Main Menu

টাকার ওপর ঘুমাতেন তিনি

খাটের জাজিমের নিচে থরে থরে সাজিয়ে রাখতেন পাঁচশ টাকার নোটের বান্ডিল। স্ত্রীকে নিয়ে ঘুমাতেন টাকার ওপর। টাকশালের মতো ১০-১২ ফুট আয়তনের শয়নকক্ষের আনাচে-কানাচে রাখতেন টাকা আর টাকা। লাগেজ ও ওয়্যারড্রবে পরিধানের কাপড়ের ফাঁকে ফাঁকে রাখতেন বিদেশি মুদ্রা। শখ ছিল ঘরের বাইরে পাঞ্জাবি-পায়জামা থেকে বেরোবে নতুন টাকার ঘ্রাণ।

ওয়ান-ইলেভেনে ধরা পড়া সেই বনখেকো গণিকে হার মানানো এই ব্যক্তি স্বর্ণ চোরাচালানি এসকে মোহাম্মদ আলী। চার বছরের দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে মোহাম্মদ আলীর ৪০ কোটি ৯১ লাখ টাকার সম্পদ অর্জনের তথ্য পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। নামে-বেনামে এই অঢেল সম্পদ পেয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার তার বিরুদ্ধে চার্জশিটের অনুমোদন দিয়েছে সংস্থাটি।২০১৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের একটি দল রাজধানীর পুরানা পল্টনের ২১/১ নম্বর বাড়ির ১১ ও ৭ তলায় মোহাম্মদ আলীর দুটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে সাড়ে ৪ কোটি টাকা, ১৫ লাখ সৌদি রিয়াল ও ৫২৮টি (৬১ কেজি ৫৩৮ গ্রাম) স্বর্ণবার উদ্ধার করে। ওইদিনই শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের অভিযান পরিচালনাকারী উপপরিচালক মুস্তাফিজুর রহমান বাদী হয়ে মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে পল্টন মডেল থানায় একটি মামলা করেন। এর পর নতুন করে মামলার তদন্তে নামে দুদক।

তদন্তের একপর্যায়ে গত বছর ১৩ নভেম্বর রমনা মডেল থানায় দুদকের পক্ষ থেকে একটি মামলা করা হয়। দুদকের উপপরিচালক জালাল উদ্দিন আহাম্মদ মামলাটি অনুসন্ধান করেন। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা ও দুদক কর্মকর্তারা জানান, মোহাম্মদ আলীর ধানম-িতে আলী সুইটস নামের একটি মিষ্টির দোকান রয়েছে। মিষ্টি ব্যবসার আড়ালে দীর্ঘদিন ধরেই তিনি আন্তর্জাতিক স্বর্ণ চোরাকারবারে জড়িত ছিলেন। ব্যাংকিং লেনদেন এড়ানো ও শখের বশে বাসায় থরে থরে টাকা-স্বর্ণবার সাজিয়ে রাখলেও সাদামাটা হয়ে বাইরে চলাফেরা করতেন। আবার বাসা থেকে বেরোনোর সময় নিজ স্ত্রীকেও শয়নকক্ষ থেকে বের করে ব্যক্তিগত সেই ‘ভল্ট’ তালাবদ্ধ করে রাখতেন।

দুদক সূত্র জানায়, সম্পদের হিসাব চেয়ে ২০১৬ সালের ১২ ডিসেম্বর শেখ মোহাম্মদ আলীকে নোটিশ দেওয়া হয়। এর পর তিনি দুদকে দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে ৪ কোটি ৮৮ লাখ ৬৬ হাজার ১৫০ টাকার স্থাবর এবং ২৫ কোটি ৯০ লাখ ৩০ হাজার ৪৭৩ টাকার অস্থাবর সম্পদের (মোট ৩০ কোটি ৭৮ লাখ) ঘোষণা দেন। এর পর তদন্তকালে মোহাম্মদ আলী দুদক কর্মকর্তাদের জানান, সিলেট সদরের মালঞ্চ কুমারপাড়া ১৩/৩, মানিকপীর রোডে তার জমি আছে। কিন্তু দুদক কর্মকর্তারা সরেজমিন দেখতে পান, ওই জমিতে তার ৬ তলা একটি ভবনও রয়েছে। সিলেট গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলীদের হিসাবে যার নির্মাণব্যয় ৯৫ লাখ টাকা ধরা হয়।

দুদকের তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, পূর্বাচল নুতন শহর রাজউক প্রকল্পে তার নামে ১০ কাঠা জমির মূল্য দেখানো হয় ৩০ লাখ টাকা। কিন্তু অন্যের নামে বরাদ্দ হওয়া ওই জমি তিনি কেনেন ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকায়। দুদক কর্মকর্তারা প্রমাণ পেয়েছেন, তার কাছে ৬১ কেজি ৫৩৮ গ্রাম স্বর্ণ রয়েছে, যার বাজারমূল্য ৩০ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। তার হেফাজতে পাওয়া গেছে নগদ ৩ কোটি ২৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা মূল্যমানের সৌদি রিয়াল ও বাংলাদেশি ৫ কোটি ৫৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা। এই ৩৯ কোটি ৬৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা মূল্যমানের অস্থাবর সম্পত্তি গোপন করেন তিনি।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ড. মইনুল খান আমাদের সময়কে বলেন, স্বর্ণ চোরাকারবারি মোহাম্মদ আলীর নগদ-স্বর্ণবার বাসায় মজুদ রাখা একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা। তখন আমাদের কর্মকর্তাদের ৫ বস্তা টাকা গুনতে ২৪ ঘণ্টার মতো সময় লাগে। চার্জশিটের পর তার কঠোর সাজা হলে রাষ্ট্র উপকৃত হবে।

দুদক ও শুল্ক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, মোহাম্মদ আলী দীর্ঘ সময় ধরে হুন্ডি ব্যবসা ও স্বর্ণ চোরাকারবারে জড়িত। এর আগে গ্রেপ্তার বাংলাদেশ বিমানের ডিজিএম এমদাদ হোসেন, ক্যাপ্টেন আবু মোহাম্মদ আসলাম শহীদ, বিমানের শিডিউল ইনচার্জ তোজাম্মেল হোসেন এবং সাবেক চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিনের ধর্মপুত্র মাহমুদুল হক পলাশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল মোহাম্মদ আলীর। তাদের সঙ্গে যোগসূত্র করেই দুবাই থেকে চোরাই পথে স্বর্ণ আমদানি করতেন মোহাম্মদ আলী। এর পর বাসায়ই স্বর্ণের মজুদ রাখতেন। সেখান থেকে বাসার পাশে বায়তুল মোকাররম মার্কেটে গোপনে বিক্রি করতেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জিজ্ঞাসাবাদে মোহাম্মদ আলীর তথ্যে তার সহযোগী হিসেবে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার চেয়ারম্যান রিয়াজ উদ্দিনের নাম চলে আসে। ১৯৮৫ সালে জনতা ব্যাংকে কেরানি পদে রাজধানীর পল্টন শাখায় চাকরি পান রিয়াজ উদ্দিন। একই ব্যাংকে যাতায়াতের কারণে তার সঙ্গে পরিচয় ও সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে মোহাম্মদ আলীর। এর পর রিয়াজ উদ্দিন পোস্টিং পান জনতা ব্যাংকের বিমানবন্দর শাখায়। এভাবে বিমানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে ক্লিনার পর্যন্ত অনেকের সঙ্গে যোগসাজশ তৈরি হয় রিয়াজের। দুদকের অনুসন্ধানী দল রিয়াজ উদ্দিনের সম্পদের বিষয়ে খোঁজখবর করছে।

উৎসঃ   amadershomoy


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT