Main Menu

ক্যান্টন থেকে দেখা

রাশেদুল ইসলাম: এবার চীন দেশে যাওয়া হচ্ছে আমার ।  এই ২০১৮ সনে । ১৯৯৭ সনেও একবার চীন যাই আমি ।  চীনের গ্রেটওয়াল, নিষিদ্ধ নগরী, সামার প্যালেস –এসব ঐতিহাসিক স্থান তখনই দেখা আমার ।  তারপরও চীন যাওয়ার কথা শুনে আমার ভালো লাগে । চীনের পরিবর্তন আমাকে টানে । আমি জানি নব্বই দশকের সেই  চীন, আর আজকের চীন এক নয় । আকাশ- পাতাল ব্যবধান । এ সময়ের মধ্যে চীনের অর্থনীতি একেবারে ওলটপালট হয়ে গেছে । এখনকার চীন দেশের ভিতরের  খোলনলচে বদলে ফেলেছে শুধু নয়; গোটা বিশ্ববাজার দখলে নিয়েছে যেন ! আমি আলো ঝলমল বেইজিং এর কথা কল্পনা করি । কিন্তু, ভ্রমণসূচী দেখে আমার টনক নড়ে। না, বেইজিং নয়। আমাদের গন্তব্য গোয়াংঝু । গোয়াংঝু আমার পরিচিত নগরী নয় । জায়গাটা চিনতে  গুগোল সার্চ করি আমি । জানতে পারি গোয়াংঝুর পুরাতন নাম ক্যান্টন । ক্যান্টন নাম দেখেই আমি চমকে উঠি । এক ধরণের স্মৃতিকাতরতা (nastalzia) ভর করে আমার মধ্যে । আমি আমার ছেলে বেলায় ফিরে যাই ।

পাঠ্যপুস্তকের বাইরে আমার পড়াশুনা খুব ছোটকাল  থেকেই । ষষ্ট শ্রেণিতে পড়াকালে একটা ছেঁড়া ম্যাগাজিন আমার হাতে আসে । সেখানে চীনের জাতীয় লেখক লু সান (Lu Xun) এর  একটা লেখা পাই আমি । চড়ুই পাখির উপর সে লেখাটি আমার মনে দাগ কাটে । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গোরা’ উপন্যাস যখন পড়ি, তখন আমি সপ্তম শ্রেণির ছাত্র । একজন  কলা বিক্রেতার ঝুড়ি থেকে একটার পর একটা কলা খাচ্ছেন গোরা; নিমিষেই একঝুড়ি কলা শেষ – ‘গোরা’ উপন্যাসের কথা এলেই আজও আমার স্মৃতিতে গোরার কলা খাওয়ার দৃশ্য ভেশে ওঠে ।  আমার জানামতে ‘গোরা’ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি অনবদ্য উপন্যাস । তৎকালে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে যে ধর্মীয় মতভেদ দেখা যায়, তার প্রতিফলন ঘটেছে গোরা উপন্যাসে । নায়ক গোরা গোঁড়া হিন্দুবাদী ।   আমার তখন এসব তত্ত্ব বোঝার বয়স হয়নি । হয়ত সে কারণেই কিশোর মনে গেঁথে যাওয়া গোরার কলা খাওয়ার দৃশ্য আজও আমার মনে আছে । তবে, এগুলো সব আমার অপরিণত বয়সের পড়া । সত্যই লু সানের চড়ুই পাখির উপর কোন লেখা আছে কিনা;  বা ‘গোরা’ উপন্যাসে গোরার কলা খাওয়ার দৃশ্য আছে কি না–বড় হয়ে তা যাচাই করে দেখা হয়নি আমার। আসলে যখন আমার সবকিছু বোঝার বয়স হয়েছে; তখন আমি পড়াশুনা একেবারেই ছেড়ে দিয়েছি । তাই, পৃথিবীর পুরানো ইতিহাস আমি যত জানি; সে তুলনায় নতুন ইতিহাস আমার তেমন জানা নেই বললেই চলে । সেদিক থেকে আমি একজন অপূর্ণ জ্ঞানের মানুষ । অবশ্য এটা আমার এখানে লেখার বিষয় নয় ।

আমি বলছিলাম, আমার ছেলেবেলার বই পড়ার কথা । সে সময় একটা বই আমার কিশোর মনের চিন্তা-চেতনা একেবারে ওলটপালট করে দেয় । বইটির নাম ‘পথের দাবী’ । লেখক অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় । এই ‘পথের দাবী’র নায়ক সব্যসাচীর মুখে আমি চীনের ক্যান্টনের  কথা শুনি । ভারতে ইংরেজ শাসনের অবসান তাঁর (সব্যসাচী) জীবনের একমাত্র ব্রত । ইংরেজ বিচারকের দেয়া মৃত্যুদণ্ডাদেশ মাথায় নিয়ে পৃথিবী চষে বেড়ান তিনি । নিজের মৃত্যু অথবা ভারতের স্বাধীনতা – আর কোন বিকল্প নেই তাঁর কাছে । এই নায়ক সব্যসাচী ইংরেজ ভক্ত ভারতীকে ইংরেজদের প্রকৃত স্বরূপ বোঝাতে চান । সেখানে  ক্যান্টন এর উদাহরণও তুলে ধরেন তিনি । বেনিয়া ইংরেজ ভারতে আসন গেড়েছে । মীর জাফরদের সহায়তায় রাষ্ট্র পরিচালনায় ইস্ট ইনডিয়া কোম্পানি । এখন লক্ষ্য চীন । ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত দেখা করেন চৈনিক রাজদরবারে । রাজা সাধু প্রকৃতির মানুষ । অতীব দয়ালু । তাঁর দেশে কোন কিছুর অভাব নেই । প্রজারা সুখে আছে । ইংরেজ অনেক দূর থেকে আসা মেহমান । তাঁরা যদি ব্যবসা করে খায়- অসুবিধা কি ? মহান রাজা  ক্যান্টনে ইংরেজদের ব্যবসা করার অনুমতি দেন । চীন সম্রাটের উদারতা মোক্ষম কাজে লাগায় ইংরেজ । নিজেদের কলোনি রাজ্য ভারতে কৃষকদের আফিম চাষ করতে বাধ্য করে তাঁরা । সেই আফিম জাহাজ বোঝাই করে নিয়ে যায় ক্যান্টনে । কয়েক বছরের মধ্যেই ক্যান্টনসহ উপকুলীয় অঞ্চলে মাদকাসক্ত লোকের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪০ লক্ষ থেকে ১ কোটি ২০ লক্ষে । এসব অঞ্চল খুন, রাহাজানি ও নৈরাজ্যের আখড়ায় পরিণত হয় । চীন সম্রাট বাধ্য হন মাদকদ্রব্য আমদানী নিষিদ্ধ করতে  । বাজারে থাকা সব আফিম বাজেয়াপ্ত করেন তিনি । একটা হিসাবমতে, সম্রাটের এই আদেশে ইংরেজদের ১৩০০ মেট্রিক টন আফিম বাজেয়াপ্ত হয় । এতে ব্রিটিশ রানী ক্ষুব্ধ হন। চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন তিনি। ইতিহাসে এ যুদ্ধ আফিম যুদ্ধ নামে পরিচিত। যুদ্ধে পরাজিত হয় চীন । অসম নানকিং চুক্তি (১৮৪২ )’র মাধ্যমে প্রথম আফিম যুদ্ধের অবসান হয় । পরাজিত চীনকে বাজেয়াপ্তকৃত আফিমের দাম, ক্ষতিপূরণ, যুদ্ধের ব্যয় সব মিলিয়ে ২১ মিলিয়ন সিলভার ডলার প্রদান করতে হয় বিজয়ী ইংরেজকে । এছাড়া হংকং দ্বীপটি  ইংরেজদের দক্ষিনা হিসাবে দেয়া ছাড়াও, ৫টি বন্দরনগরীতে ব্যবসা করার অনুমতি দিতে হয় চীনকে। এখানেই শেষ নয় । ইংরেজ মাদক ব্যবসাকে বৈধতা দেওয়া এবং শুল্কমুক্ত ব্যবসা সুবিধা পাওয়ার জন্য চীনের বিরুদ্ধে ১৮৫৬ সনে দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধ শুরু করে । সে যুদ্ধে ফ্রান্স অংশ নেয়। দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধেও চীন পরাজিত হয়। পরাজিত চীন ইউরোপীয় দেশের জন্য লুটপাটের একটা স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয় । বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের তথ্য অনুযায়ী দীর্ঘদিনের বৃহত্তম ও স্থিতিশীল চীনের অর্থনীতিতে ধ্বস নামে দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের পর ।  ঐতিহাসিকগণ চীনে ইংরেজ আগমনের পরবর্তী একশত বছর (১৮৩৯-১৯৩৯) চীনের জন্য অপমানকর শতবর্ষ (Century of Humiliation)  হিসাবে গণ্য  করেন । অথচ, গোটা ঘটনা ঘটে চীনের একজন দয়ালু রাজার উদারতা প্রদর্শনের কারণে । তাহলে বিদেশী মেহমানদের  প্রতি কোন দেশ কি মানবিক আচরণ করবে না ?

চীনের সভ্যতা অনেক প্রাচীন । অনেকের জন্য ঈর্ষনীয় । পৃথিবীর যে ৪ টি মৌলিক  আবিস্কার মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, সে ৪ টি আবিষ্কারই  চীনের । কাগজ, মুদ্রণযন্ত্র, কম্পাস ও গান পাওডার- সেই ৪ টি আবিষ্কারের নাম । অথচ, এই ৪ টি আবিষ্কারের সুফল ভোগ করে ইউরোপ । কম্পাস ব্যবহার করে সমুদ্র জয় করে তারা । কাগজ ও মুদ্রণযন্ত্র ব্যবহার করে রেনেসাঁ বিপ্লব ঘটে  ইউরোপে । চীনের আবিষ্কৃত গোলাবারুদে বলীয়ান ইংরেজ, চীনের কম্পাসের দিক নির্দেশনায় চীনে গিয়ে হাজির হয় । চীনের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়ায় তাঁরা । কিন্তু, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চীনের প্রেক্ষাপট বদলে যায় । বিপ্লবী মাও সে তুং চীনকে একটা  ভিন্ন মর্যাদায় দাঁড় করান । যদিও মাও সে তুং এর চীন এবং দেং জিয়াও পিং এর চীন এক নয় । তারপরও এই ভিন্নতা চীনের পিছনে তাকানো নয় । শুধু এগিয়ে যাবার জন্য । বর্তমানে সার্বিক বিচারে সফলতম একটি দেশের নাম চীন ।

ক্যান্টন ছাড়াও আমাদের ভ্রমণসূচিতে আছে শেনজেন, কুনমিং, হংকং- তারপর থাইল্যান্ড হয়ে স্বদেশ । হংকং এখন ব্রিটিশ হংকং নয় । চীনের  অংশ । থাইল্যান্ড মানে আমার ছেলেবেলায় পড়া শ্যামদেশ । শ্যামদেশের কথা পরে । আমি আসলে ফিরে যেতে চাই ক্যান্টনে । প্রায় দুইশত বছর আগের ক্যান্টনে ।  দুইশত বছর আগের ক্যান্টন থেকে আমি বর্তমানকে দেখতে চাই । মানুষের নৃশংসতা, লোভ, শঠতা, প্রবঞ্চনা ও প্রতারণার শেষ পরিণতি আমি জানতে চাই । দয়া, উদারতা,  মায়ামমতা- এসব মানবিক গুণাবলি কি শুধুই কথার কথা ? ব্যবহারিক কোনই মূল্য নেই ? আমি জানিনে আজকের আলোঝলমল গোয়াংঝুতে সেদিনের ক্যান্টনের কোন চিহ্ন আছে কি না । তারপরও আমি দেখতে চাই । ক্যান্টন  থেকে দেখতে চাই ।

৫ আগস্ট, ২০১৮ ।  আমি ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে ।    গোয়াংঝুর পথে । ফ্লাইটের সময় রাত ১২.৫০ । চায়না সাউদার্ন  এয়ারলাইন্স এর যাত্রী আমি । ৩ ঘণ্টা ৩৫ মিনিটের পথ । ৬ আগস্ট ।  সকাল ৬.২৫ । চীনের গোয়াংঝুতে আমি । আমার ছেলেবেলায় পড়া সেই ক্যান্টন ।

(চলবে)


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT