Main Menu

একজন নূর মোহাম্মদের আত্মকাহিনী

বনজ মজুমদার :অভাবের সংসার। দুঃসহ ক্ষুধার যন্ত্রনায় প্রায় ২১ বছর বয়সে কুষ্টিয়া সদর থানার নিজগ্রাম দহখোলা হতে চলে আসি বংশীতলায়। শ্বশুর বাড়ীর এক চিলতে জমিতে কুড়েঘর বানিয়ে থাকি। এ গ্রামে ২ জন মাতুব্বর। মাজেদ আলী জোয়ার্দার ও আলতাফ মোল্লা। এলাকায় তাদের কথাই সব।সবাই তাদের সম্মান করেন। আমি সারাদিন কামলা খাটি মাজেদ চাচার বাড়ীতে। চাচা আমাকে পছন্দ করেন। এভাবেই ২৫ বছর কেটে যায়। ১৯৮৭ সালের শ্রাবন মাস। বর্ষণক্ষান্ত এক বিষন্ন সন্ধ্যায় কাঁদা মাটির রাস্তায় ঘরের উদ্দেশ্যে রওনা হই। হঠাৎ শোর চিৎকার। কিছু বোঝার আগেই আমি খুন হই। বৌ-বাচ্চার মুখ আর দেখা হয় না।
আমার মালিক মাজেদ চাচা শোকে ভেঙ্গে পরেন। আমার স্ত্রী তহুরুন্নেসা কোনদিন স্কুলে যান নাই। পুলিশ দেখলে ডরায়। তাই বাধ্য হয়ে চাচা মাজেদ জোয়ার্দার আমার খুনের বিচার চেয়ে থানায় মামলা করেন। আসামী হয় গ্রামের ২য় মোড়ল আলতাফ চাচা সহ ১৩ জন। তারা সবাই আলতাফ চাচার লোক। মামলা খেয়ে সবাই গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায়।   আলতাফ চাচারা কেন আমাকে খুন করবেন?
মাস দুই-এক পর মামলাটি সিআইডি’তে চলে আসে। স্যাররা দেখি আমাকে নিয়ে মাঝেমধ্যে শলা-পরামর্শ করে। ভাবতে ভাল লাগে- আমি এখন গুরুত্বপূ্র্ণ। খবর পাই, আমার স্ত্রী আদালতে পুলিশের “তদন্ত সঠিক হচ্ছে না” মর্মে অভিযোগ এনে ফৌজদারী মিস মামলা দায়ের করেছেন। স্যারদের এত শলা-পরামর্শ নাকি আমার স্ত্রী’র ভাল লাগে নাই। পুলিশকে আর সে ভয় পায় না। আমার স্ত্রী স্মার্ট হযেছেন। ৬মাস শুনানী শেষে আদালত আমার স্ত্রী’র অভিযোগ খারিজ করে দেন। অর্থা্ৎ খুনের মামলার তদন্ত সঠিক আছে। 
সে সময়ে খুন মামলা তদন্তের নির্দিষ্ট সময়-সীমা ছিল, যা এখন নাই। তদন্তের সময় চলে যাচ্ছিল বলে সিআইডি আদালতের কাছে ২ মাস তদন্ত সময় বৃদ্ধির অনুমতি চায়। আদালত “তদন্ত সময় ১ মাস মঞ্জুর” আদেশ দেন। 
আমার স্ত্রী ও মাজেদ চাচা এ সকল আদেশে খুশি হননি। আমার স্ত্রী আদালতে আবেদন করেন- ‘‘তদন্ত সঠিক হচ্ছে না” ও “তদন্ত সময় ১ মাস বৃদ্ধি” আদেশ দুইটির বিরুদ্ধে তিনি মহামান্য হাইকোট© বিভাগে রিভিশন করতে চান। অধিকন্তু, রিভিশন চলাকালীন খুন মামলার ডকেট আদালতে রাখতে চান। পুলিশকে তিনি বিশ্বাস করেন না। পুলিশ যদি মামলার ডকেট পরিবর্তন করে ফেলে! সেই দাবী অনুযায়ী আদালতের নির্দেশে ডকেট সিআইডি হতে আদালতের হেফাজতে চলে আসে। সেই সাথে আমিও। আদালত এক বিশাল জায়গা। 
রিভিশন মামলা ২-টির প্রায় ৬ বছর শুনানী শেষে মহামান্য হাইকোট© জেলা আদালতের পক্ষে–ই রায় দেন। সিআইডি আবার মামলা তদন্ত শুরু করে। সিআইডি একদিন আমার ছেলে আমিরুলকে নিয়ে থানায় যায়। আমিরুল আমার খুনের জন্য কুষ্টিয়া সদর থানায় নতুন একটি হত্যা মামলা করে। এ মামলায় মাজেদ চাচা সহ ১০জন আসামী। এরাও সবাই চাচার লোক। মাজেদ চাচা সহ এই ১০ জনের কত ফুট-ফরমাইস খেটেছি। চাচা কেন আমাকে খুন করবেন? খুন হলাম আমি একা অথচ মামলা ২টি। সিআইডি একই দিনে আমার ১ম খুনের মামলার ফাইনাল রিপোট© আদালতে প্রেরণ করে। বুঝলাম আলতাফ মোল্লা চাচারা আমাকে খুন করেন নাই। তারা নির্দোষ।  
মাজেদ চাচা আমার ১ম খুনের মামলা অর্থাৎ “ফাইনাল রিপোর্ট” দেয়া মামলার বাদী। আইন অনুযায়ী তিনি বিশেষ আইনগত সুবিধার অধিকারী। তিনি আমার ছেলের মামলা বিশ্বাস করেন না। আমিরুলকে না-কি পুলিশ কু-পরামর্শ দিয়েছে। তাই বাদী হিসাবে তিনি ১ম খুনের মামলার ফাইনাল রিপোর্টের বিরুদ্ধে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে “না রাজী’’ দেন। অর্থাৎ এ মামলাও চলবে। নিয়ম অনুযায়ী একই ঘটনায় ২টি মামলা চলতে পারে না। ফলে ২য় মামলাটির তদন্ত বন্ধ হয়ে যায়। চাচা আমার খুনের ন্যায় বিচারের জন্য “না-রাজী”, “আপিল”, “রিভিশন” ও “আদালত পরিবত©ন’’ ইত্যাদির মাধ্যমে মামলাটি আদালতে ঘুরাঘুরি করাতে থাকেন। তহরুন্নেসা আর আদালতে আসে না। কেউ তার খোঁজও নেয় না। সে হারিয়ে যায়। 
মাজেদ চাচার বয়স এখন ৯০ বৎসর। মৃত্যু শয্যায়। আদালতে আসার প্রশ্নই ওঠে না। মামলার তদবীরও নাই। তদবীর না থাকায়, বছর দেড়েক আগে আদালত ১ম খুনের মামলার ফাইনাল রিপোট©-টি গ্রহন করে নেয়। এখন আমার জন্য একটাই খুনের মামলা। আদালত আমিরুলের দায়ের করা ২য় মামলাটির তদন্ত পিবিআই’তে দেয়। পিবিআই প্রমান করেছে মাজেদ চাচার প্রত্যক্ষ নির্দেশ ও উপস্থিতিতে ঐ ১০ জন আমাকে অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে খুন করে। খুনের আগমুহুর্তে অন্ধকারের বৃষ্টিতে শোর-চিৎকার করে গ্রামে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। যাতে কোন সাক্ষী না থাকে। মাজেদ আলী  আমার স্ত্রী’কে  পুলিশের ভয় দেখিয়ে নিজেই খুন মামলার বাদী হয়েছেন এবং সরল তহরুন্নেসাকে ভুল রাস্তায় পরিচালিত করেছেন। পিবিআই মাজেদ আলী জোয়ার্দার সহ ৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে। অন্য ২ জন ইতোমধ্যে বার্ধ্যক্য জনিত কারনে মারা গেছে। অনেকেই মাজেদ আলীর মত মরে মরে। আদালতের সপি©ল ও জটিল পথে হেটেঁ হেটেঁ- নিরিহ মানুষ কত প্রকার, কি কি, এবং কতভাবে বিপদে পড়তে পারেন তা উদাহরণ সহ দেখেছি। দেখে দেখে ভুলেই গেছিলাম, আমার-ও খুনের বিচার পাবার অধিকার ছিল। 

বলশালী প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে দরকার একটি শক্তিশালী খুন মামলা। নূর মোহাম্মদের অপরাধ তিনি অত্যন্ত গরীব। গরীব হওয়া কি অপরাধ?
মন্তব্যঃ পিবিআই সিলেট, রংপুর, ময়মনসিংহ, বগুড়া, বরিশাল, ফরিদপুর, খুলনা ও চট্রগ্রাম জেলা এবং মেট্রোপলিটন এলাকার বিজ্ঞ জেলা ও দায়রা জজ আদালত কর্তৃক ২০১৫ ও ২০১৬ সালে ঘোষিত মোট ২১৯ টি খুন মামলার রায়ের বিশ্লেষন করে। এ খুন মামলা সমূহের পুলিশ তদন্তে গড় সময় নিযে ছিল ১.৪৩ বছর (প্রায় ১১/২বছর) এবং বিচারকার্যে সময় লেগেছিল গড়ে ৬ বছর । নূর মোহাম্মদের মামলা তদন্তে সময় নিয়েছে ৩১ বছর।
সুত্র- কুষ্টিয়া সদর থানার মামলা নং-২৬, তাং-২৫/০৬/১৯৮৭, ধারা-১৪৭/১৪৮/ ৪৪৭/৩৬৪/১৪৯/৩০২ দঃবি।

লেখকঃ ডিআইজি এবং পু‌লিশ ব্যু‌রো অব ইন‌ভেসটি‌গেশন (PBI) এর প্রধান


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT