Main Menu

নিরাপদ সড়ক আমার অধিকার

বনজ মজুমদার : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় (২০০৭-০৮) কক্সবাজার জেলার পুলিশ সুপার ছিলাম। সে সময় রামু-নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের তামাক খেতে একটি হ্ত্যাকান্ড ঘটে। বাইশারীর পর আর জীপ যায় না। উঠি চাঁন্দের গাড়িতে। এ গাড়ি ছড়া, খাল, কাঁচা রাস্তা ইত্যাদি সবার উপর দিয়ে চলতে পারে। কারো কারো ধারণা, এ গাড়িতে চড়ে চাঁন্দের দেশেও যাওয়া যায়। সাধারণত এ পুরনো জীপ-গাড়িগুলিতে ০৬ থেকে ১০ জন যাত্রী উঠতে পারে। কিন্তু দেখবেন যাত্রী কম করে হলেও ৫০ জন। ভাগ্য ভালো থাকলে ৭০ জন পর্যন্ত দেখতে পারেন। ড্রাইভার যাত্রীর কারণে সামনে কিছু দেখেন না। হেলপার ডানে-বামে ইত্যাদি শব্দ বলেন, এগুলো শুনে ড্রাইভার গাড়ি চালান। যাত্রীরা কেন যেন এ গাড়িতে চলতে নিরাপদবোধ করেন। একটু খেয়াল করলে দেখবেন, এসব ড্রাইভার ও হেলপাররা একেকজন মারাত্নক আচরনগত(Attitudinal) সমস্যায় ভুগছেন। 
    আপনি যদি এদের ড্রাইভিং লাইন্সেস দেখতে চান দেখবেন প্রায় সকলেরই হয় নাই অথবা নকল। ট্রাফিক আইন কি তারা জানেন না। অথচ এরা পাকা ড্রাইভার। খোজঁ নিয়ে দেখি জেলায় এদের সংখ্যা হাজার হাজার। কি এ্যাকশন নেব? কিভাবে এদের গাড়ি থেকে নামাবো? নামালে এদের স্ত্রী, পুত্র, কন্যারা খাবেন কি? অথচ এরা কেউ চাইলেও শিক্ষাগত যোগ্যতার অভাবে কোন বৈধ লাইন্সেস পাবেন না। তাহলে?
    আমরা চিন্তা করে দেখলাম, যদি এসব ড্রাইভারদের মধ্যে আচরনগত পরিবর্তন আনা যায়, তাহলে কেমন হয়? আমরা কক্সবাজার পুলিশ একদিনের একটি প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করলাম। সারাদিন ৫০ জন ড্রাইভার প্রশিক্ষণে থাকবেন। আমাদের সাথে খাবেন এবং প্রশিক্ষণ গ্রহণ করবেন। প্রশিক্ষণের বিষয় ছিল- ব্যক্তিগত পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, নিজ পরিবারের প্রতি ভালবাসা, ইসলামের দৃষ্টিতে যাত্রী সেবা, মহিলা ও শিশুদের প্রতি আচরণ, স্কুলের সামনে করণীয়, ট্রাফিক সিগনাল চেনা ও মেনে চলা ইত্যাদি। ক্লাস নিতে রাজি হলেন জেলা ও দায়রা জজ, জেলা প্রশাসক, যৌথ বাহিনীর সিও, ডিজিএফআই-এর সিও, রামু কলেজের অধ্যাপিকা রেশমি (ক্যান্সারে মৃত্যুবরন করেছেন, চির শান্তি লাভ করুন), জেলা কমিউনিটি পুলিশের সেক্রেটারিসহ আরো অনেক পরিচিত মুখ। প্রায় ১১০০ ড্রাইভারকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের প্রত্যেককে একটি সার্টিফিকেট দেয়া হয় যা পুলিশ সুপার কর্তৃক স্বাক্ষরিত ছিল।
    প্রশিক্ষণের ব্যাপক চাহিদা স্বত্ত্বেও আমরা প্রশিক্ষণটি পরবর্তীকালে বন্ধ রেখে ছিলাম বিভিন্ন কারণে। প্রায় ছয় মাস পর একটি NGO(এক্সপ্লোরাল)-কে অনুরোধ করলাম প্রশিক্ষিত ১১০০ ড্রাইভারের উপর একটি সমীক্ষা করতে। তারা জানিয়েছিল-
    (১) ঐ সার্টিফিকেটটিই হলো অনেকের ড্রাইভিং করার একমাত্র কাগজ। তাদের প্রায় অনেকে এ কাগজটি বাধাই করে রেখেছেন। 
    (২) গাড়ী চালনার সময় কেউ এখন লুঙ্গি পড়েন না। ফুলপ্যান্ট পড়েন। 
    (৩) প্রত্যেক ড্রাইভার এখন ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য ১টি লুঙ্গি, ১টি গামছা ও ১টি সাবান রাখেন। যা তিনি কাউকে শেয়ার করতে দেন না। অন্যের ব্যবহৃত সাবান ও গামছা আর নিজে ব্যবহার করেন না। 
    (৪) স্কুলের সামনে গেলেই নিজের বাচ্চা বা ছোট ভাই-বোনের কথা মনে করেন। 
    (৫) মেয়েদের সাথে তাদের আচরনের আমুল পরিবর্তন ঘটেছে। মেয়েদের সাহায্য করার প্রবণতা বাড়ছে এবং গাড়িতে কোন মহিলারা উঠলে নিজেরা ভদ্র হওয়ার চেষ্টা করেন। 
    NGO টি আরো জানিয়েছিল প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী ড্রাইভারদের প্রায় সকলেই স্বীকার করেছেন তাদের ড্রাইভিং এর সময় পূর্বের চেয়ে দূর্ঘটনার প্রবণতা কমেছে। আমার ধারণা হয়তঃ প্রশিক্ষণ গ্রহণের কারণে তারা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বেপরোয়া ড্রাইভিং –এর ফলে সৃষ্ঠ দূর্ঘটনায় পতিত মানুষটি সে নিজে বা তার প্রিয়জন হতে পারে। 
    প্রকৃত জ্ঞান-ই সদাচার শিখায়। পরিবারের প্রতি ভালবাসা সকল মানুষকে ভালবাসতে শিখায়।

লেখকঃ ডিআইজি এবং পু‌লিশ ব্যু‌রো অব ইন‌ভেসটি‌গেশন (PBI) এর প্রধান


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT