Main Menu

ক্যান্টন থেকে দেখা

রাশেদুল ইসলাম: 

(তিন )  

দেং জিয়াও পিং কখনও  চীনের রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী হননি । অবশ্য তাঁর  নেতা মাও সে তুং নিজেও কখনও এ ধরণের পদ গ্রহন করেননি। মাও সে তুং এঁর মতই  দেং জিয়াও পিং ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৯ সনে অবসর গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত চীনা কম্যুনিস্ট পার্টির ব্যানারে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন । রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই ১৯৭৮ সনে তিনি সিংগাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ এঁর  সাথে সাক্ষাত করেন । সিংগাপুরের অভূতপূর্ব উন্নতি তাঁকে মুগ্ধ করে । তিনি হাজার হাজার ছাত্র এবং চীনা নাগরিককে সিঙ্গাপুরসহ অন্যান্য উন্নত দেশে প্রেরণ করেন । উন্নত দেশের কারিগরি ও অন্যান্য বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের পর নিজের  দেশে ফেরার জন্য বলেন তিনি । চীনের বন্ধ দুয়ার খুলে দেন তিনি । মাও সে তুং এঁর চীনকে স্বীকৃতি দেয়নি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র । কিন্তু, ১৯৭৯ সনের ১লা জানুয়ারী; দেং জিয়াও পিং এঁর চীনকে স্বীকৃতি দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র । একই বছর  আমেরিকা সফর করেন দেং । এ সফর কালে প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সাথে তিনি সাক্ষাৎ করেন । কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ও ঘুরে দেখেন তিনি । তিনি বোঝাতে চান, চীনের সমাজতন্ত্র ফেরী করার জন্য তাঁর এ সফর নয় । চীনের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে চান তিনি । কারিগরী ক্ষেত্রে  উন্নত দেশের সহযোগিতা চান; দেশের মাটিতে বৈদেশিক বিনিয়োগ চান তিনি । তাঁর উদার নীতি ও দক্ষ কূটনৈতিক তৎপরতা সফল হয় । স্বল্পতম সময়ে তাঁর দেশকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যান তিনি । কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রার মানের উন্নতি ঘটে তাঁর সময়ে ।

১৯৮০ সনেই  হংকং দ্বীপ ফিরে পেতে তৎপর হন দেং জিয়াও পিং । ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী  মারগারেট থ্যাচারের সাথে আলোচনা করেন তিনি। মাদাম থ্যাচার ১৯৮২ সনে চীন সফর করেন । তিনি নানকিং চুক্তি- ১৮৪২, কনভেনশন অব পিকিং-১৮৫৬ এবং কনভেনশন ফর এক্সটেনশান অব হংকং টেরটরিজ-১৮৯০ এর বিধান নিয়ে কথা বলেন । এসব চুক্তি নিয়ে কথা বলা চীনের ‘কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেয়া’ র মত ।  কিং সাম্রাজ্যের এক দয়ালু রাজার মহানুভবতার সুযোগ নিয়ে ইংরেজ ক্যান্টনে ব্যবসা করার অনুমতি পান । কিন্তু, তারা বৈধ ব্যবসা না করে অবৈধ মাদক ব্যবসা শুরু করে । চীনের উপকূলীয় অঞ্চলে নৈরাজ্য ডেকে আনে তারা । এই অবৈধ মাদক ব্যবসা বন্ধ করতে গিয়েই চীনের মহারাজা ইংল্যান্ড রানীর রোষানলে পড়েন । চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন তিনি । সেই আফিম যুদ্ধে পরাজিত হয় চীন । পরাজিত চীনকে নানকিং চুক্তি করতে বাধ্য করা হয় । সেই অসম চুক্তি বলে হংকং দ্বীপের ৯৯ বছরের মালিকানা পায় ইংরেজ । দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধেও পরাজিত হয় চীন । আরও দুটি চুক্তি করতে বাধ্য হয় চীন । কাউলুন উপতাক্যা দখলে নেয় ইংরেজ । হংকং এর সীমানা বৃদ্ধি করে । এসব চুক্তি চীনের জন্য অপমানকর । এর কোনটাই মানে না চীন । দেং চীনের হারান সম্পদ ফেরত পেতে চান । হংকং এর সার্বভৌমত্ব দাবী করেন তিনি । একদিকে আফিম যুদ্ধে বিজয়ী  ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী মারগারেট থ্যাচার । অন্যদিকে আফিম যুদ্ধে পরাজিত চীনের কিং সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার পোড় খাওয়া ঝানু কম্যুনিস্ট নেতা দেং জিয়াও পিং । চীন এখন আগের সেই ১৮৪২ বা ১৯৩৯ সনের অবস্থায় নেই । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে । তখন ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য অস্ত যায় না’ বলে যে প্রবাদবাক্য তৈরি হয়; এখন তা মোটেও সত্য নয় । সেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এখন আর নেই । বড় কোন ক্ষমতার বলয়ে এখন সেই গ্রেটব্রিটেন আর নেই । কিন্তু, চীনের চিত্র ভিন্ন । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঘুরে দাঁড়িয়েছে চীন । অর্থশক্তি, সমরশক্তি সবদিক থেকেই পৃথিবীর যেকোন দেশকে টেক্কা দেবার ক্ষমতা রাখে চীন । ইচ্ছে করলে দেং জিয়াও পিং এক বিকেলেই হংকং এর দখল নিতে পারেন । নানকিং চুক্তির অপমান এক নিমিষেই ঘুচিয়ে দিতে পারেন তিনি । মুচকি হাসেন  লৌহমানবী মারগারেট থ্যাচার । আন্তর্জাতিক চুক্তির বিধান স্মরণ করিয়ে দেন তিনি । গ্রেট ব্রিটেনের আগের দিন নেই, তা তিনি জানেন । কিন্তু, যে তিনটি চুক্তি তাঁর হাতে আছে, তাতেই অসীম ক্ষমতার অধিকারী তিনি । এসব চুক্তির মেয়াদ এখনও শেষ হয়নি । এখনও পনের বছর বাকী । এখনও হংকং দ্বীপ এবং কাউলুন উপত্যাকার একক মালিকানা ইংল্যান্ডের । চীন ইচ্ছে করলে ক্ষমতা দেখিয়ে হংকং জবরদখল করতে পারে । এক বিকেলেই পারে । সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক চুক্তি ভঙ্গের দায় চীনকেই নিতে হবে । চুপসে যান দেং জিয়াও পিং । বিকল্প চিন্তা তাঁর মাথায় ছিল । সেদিকেই মনোযোগী হন তিনি ।

হংকং এ ব্রিটিশ পতাকা পতপত করে ওড়ে । ওখানকার ছেলেমেয়েরা ইংল্যান্ডের রাণীর নিরাপদ জীবন  কামনা করে দিন শুরু করে । সকলে একসাথে গায়, “God Save the Queen” । মুক্ত বানিজ্য সুবিধার কারণে বিদেশী বিনিয়োগকারীগণ  ছুটে আসেন হংকং । আন্তর্জাতিক বানিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয় হংকং । ভিক্টোরিয়া হারবার এর চারিদিকে গড়ে ওঠে সুউচ্চ বহুতল ভবন । পৃথিবীর এক নম্বর মনোরম বহতল ভবনের নজরকাড়া নগররাষ্ট্র হয়ে ওঠে হংকং; যা কেবল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিজয় ঘোষণা করে । কোনটাই চীনের জন্য সুখকর নয় । বরং, অপমানকর । তাই, হংকংকে ম্লান করে দিতে চান দেং জিয়াও পিং । ক্যান্টন- কাউলুন রেলওয়ে রুটের একটি রেলওয়ে জংশন শেনজন । হংকং এর মুখোমুখি এই শেনজেন শহরকেই বেঁচে নেন তিনি । ১৯৮০ সনে শেনজেন  শহরকে বিশেষ অর্থনৈতিক জোন ঘোষণা করেন তিনি । বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য বিশেষ ছাড় দেন । শুরু হয় দেং জিয়াও পিং এর স্বপ্নের শহর শেনজেন বিনির্মাণ কর্মযজ্ঞ । ১৯৮১ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত শেনজেনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়ায় শতকরা ৪৩ ভাগে । যেখানে চীনের গড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার তখন শতকরা ৯. ১ ভাগ । তাই, উনিশ-বিংশ শতাব্দীর স্বল্পতম সময়ে গড়ে ওঠা সুপরিকল্পিত একটি অত্যাধুনিক নগরের নাম শেনজেন । বর্তমান চীনের ৬৫৯ টি নগরীর মধ্যে সাংহাই এবং বেইজিং এর পরেই শেনজেন এর অবস্থান । আলো ঝলমল মনোরম বহুতল ভবনের নজরকাড়া  এবং হংকং এর সৌন্দর্য ম্লান করা নগর এখন শেনজেন । সেই শেনজেনের শ্যানন রোডের ফুটপাথ ধরে হাঁটি আমি ।

আমার হাঁটার গতি থেমে যায় । আমার সামনে ‘পৃথিবীর জানালা’ । ‘Window of the World’ । ভোরের শুভ্র  আলোয় আমি তাকিয়ে থাকি নামফলকের দিকে । আশেপাশে কোন দর্শনার্থী নেই । প্রদর্শনের সময় সকাল নটা থেকে । এখন জনমানব শূন্য । গতদিন জমকালো চায়না (Splendid China) দেখা হয়েছে আমাদের । ৩৭ লক্ষ বর্গমাইলের বিশাল এক দেশ চীন । লোকসংখ্যা ১৪০ কোটি । প্রশাসনিক পদ্ধতি বিচারে   চীন ৩৫ টি প্রদেশে বিভক্ত । তবে, সব প্রদেশ এক প্রকৃতির নয় । এর মধ্যে স্বায়ত্বশাসিত আছে ৫ টি । যেমনঃ তিব্বত । কেন্দ্রশাসিত ৪ টি । যেমনঃ বেইজিং । এছাড়া আছে বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল হংকং ও মাকাও । আছে ভিন্ন প্রশাসনিক ব্যবস্থার তাইওয়ান । এসকল অঞ্চল বিশেষের জনজীবন, কৃষ্টি, সভ্যতা, সংস্কৃতি সবকিছুই ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে জমকালো চায়নাতে । এর মানে এই যে,  জমকালো চায়না ঘুরে দেখলে একজন দর্শনার্থী বিশাল দেশ চীন সম্বন্ধে মুগ্ধ হওয়ার মত একটা পরিষ্কার ধারণা পেতে পারেন । জমকালো চায়নার

 

https://scontent.fdac20-1.fna.fbcdn.net/v/t1.15752-0/p280x280/41530653_2070080039720279_189481505989328896_n.jpg?_nc_cat=0&oh=a87613c3daf3207b26a79415ef22b8df&oe=5C2E3DCB

শেনজেনের  ‘উইন্ডো অফ দি ওয়ার্লড’ এর সামনে বাংলাদেশী একজন পর্যটক ।

অনতিদূরে এই পৃথিবীর জানালা । Window of the World ।  প্যারিসের আইফেল টাওয়ার, আগ্রার তাজমহলসহ পৃথিবীর যা কিছু বিখ্যাত,  সবই আছে এই ‘উইন্ডো অফ দি ওয়ার্লড’ এ । এটাই দেং জিয়াও পিং এঁর মেসেজ । আগে জমকালো চীনকে দেখুন । তারপর গোটা পৃথিবীর সাথে  তুলনা করুন । ক্যান্টন নয়, শেনজেন থেকে পৃথিবীকে দেখতে বলেন তিনি ।

আমি ক্যান্টন থেকে পৃথিবীকে দেখতে চাই । ব্যক্তি, সমাজ, জাতি বা রাষ্ট্র স্বার্থের নামে ক্ষমতালিপ্সু মানুষের শঠতা, প্রতারণা, বিশ্বাসঘাতকতা, নিষ্ঠুরতা এবং এসবের শেষ পরিণতি আমি ক্যান্টন থেকে দেখতে চেয়েছি । কিন্তু, দেং জিয়াও পিং ক্যান্টনকে  ভুলে যেতে চান । তিনি নানকিং চুক্তির কথা ভুলে যেতে চান । তিনি নিজে শেনজেন থেকে দেখতে চান । শেনজেন থেকে চীনকে দেখাতে চান তিনি । পিছনে তাকাতে চান না তিনি ।

আমি কট্টর দেশপ্রেমিক মহান নেতা  দেং জিয়াও পিং এঁর মনস্তত্ত্ব অনুভব করার চেষ্টা করি । (চলবে)

 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT