Main Menu

মাএ এক টাকার মাস্টার

লুৎফর রহমান, এই নামে এলাকায় তাঁকে কেউ চেনে না। এক টাকার মাস্টার বললে সবাই চেনে। ছবি : কালের কণ্ঠ

গাইবান্ধা শহর থেকে যমুনা নদী অভিমুখী বালাসীঘাট সড়ক ধরে মদনেরপাড়ার দূরত্ব প্রায় চার কিলোমিটার। সেখান থেকে বাঁয়ে মোড় নিয়ে পাকা রাস্তা ধরে আরো অন্তত তিন কিলোমিটার পথ। তারপর বাগুড়িয়া গ্রাম। গ্রামটির আলাদা কোনো বিশেষত্ব নেই। তবে এক টাকার মাস্টার লুৎফর রহমানের জন্যই আশপাশের সাত গ্রামের মানুষ ওই গ্রামটিকে চেনে। নদীভাঙনে সব হারানো এই নির্মোহ মানুষটি গ্রামের এক কোণে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের পাশে একটি ছোট্ট টিনের ঘরে বাস করেন। তবে লুৎফর রহমানকে নিজ নামে কেউ চেনে না। এক টাকার মাস্টার বললে সবার মুখে সমীহ জাগে।

বাগুড়িয়া গ্রামে গিয়ে জানা গেল তার এক টাকার মাস্টার হয়ে ওঠার অসাধারণ কাহিনী। গ্রামবাসী জানায়, প্রতিদিন ফজরের নামাজ পড়ে বাড়ি থেকে বের হন তিনি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে শিশুদের লেখাপড়া শেখান। মাইলের পর মাইল ক্রমাগত হাঁটতে থাকেন। এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রাম। বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জোগাড় করেন। অভিভাবকদের বুঝিয়ে বই, খাতা, কলমসহ তাদের নিয়ে কখনো রাস্তার ধারে, বাঁধে, কখনো গাছতলায় বসে যান।

নদীভাঙা, দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়ে তাঁর লক্ষ্য। মধ্যবিত্ত পরিবারের ছাত্রদেরও পড়ান। প্রতিদিনের রুটিন আট থেকে ১০ ঘণ্টা। শুক্রবার বাদে গ্রামও ঠিক করা থাকে। পড়া শেষে দিনে ছাত্রপ্রতি নেন মাত্র এক টাকা। সারাদিন প্রায় ৩০ জন ছাত্রকে পড়িয়ে তাঁর হাতে আসে ত্রিশ টাকা। গুরুদক্ষিণার এই সামান্য প্রাপ্তিতেই তিনি খুশি। সকাল-দুপুর ছাত্রছাত্রীদের ভালোবেসে দেওয়া মুড়ি, জলপান খেয়ে দিব্যি কাটিয়ে দেন দিন। প্রতিদিন ৩০ টাকা নিজের সংসারের প্রয়োজনে দেন। এই হচ্ছে তাঁর এক টাকার মাস্টার খ্যাতির নেপথ্য কথা।

লুৎফর রহমানের ছাত্র বাগুড়িয়া গ্রামের সমাজকর্মী জাহেদুল ইসলাম (৪৫) বলেন, ছোটবেলা থেকেই আমি দেখছি লুৎফর রহমান এভাবে ছেলেমেয়েদের পড়ান। অনেকেই তাঁকে একসময় পাগল বলেও কটূক্তি করেছে। তার পরও দমে যাননি তিনি। বাগুড়িয়া, মদনেরপাড়া, পুলবন্দি, চন্দিয়া, ঢুলিপাড়া, কঞ্চিপাড়া ও পূর্বপাড়ায় এ পর্যন্ত শত শত ছেলেমেয়েকে পড়িয়েছেন। তাঁর অনেক ছাত্র এখন শিক্ষক, পুলিশ, চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত আছেন।

গাইবান্ধার শিক্ষাবিদ (রংপুর কারমাইকেল কলেজের বাংলা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক) মাজহার উল মান্নান বলেন, এই মানুষটি বিদ্যার ফেরিওয়ালা। নীরবে-নিভৃতে অবহেলিত-দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারে অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন। কোনো মানুষ নিঃস্বার্থভাবে এমন কাজ করেন বলে আমার জানা নেই।

গাইবান্ধা সদর উপজেলার গিদারী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান গোলাম সাদেক লেবু বলেন, মাইলের পর মাইল হেঁটে গ্রামে গ্রামে ঘুরে তিনি শিক্ষার আলো ছড়ান। প্রায় চল্লিশ বছর ধরে ছোট্ট সোনামণিদের আলোর পথ দেখাচ্ছেন এই মানুষটি। বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও তাঁর মনোবল কমেনি। শিক্ষার আলো ছড়ানোর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন সমানতালে। আলোকিত এই মানুষটির উদ্যোগকে আরো এগিয়ে নিতে সাহায্যের হাত নিয়ে তাঁর পাশে দাঁড়ানো দরকার।

গত শনিবার চন্দিয়া গ্রামে গাছের নিচে বসে একদল শিশুকে পড়াচ্ছিলেন লুৎফর রহমান। এ প্রতিবেদক তাঁর সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তিনি বলেন, আমি খুব সামান্য মানুষ। যতটুকু জানি তাই শেখাই। লেখাপড়া না শিখলে কী কষ্ট আমি বুঝি।

পাশে বসা তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী জেসমিন আক্তার বলল, দ্যাখেন, স্যার আজ রোজা আছেন। তার পরও কয়েক মাইল হাঁটিয়া হামার ঘরোক পড়াবার আচ্চে। আমরা স্যার ছাড়া কিছুই বুজি না।

লুৎফর রহমান জানান, ১৯৫০ সালের ৭ আগস্ট গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া গ্রামে জন্ম তাঁর। বাবা ফইমুদ্দিন ব্যাপারী মারা গেছেন অনেক আগে। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট তিনি। ১৯৭২ সালে ফুলছড়ি উপজেলার গুণভরি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। ৭০-৮০ বিঘা জমি, পুকুর ভরা মাছ, গোয়াল ভরা গরু সবই ছিল তাঁদের। ১৯৭৪ সালে নদীভাঙনে সব হারিয়ে সদর উপজেলার গিদারী ইউনিয়নের বাগুড়িয়া গ্রামের ওয়াপদা বাঁধে আশ্রয় নিয়ে কোনোমতে মাথাগুঁজে আছেন। স্ত্রী লতিফুল বেগম, মেয়ে লিম্মি, লিপি এবং ছেলে লাভলু ও লিটনকে নিয়ে তাঁর সংসার। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। বড় ছেলে লাভলু এসএসসি পাস করার পর অর্থাভাবে আর পড়তে পারেনি। এখন অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। ছোট ছেলে লাভলু একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে। সংসারে অভাব-অনটনের শেষ ছিল না। কিছুদিন আগেও খেয়ে না খেয়ে দিন কাটত। এখন বড় ছেলের সামান্য আয় দিয়ে কোনোমতে সংসার চলে।

স্ত্রী লতিফুল বেগমকে পাওয়া গেল বাগুড়িয়া গ্রামে তাঁর নিজ বাড়িতে। তিনি বলেন, আমাদের সংসারে অভাবের শেষ নেই। ক্ষুধার জ্বালায় সন্তানরা আমার আঁচলের নিচে মুখ লুকিয়ে কাঁদত। এর-ওর কাছে চেয়েচিন্তে নিয়ে তাদের দিয়েছি। কিন্তু ওই মানুষটি কখনোই সংসারের ধারেকাছে আসেননি। এখনো না। তাঁর এমন কাজকর্ম নিয়ে আমার বা সন্তানদের কোনো আপত্তিও নেই। দোয়া করবেন, যেন তিনি সুস্থ থাকেন। লুৎফর রহমান বলেন, ১৯৭২ সালে ম্যাট্রিক পাস করার পর অর্থাভাবে কলেজের বারান্দায় পা রাখতে পারেননি। তাই নিজের অভাব হাসির আড়ালে লুকিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে নিজের না পাওয়ার বেদনা ভুলতে চান। তাঁর কাছে কালের কণ্ঠের শেষ প্রশ্ন ছিল, আপনি কী চান? তাঁর সাদামাটা উত্তর, কিছুই চাই না। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত এভাবে মানুষের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পৃথিবী ছাড়তে চাই। গাইবান্ধা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল মমিন খান বলেন, এই মানুষটিকে যথাসাধ্য সহযোগিতা করা হবে।


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT