করতে চায়। এ জন্য নাম পরিবতের্নর উদ্যোগ নিয়েছে ব্যাংটির বতর্মান পরিচালনা পষর্দ। অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের এই ব্যাংকটিকে টেনে তুলতে এক হাজার ২১৫ কোটি টাকা মূলধন সহায়তা দিচ্ছে সরকারি চার ব্যাংক ও একটি বিনিয়োগ সংস্থা। এর মধ্যে ৮১৫ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে, আরও ৪০০ কোটি টাকা দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এত সুযোগ-সুবিধার পরও নাম পরিবতর্ন করে ব্যাংকটি আসলে ঘুরে দঁাড়াতে বা আমানতকারীদের আস্থা অজর্ন করতে পারবে কিনাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে তত্ত¡াবধায়ক সরকারের সাবেক অথর্ উপদেষ্টা এবি মিজ্জার্ আজিজুল ইসলাম যায়যায়দিনকে বলেন, এ ধরনের উদ্যোগের ফলে সাধারণ মানুষের আস্থা খুব একটা ফিরবে বলে তার মনে হয় না। তিনি বলেন, আগে সরকারকে এই ব্যাংকের আমানতকারীর আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া ব্যাংকটিকে বেসরকারি মালিকানায় রেখে সরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে জনগণের টাকা মূলধন হিসেবে জোগান দেয়া ঠিক হচ্ছে না। কোনো কারণে যদি ব্যাংকটি ধসে যায়, তবে সমস্যা আরও বড় হবে। তাহলে সমাধান কি জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রথমত বতর্মান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকার অন্য কোনো ব্যাংকের সঙ্গে ব্যাংকটিকে একীভ‚ত করতে পারে বা সরকারি মালিকানায় অধিগ্রহণ করতে পারে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রীয় ব্যাংককের কাছে পুরোপুরি ছেড়ে দেয়া যেতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগ নিলে হয়ত ব্যাংকটির পক্ষে ঘুরে দঁাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হতো। সুতরাং, শুধু মূলধন জোগান আর নাম পরিবতর্ন করে বতর্মান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের সুযোগ কম। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভনর্র ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ যায়যায়দিনকে বলেন, নাম পরিবতের্ন ব্যাংকের ওপর ইতিবাচক কোনো প্রভাব পড়বে না। ওরিয়েন্টল ব্যাংকের ক্ষেত্রেও নাম পরিবতর্ন করা হয়েছে, কিন্তু এ পযর্ন্ত ব্যাংকটির তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। ফলে নাম পরিবতের্নর চেয়ে দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং পষর্দ গঠনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির সব কমর্কাÐ জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত, তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। নিজেদের খেলাপি ঋণ আদায় বাড়িয়ে সেটা নতুন করে বিনিয়োগ করা দরকার। তিনি আরও বলেন, প্রথমত, জনগণের টাকা এভাবে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে দেয়া ঠিক হচ্ছে না। এটা বিধিসম্মতও নয়। খারাপ নজির সৃষ্টি হচ্ছে। অনেকেই তাদের দেখে জনগণের টাকা তছরুপ করার চেষ্টা করতে পারে। যারা অনিয়ম এবং জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া দরকার। তা না হলে ব্যাংকটির ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরবে না। প্রসঙ্গত, ঋণসহ বিভিন্ন পযাের্য় অনিয়মের তথ্য ফঁাস হওয়ায় ওরিয়েন্টাল ব্যাংক অধিগ্রহণের পর ২০০৭ সালে ব্যাংকটি পুনগর্ঠন করে আইসিবি ইসলামী ব্যাংক করা হয়। ওরিয়ন গ্রæপের পরিবতের্ এর মালিকানা দেয়া হয় মালয়েশিয়াভিত্তিক আইসিবি গ্রæপকে। মালিকানা পরিবতের্নর প্রধান শতর্ ছিল, পঁাচ বছরের মধ্যে আমানতকারীর সব পাওনা মিটিয়ে দেয়া। সে অনুযায়ী নিধাির্রত সময় শেষ হয়েছিল ২০১৩ সালের ৪ মে। নিধাির্রত সময় পাওনা পরিশোধ না হওয়ায় ব্যাংক কতৃর্পক্ষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বার বার সময় দিয়ে আসছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অথার্ৎ গত ১১ বছরেও আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেয়নি আইসিবি। সবের্শষ পাওনা পরিশোধে ২০২১ সালের মে পযর্ন্ত আইসিবিকে সময় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক । ফারমাসর্ ব্যাংক বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভনর্র খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ যায়যায়দিনকে বলেন, ফারমাসর্ ব্যাংকের ক্ষেত্রে অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে। মূলধন জোগান বা নাম পরিবতের্নর মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান হবে না। তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে ওরিয়েন্টাল ব্যাংক। কি ধরনের পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারেÑ জানতে চাইলে তিনি বলেন, যারা এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী, সেই ব্যাংক কমর্কতার্, পষর্দ সদস্য এবং ঋণ গ্রহীতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। কিছু চুনোপুটি ধরা পড়েছে, কিন্তু রাখব-বোয়ালরা এখনো ধরাছেঁায়ার বাইরে রয়েছে। তাদের ধরতে হবে। অন্যায়ের প্রতিবিধান করা গেলে ব্যাংকটির ওপর মানুষের আস্থা বাড়বে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নজরদারি থাকতে হবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম যায়যায়দিনকে বলেন, ফারমাসর্ ব্যাংকের বতর্মান পরিচালনা পষর্দ পুনগর্ঠন করা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। মূলধন ঘাটতি পূরণে সরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে বন্ড এবং শেয়ার বিক্রি করা হচ্ছে। সবের্শষ ব্যাংকের নাম পরিবতের্নর কথা শোনা যাচ্ছে। এগুলো করা হয়েছে ব্যাংকের ইমেজ বা ভাবমূতির্ পুনরুদ্ধারের জন্য। বতর্মান পরিচালনা পষর্দ এবং ব্যবস্থাপনা আগের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন মূলধন সঠিকভাবে ব্যবহার করলে ইতিবাচক পরিবতর্ন আসতে পারে। তবে আগের অনিয়মের বিষয়ে কঠোর হওয়ার পরামশর্ দিয়ে তিনি বলেন, যে সব ত্রæটি বা দুবর্লতার কারণে ব্যাংকটিতে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, সেটাকে কোনোভাবেই পাশ কাটানো যাবে না। আগের অব্যবস্থাপনা, দুনীির্ত, খেলাপি ঋণ গ্রহীতার বিরুদ্ধে যথাযথা ব্যবস্থা নিতে হবে। পূবের্র সমস্যার সমাধান না করে শুধু নাম পরিবতর্ন বা ইমেজ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে কাজ করলে কোনো সমাধান হবে না। এদিকে মূলধন সহায়তা দিয়ে রাষ্ট্র মালিকানাধীন সোনালী, অগ্রণী, জনতা ও রূপালী ব্যাংক এবং ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) ব্যাংকটির পষের্দর পরিচালক হয়েছে। আর গত জানুয়ারি থেকে চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন রেইস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের অন্যতম উদ্যোক্তা চৌধুরী নাফিজ সরাফাত। এর উদ্যোগেই ব্যাংকটি পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে। কিন্তু নতুন পষর্দ দায়িত্ব নেয়ার আট মাস পেরিয়ে গেলেও ব্যাংকটি এখনো চালু করতে পারেনি কোনো ঋণ কাযর্ক্রম। পুরোপুরি গ্রাহকের আস্থা না ফেরায় চাহিদামতো আমানত পাচ্ছে না ব্যাংকটি। তাই বন্ড ছেড়ে ব্যাংক ও আথির্ক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে টাকা সংগ্রহের চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এহসান খসরু সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেছেন, সরকারি ব্যাংকগুলো এখন এই ব্যাংকের মালিক। এ কারণে গ্রাহকদের মধ্যে খুব বেশি আতঙ্ক নেই। ব্যাংকটির নামসহ পুরো কাযর্ক্রমে পরিবতর্ন আনা হবে। আগামী জানুয়ারি থেকেই নতুন করে কাযর্ক্রম শুরু হবে। ফারমাসর্ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, পষর্দ পুনগর্ঠনের পর ব্যাংকে নতুন করে ৭১৫ কোটি টাকা মূলধন জোগান আসে। আগে মূলধন ছিল ৪০১ কোটি টাকা। এ ছাড়া চলতি বছরের শুরু থেকে গত আগস্ট পযর্ন্ত নতুন করে আমানত আসে ২৭৭ কোটি টাকা, ঋণ আদায় হয় ৩৬০ কোটি টাকা। তবে এ সময় গ্রাহকরা ৯৮০ কোটি টাকা আমানত তুলে নেয়। উল্লেখ্য, রাজনৈতিক বিবেচনায় ২০১৩ সালে অনুমোদন পাওয়া নতুন ৯ ব্যাংকের একটি ফারমাসর্ ব্যাংক। কিন্তু চার বছর না পেরোতেই চরম সংকটে পড়ে ব্যাংকটি। পরিস্থিতির চরম অবনতি হওয়ায় গত বছরের নভেম্বরে পদ ছাড়তে বাধ্য হন ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর। ব্যাংকটির এমডি একেএম শামীমকেও অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক।


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT