Main Menu

সংখ্যালঘু ও সাম্প্রদায়িকতা

জঙ্গলে যারা বাস করে তাদেরও নাকি একটা নিয়ম আছে। সেখানেও কেউ কাউকে অঝথা হেনস্থা করে না। কিন্তু বিশ্ব জুড়ে কিছু কিছু দেশের খবর শুনে মনে হয় সেখানের অবস্থা এখন জঙ্গলের চাইতে খারাপ।এইসব দেশের সমাজের মানুষ এতটাই অধঃপতিত যেখানে কিনা শুধুমাত্র সন্দেহের বশে মেরে ফেলা যায়, বাড়ী-ঘর জ্বালিয়ে দেয়া যায়, মাথা নেড়া করে দেয়া যায়।  জঙ্গলে  সবার জন্য আইন থাকে না, আছে শুধু হিংস্রদের জন্য। সেখানে যারা থাকবে তাদের এই হিংস্রদের অত্যাচার মেনে নিয়েই চলতে হবে। ঠিক তেমনি এই সব দেশের অসহায় মানুষদেরও সবকিছু সয়ে নিয়ে থাকতে হয়, এমনকি কষ্টের কান্নাটাও লুকিয়ে রাখতে হবে নয়তো হীরক রাজার দেশের মতো হয়তো আইনের খড়গ নেমে আসবে।

বাংলাদেশের খবর পড়লে মনে প্রশ্ন জাগে, কি-করে একটি দেশ, দেশের মানুষ এতটা বদলে যেতে পারে?  দেশের লোকজনের আবেগ, বিবেক সবকিছু যেনো কোনো রাজনৈতিক অথবা ধর্মীয় লেবাসে মোড়া। রাজনীতি আর ধর্মনীতির কাছে বিবেক মনুষ্যত্ব সবকিছু অর্থহীন। সংখ্যালঘু প্রশ্নে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় যেনো আজ শুধুমাত্র দর্শক। আয়না ছাড়া যেমন নিজের চেহারা দেখা যায়না, তেমনি দেশের অধিকাংশ লোকজন দেশের চেহারা ভালো করে দেখতে পায়না, যেটা প্রবাস থেকে ভালো দেখা যায়। কিন্তু দেশ থেকে যারা পালিয়ে (অন্যায়কে মেনে না নিয়ে) অথবা সুবিধা নিয়ে আজকে উন্নত দেশে বসবাস করছেন তাঁদের অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক অনেক স্থূল বিষয় নিয়ে কথার ফুলঝুড়ি ছোটাতে পারেন কিন্তু কয়দিন আগে কয়েকজন মৎস্য শ্রমিকের মাথা নেড়া করে দেয়ার ঘটনাতে তাঁদের কোনো রা শোনা গেলো না। এই মৎস্য শ্রমিকরা একটি বিশেষ ধর্মের অনুসারী বলেই কি এই নীরবতা? আরো কিছুদিন আগে পাহাড়ে কিশোরী ধর্ষণ ও হত্যার খবরও আমাদের চোখ অব্দি গিয়েই আটকে গেছে - একই কারণে?

পত্রিকার সূত্র অনুযায়ী এইসব মৎস্য শ্রমিকদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো কোনো এক চেয়ারম্যানের পুকুরের মাছ ওঠাতে। কাজ শেষে যখন ওরা ফিরে যাচ্ছিলো রাস্তায় গাড়ী থামিয়ে ওদেরকে আবার ফিরিয়ে এনে মাছ চুরির অভিযোগ দিয়ে মাথা নেড়া করে দেয়া হয়। এখন প্রশ্ন হলো ওদের সাথে যদি ঝামেলা হয়ে থাকে তাহলে ওদেরকে প্রথমে পাওনা মিটিয়ে বিদায় করা হলো কেন? মাছ চুরি করলে সেটা প্রথমে দেখা হলোনা কেন? যদি চুরির ঘটনা সত্য হয় তাহলে ওদেরকে কেন পুলিশে দেয়া হলো না? শুধু সন্দেহের বশে শ্রমিকদের মাথা নেড়া করে দেয়ার ক্ষমতা এরা কোথায় পেল? এই প্রশ্নগুলো যখন মনের মধ্যে খোঁচা দেয় তখন অনেক কিছু ছাপিয়ে সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু শব্দগুলো দরজায় কড়া নাড়ে।

অনেকেই হয়তো বলবেন দেশে কি শুধুমাত্র সংখ্যালঘু ধর্মের লোকজন অত্যাচারিত হচ্ছে? অন্য ধর্মের লোকজনের ওপর নির্যাতন হচ্ছে না? হ্যাঁ, অত্যাচারিত অনেকেই হচ্ছে, বরং সংখ্যাগুরুর নির্যাতনের খবর সবচাইতে বেশী। কিন্তু কোনো সংখ্যাগুরু তার ধর্মের কারণে নির্যাতিত হয়েছে সেটা বিরল এবং হলেও ধটনার প্রতিবাদও হয়েছে, বিচারও হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো সংখ্যালঘুর নির্যাতনের বিচার হয়নি। হাজারো ঘটনার মামলাও হয়নি। এই বিচারহীনতা যেমন সংখ্যালঘুদের করেছে ভীত-সন্ত্রস্ত, ঠিক তেমনি সুযোগ সন্ধানী ধর্মীয় সংখ্যাগুরুদের করেছে সাহসী। এই ভীত-সন্ত্রস্ত সংখ্যালঘুরা সবসময় জ্বলন্ত উনুনের চাইতে উত্তপ্ত করাইকে বেছে নিয়েছে। তারা বুঝেও বুঝতে চায়নি এইসব লেবাসী ধর্মীয় সংখ্যাগুরুদের কোনো আদর্শ নেই, বরং নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী তারা দল বাছাই করে।   

কেন সমাজে এমন হচ্ছে? কেনো আমরা দিন দিন সাম্প্রদায়িক হয়ে যাচ্ছি? অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি কেন আমাদের বংশধরেরা ঘৃণা নিয়ে জন্মাচ্ছে? এই প্রশ্নের কিছু উত্তর হয়তো আমাদের জানা আর কিছু হয়তো অজানা। ছোটবেলার লাল পিঁপড়ে আর কালো পিঁপড়ের গল্প আমরা অনেকেই জানি। এই ধরণের গল্প দিয়ে ছোট বয়েসেই আমাদের মনকে সাম্প্রদায়িক বানানো হচ্ছে। এখানে অস্ট্রেলিয়াতে আমি অনেককেই বলতে শুনেছি - 'হিন্দু লোকটা কি যেনো নাম, মনে করতে পারছিনা', কিন্তু কখনো ধর্মীয় সংখ্যাগুরু নামের লোকের জন্য এভাবে বলতে শুনিনি। কিংবা গত বিশ্বকাপে বাংলাদেশের খেলা দেখতে গিয়ে শুনি এক বাচ্চা আরেক বাচ্চাকে জিজ্ঞেস করছে ‘তুমি কি মুসলিম? কারণ মুসলিম না হলে তোমার সাথে বন্ধুত্ব করবো না’। এই যে সাম্প্রদায়িক শিক্ষা আমরা পারিবারিক ভাবে পেয়ে আসছি এবং যা আমাদের বংশধরদের শেখাচ্ছি সেটারই প্রতিফলন আজকে সারা দেশ-বিদেশ জুড়ে। সাম্প্রদায়িক দৃষ্টি নিয়ে যখন সমাজ পরিচালিত হয় তখন সমাজের লোকজনের বিবেক, বুদ্ধি লোপ পেতে থাকে। ন্যায় অন্যায় বোধ কাজ করে না। ধর্ম গেলো বলে গুজব তুলে লোকজনকে হিংস্র করে তোলা সহজ।

কিছুদিন পর খুব ধুমধামের সাথে দূর্গা পূজা হবে সারা অস্ট্রেলিয়াতে। হাজার হাজার হিন্দু ধর্মের অনুসারীরা আরো হাজার হাজার ডলার খরচ করে দুইদিন ধরে পূজা উদযাপন করবেন। এই পূজা আয়োজনে যারা যুক্ত তারা নিজেদের নেতা হবার সুযোগ পেয়ে নিজেদের মত করে সংগঠন পরিচালনা করছে। দেশে ফেলে আসা নিজেদের সম্প্রদায়ের লোকজনের এসব নির্যাতন-অপমানের প্রতিবাদ করা একজন শিক্ষিত মাত্রেরই নৈতিক দায়িত্ব। আর যাঁরা সংগঠনের দায়িত্বে আছেন তাদের কাজ সবথেকে বেশী। কিন্তু দুঃখজনক হলেও এইসব নির্যাতনের প্রতিবাদ করতে কখনো শুনিনি বা হলেও তেমন জোরালো নয়। শুধুমাত্র পূজা আয়োজন করে নিজেদের আত্মতুষ্টিতে না ভুগে আসুন সবাই মিলে নিপীড়িতদের জন্য আওয়াজ তুলি। তাহলেই পূজার আয়োজন সার্থক হবে।

নিউটন দেবু

সাংস্কৃতিক কর্মী


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT